তখন বাহাদুর শাহ্ বিশেষ দূত সম্রাট হুমায়ূনের কাছে একটি চিঠি দিলেন । চিঠিতে লেখা-
সম্রাট হুমায়ূন,
অতি ভক্তিভরে নিবেদন করছি যে, আমি মোঘল সম্রাটের একজন দীন সেবক মাত্র । আমি বর্তমানে ধর্মযুদ্ধে নিজেকে
নিয়োজিত করেছি । ওলেমারা রানী কর্ণাবতীর বিরুদ্ধে এই যুদ্ধকে ‘জেহাদ’ অ্যাখ্যা দিয়েছেন । সম্ভবত আপনার কাছে নাই যে ,
এই দুর্গে অনেক মুসলমান রমণী বন্ধি অবস্থায় আছেন ।
রাজপুত পুরুষরা তাদের ব্যবহার করে ।
নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তাদের নৃত্যগীত এবং আরও অনেক অশ্লীল কুৎসিত কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ
করতে হয় ।
আমি অনুরোধ করব যে, আপনি এই যুদ্ধযাত্রা
স্থগিত করবেন । আমি আপনার সম্মানে এক বাক্স
মণিমুক্তা, চারটি আরবি ঘোড়া এবং একটি হাতি
পাঠালাম । এই হাতিটা আমার প্রিয় , এর নাম কুশ ।
ইতি
আপনার সেবক
বাহাদুর শাহ
হুমায়ূন যুদ্ধযাত্রা করলেন না । জোহরের নামাজের পর স
সেনাবাহিনী দ্রুত অগ্রসর হতে লাগল । বাহাদুর শাহ খবর পেলেন
হুমায়ূন যাত্রা অব্যাহত রেখেছেন । তিনি সঙ্গে করে এনেছেন তাঁর
গোলন্দাজ বাহিনী । গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান তকি খাঁ কামান চালনায়
বিশেষ পারদর্শী। হুমায়ূনের বিশেষ কামান ‘ফিরোজ’কে দু’টা হাতি
টেনে নিয়ে আসছে । মাঝারি কামানগুলি টানছে মাদ্রাজি বলদ ।
বন্দুকধারীরা কামনের সঙ্গে সঙ্গে আসছে । যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে কামান অগ্রসর হবে না, তবে বন্দুকধারীর অগ্রসর হবে ।
সম্রাটের তীরন্দাজ বাহিনীর নেতৃত্বে আছে আফগান তীরন্দাজ প্রধান শাহ জুম্মা । তাঁর সম্পর্কে কথিত আছে, লক্ষ্যবস্তু দেখার পর
তিনি চোখ বন্ধ করে তীর ছুঁড়ে লক্ষ্যভেদ করতে পারেন ।
বাদশাহ নামদার পর্ব –৫
হুমায়ূনের অশ্বারোহী বাহিনীর সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার । তারা
অগ্রবর্তী তীরন্দাজ দলের পেছনে যাচ্ছিল ।
বাহাদুর শাহ সম্রাট হুমায়ূনের দ্রুত এগিয়ে আসার খবর শুনলেন ।
তিনি পালিয়ে যাওয়ার সব প্রস্তুতি শেষ করে দুর্গ অবরোধকারী সৈন্যদের উল্লাসিধ্বনি করতে বললেন । দুর্গের বাইরে বিরাট হৈচৈ হতে লাগল ।
রানী কর্ণাবতী বাইরে হঠাৎ হৈচৈ শুরু হয়েছে কেন জানতে চাইলেন । তাকে জানানো হলো বাহাদুর শাহর বাহিনীর সঙ্গে হুমায়ূন বাহিনীর যুদ্ধ হয়েছে । যুদ্ধে হুমায়ূন পরাজিত হয়েছেন । হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট হয়ে নিহত হয়েছেন বলেই বাহাদুর শাহর শিবিরে আনন্দ উল্লাস ।
জহরব্রত পালনের জন্যে আগুন প্রস্তুত ছিল । রানী কর্ণাবতী সবাইকে নিয়ে জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে ঝাঁপিয়ে পড়লেন । রানীর আদেশে দুর্গের তিন হাজার শিশুকেও কুয়ায় নিক্ষেপ করা হলো । যেন এরা শত্রুর হাতে পড়ে নিগৃহিত না হয় ।
বাহাদুর শাহ দুর্গে প্রবেশ করতে পারলেন না । হুমায়ূনের বাহিনী চলে এসেছে । তিনি পালিয়ে গেলেন । রানী কর্ণাবতীর মৃত্যু হুমায়ূনকে দুঃখে অভিভূত করল । তিনি তৎক্ষণাৎ বাহাদুর শাহর পেছনে ছুটলেন । রানী কর্ণাবতীর মৃত্যু আরেকজনের মনে গভীর রেখাপাত করল । তিনি বাহাদুর শাহর গোলন্দাজ বাহিনীর প্রধান রুমী খাঁ । তিনি তাঁর দলবল নিয়ে হুমায়ূনের সঙ্গে যুক্ত হলেন ।
চিতোরের দুর্গ শ্মশান । দুর্গের বাইরে বাহাদুর শাহের অতি প্রিয় দুই হাতি বিকট চিৎকার করছে এবং ছোটাছুটি করছে । হুমায়ূনের হাতে বাহাদুর শাহর প্রিয় দুই হাতি পড়বে তা তিনি মেনে নিতে পারছিলেন না বলে নিজের হাতে এদের শুঁড় কেটে দিয়েছেন । হাতি দু’টির নাম শিরজা ও পতসিকার । বাহাদুর শাহর প্রসিদ্ধ দুই কামান লায়লা এবং মজনু যেন হুমায়ূনের হাতে না পড়ে সেই ব্যবস্থা ও হলো । বাহাদুর শাহ নিজে কামান দুটি নষ্ট করলেন । *
বাদশাহ নামদার পর্ব –৫
বাহাদুর শাহ পালিয়ে মাণ্ডু দুর্গে আশ্রয় নিলেন ।
হুমায়ূন মাণ্ডু পৌঁছালেন ত্রিশ হাজার অশ্বারোহী নিয়ে । তিনি মাণ্ডু দুর্গ অবরোধ কররেন । সারা দিন ঘোড়া ছুটিয়ে তিনি ছিলেন ক্লান্ত । এশার নামাজ শেষ করে সেনাপতিদের ডেকে বললেন, আমি জানি মাণ্ডু দুর্গ দখল করা কঠিন । কিন্তু আমি বাহাদুর শাহকে ধরতে চাই । এমন ব্যবস্থা করা হোক যেন রাতের ভেতর দুর্গ দখল হয় ।
লম্বা লম্বা মই তৈরি করা হলো । মই দুর্গের গায়ে লাগিয়ে তীরন্দাজরা দুর্গপ্রাচীরে উঠে গেল । একদল তীরন্দাজ দুর্গের প্রধান দরজা খুলে দিল ।
বাহাদুর শাহ দড়ি বেয়ে দুর্গ থেকে পালিয়ে গেলেন । দুর্গের ভেতরের মানুষজন কেউ বলল না , বাহাদুর শাহ কীভাবে পালিয়েছেন
*সূত্র : ডক্টর হরিশংকর শ্রীবাস্তব, মোঘল সম্রাট হুমায়ূন ।
কোন দিকে যাচ্ছেন । হুমায়ূন তখন এক অদ্ভুত কাণ্ড করলেন, গাঢ় লাল রঙের পোশাক পরলেন । এর অর্থ , সবাইকে হত্যা করো ।
ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ শুরু হলো । মোঘল সৈনিকের তলোয়ারের নিচে হাজার হাজার মানুষকে প্রাণ দিতে হলো । সেদিন মঙ্গলবার হওয়ায় রক্তাম্বর পরে হুমায়ূন উন্মাদ হয়ে গেলেন । তাঁকে দেখে তাঁর সৈনরাও উন্মাদ হয়ে গেল ।
মাণ্ডুবাসীদের যে রক্ষা করে, তার কথা এখন বলা যাক । তার নাম বচ্ছূ (মতান্তরে মঞ্চু) । এই বচ্ছু বাহাদুর শাহ’র অতি প্রিয় এক গায়ক । বাহাদুর শাহ যেখানে যান সেখানেই সে যায় ।
রক্তাম্বর পরা সম্রাট হুমায়ূনের দিকে বচ্ছু গান গাইতে গাইতে এগিয়ে গেল । গানের কথা-‘রক্তের রঙের চেয়ে বৃক্ষের সবুজ রঙ কি কম সুন্দর ?… ‘
হুমায়ূন গায়কের কণ্ঠ শুনে অভিভূত হলেন । তাঁর কাছে মনে হলো , তিনি তাঁর জীবনে এত মধুর সঙ্গীত শোনেন নি । বচ্ছু সম্রাটের সামনে দাঁড়াল । সম্রাট বললেন, তুমি কি জানো যে তুমি এই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ গায়ক ?
