বৃক্ষকথা-পর্ব-(১)-হুমায়ুন আহমেদ

বৃক্ষকথা

ভূমিকা 

আমার খুব পছন্দের একটা হাদিস দিয়ে শুরু করি। নবিজি (সা.) বলছেন, যদি তুমি জানাে পরের দিনই রােজ কেয়ামত, তারপরেও একটি গাছ লাগিও।

গাছ লাগানাের কোনাে সুযােগ আমার ছিল না। সারাজীবন বাস করেছি শহরে। কংক্রিট খুঁড়ে তাে আর চারা লাগানাে যায় না। অনেকেই দেখি টবে গাছ লাগান। ব্যাপারটা আমার ভালাে লাগে না। টবে গাছ লাগানাের অর্থ গাছের ভুবন সীমিত করে ফেলা। এমনিতেই বেচারা হাঁটতে পারে না। 

অনেককেই দেখি বনসাই’ নিয়ে উত্তেজিত। বিশাল বটবৃক্ষকে বামুন বানিয়ে উত্তেজিত হবার কী আছে? একটি বিশাল প্রাণকে সঙ্কুচিত করার অপরাধে তারা। অপরাধী। বৃক্ষদের হাতে শাসনক্ষমতা থাকলে এই অপরাধে তারা যাবজ্জীবন শাস্তির ব্যবস্থা করত। মানবজাতি ভাগ্যবান, বৃক্ষের হাতে শাসনক্ষমতা নেই।

বৃক্ষকথা-পর্ব-(১)-হুমায়ুন আহমেদ

প্রায় দশবছর আগে নুহাশ পল্লীতে আমি নিজের হাতে আটটা ঝাউগাছ লাগাই। তখন কল্পনাও করি নি, এই ছােট ছােট চারা আকাশ স্পর্শ করার স্পর্ধা নিয়ে বড় হবে। আমি যতবার নুহাশ পল্লীতে যাই, একবার হলেও ঝাউগাছগুলির পাশে গিয়ে দাড়াই। তাদের স্পর্শ করে বলি— ‘এই তােদের আমি নিজের হাতে লাগিয়েছি! আজ যে তােরা এত বড় হয়েছিস, তার মূলে কিন্তু আমি। আমাকে Hello বল।। 

ঝাউগাছগুলি আমাকে Hello বলে। তাদের ভাষায় বলে । অন্যরা না বুঝলেও আমি বুঝি। ঝাউগাছ দিয়েই আমার বৃক্ষরােপণ শুরু। যেখানে যে গাছ পাই, নুহাশ পল্লীতে লাগিয়ে দেই। নিতান্তই অপরিকল্পিত বৃক্ষরােপণ। কাঁঠালগাছের পাশে গােল মরিচের গাছ। তখনাে জানি না গােলমরিচ গাছ অন্য এক গাছকে জড়িয়ে না ধরে বড় হতে পারে 

 সে তার জীবনীশক্তি বড় কোনাে গাছ থেকে নেয়। 

এখন আমি গাছপালা সম্পর্কে কিছু জানি। দুনিয়ার বই পড়ছি, ইন্টারনেট ঘাঁটছি কেন জানব না? যা কিছু জেনেছি তা অন্যদের জানাতে ইচ্ছা করছে। আমার মূল আগ্রহ। ঔষধি গাছ । আমার কেন জানি মনে হয়, একসময় এদের কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে। 

বৃক্ষকথা-পর্ব-(১)-হুমায়ুন আহমেদ 

ঘৃতকুমারী 

আদা কদর गौशा বেল পান वामक অগুরু বা অগর কলকে সৌভাগ্য বাদাম বৃক্ষ তেঁতুল বাজনা কাঁকড়ার চোখ নিসিন্দা বিলম্বী মৃত্যুফুল বকফুল ওলট কম্বল/শয়তানের তুলা ওলট চালঅগ্নিজিহ্বা বনকলা না-কি কলাপতি ? আম কাঁঠাল নিম বিছুটি খয়ের কৃষ্ণবট ঘেটু পুত্ৰঞ্জীব রাণীর ফুলজারুল লটকন হিং বরুন তেলাকুচা করমচা পপি লজ্জাবতী আতা পেঁকি শাক তালগাছ শয়তানের গাছছাতিম গাব ধূপগাছগুগল বকুলসদাপুষ্প মাকাল রিঠা আদা ‘বেহেশতে তােমাকে দেয়া হবে আদা মিশ্রিত পানীয়। আল কোরান, সূরা দাহর And they shall drink therin a cup tempared with Zanjabil (Ginger). আদার মতাে নগণ্য কন্দমূল যা বাংলাদেশের ঝােপঝাড়ে জন্মে, তার স্থান হয়েছে। বেহেশতের পানীয়তে ? অদ্ভুত ব্যাপার না ? 

বৃক্ষকথা-পর্ব-(১)-হুমায়ুন আহমেদ

বিপুল উৎসাহে কোনাে কাজে লেগে পড়াকে আমরা বলি ‘আদা জল খেয়ে লাগা’। এই বাগধারাইবা কেন এসেছে । আদা পানি খেয়ে দেখেছি— অতি অখাদ্য। আমেরিকায় Ginger Beer নামের এক ধরনের পানীয় আছে। আদা, চিনি, ক্রিম অব টারটার পানিতে মিশিয়ে ইস্ট দিয়ে ফার্মেন্টেড করে এই পানীয় তৈরি। সেটাও অখাদ্য। (অখাদ্য না বলে অপেয় বলা উচিত। তবে অখাদ্য শুনতে ভালো লাগে)। 

আদার রসায়ন হচ্ছে— আদায় আছে শতকরা দুই ভাগ ‘Essential oil যার প্রধান অংশ Zingiberene, আদার ঝাঁঝালাে ব্যাপারটা আসে Zingerene থেকে। কিছু লবণ থাকে (Potassiur 0xalate) আর থাকে larpenoids {Comphere, 

cineol, citral, Shogaol, gingerol, bomeol h) 

বােটানিক্যাল নাম Zingiber officinate Rose. আদার ফ্যামিলি Zingiberaceae, এই ফ্যামিলির কয়েকটি প্রজাতি পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। নওয়াজেশ আহমেদের লেখায় পড়েছি (বাংলার বনফুল) বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে এর এক প্রজাতি আছে। বনআদা {Wild ginger). যার বােটানিক্যাল নাম Zingiber spectabile

বৃক্ষকথা-পর্ব-(১)-হুমায়ুন আহমেদ

তিব্বিয়া হাবিবিয়া ইউনানী কলেজের প্রভাষক হেকিম হযরত মাওলানা মােঃ মােস্তফা ‘আম আদা’ নামের এক আদার উল্লেখ করেছেন (রােগােপকারী গাছগাছালি লতাপাতা) । এই আদা শুধু আচার তৈরিতে ব্যবহার হয়। আমি এ ধরনের আদার কথা শুনি নি। 

ভারতীয় এবং চৈনিক ভেষজবিদরা আদার ঔষধি গুণাগুণ হাজার বছর আগেই জানতেন। অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীরা নানান রােগে আদা ব্যবহার করে আসছেন। আয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য রােগ প্রতিকারে আদার যেসব ব্যবহারের কথা বলেছেন তার কয়েকটি হলাে— অক্ষুধায় এবং অরুচিতে খাবারের আগে সৈন্ধব লবণ দিয়ে সামান্য আদা খাওয়া। সর্দি জ্বরে আদার রসে মধু মাখিয়ে খাওয়া।

নেফ্রাইটিসে রােগীর খাবারের সঙ্গে আদার রস বা উঁঠের (শুকনী আদা) গুড়া মিশিয়ে খাওয়া। পুরনাে আমাশয় গরম পানিতে গুঠের গুঁড়া মিশিয়ে খাওয়া । মাটি ফোলা রােগে দাঁতের গােড়ায় যন্ত্রণা এবং মাঢ়ি ফুলে রক্ত বের হলে গরম পানিতে দু’চামচ আদার রস মিশিয়ে দশ-পনেরাে মিনিট মুখে রাখতে হবে। রক্তপাত বন্ধ করতে। শুকনাে আদৗড়া (ঠ) কেটে যাওয়া জায়গায় চেপে ধরলে রক্তপাত বন্ধ হবে। 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *