স্যার আমি টেলিফোন করতাম না খুব জরুরি কারণে টেলিফোন করেছি। সময় জানার জন্যে টেলিফোন করেছি। আমার ঘরে কোনো ঘড়ি নেই। মা’র ঘরে ঘড়ি। মা দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়েছেন। আমি তো ঘুম থেকে ডেকে তুলে সময় জিজ্ঞেস করতে পারি না।এখন বাজছে এগারোটা দশ।ও এত কম? আমি ভেবেছি বারটার উপর বাজে। সার Thank you সময় বলার জন্যে। আপনি কি এখন ঘুমুতে যাবেন?
হ্যাঁ।আমার ঘুম আসছে না। স্যার কী করি বলুন তো? ঘুমের ওষুধ খেয়ে শুয়ে পড়।ঘুমের ওষুধ কই পাব? মা’র কাছে অবশ্যি আছে। আমি যদি মার কাছে ঘুমের ওষুধ চাই তাহলে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটবে।তাহলে না ঘুমিয়ে রাত পার করে দাও।ম্যাডাম কেমন আছেন স্যার? ভালো আছে।আসল কথা বলতে ভুলে গেছি। স্যার আমি আপনার বাসায় গিয়েছিলাম।ঠিকানা কোথায় পেয়েছ?
ঠিকানা তো আপনিই দিয়েছেন। স্যার আপনার এত ভুলো মন কেন? আপনি হচ্ছেন Absent minded professor, আচ্ছা, স্যার আপনি কি Absent minded professor ছবিটি দেখেছেন? না। খুবই হাসির ছবি। হাসতে হাসতে আপনার দম বন্ধ হয়ে যাবে। হেঁচকি উঠে যাবে। Walt disney-র ছবি। ছবিটার একটা DVD আমার কাছে আপনি চাইলে আপনাকে দিতে পারি।
দরকার নেই। নীতু আমি এখন শুয়ে পড়ব।এত সকাল সকাল কেন ঘুমিয়ে পড়বেন? এখন তো ইচ্ছা করলেই আপনি রাত জাগতে পারেন। সকালে উঠে কলেজে দৌড়াতে হবে না। আচ্ছা ঠিক আছে, ঘুমিয়ে পড়ুন। আপনি আরাম করে ঘুমাবেন আর আমি জেগে থাকব। কী বিশ্রী! স্যার শেষ এক মিনিট কথা বলি?
বলো।আমি এমন একটা মিসটেক করেছি, বুঝতে পারার পর নিজের গালে নিজে কয়েকবার চড় মেরেছি। তবে তাতে তো আর কোনো লাভ হবে না। মিসটেকটা হচ্ছে- বান্ধবীদের সঙ্গে আপনার বাসায় আসার ব্যাপারটা গল্প করেছি। এরা তার অন্য মিনিং বের করেছে।
কী মিনিং? খারাপ মিনিং।খারাপ মিনিংটা কী? এটা স্যার আমি অপানাকে বলতে পারব না। আমার বয়েসী মেয়েরা তো গসিপ পছন্দ করে। এই গসিপটা খুব ছড়িয়েছে।নীতু রাখি। ঘুমে আমার চোখ বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।আচ্ছা। স্যার ঘুমান।হেদায়েত বিছানায় শোয়া মাত্র আবার টেলিফোন বেজে উঠল। আজ মনে হয় টেলিফোন দিবস। সবচেয়ে ভালো বুদ্ধি লাইনটা খুলে রাখা। হেদায়েত আবার উঠে টেলিফোন ধরল। হ্যালো। কে?
কেউ কথা বলছে না। ওপাশ থেকে শো শো শব্দ আসছে। শঙ্খে কান রাখলে যেমন শব্দ আসে তেমন শব্দ। হেদায়েত বলল, কে ভাইজান? ক্ষীণ স্বরে কেউ একজন যেন বলল, হুঁ।ভাইজান তুমি কোথায়? হ্যালো হ্যালো।আর কোনো শব্দ আসছে না। এমন কী হতে পারে যে ভাইজান টেলিফোন পর আছেন, কোনো কারণে কথা বলতে চাচেছন না। হেদায়েতের উচিত কথা চালিয়ে যাওয়া।
ভাইজান আমরা ভালো আছি। তুমি কোথায় লুকিয়ে আছ? ভাবি খুব দুশ্চিন্তা করছেন। তোমার সমস্যাটা কী আমাকে বলো। আমাদের খবর ভালো। তবে আমি মনে হয় পাগল হয়ে যাচ্ছি। আমি ঠিক করেছি এখন থেকে ডায়েরি লিখব। এতে প্রতিদিনকার কথা লেখা থাকবে। ধীরে ধীরে কীভাবে পাগল হচ্ছি সেটা বোঝা যাবে।
সেতু ভালো আছে। তার ছবিটার নাম বদল হয়েছে। তারা একটা কমার্শিয়াল নাম দিয়েছেন— দুষ্ট প্রজাপতি। সিনেমার কারণে সেতু তার নিজের নাম বদলে রেখেছে দিলরুবা। সিনেমা জগতের নিয়ম হচ্ছে, পুরনো সব ফেলে দিয়ে নতুন করে সব করতে হয়। বিবাহিতা মেয়েদের ছবি দর্শক দেখে না। এই কারণে দিলরুবা অর্থাৎ সেতু হয়তো বিবাহ বিচ্ছেদের দিকে যাবে। আমি এখনও নিশ্চিত না।
তোমার খোঁজ লাগানোর আমরা নানান চেষ্টা করছি। কোনোটাতে লাভ হচ্ছে না। তোমার বাসায় একজন জিন সাধক রাখা হয়েছে। তার নিজস্ব পোষা জিন আছে। জিনের নাম হাফসা। জিন সাধক রোজই হাফসাকে নানান জায়গায় পাঠাচ্ছেন। সে এখনও কোনো খবর আনতে পারছে না। আমার কাছে পুরো বিষয়টাই মিথ্যা বলে মনে হচ্ছে। তোমার কী ধারণা?
তোমার কাষ্ঠ বিতানে একদিন গিয়েছিলাম। সেখানে তোমার একটা অদ্ভুত ক্ষমতার কথা শুনে মুগ্ধ হয়েছি। তুমি না-কি চোখ বন্ধ করে শুধু কাঠের গন্ধ কে বলতে পার এটা কোন গাছের কাঠ?
হ্যালো। ভাইজান হ্যালো। আমার কথা শুনতে পাচ্ছ? হেনা ভাবির একটা কথা বলতে ভুলে গেছি, উনি রোগা হয়ে গেছেন। দেখলে তুমিও চিনতে পারবে না। BMা স্বাভাবিক পর্যায়ে নেমে এসেছে বলে আমার ধারণা। যদিও আমি মাপি নাই। BMI মনে আছে তো বডি মাস ইনডেক্স। আঠারো থেকে বিশের মধ্যে হবার কথা। কিলোগ্রামে শরীরের ওজনকে বড়ি মাসের স্কয়ার দিয়ে ভাগ করতে হবে।হ্যালো। হ্যালো। ভাইজান হ্যালো।
হেদায়েতের লেখা প্রথম দিনের ডায়েরি আজ ২১ তারিখ। একুশ সংখ্যা হিসাবে খারাপ না। তিন এবং সাত দিয়ে বিভাজ্য। পিথাগোরাসের মতে, তিন এবং সাত এই দুটি সংখ্যাই Magical. নিউমারোলজিতে একুশ হলো তিন। তারা ২১-কে ২+১ হিসেবে তিন করে। এটি একটি হাস্যকর প্রক্রিয়া।
ভাইজান নিখোঁজ আছেন সতেরোদিন ধরে। সতেরো একটা প্রাইম সংখ্যা। এবং আমার খুবই পছন্দের সংখ্যা। এক এবং সাতে সতেরো। এখানে এক যেমন প্রাইম সংখ্যা, আবার সাতও প্রাইম সংখ্যা। আলাদা দুটি প্রাইম সংখ্যায় নতুন একটি প্রাইম সংখ্যা হচ্ছে। ব্যাপারটা আনন্দজনক।
যাই হোক ভাইজানের খোঁজ না পাওয়ায় নানান সমস্যা শুরু হবে। আমি ফ্ল্যাট ভাড়া দিতে পারব না। মাসের তিন তারিখে (আরেকটা প্রাইম সংখ্যা) ফ্ল্যাটের ভাড়া দিতে হয়। এই কাজটা আগে ভাইজান করতেন। আমাকে মনে হয় ভাইজানের কলাবাগানের বাড়িতে উঠতে হবে। পরিমল বাবু আমাকে এই উপদেশ দিলেন। তিনি বললেন, নিজের ভাইয়ের বাড়িতে উঠবেন সমস্যা কি!