বাদশাহ নামদার পর্ব –৫
বচ্ছু বলল, জানি ।
আমি তোমার জাদুকরী ক্ষমতায় মুগ্ধ হয়েছি । বলো কী চাও ?
আমি চাই আপনি পোশাক বদলে সবুজ পোশাক পরুন ।
সম্রাট সবুজ বস্ত্র পরলেন । হত্যাযজ্ঞ সঙ্গে সঙ্গে থামল । সম্রাট বললেন, তুমি আর কী চাও ?
বচ্ছু বলল, যারা বন্ধি আছে তাদের মুক্ত করে দিন ।
হুমায়ূন বললেন , সবাই মুক্ত । আমি তোমার আরও একটি ইচ্ছা পূর্ণ করব । বলো কী চাও ?
আমি আমার গুরু বাহাদুর শাহের কাছে যেতে চাই ।
হুমায়ূন দুর্গের প্রধান ফটক খুলে বচ্ছুকে চলে যেতে দিলেন ।
হুমায়ূনের প্রধান উজির বললেন, আপনি কী করছেন ?
সম্রাট বললেন , এই গায়ক যদি আমার রাজ্য প্রার্থনা করত আমি তাকে দিয়ে দিতাম ।
মাণ্ডু থেকে পালিয়ে বাহাদুর শাহ আহমেদাবাদের চম্পানী দুর্গে অবস্থান নিলেন । মোঘলদের বিরুদ্ধে যুদ্ধের প্রস্তুতি নিলেন । বাহাদুর শাহের গোলন্দাজবাহিনী কামান বসানোর আগেই সম্রাট হুমায়ূন চম্পানীর দুর্গ অবরোধ করলেন । বাহাদুর শাহ আবার পালালেন , তিনি আশ্রয় নিলেন কম্ব দুর্গে । হুমায়ূন এক ঘণ্টার মধ্যে কম্ব দুর্গে উপস্থিত হলেন ।
কম্ব দুর্গ থেকেও বাহাদুর শাহকে পালাতে হলো । এবার তার সঙ্গে গায়ক বচ্ছু । পালাবার সময় তিনি বলেছিলেন, আমার সঙ্গে বচ্ছু আছে আমার আর কিছুই লাগবে না ।
হুমায়ূন দুর্গের ভেতর মাগরেবের নামাজ পড়লেন । নামাজের শেষে তার ইমামকে ডেকে পাঠালেন । ইমামকে বললেন , মাগরেবের নামাজে আপনি সূরা ফিল পাঠ করেছেন ?
বাদশাহ নামদার পর্ব –৫
ইমাম বললেন, জি জনাব ।
সূরা ফিলের শানে নজুল এবং তর্জমা আমাকে শেনান ।
ইমাম বললেন , ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে নবীয়ে করিম (দঃ)-এর জন্মবর্ষের ঘটনার বর্ণনা নিয়ে এই সূরা নাযেল হয় । হয়েমেনের বাদশাহ আবরাহা হস্তীবাহিনী নিয়ে মক্কা আক্রমণ করেছিলেন , তখন আল্লাহর আদেশে ছোট ছোট আবাবিল পাখি দিয়ে ইয়েমেনের বাদশাহকে পরাস্ত করা হয়েছিল । সূরা ফিলের এই হলো ঘটনা । আল্লাহপাক বলেছেন , হে রসুল ! তুমি কি দেখো নি তোমার আল্লাহ হাতিওয়ালাদের সাথে কেমন আচরণ করলেন ? তাদের সমস্ত আয়োজন কি আল্লাহ ব্যর্থ করে দেন নি ?
সম্রাট বললেন, আপনি আমাকে ইয়েমেনের বাদশাহর কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্যে এই সূরা পাঠ করেছেন ?
ইমাম বললেন, আমার ভুল হয়েছে ।
সম্রাট বললেন, আপনি বাহাদুর শাহর অনুরক্ত বলেই এই কাজটি করলেন । কী আশ্চর্য , আমার প্রধান শত্রুর প্রতি যে অনুরক্ত , আমি তার পেছনে দিনের পর দিন নামাজ পড়েছি !
Read more
