সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

‘ ফেলুদা আপত্তি করল না। আমরা তিনজনে গিয়ে কোয়ালিটিতে ঢুকলাম। ওরা দুজনে চা আর আমি কোকা-কোলা অডার দিলাম। মহাবীর বলল, ‘আপনি নিজে ক্রিকেট খেলেন ?

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড ফেলুদা বলল, খেলতাম। স্লো স্পিন বল দিতাম। লখনৌয়ে ক্রিকেট খেলে গেছি।…আর আপনি! ‘আমি ভুল স্কুলে ফাস ইলেভেলে খেলেছি। বাবাও স্কুলে থাকতে ভাল খেলতেন।’ পিয়ারিলালের কথা বলেই মহাবীর কেমন জানি গম্ভীর হয়ে গেল। ফেলুদা চা ঢালতে ঢালতে বলল, “আপনি আংটির ঘটনাটা জানেন নিশ্চয়ই। “হ্যাঁ । ডক্টর শ্রীবাস্তবের বাড়ি গিয়েছিলাম। উনি বললেন। ‘আপনার বাবার যে আংটি ছিল, আর উনি যে সেটা শ্রীবাস্তবকে দিয়েছিলেন সেটা আপনি জানতে তো ? 

‘বাবা আমাকে অনেকদিন আগেই বলেছিলেন যে আমাকে ভাল করে দেবার জন্য শ্রীবাস্তবকে উনি একটা কিছু দিতে চান। সেটা যে কী, সেটা অবিশ্যি আমি বাবা মারা যাবার পর শ্রীবাস্তবের কাছেই জেনেছি।’ তারপর হঠাৎ ফেলুদার দিকে তাকিয়ে মহাবীর বলল, কিন্তু আপনি এ ব্যাপারে এত ইন্টারেস্ট নিয়েছেন কেন ? 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

ফেলুদা একটু হেসে বলল, “ওটা আমার একটা শখের ব্যাপার।’ মহাবীর চায়ে চুমুক দিয়ে একটু যেন অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। ফেলুদা বলল, আপনার বাড়িতে আর কে থাকে ? ‘আমার এক বুড়ি পিসিমা আছেন, আর চাকর-বাকর।’ ‘চাকর-বাকর কি পুরনো ? ‘সবাই আমার জন্মের আগে থেকে আছে। অথাৎ কলকাতায় থাকার সময় থেকে প্রীতম সিং বেয়ারা আছে আজ পঁয়ত্রিশ বছর। ‘ ‘আংটিটার মতো আর কোনও জিনিস আপনার বাবার কাছে ছিল ? ‘বাবার এ-শখটার কথা আমি প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এটা অনেক দিন আগের ব্যাপার । তখন আমি খুবই ছােট। এবার এসে এই সেদিন বাবার একটা সিন্দুক খুলেছিলাম, তাতে বাদশাহী আমলের আরও কিছু জিনিস পেয়েছি। তবে আংটিটার মতো অত দামি বােধহয় আর কোনওটা নয়।’ 

আমি ‘স্ত্র দিয়ে আমার ঠাণ্ডা কোকা-কোলায় চুমুক দিলাম । মহাবীর একটুক্ষণ চুপ করে থেকে গলাটা একটু নামিয়ে নিয়ে বলল, প্রীতম সিং একটা অদ্ভুত কথা বলেছে আমাকে।’ ফেলুদা চুপ করে অপেক্ষা করতে লাগল। রেস্টুরেন্টের চারিদিকে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে ফেলুদার দিকে একটু ঝুঁকে পড়ে মহাবীর বলল, বাবার যেদিন দ্বিতীয় বার হার্ট অ্যাটাক হল, সেদিন সকালে অ্যাটাকটা হবার কিছু আগেই প্রীতম সিং বাবার ঘর থেকে বাবারই গলায় একটা আর্তনাদ শুনতে পেয়েছিল।’ 

‘বটে ? 

কিন্তু প্রীতম সিং তখন খুব বিচলিত হয়নি, কারণ বাবার মাঝে মাঝে কোমরে একটা ব্যাথা হত, তখন চেয়ার বা বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াবার সময় উনি একটা আর্তনাদ করতেন। কিন্তু তা সত্ত্বেও কারুর সাহায্য নিতেন না। প্রীতম সিং প্রথমে ভেবেছিল ব্যথার জন্যই উনি চিৎকার করছেন, কিন্তু এখন বলে যে ওর হয়তাে ভুল হতে পারে, কারণ চিৎকারটা ছিল বেশ জোরে।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