সামান্য সমস্যা আছে। হেনা ভাবি চাচ্ছেন না আমি তার বাড়িতে উঠি। তিনি বলেছেন— আমি নিজের যন্ত্রণায় অস্থির। তুমি নতুন যন্ত্রণা নিয়ে আসবে। আমার হাতে নাই টাকাপয়সা। ব্যাংকে তোমার ভাইয়ের একাউন্ট তার নিজের নামে। একটা পয়সা তুলতে পারছি না। তোমার ভাইয়ের বিজনেস থেকে একটা পাই পয়সা আসছে না। শাড়ি-গয়না বেচে খাচ্ছি। তুমি এই বাড়িতে উঠধে না। এটা আমার সোজা কথা।
পরিমল বাবুকে হেনা ভাবির কথা কিছু বলি নাই। এতে ভাবির বদনাম করা হয়। স্বামী নিখোঁজ, এই কারণে দ্রমহিলা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। মানসিক বিপর্যস্ত একজন মানুষ অনেক অর্থহীন কথা বলতে পারেন।আমি যে খুব চিন্তিত তাও না। তেমন সমস্যা হলে ভাইজানের মতো নিখোঁজ হয়ে যাব। সব মানুষেরই নিখোঁজ হবার Option থাকলে ভালো হতো।কোয়ান্টাম মেকানিক্স প্যারালাল পৃথিবীর কথা বলে। নিখোঁজ হওয়া মানে এক পৃথিবী থেকে অন্য পৃথিবীতে চলে যাওয়া।
এখন বাজে এগারোটা সাত (দু’টাই প্রাইম সংখ্যা)। কিছুক্ষণ আগে চা খেয়ে পত্রিকা পড়েছি। পত্রিকার বিনোদন পাতায় দিলরুবার (সেতু) একটা ইন্টারভিউ পড়েছি। ইন্টারভিউ’র মাধ্যমে জানলাম তার পছন্দের রঙ সবুজ। কারণ আমাদের প্রফেট (দঃ) সবুজ রঙ পছন্দ করতেন। তিনি সবুজ রঙের পাগড়ি এবং জোব্বা পরতেন। বিষয়টা আমার জানা ছিল না।দিলরুবার পছন্দের খাবার যে শুটকি এটাও জানতাম না। আমি জানতাম সে শুঁটকির গন্ধই সহ্য করতে পারে না। হয়তো এখন খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন হয়েছে।
আজ এই পর্যন্তই। পরিমল বাবু চলে এসেছেন। আমাকে ভাইজানের সন্ধানে যেতে হবে। পরিমল বাবু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। বেচারার হাঁটুতে কী যেন সমস্যা হয়েছে।পরিমল বাবুকে জিজ্ঞেস করতে হবে, যিশুখ্রিস্টের প্রিয় রঙ কী? পরিমল বাবু খ্রিস্টান ধর্ম সম্পর্কে অনেক কিছু জানেন।একচল্লিশ দিন পার হয়েছে বেলায়েতের কোনো খোঁজ নেই। জিন হাফসা জানিয়েছে বেলায়েত বর্ডার পার হয়ে ইন্ডিয়াতে আছে। তার শরীর সামান্য
হেদায়েতকে ফ্ল্যাটবাড়ি ছেড়ে দিতে হয়েছে। বাড়িওয়ালা পাওনা ভাড়া বাবদ ফ্লাটের সবকিছু রেখে দিয়েছে। শুধু হাওয়াই মিঠাই বানানোর যন্ত্রটা ফেরত দিয়েছে। হেদায়েত এখন পরিমল বাবুর সঙ্গে বেলায়েত টিম্বারের অফিস ঘরে থাকে। দুজনই তিনবেলা দি নিউ বিরানী হাউস এন্ড রেস্টুরেন্টে খায়। এই ফ্রি খাওয়াও বন্ধ হবার উপক্রম হয়েছে।
হেনার সেক্রেটারি মিস শারমিন বিষয়টা একেবারেই পছন্দ করছেন না। তিনি হেদায়েতকে সরাসরি বলেছেন, আপনার ভাই বেলায়েত সাহেব যখন নিজের রেস্টুরেন্টে খেতেন তখন পয়সা দিয়ে খেতেন। সেখানে দিনের পর দিন আপনি ফ্রি খেতে পারেন। না। আপনি যে একা খাচ্ছেন তা-না, একজন সঙ্গীও আছে। সে আমাদের কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত না। সে কীভাবে ফ্রি খাচ্ছে? হেদায়েত বলল, ভাবি কি খেতে নিষেধ করেছেন?
শারমিন বলল, উনি শোকে কাতর একজন মহিলা। সব দিক দেখা তার পক্ষে সম্ভব না। রেস্টুরেন্টটা পুরোপুরি আমি দেখছি। তবে ম্যাডাম বলেছেন, ফ্রি খাওয়া-খাওয়ি বন্ধ।হেদায়েত বলল, আমরা কোথায় খাব?
সেটা আপনারা জানেন। আমি কী করে বলব? পরিমল বাবু যে বেলায়েত টিম্বারে থাকেন এটা ম্যাডামের খুবই অপছন্দ। অফিস ঘুমানোর জায়গা না।উনার তো যাওয়ার কোনো জায়গা নাই।
এই বিষয়ে আমি কিছু বলতে পারব না। আপনার কিছু বলার থাকলে ম্যাডামকে বলুন। আমার কাছে সুপারিশ করে কিছু হবে না। সরি! হেদায়েত হেনার সঙ্গে দেখা করতে গেল। পরিমল বাবু বাসার সামনে রাস্তায় হাঁটাহাঁটি করতে লাগলেন। হেদায়েত কী খবর নিয়ে আসে তার জন্যে অপেক্ষা। কোনো সুখবর আসবে সে-রকম মনে হচ্ছে না। আজ সকালের নাশতা খাওয়া হয়েছে। দুপুরের কোনো ব্যবস্থা হয় নি।
হেনা চোখমুখ শক্ত করে সোফায় বসে আছে। অতি কদাকার দেখতে এক মহিলা তার মাথায় তেল দিয়ে দিচ্ছে। মনে হয় আরামদায়ক অবস্থা, কারণ হেনার চোখ বন্ধু।হেনা বলল, তুমি সমস্যায় আছ সেটা আমি শুনব। কিন্তু পরিমন বাবুটা কে? তার বিষয়ে দরবার করতে এসেছ কেন? হেদায়েত বলল, বেচারার কেউ নাই। ভাইজান ফিরে না আসা পর্যন্ত থাকুক।তোমার ধারণা তোমার ভাইজান ফিরে আসবে? জি।যে একচল্লিশ দিনে ফেরে না সে একচল্লিশ বছরেও ফেরে না। বুঝেছ?
হেদায়েত বলল, বুঝতে পারছি না। একচল্লিশ দিনের সঙ্গে একচল্লিশ বৎসরের সম্পর্ক বুঝতে পারছি না। অবশ্য ৪১ একটা প্রাইম নাম্বার। ৪১ বৎসর হচ্ছে ৩৬৫ দিন ৬ ঘণ্টা। ৬ ঘণ্টা হিসাবে ধরা হয় না। প্রতি চার বছরে একবার হিসাবে আসে। তখন হয় ৩৬৬ দিনে বৎসর।হেনা বলল, বকবকানি বন্ধ কর। হাজার যন্ত্রণায় অস্থির, তুমি শুরু করেছ বৎসরের হিসাব। মাথা কি পুরোপুরি গেছে?
হেদায়েত চুপ করে রইল। ভাবিকে তার খুব অচেনা লাগছে। মনে হচ্ছে অচেনা একজন মহিলা।হেনা বলল, তোমার বিষয়ে এই মুহূর্তে কিছু করতে পারছি না। কোর্ট থেকে পাওয়ার অব এটর্নি বের করার চেষ্টা করছি। বের করতে পারলে তোমার ভাইয়ের একাউন্ট থেকে টাকা তুলতে পারব। তখন তোমার বিষয়ে কিছু করার চেষ্টা করব। বুঝেছ? এখন যাও। সকাল থেকে আমার মাথায় যন্ত্রণা। প্রেসারের ওষুধও এখন দুইবেলা খেতে হয়, বুঝেছ? এখন যাও।হেদায়েত বলল, ভাইজানের রেস্টুরেন্টে কি খেতে পারব ভাবি?
হেনা জবাব দিল না। সামনে থেকে উঠে গেল। তার মানে হ্যাঁ না-কি না এটা পরিষ্কার হচ্ছে না। না হলে মুখে সরাসরি না বলত।হেদায়েত পরিমল বাবুর সঙ্গে র্যাংগস ভবনের সামনের ঝরনার পাশে বসে আছে। এখান থেকে রাংগস ভবন ভাঙার দৃশ্য দেখা যায়। হেদায়েততের সিগারেট খেতে ইচ্ছা হচ্ছে। সঙ্গে সিগারেট নেই।পরিমল বাবু বললেন, দুশ্চিন্তা করবেন না।হেদায়েত বলল, দুশ্চিন্তা করছি না। সিগারেট খেতে ইচ্ছা করছে।পরিমল বাবু বললেন, সিগারেটের ব্যবস্থা করছি।কীভাবে করবেন?
সিগারেট ভিক্ষা চাইব। টাকা ভিক্ষার মধ্যে লজ্জা আছে। সিগারেট ভিক্ষায় লজ্জা নেই। কারণ সিগারেট ক্ষতিকর জিনিস।পরিমল বাবু উঠে গেলেন এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ফিরে এলেন। তাঁর হাতে দু’টা সিগারেট। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, একটা এখন খান আরেকটা খাবেন লাঞ্চের পরে।লাঞ্চ কোথায় করব?
স্যারের রেস্টুরেন্টেই করব। গলা ধাক্কা দিয়ে বের না করে দেয়া পর্যন্ত সেখানেই যাব। দুঃসময়টা আপনার জন্যে কী রকম ভালো হয়েছে লক্ষ করেছেন? কী ভালো হয়েছে? আপনার ভাই কোথায় আছে, তার কী হয়েছে এটা নিয়ে এখন আর চিন্তা করছেন না। এখনকার একমাত্র চিন্তা খাব কী? কোথায় খাব?
হেদায়েত বলল, ভাইজানকে নিয়ে আমি রাতে চিন্তা করি। দিনে করি না।সেটা ভালো। চিন্তার জন্যে রাত্রি উত্তম। আচ্ছা আপনার কাছে তো হাওয়াই মেঠাই বানানোর যন্ত্রটা আছে।জি আছে।বিশটা হাওয়াই মেঠাই আমাকে বানিয়ে দিন। আমি বিক্রি করব। বানাতে পারবেন না? পারব। বিশটা না বানিয়ে উনিশটা বানাই? উনিশটা কেন?
উনিশ একটা প্রাইম নাম্বার।ও আচ্ছা। আপনার তো আবার প্রাইমের ঝামেলা আছে। বানান উনিশটাই বানান।দিলরুবা ম্যাডামের আজ সারাদিনে দু’টা মাত্র শট। প্রথমটা হয়ে গেছে। দ্বিতীয়টা কিছুক্ষণের মধ্যে হবে। আয়োজন চলছে। দোলনার শট। নায়িকা দোলনায় দুলছে। নায়ক পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে দোলনা দোলাচ্ছে। এক পর্যায়ে ধাক্কা বেশি হয়ে গেল। নায়িকা দোলনা থেকে পড়ে ব্যথা পেল। তার নাক দিয়েও রক্ত পড়তে লাগল। তখন একে অন্যকে দেখে হাসতে শুরু করল। এই হাসি থেকে গানের শট চলে যাওয়া হবে—
সব ফুল যদি ফাল্গুনে ফোটে
শ্রাবণে ফুটবে কী?
ভালোবাসা যদি তোমার আমার
তাহাদের গতি কী?
গানের কয়েকটা শটও আজ হওয়ার কথা ছিল। ড্যান্স ডিরেক্টর আসে নি বলে হবে না। শুটিং প্যাক আপ হয়ে যাবে। রবিন সেতুকে নিয়ে বড় কোনো রেস্টুরেন্টে খেতে যাবেন। আজ রবিনের জন্মদিন।
রবিন চলে এসেছেন। দোলনার শটটা এক্ষুনি শুরু হবে। মেকআপম্যান শেষবারের মতো মেকআপ ঠিকঠাক করছেন। রবিন মেকআপ রুমে ঢুকতে ঢুকতে বললেন, ‘আজ আসার পথে মজার এক দৃশ্য দেখলাম। দৃশ্যটা তোমার সঙ্গে শেয়ার করব কি-না বুঝতে পারছি না। তোমার তো মেজাজের কোনো ঠিক নেই, কীভাবে নেবে কে জানে!সেতু বলল, আমাকে কিছু বলার দরকার নেই।
রবিন বললেন, হেদায়েত সাহেবকে দেখলাম ছোটাছুটি করে হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করছেন। আমার কাছেও এসেছিলেন। আমাকে চিনতে পারেন নি।সেতু বলল, ও আচ্ছা।তার চেহারায় কোনো ভাবান্তর হলো না। আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল।ব্যাপারটা মনে হয় তোমার কাছে তেমন ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না।সেতু বলল, ওর আবার শুটিং দেখার শখ ছিল। তুমি এক কাজ কর, তাকে নিয়ে এসো শুটিং দেখবে।এখন যাব?
তোমাকে যেতে হবে না। ড্রাইভারকে পাঠাও।বাদ দাও তো, পরে দেখা যাবে।সেতু রবিনের দিকে তাকাল। কঠিন দৃষ্টি। তারপর সেই দৃষ্টি মুহূর্তেই স্বাভাবিক করে বলল, যা করতে বলেছি কর।রবিন বললেন, এখন গেলে তো পাওয়া যাবে না।সে বলল, পাওয়া যেতেও তো পারে।রবিন বলল, শুটিং দেখার ব্যাপারটা অন্য একদিন করলে হয় না? আমরা খেতে যাব।সেতু বলল, সেও যাবে আমাদের সঙ্গে। জন্মদিনের উৎসবে একজন বাড়তি মানুষ থাকল। There is compary. তার সঙ্গে আরো একজনকে দেখলাম। বৃদ্ধ।বৃদ্ধও আমাদের সঙ্গে যাবেন।
হেদায়েতকে যথেষ্টই আনন্দিত মনে হচ্ছে। উনিশটা হাওয়াই মেঠাইয়ের মধ্যে এগারোটা বিক্রি হয়ে গেছে। বারো নম্বরটা মনে হয় এখন বিক্রি হবে। মেয়েটা যেভাবে অবাক হয়ে তাকাচ্ছে— সে না কিনেই পারে না।হেদায়েত বলল, নতুন ধরনের কিছু হাওয়াই মেঠাই আছে—-ঝাল-মিষ্টি। ট্রাই করে দেখবেন? মেয়েটা গাড়ি থেকে নেমে এসে বলল, স্যার আপনি আমাকে চিনতে পারেন নি?
না।স্যার আমি আপনার ছাত্রী। আমার নাম মাহজাবিন। রোল উনিশ।হেদায়েত অবাক হয়ে বলল, খুবই আশ্চর্য ব্যাপার! আমি হাওয়াই মেঠাই বানিয়েছিলাম উনিশটা। এর মধ্যে এগারোটা বিক্রি হয়ে গেছে। তুমি যদি একটা কেন তাহলে বারোটা বিক্রি হয়ে যাবে। থাকবে সাত। সাত একটা প্রাইম নাম্বার। ‘মায়াদের কাছে সাত ছিল অত্যন্ত গুরুত্ত্বপূর্ণ সংখ্যা। ওরা সবসময় সাতজন করে মানুষ বলি দিত।স্যার, আপনি হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করছেন কেন?
হেদায়েত বলল, বিপদে পড়েছি। মহা বিপদে বলতে পার। চাকরি নেই, ওইদিকে ভাইজান নিখোঁজ। ভাইজানের রেস্টুরেন্টে খেতাম। সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। হাওয়াই মেঠাই বিক্রি করে যে টাকাটা পাব সেটা দিয়ে লাঞ্চ খাব। ভাইজানের রেস্টুরেন্টেই খাব তবে পয়সা দিয়ে খাব। ভালো কথা তুমি কাঁদছ কেন?মাহজাবিন চোখ মুছতে মুছতে বলল, আমি কেন কাঁদছি জানি না স্যার।হাওয়াই মেঠাই কিনবে?
জি না স্যার।আচ্ছা ঠিক আছে। রোল নাম্বার নাইনটিন, ভালো থেকো। আসল কথা তোমাকে বলতে ভুলে গেছি। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি তো— এই জন্যে মাঝে মাবো হ্যালোসিনেশনের মতো হয়। একটা মেয়েকে মাঝে মাঝে দেখি। মেয়েটার চেহারার সঙ্গে তোমার অদ্ভুত মিল।স্যার, আপনি কোথায় থাকেন, ঠিকানাটা একটু বলবেন?
হেদায়েত বলল, এত দিন থাকতাম বেলায়েত টিম্বার নামের একটা দোকানে। আজ থেকে অন্য কোথাও থাকব। পরিমল বাবু ব্যবস্থা করবেন। তুমি চলে যাও, তোমার সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আমার বিক্রি বন্ধ।সেতুরা খেতে গেছে শেরাটন হোটেলে। সুইমিং পুলের পাশেই রেস্টুরেন্ট। লাঞ্চ শুরুর আগে রবিন ব্লাডি মেরি নিয়েছেন। গরমে ব্লাডি মেরি খেতে ভালো লাগছে। রবিন বললেন, তুমি একটা ব্লাডি মেরি ট্রাই করবে?
সেতু বলল, না।রবিন বললেন, তোমার আজকের অভিনয় দেখে খুব ভালো লাগল। এরকম একটা ডিফিকাল্ট সিকোয়েন্স এক টেকে মেরে দেবে চিন্তাই করি নি।সেতু বলল, থ্যাংক য়্যু।রবিন বললেন, হেদায়েত সাহেবকে খুঁজে পেলে ভালোই হতো। দুজন আসলেই খালি খালি লাগছে। ঐ রাস্তায় দু’বার আসা-যাওয়া করেছি। নো ট্রেস।সেতু বলল, তুমি ওখানে যাও নি। মিথ্যা করে বললে গিয়েছিলে।কে তোমাকে বলল, যাই নি?
আমি প্রডাকশনের একটি ছেলেকে গাড়ি দিয়ে তোমার পেছনে পেছনে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছে তুমি গাড়ি নিয়ে বের হয়ে রমনা গ্রিনের দিকে কিছুদূর গিয়েছ। গাড়ি থেকে নেমে একটা সিগারেট খেয়েছ, তারপর ফিরে এসেছ।রবিন চুপ করে রইলেন। সেতু বলল, আমাকে একটা ব্লাডি মেরি দিতে বলো।রাত এগারোটা।হেনা হতভম্ব হয়ে বসে আছে। তার শরীরে জ্বলা রোগ শুরু হয়েছে। এর সঙ্গে শুরু হয়েছে মাথাঘোরা।
নিঃশ্বাসের কষ্ট হচ্ছে। কিছুক্ষণ আগে তার সেক্রেটারি মিস শারমিন দু’টা খবর দিয়েছে। প্রথম খবর সে ব্যাংকে ছোটাছুটি করে বের করেছে ব্যাংকে বেলায়েতের চার কোটি সাতান্ন লক্ষ টাকা আছে।দ্বিতীয় খবর বেলায়েত একটা উইল করে গেছে। রেজিস্ট্রি করা উইল। সেখানে লেখা— তার মৃত্যু হলে স্থাবর-অস্থাবর সব সম্পত্তির মালিক হবে তার ছোটভাই হেদায়েত। সেখানে হেনার কোনো উল্লেখই নেই।হেনা বলল, তুমি ঠিকমতো উইল পড়েছ? জি ম্যাডাম।আমার কোনো উল্লেখই নেই?
জি ম্যাডাম।বদ্ধ উন্মাদ ছাড়া এই কাজ কেউ করে? এরা দুই ভাইই বদ্ধ উন্মাদ। সহজভাবে ঘুরে বেড়ায়, কারোর বুঝার উপায় নেই যে এরা উন্মদি। ঠিক বলেছি কি-না বলো? অবশ্যই ঠিক বলেছেন। মাডাম উইলের একজন সাক্ষীর নাম শুনলে আপনি চমকে উঠবেন।হেনা বলল, অনেক চমকেছি, আর চমকাতে ইচ্ছা করে না। কে সে? পরিমল বাবু।হেনা বিড়বিড় করে বলল, বদটা সাক্ষী? অথচ আমাকে কিছুই বুঝতে দেয় নাই। সে উইলের কথাটা আগে বললে…
হেনা কথা শেষ করল না। তার দম বন্ধ হয়ে আসছে।শারমিন বলল, ম্যাডাম পরিমল বাবুকে কি খবর দিয়ে আনব? তারা তো বেলায়েত টিম্বারেই রাতে থাকে।তাকে এখন খবর দিয়ে কী হবে? আচ্ছা যাও খবর দাও।হেদায়েত, পরিমল বাবু কাউকেই বেলায়েত টিম্বারে পাওয়া গেল না। তারা কোথায় গেছে তাও কেউ জানে না।
পরিমল বাবু রাত্রি যাপনের জন্যে হেদায়েতকে কমলাপুর রেলস্টেশনে নিয়ে এসেছেন। তিনি বলেছেন, নিরিবিলি ঘুমের এক মজা আবার হৈচৈয়ের মধ্যে ঘুমের আরেক মজা। একেকবার ট্রেন এসে থামবে। বিরাট হৈচৈ, ইনজিনের শব্দ, হুইসেল। ঘুম ভাঙবে। কিছুক্ষণ ট্রেন দেখে আবার ঘুমিয়ে পড়বে। আসুন জায়গা খুঁজে বের করি। চোখের উপর সরাসরি আলো এসে পড়বে না এমন জায়গা।হেদায়েত বলল, স্টেশনে আপনি আগেও রাত কাটিয়েছেন?
