মামি সত্যি সত্যি চলে গেলেন। মা এবং বাবা অনেক বুঝিয়েও তাঁকে রাখতে পারলেন না। শত্রুপক্ষ চলে যাওয়ায় আমার খুশি হওয়া উচিত, কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, আমার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। চোখে পানি এসে গেল। তবু এমন ভাব করলাম যেন খুব খুশি হয়েছি।
রাতে বড়মামার ঘরে গিয়েছি। মামা বললেন, এবার নিশ্চিন্ত মনে লেখালেখি করা যাবে, কী বলিস ?
তবে আমি ঠিক করেছি মেয়েটাকে একটা শিক্ষা দেব। ওর ধারণা আমি বােকা।
ভুল ধারণা মামা ?
ভুল ধারণা তাে বটেই। পরীক্ষায় পাস করলেই মানুষ বুদ্ধিমান হয় না। বরং ইতিহাস পর্যালােচনা করে দেখা যায়, গাধাটাইপ ছেলেপুলে পরীক্ষায় ফাস্ট সেকেন্ড হয়। পাঠ্যবই ছাড়া এরা আর কিছু বুঝে না। বইয়ের পােকা ছাড়া তাদের অন্যকিছু ভাবা ঠিক না।
তুমি মামিকে কীভাবে শাস্তি দেবে ?
পরীক্ষায় ফার্স্ট সেকেন্ড হয়ে দেখিয়ে দেব এটা কিছুই না। বরং হাতির ছবি আঁকা এরচে অনেক কঠিন।
ফার্স্ট–সেকেন্ড কীভাবে হবে ? সব মুখস্থ করে ফেলব । ঝাড়া মুখস্থ। দাড়ি–সেমিকোলনসহ। পারবে ?
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
পারব না কেন? মানুষের অসাধ্য কিছুই নেই। একটু কষ্ট হবে, উপায় কী? কবিতা মুখস্থ করা সহজ। ইতিহাস, লজিক এইসব মুখস্থ করা কঠিন। তবে অসাধ্য কিছু না। কাল থেকে মুখস্থ করা শুরু করব।
মামা বই মুখস্থ করা শুরু করে দিলেন। বড়ই কঠিন কাজ। এক পাতা মুখস্থ করে মাথা গরম হয়ে যায়, তখন রবীন্দ্রনাথের কবিতা পড়ে মাথা খানিকটা ঠাণ্ডা করে দ্বিতীয় পাতা মুখস্থ করেন। তৃতীয় পাতা মুখস্থ করার পর দেখা যায় প্রথম পাতাটা ভুলে গেছেন। আবার গােড়া থেকে শুরু করতে হয়। মামা হাল ছাড়েন।
প্রতিভাবান মানুষরা সহজে হাল ছাড়েন না। সাধারণ মানুষের সাথে এইখানেই তাদের তফাত। মামা তাে আর সাধারণ মানুষ না।
এইবার গল্পের শেষটা বলি।
মামি আমাদের সাথে আছেন। পরীক্ষা দিতে এসেছিলেন। পরীক্ষা দেয়ার পর আর ফিরে যান নি। অবশ্যি মামার সাথে তার ভাব হয় নি। রাতে শেফুর সাথে ঘুমান। মামার সাথে কখনাে দেখা হলে মুখ অন্যদিকে ফিরিয়ে রাখেন। বড় মামা তার মুখ দেখতে চান না— এটা বােধহয় তার খুব মনে লেগেছে। বড়রা ছােটদের মতাে না। কেউ কোনাে একটা কথা বললে তারা অনেক দিন মনে পুষে রাখেন।
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
যাই হােক, এসব নিয়ে আমরা এখন মােটেই চিন্তিত না। আমাদের নিঃশ্বাস ফেলার সময় নেই। নতুন নাটকের রিহার্সেল হচ্ছে। এবারের নাটকও রাজকুমারী সুবর্ণরেখাকে নিয়ে । খুব করুণ নাটক। আগের বারের চেয়েও অনেক করুণ। নাটক দেখতে হলে চোখ মােছার জন্যে রুমাল আনলে চলবে না। বিছানার চাদর আনতে হবে, এমন অবস্থা। আই. এ. পরীক্ষার রেজাল্ট হবার আগেই নাটক নামিয়ে ফেলতে হবে।
না, পরীক্ষা নিয়ে মামার কোনাে ভয় নেই। খুব ভালাে পরীক্ষা দিয়েছেন, বাংলা পরীক্ষায় তিনটা বাড়তি খাতা নিয়েছেন। এই অবস্থায় নিজেকে নিয়ে তার চিন্তা নেই। তবে তার ধারণা রেজাল্টের পর মামি যখন দেখবে কাগজে তাঁর নাম নেই আর মামার নাম প্রথম বিভাগে তখন ভয়াবহ শক খাবে। এই অবস্থায় মামি নাটক দেখতে উৎসাহ পাবে না।
আমি বললাম, মামি নাটক না দেখলে কী হবে ? না দেখলেই তাে ভালাে। আগের বারের মতাে হাসাহাসি করবে।
মামা বললেন, তাের মামিকে দেখানাের জন্যেই এই নাটক। ওর কথা মনে করেই লেখা।
কেন ?
ওর ধারণা আমার প্রতিভা নেই। নাটক দেখলে বুঝবে প্রতিভা কত প্রকার ও কী কী ?
আমাদের রিহার্সেল পুরােদমে চলছে। এর মধ্যে বিনা মেঘে বজ্রপাতের মতাে আগে আগে আই. এ. পরীক্ষার রেজাল্ট হয়ে গেল। বাবা গম্ভীর মুখে খবরের কাগজ নিয়ে ঘরে এলেন। মামা হাসিমুখে বললেন, অবস্থা কী দুলাভাই ?
কিছু শৈশব-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ
বাবা বললেন, অবস্থা ভালােই।
মামা বললেন, অবস্থা যে ভালাে তা জানি । কতটা ভালাে সেটা বলেন। ফার্স্ট ডিভিশনে আছি?
বাবা গম্ভীর গলায় বললেন, খবরের কাগজে তােমার নাম নেই। কোথাও খুঁজে পেলাম না।
ও আচ্ছা।
আগের তিনবার যেমন ছাপাখানার ভুলে তােমার নাম উঠে নি, এবারাে বােধহয় তাই হয়েছে।
বড়মামা পাঞ্জাবি গায়ে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেলেন। তিনি চলে যাবার পর জানলাম নতুন মামি পাস করেছেন। তিনটা মেয়ে ফার্স্ট ডিভিশন
পেয়েছে। মামি ঐ তিনজন মেয়ের মধ্যে প্রথমজন।
বড়দের কাণ্ডকারখানা আমি কিছু বুঝি না। মামি পাস করেছেন, তার শত্রু ফেল করেছে, মামির উচিত খুশি হওয়া। তিনি কেঁদে–টেদে অস্থির হয়ে। গেলেন। কেউ তাঁকে সান্ত্বনা দিতে পারছে না।
মা’কে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বললেন, আহা বেচারা কী কষ্টটাই না পাচ্ছে। আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। আমার সত্যি মরে যেতে ইচ্ছে করছে।
দুপুরে বড়মামা খেতে এলেন না। মামিও খেলেন না। দরজা বন্ধ করে কাদতে লাগলেন। মামা মুখ শুকনাে করে রাতে ফিরলেন। আমাকে ফিসফিস করে বললেন, তাের মামিকে একটু আমার ঘরে আসতে বল তাে।
আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, কেন ? সে এত ভালাে একটা রেজাল্ট করেছে, তাকে অভিনন্দন দেওয়া উচিত না ? মেয়েদের মধ্যে ফার্স্ট হয়েছে। সহজ কথা তাে না । নিতান্ত গ্রামের একটা মেয়ে। যা করেছে নিজের চেষ্টায় করেছে। কিছু ফুল নিয়ে এসেছি, ভাবছি ফুলগুলাে দেব। এমন পচা শহর, ফুল পাওয়া যায় না। দশটা গােলাপ জোগাড় করতে জীবন বের হয়ে গেছে ।
আমি বললাম, তােমার ঘরে আসতে বললে মামি আসবে বলে তাে মনে হয় না।
আসবে না ?
আমারও তাই ধারণা । না এলে ফুলগুলাে চুপিচুপি দিয়ে আসিস।
Read more