‘আচ্ছা, সেদিন আপনার বাবার সঙ্গে কেউ দেখা করতে গিয়েছিলেন কি না সে খবর আপনি জানেন ? প্রীতম সিং-এর কিছু মনে আছে কি ? | সে কথা আমি ওকে জিজ্ঞেস করেছি, কিন্তু ও ডেফিনিটলি কিছু বলতে পারছে না। সকালের দিকটায় মাঝে মাঝে বাবার কাছে লােকজন আসত-~-কিন্তু বিশেষ করে সেদিন ওঁর কাছে কেউ এসেছিল কি না সে কথা প্রীতম বলতে পারছে না। প্রীতম যখন বাবার ঘরে গিয়েছিল, তখন ওঁর অবস্থা খুবই খারাপ, আর তখন ঘরে অন্য কোনও লােক ছিল না । তারপর প্রীতমই ফোন করে শ্রীবাস্তবকে আনায়। বাবার হার্টের চিকিৎসা যিনি করতেন———ডক্টর গ্ৰেহ্যাম–তিনি সেদিন এলাহাবাদে ছিলেন একটা কনফারেন্সে।’ 

আর স্পাই ব্যাপারটা সম্বন্ধে আপনার কী ধারণা ? ‘স্পাই ?–মহাবীর যেন আকাশ থেকে পড়ল। ‘ও, তা হলে আপনি এটা জানেন না। আপনার বাবা শ্রীবাস্তবকে ‘স্পাই’ সম্বন্ধে কী যেন বলতে গিয়ে কথাটা শেষ করতে পারেননি। 

মহারীর মাথা নেড়ে বলল, এটা আমার কাছে একেবারে নতুন জিনিস। এ সম্বন্ধে আমি কিছুই জানি না, আর বাবার সঙ্গে গুপ্তচরের কী সম্পর্ক থেকে থাকতে পারে তা আমি কল্পনাই করতে পারছি না।’ | আমি কোকো-কোলাটাকে শেষ করে সবে স্ত্র-টাকে দুমড়ে দিয়েছি, এমন সময় দেখলাম একজন ষণ্ডা মাকা লােক আমাদের কাছেই একটা টেবিলে বসে চা খেতে খেতে আমাদেরই দিকে দেখছে। আমার সঙ্গে চোখাচোখি হতেই ভদ্রলােক টেবিল ছেড়ে উঠে এগিয়ে এলেন, আর ফেলুদার দিকে ঘাড়টা কাত করে বললেন, ‘নমস্কার । চিনতে পারছেন ? ‘হ্যাঁ-কেন পারব না। ‘

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

আমি প্রথমে চিনতে পারিনি, এখন হঠাৎ ধাঁ করে মনে পড়ে গেল-ইনিই বনবিহারীবাবুর বাড়িতে থাকেন আর ওঁর চিড়িয়াখানা দেখাশােনা করেন। ভদ্রলােকের থুতনিতে একটা তুলাের উপর দুটো স্টিকিং প্লাস্টার ক্রসের মতাে করে লাগানাে রয়েছে। বােধহয় দাড়ি কামাতে গিয়ে কেটে গেছে ।ফেলুদা বলল, বসুন । ইনি হচ্ছেন মহাবীর শেঠ–আর ইনি গণেশ গুহ। এবার লক্ষ করলাম যে ভদ্রলােকের ঘাড়েও একটা আঁচড়ের দাগ রয়েছে—যদিও এ দাগটা পুরনাে। 

ফেলুদা বলল, “আপনার থুতনিতে কী হল ? গণেশবাবু তার নিজের টেবিল থেকে চায়ের পেয়ালাটা তুলে এনে আমাদের টেবিলে রেখে বলল, “আর বলবেন না–সমস্ত শরীরটাই যে অ্যাদ্দিন ছিড়ে ফুড়ে শেষ হয়ে যায়নি সেই ভাগ্যি। আমার চাকরিটা কী সে তাে জানেনই।’ ‘জানি। তবে আমার ধারণা ছিল চাকরিটা খুশি হয়েই করেন আপনি। 

‘পাগল ! সব পেটের দায়ে । এক কালে বিজু সাকাসের বাঘের ইন-চার্জ ছিলুম-তা সে বাঘ তাে আফিম খেয়ে গুম হয়ে পড়ে থাকত। বনবিহারীবাবুর এই সব জানােয়ারের কাছে তাে সে দুগ্ধপােষ্য শিশু । সেদিন বেড়ালের আঁচড়, আর কাল এই থুতনিতে হাইনার চাপড় ! আর পারলাম না। সকালে গিয়ে বলে এসেছি-~~~-আমার মাইনে চুকিয়ে দিন। আমি ফিরে যাচ্ছি সাকাস পার্টিতে। তা ভদ্রলােক রাজি হয়ে গেলেন। 

ফেলুদা যেন খবরটা শুনে অবাক হয়ে গেল। বলল, ‘সেকী, আপনি বনবিহারীবাবুর চাকরি ছেড়ে দিলেন ? কাল বিকেলেও তো আমরা ওঁর ওখানে ঘুরে এলাম।’ 

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

‘জানি। শুধু আপনারা কেন, অনেকেই যাবেন। কিন্তু আমি আর ও তল্লাটেই নয়। এই এখন স্টেশনে যাব, গিয়ে হাওড়ার টিকিট কাটব। বাস-ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে গিয়ে নিশ্চিস্তু। আর ভদ্রলােক নিচু হয়ে ফেলুদার কানের কাছে মুখ নিয়ে এলেন, একটা কথা বলে যাই-উনি লােকটি খুব সুবিধের নন। 

‘বনবিহারীবাবু ? ‘আগে ঠিকই ছিলেন, ইদানীং হাতে একটি জিনিস পেয়ে মাথাটি গেছে বিগড়ে।’ ‘কী জিনিস ? ‘সে আর না হয় নাই বললাম’-বলে গণেশ গুহ তার চায়ের পয়সা টেবিলের উপর ফেলে দিয়ে রেস্টুরেন্ট থেকে হাওয়া হয়ে গেল। ফেলুদা এবার মহাবীরের দিকে ফিরে বললেন, আপনি দেখেছেন বনবিহারীবাবুর চিড়িয়াখানা ? 

“ইচ্ছে ছিল যাওয়ার কিন্তু হয়নি। বাবার আপত্তি ছিল। ওই ধরনের জানােয়ার-টানােয়ার উনি একদম পছন্দ করতেন না। একটা আরশােলা দেখলেই বাবার প্রায় হার্ট প্যালপিটেশন হয়ে যেত। তবে এবার ভাবছি একদিন গিয়ে দেখে আসব।’ মহাবীর তুড়ি মেরে বেয়ারাকে ডাকল। ফেলুদা অবিশ্যি চায়ের দামটা দিতে চেয়েছিল, কিন্তু মহাবীর দিতে দিল না। আমি মনে মনে ভাবলাম যে ফিল্মের অ্যাক্টরের অনেক টাকা, কাজেই মহাবীর দিলে কোনও ক্ষতি নেই। 

বিলটা দেবার পর মহাবীর তার সিগারেটের প্যাকেটটা বের করে ফেলুদার দিকে এগিয়ে দিল। দেখলাম প্যাকেটটা চারমিনারের। ‘আপনি কদিন আছেন ?’ মহাবীর জিজ্ঞেস করল। ‘পরশু দিন-দুয়েকের জন্য হরিদ্বার যাচ্ছি, তারপর ফিরে সে বাকি এ মাসটা আছি।’ ‘আপনারা সবাই যাচ্ছেন হরিদ্বার ? ‘ধীরেনবাবুর কাজ আছে তাই উনি যাবেন না। আমরা তিনজন যাচ্ছি, আর বােধ হয় বনবিহারীবাৰু। উনি লছমনঝুলায় একটা অজগরের সন্ধানে যাচেছন।

ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৬)

রেস্টুরেন্টের বাইরে এসে পড়লাম। মহাবীর বলল, আমার কিন্তু গাড়ি আছে—আমি লিফট দিতে পারি।’  ফেলুদা ধন্যবাদ দিয়ে বলল, না, থাক। মােটর তাে কলকাতায় হামেশাই চড়ি। এখানে টাঙ্গাটা বেড়ে লাগছে।’ 

এবার মহাবীর ফেলুদার কাছে এসে ওর হাতটা নিজের হাতের মুঠোর মধ্যে নিয়ে বলল, ‘আপনার সঙ্গে আলাপ করে সত্যিই ভাল লাগল। একটা কথা আপনাকে বলছি—যদি জানতে পারি যে বাবার মৃত্যু স্বাভাবিক ভাবে হয়নি, তার জন্য অন্য কেউ দায়ী, তা হলে সেই অপরাধী খুনিকে খুঁজে বার করে তার প্রতিশােধ আমি নেবই।

আমার বয়স বেশি না হতে পারে, কিন্তু আমি চার বছর মিলিটারি অ্যাকাডেমিতে ছিলাম। রিভলভারের লাইসেন্স আছে, আমার মতো অব্যর্থ টিপ খুব বেশি লােকের নেই । …গুড বাই।’ মহাবীর রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে একটা কালাে স্ট্যান্ডার্ড গাড়িতে উঠে হুশ করে বেরিয়ে চলে গেল । 

ফেলুদা খালি বলল, ‘সাবাস।’আমি মনে মনে বললাম, ফেলুদা যে বলেছিল প্যাঁচের মধ্যে প্যাঁচ সেটা খুব ভুল নয়। টাঙ্গার খোঁজে আমরা হাঁটতে শুরু করলাম। এটাও বুঝতে পারছিলাম যে ব্লেড জিনিসটার খুব বেশি দরকার বােধহয় ফেলুদার নেই।

 

Read More

সত্যজিৎ রায় এর ফেলুদা সমগ্র ১ম খণ্ড (পর্ব-২৭)

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *