হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

বাদশাহ নামদার পর্ব –২০

হুমায়ূন আবার রক্তপোষাক পরলেন । বাহাদুর শাহ তাঁকে যে হাতিটি দিয়েছেন কুশ তিনি সেই হাতি আনতে বললেন । হাতি হাজির করা হলো ।

সম্রাট বললেন, আজ মাগরেবে যে সূরা পাঠ করা হয়েছে তার নাম ফিল অর্থাৎ হাতি । ইমাম, আপনার প্রিয় বাহাদুর শাহর দেওয়া সেই হাতির পায়ের চাপে পিষ্ট করে আমি আপনাকে হত্যার নির্দেশ দিলাম ।

এই আদেশ এশার নামাজের আগেই যেন কার্যকর হয় ।*

নির্দেশ কার্যকর করা হলো ।

কম্ব দুর্গ থেকে বাহাদুর শাহ পালিয়ে গেলেও তাঁর ধনরত্ন নিতে পারলেন না । সবই হুমায়ূনের হাতে পড়ল । ধনরত্নের বাইরে পেলেন বাহাদুর শাহের পোষা তোতাপাখি ।

এই পাখি নাকি ভবিষৎ বলতে পারে । রুমী খাঁকে সে যতবার দেখে ততবারই বলে, ফট রুমী হারামখোর । ফট রুমী হারামখোর । এর অর্থ হারামখোর রুমীর উপর অভিসম্পাত ।

সম্রাটের প্রধান খেলা এখন হলো পাখির সঙ্গে সময় কাটানো । কম্ব

বিজয়ের পর সম্রাট তোতাকে জিজ্ঞেস করলেন, কে শ্রেষ্ঠ আমি না

*ঐতিহাসিক আবুল ফজল লিখেছেন, এই ঘটনার পর হুমায়ূন অত্যন্ত অনুতপ্ত হন । তিনি সারা রাত একফোঁটা ঘুমাতে পারেন নি। সারা রাত শিশুর মতো কেঁদেছেন । পরদিন ফজরের নামাজের আগে তিনি তাঁর রক্তপোশাক পুড়িয়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন । বাকি জীবন তিনি আর এই ভয়ঙ্কর বস্ত্র পরিধান করেন নি।

বাহাদুর শাহ?

তোতা বলল, আল্লাহু আকবর ।

পাখির মতে আল্লাহই শ্রেষ্ঠ । সম্রাট সন্তোষ লাভ করলেন । তোতাকে স্বর্গীয় পক্ষী উপাধি দিলেন । তার জন্যে সোনার খাঁচা বানানোর নির্দেশ দিলেন ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

সম্রাটকে পানি খাওয়ানোর দায়িত্বে নিযুক্ত জওহরকে এই পক্ষীর সেবক নিয়োগ করলেন । (এই জওহর সম্রাট হুমায়ূনের একটি জীবনী রচনা করেন । সম্রাটভগ্নি গুলবদনের পরেই জওহরের জীবনীকে প্রামাণ্য ধরা হয়) সম্রাটের নির্দেশে এই তোতাপাখির একটি ছবি আঁকা হয় । ছবিটি ব্রিটিশ মিউজিয়ামে এখনো সংরক্ষিত আছে।

জুন মাস ।আগ্রার উপর দিয়ে কয়েকদিন ধরেই লু হাওয়া বইছে । পিঙ্গল আকাশে মেঘের দেখা নেই । লোকজন দরজা-জানালা বন্ধ করে ঘরে বসা । কিছু মিঠাইয়ের দোকন খোলা । মিঠাইয়ের উপর ভনভন করছে মাছি । গরম কাল মাছিদের প্রিয় সময় । গরমে তারা দ্রুত বংশবৃদ্ধি করে ।

আগ্রার পথেঘাটে ময়ূরের ঝাঁক । তাদের দৃষ্টি আকাশের দিকে । তারা কুৎসিত শব্দে ডাকে, চক্রাকারে ঘোরে, একে অন্যের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে । গরমে এদেরও মাথা খারাপের মতো হয়ে গেছে । ময়ূর পেখম মেলার জন্যে অস্থির । বৃষ্টির দেখা নেই বলে পেখম মেলতে পারছে না ।

আগ্রার অধিবাসীরা আজ খানিকটা উত্তেজিত । প্রধান কাজির নির্দেশে তিন অপরাধীর জন্যে তিনটি গাধা হত্যা করা হয়েছে । গাধাগুলির চামড়া ছিলানো হয়েছে । অপরাধীদের গাধার চামড়ার ভেতরে ঢুকিয়ে চামড়া সেলাই করে দেওয়া হবে । তারপর তাদের শুইয়ে দেওয়া হবে ঘোড়ার গাড়িতে । এই গাড়ি আগ্রা শহরময় ঘুরবে । প্রচণ্ড গরমে গাধার চামড়া এঁটে বসে যাবে অপরাধীদের গায়ে । তাদের মৃত্যু হবে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

তিন অপরাধী গাধার চামড়ার মোড়া অবস্থায় ঘোড়ার গাড়ির পাটাতনে শুয়ে আছে । ঘোড়ার গাড়ি চলছে । ঘোড়ার গাড়ির চালকের হাতে রুপার ঘণ্টা । সে মাঝে মাঝে ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘণ্টা বাজাচ্ছে । ঘণ্টাধ্বনি শাস্তির ঘোষণা । প্রচণ্ড গরমে গাধার চামড়া অপরাধীদের গায়ে এঁটে বসছে । তাদের একজন ‘পানি পানি’ বলে অস্ফুট শব্দ করছে । গাড়ির পেছনে এক দঙ্গল ছেলেপুলে । তাদের উৎসাহের সীমা নেই । তারা মাঝে মাঝে ঢিল ছুঁড়ছে । যখনই কোনো ঢিল গাধার চামড়ায় আবৃত অপরাধীদের উপর পড়ছে, তখনই তারা উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠছে ।

গরম অসহনীয় বোধ হওয়ায় সম্রাট গোসলখানায় ‘দরবারে খাস’ বসিয়েছেন । তাঁর প্রিয় অমাত্যরা গোসলখানায় জড়ো হয়েছেন । সম্রাট হাম্মামে বুক পর্যন্ত ডুবিয়ে বসে আছেন । দুজন খোজা বালক মাঝে মাঝে তাঁর মাথায় পানি ঢালছে । পানিতে গোলাপগন্ধ । অসংখ্য গোলাপ পাপড়ি ছড়িয়ে পানিতে এই গন্ধ আনা হয়েছে । বিশেষ ব্যবস্থায় পানি শীতল করা হয়েছে । শীতলকরণ-পদ্ধতি চালু আছে । সম্রাট যতক্ষণ হাম্মামে থাকবেন ততক্ষণ এই প্রক্রিয়া চলবে ।

পানির শীতলকরণ-পদ্ধতি যথেষ্টই বৈজ্ঞানিক । বাষ্পীভবনের সময় পানি কিছু উত্তাপ নিয়ে বাষ্পে পরিণত হয় । উত্তাপ নেওয়ার কারণে পানি ঠাণ্ডা হয় । প্রকাণ্ড সব মাটির জালার গায়ে পানি ঢেলে বাতাস দেওয়া হচ্ছে । এতে বাষ্পীভবন-প্রক্রিয়া দ্রুত হচ্ছে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

সম্রাটকে ঘিরে আছেন দরবারে খাসের অমাত্যজন । মন্ত্রীসভার সকল সদস্য আছেন । দুজন সেনাপতি আছেন । আজকের দরবারে খাসে আফগান শের খাঁর বিষয়ে আলোচনা হবে । শের খাঁ শক্তি সঞ্চয় করেই যাচ্ছে । তার বিষয়ে কখন কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে তা সম্রাট বলবেন । আলোচনায় অন্যরাও অংশ নিতে পারবে, তবে কে অংশ নেবে তা সম্রাট আঙুলের ইশারায় ঠিক করবেন। ইচ্ছামতো মতামত জাহির করার সুযোগ নেই । গোপন আলোচনা খোজাদের সামনেই হচ্ছে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। গোসলখানায় উপস্থিত সব খোজাই বধির । কানে গলন্ত সীসা ঢেলে তাদের কান নষ্ট করা হয়েছে ।

সভা শুরুর আগে সম্রাট একটি শের আবৃত্তি করলেন-

মুরদই লাখ বুড়া চাহে তো কেয়া হোতা হ্যায়

ওই হোতা হ্যায় যো মঞ্জুরে খোদা হোতা হ্যায় ।

(শত্রুরা আমার যতই অনিষ্ট কামনা করুক তাতে

কিছুই হবে না । ঈশ্বর যা মঞ্জুর করবেন তা-ই হবে

আমার ভাগ্যলিপি।)

দরবারিরা একসঙ্গে বললেন, মারহারা ! মারহাবা !

সম্রাট হাসলেন । দ্বিতীয় শের আবৃত্তি করলেন-

হর মুসিবৎকো ‍দিয়া এক তবসুমসে জবাব

ইসতরাহ গরদিসে দেীড়োকে রুলায়া হ্যায় ম্যায়নে ।

(দুর্দিন ভেবেছিল সে আমাকে কাঁদাবে ।

উল্টা হাসিমুখে আমি তাকে কাঁদিয়েছি।)

আবারও আওয়াজ উঠল, মারহাবা ! মারহাবা!

প্রধান উজির বললেন, গোস্তাকি মাফ হয় । এই অপূর্ব শের কার

কলম থেকে বের হয়েছে?

সম্রাট বললেন, এই শের তোমাদের বাদশাহর কলম থেকে এসেছে । সে হিন্দুস্থানের বাদশাহ হলেও অন্তরে একজন অক্ষম দুর্বল কবি ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

প্রধান উজির কিছু বলতে চাচ্ছিলেন, সম্রাট ইশারায় তাঁকে থামিয়ে সভা শুরু করলেন । এবং সবাইকে অবাক করে দিয়ে অমাত্যদের মধ্যে গৌণ একজনকে হাম্মামে নামতে বললেন । সম্রাটের সঙ্গে স্নান করা পরম সৌভাগ্যের ব্যাপার । যাকে হাম্শামে নামতে বলা হলো, তাঁর চেহারা অতি সাধারণ । মধ্যম আকৃতির কৃশকায় একজন মানুষ । তাঁর নাম বৈরাম খাঁ । (মোঘল ইতিহাসের প্রধান পুরুষদের একজন।)

গোসলখানায় যখন দরবারে খাস বসে তখন উপস্থিত সবাই পানিতে নামার প্রস্তুতি নিয়ে আসে । যেন সম্রাটের হুকুম পাওয়ামাত্র পানিতে নামতে পারে ।

সম্রাট বললেন, এখন একটি পত্র পাঠ করা হবে । পত্রপাঠের পর পত্রের উপর আলোচনা । পত্র পাঠিয়েছেন আফগান পাঠান-শের খাঁ । সম্রাটের নির্দেশে প্রধান উজির পত্র পাঠ করলেন ।

পত্র

প্রেরক : দাসানুদাস সেবক শের শাহ ।

প্রাপক : আল সুলতান আল আজম ওয়াল খাকাল

আল মুকাররাম, জামিই সুলতানাত-ই-হাকিকি ওয়া

মাজাজি, সৈয়দ আল সালাতিন, আবুল মোজাফফর

নাসির উদ্দিন মোহম্মদ হুমায়ূন পাদশাহ, গাজি জিল্লুল্লাহ ।

হে মহান সম্রাট, হিন্দুস্থানের রক্ষাকর্তা ও মালিক ।

আল্লাহপাকের অনুগ্রহের ফুটন্ত গোলাপ । মহান

কবি ও চিত্রকর হুমায়ূন ।

হে বাদশাহ, আপনি কি অধম শের খাঁ’র উপর

নারাজ হয়েছেন? হিন্দুস্থান হলো গুজবের বাজার ।

সেই বাজারের বর্তমান দুর্গন্ধময় গুজব হলো-

আপনি অধম শের খাঁ’র বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার প্রস্তুতি

নিচ্ছেন ।

হে সম্রাট! আমিকি এমন কিছু করেছি যার

জন্যে আপনার বিরাগভাজন হয়েছি?চুনারের দুর্গ

আমার পুত্র কুতুব খাঁর দখলে, এটা সত্য । সম্রাটের

আদেশ পাওয়ামাত্র কুতুব খাঁ দুর্গের চাবি আপনার

পবিত্র হাতে তুলে দিয়ে আপনার পদচুম্বন করবে ।

বাদশাহ নামদার পর্ব –৬

তবে আপনার কোনো প্রতিনিধির হাতে না। আপনি

স্বয়ং উপস্থিত হলে তবেই দুর্গের চাবি আপনার হস্ত

মোবারকে দেওয়া হবে । আমি পুত্রকে নিয়ে বঙ্গদেশের

ভেতরে চলে যাব । এর অন্যথা কখনো হবে না ।

হে পবিত্র সম্রাট, আপনি গুপ্তচর মারফত খবর

নিয়ে নিশ্চয়ই জেনেছেন আমি আমার নিজের নামে

খুৎবা পাঠ করাই না । মহান মোঘল সম্রাট হুমায়ূনের

নামের জুমার নামাজে খুৎবা পাঠ করা হয় । টাঁকশাল

থেকে আমার নামে কোনো মুদ্রা তৈরি হচ্ছে না ।

এই অধম যেখানে সম্রাটের সেবায় নিযুক্ত তখন আপনি

তার উপর বিরাগ হচ্ছেন, অথচ আমি যতদূর জানি আপনার

ভাই আসকারি মীর্জা এবং কামরান মীর্জা তাঁদের নামে খুৎবা

পাঠ করছেন । টাঁকশালে তাঁদের নামে স্বর্ণমুদ্রা তৈরি হচ্ছে

এরকম কিছু মুদ্রা আপনার কাছে পাঠালাম ।

মহান সম্রাট, আপনার দুই ভাইয়ের নাম এখানে এন যদি

অপরাধ করে থাকি তাহলে ক্ষমা প্রার্থনা করি । আপনার

মহান পিতা বঙ্গদেশের ফল আম অত্যন্ত পছন্দ করতেন ।

আমি আম এবং আরও কিছু বঙ্গদেশীয় ফল আপনার সেবার

জন্যে পাঠালাম । এই সঙ্গে একটি বিষ্ণুমূর্তি । বিষ্ণুমূর্তিটির

ওজন এগারো সের । সম্পূর্ণ স্বর্ণনির্মিত, এর চোখ নীলকান্তমণির ।

এই বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্প হলো, ভয়াবহ বিপদের আগে আগে

অশ্রুবর্ষণ করে । রহস্যময় বিষয়ে আপনার আগ্রহের কথা জানি বলেই

বিষ্ণুমূর্তি বিষয়ে প্রচলিত গল্পটি জানালাম ।

ইতি

শের খাঁ

আপনার দাসুনুদাস সেবক ।

Read more

হুমায়ূন আহমেদ এর লেখা বাদশাহ নামদার পর্ব –৭

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *