নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

পুষ্প বলল, বাবা এখন কি উনাকে খাবার দিয়ে আসবে? এগারােটা বাজতে পাঁচ মিনিট বাকি। খাবার গরম করব? 

মােফাজ্জল করিম বিছানায় শুয়ে ছিলেন।সারাদিনের ক্লান্তিতে তার তন্দ্রার মত এসে গিয়েছে।

নীল অপরাজিতামেয়ের কথায় উঠে বসলেন। 

‘খাবার গরম করব বাবা? ‘করে ফেল। “তােমার কি শরীর খারাপ করেছে? 

‘মন খারাপ নাকি বাবা ?” করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, মন খারাপ হবে কেন? 

ঐযে ভদ্রলােক আমাদের সঙ্গে খেতে এলেন না। তুমি এত আগ্রহ করে। সবাইকে দাওয়াত টাওয়াত করলে। 

লেখক মানুষ, তাঁদের মন টন অন্য রকম।। “লেখক হলেই বুঝি অভদ্র হতে হবে? 

‘এই ধরনের মানুষরা ভদ্রতার ধার ধারেন না। তাদের যা ইচ্ছা করেন। কে কি ভাবল এইসব নিয়ে মাথা ঘামান না। এইসব নিয়ে মাথা ঘামাই আমরা – সাধারণ মানুষরা। 

পুষ্প কেরােসিনের চুলায় খাবার গরম করছে। করিম সাহেব মেয়ের পাশে এসে বসেছেন। মেয়েটা অনেক কষ্ট করেছে। সারাদিন একা একা রান্না বান্না করেছে। গায়ে জ্বর ছিল, জ্বর নিয়েই করতে হয়েছে। অন্য সময় মতির মা সাহায্য করে। গত তিন দিন ধরে মতির মা‘ও আসছে না। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

‘পুষ্প তাের গায়ে কি জ্বর আছে?” ‘না। ‘দেখি হাতটা দেখি। পুষ্প হাত বাড়িয়ে দিল। করিম সাহেব লক্ষ্য করলেন – হাত তপ্ত। “না বললি কেন? জ্বর আছে তাে। ‘আগুনের কাছে বসে আছি এই জন্যেই গা গরম। বাবা ভদ্রলােক কি খুব 

রাগী ? 

‘আরে দূর। রাগী হবে কেন? কথা কম বলেন। কেউ কথা বেশী বললেও বিরক্ত হন। 

‘তাহলেতাে তােমার উপর খুব বিরক্ত হয়েছেন। তুমি যা কথা বল। ‘আমি বেশী কথা বলি ?” 

বল। মন ভাল থাকলে অনর্গল কথা বল। এতক্ষণ কথা না বলে চুপচাপ শুয়ে ছিলে তাই ভাবলাম তােমার মন বােধ হয় খারাপ। 

‘আমার মন মােটেই খারাপ না। খুবই ভাল। এতবড় একজন মানুষ আমাদের সঙ্গে আছেন – ভাবতেই কেমন লাগে। গত সপ্তাহে ক্লাস সিক্সের রেপিড রীভারে উনার যে গল্পটা আছে সেটা ছাত্রদের বুঝিয়ে দিলাম। 

‘কোন গল্পটা ?” ‘মতিনের সংসার। ‘গল্পটা বেশী ভাল না। ‘কি বলিস তুই ভাল না। অসাধারণ গল্প। 

‘আমার কাছে অসাধারণ মনে হয় নি। বাবা, সব কিছু গরম হয়ে গেছে। তুমি ইউনুসকে বল, উপরে নিয়ে যাক। 

‘ইউনুস নিয়ে যাবে কি? আমি নিয়ে যাব। এতবড় একজন মানুষের খাবার আমি স্কুলের দপ্তরীকে দিয়ে পাঠাব? কি ভাবিস তুই আমাকে? 

পুষ্প ক্ষীণ স্বরে বলল, বাবা আমি কি তােমার সঙ্গে আসব ? ‘আয়। আসবি না কেন? পরিচয় করিয়ে দিব। “উনি আবার রাগ করবেন না তাে? 

‘রাগ করবেন কেন? রাগ ঘৃণা এইসব হচ্ছে আমাদের সাধারণ মানুষের ব্যাপার। উনারাতাে সাধারণ মানুষ না। এই যে সন্ধ্যাবেলায় এসে বারান্দায় বসেছেন – এখনাে গিয়ে দেখবি সেই একইভাবে বসে আছেন। 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

‘মনে হয় খুব অলস ধরনের মানুষ। ‘অলস ধরনের মানুষ এইভাবে বসে থাকে না। শুয়ে ঘুমায়। “বাবা, আমি কি এই কাপড়টা পরে যাব না বদলাব?’ ‘বদলে ভাল শাড়ি পর। হাত মুখটা ধুয়ে নে। 

উনি আবার ভাববেন নাতাে যে উনার সঙ্গে দেখা করার জন্যে, শাড়ি বদলে সেজেগুজে গেছি।‘ 

‘কিছুই ভাববেন না। এই ধরনের মানুষ — কে কি পরল, না পরল, কে 

সাজল কে সাজল না এইসব নিয়ে মােটেও মাথা ঘামান না। তাঁদের অনেক বড় ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করতে হয়। ছােট ব্যাপার নিয়ে চিন্তা করার সময়ই তাদের নেই। 

‘কিন্তু বাবা উনিতাে ঔপন্যাসিক। ঔপন্যাসিকরা নিশ্চয়ই এইসব ব্যাপার খুব খুঁটিয়ে দেখেন। না দেখলে লিখবেন কি করে?” 

‘সেটাও একটা কথা। তাহলে থাক, কাপড় পাল্টানাের দরকার নেই। 

“না বাবা কাপড় পাল্টেই যাই। আমাকে দশ মিনিট সময় দাও বাবা, গােসল করে ফেলি। 

‘জর গায়ে গােসল করবি?” ‘রান্না বান্না করেছি। গা কুট কুট করছে।” ‘আবার তাে সব ঠাণ্ডা হবে। 

‘আবার গরম করব। বাবা, আরেকটা কথা, আমি কি উনাকে পা ছুঁয়ে। সালাম করব? শওকত সাহেব বারান্দা ছেড়ে ঘরে ঢুকেছেন। 

স্যুটকেস খুলে দেখছেন রেনু জিনিসপত্র কি দিয়ে দিয়েছে। এক গাদা বই থাকবে বলাই বাহুল্য। ঢাকায় বই পড়ার সময় তেমন হয় না। বাইরে এলে বই পড়ে প্রচুর সময় কাটান। রেনু তার নিজের পছন্দের বই এক গাদা দিয়ে দেয়। তার মধ্যে মজার মজার কিছু বই থাকে। যেমন এবারের বইগুলির মধ্যে একটা হল – অষ্টাঙ্গ সংগ্রহ। গ্রন্থ পরিচয়ে লেখা – আয়ুর্বেদ শাস্ত্রের মূলতত্ত্ব বিষয়ক গ্রন্থ। এই বই দেয়ার মানে কি? রেনু কি তাকে আয়ুর্বেদে পণ্ডিত বানাতে চায় ? তিনি কয়েক পাতা ওল্টালেন। বিচিত্র সব কথাবার্তা বইটিতে লেখা 

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৬)-হুমায়ূন আহমেদ

“পান খাওয়ার নিয়ম ও পূর্বাহ্নে সুপারি অধিক দিয়া, মধ্যাহ্নে খয়ের অধিক দিয়া ও রাত্রে চূন অধিক দিয়া পান খাইতে হয়। পানের অগ্রভাগ, মূলভাগ, ও মধ্যভাগ বাদ দিয়া পান খাইতে হয়। পানের মূল ভাগ খাইলে ব্যাধি, মধ্যভাগে আয়ুক্ষয় এবং অগ্রভাগ খাইলে পাপ হয়। পানের প্রথম পিক বিষতুল্য, দ্বিতীয় পিক দুর্জর, তৃতীয় পিক সুধাতুল্য উহা খাওয়া উচিত।” 

“স্যার আসব ? 

শওকত সাহেব তাকিয়ে দেখেন করিম সাহেব তার মেয়েকে নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। দুজনের হাতে দুটি ট্রে। রাতের খাবার। পেছনে পেছনে আরেকজন আসছে। তার হাতে, পানির জগ, গ্লাস, চিলুমচি।

 

Read more

নীল অপরাজিতা-পর্ব-(৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *