মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

আমাদের বায়ােকেমিক শাস্ত্রে ওষুধের সংখ্যা মাত্র বারােবারােটা ওষুধে সর্বরােগের উপশমলক্ষণ বিচার করে ঠিকমতাে ওষুধ দিতে পারলেই হলাে।….. শশী ভট্টাচার্য মনে হয় বান্ধবপুরে স্থায়ী হয়ে গেছেনবান্ধবপুরে প্রাইমারি স্কুল চালু হয়েছেতিনি তার শিক্ষক | ছাত্রসংখ্যা তিনতার প্রধান কাজ ছাত্র সংগ্রহ করাঅপ্রধান কাজ হরিচরণের জমিদারির হিসাবনিকাশ দেখা। শশী ভট্টাচার্যের বর্তমান পরিচয় পাগলা মাস্টার। 

যে মাস্টার কালাে একটা চামড়ার ব্যাগ হাতে ঘুরে বেড়ায়ছােট ছেলেপুলে দেখলে পেছন থেকে এসে ঘাড় চেপে ধরে বলেতাের বাবার কাছে আমাকে নিয়ে যা তােকে স্কুলে ভর্তি করাবপেট এত মােটা কেন ? পেটভর্তি কৃমি গজগজ করছেহা কর ওষুধ খাবি। 

রােগী পালাতে চেষ্টা করেঝেড়ে দৌড় দেয়পেছনে পেছনে দৌড়ানশশী মাস্টার। একদিন রােগীর পেছনে ছুটতে শশী মাস্টার শশাংক পালের সামনে পড়ে গেলশশাংক পাল বললেন, আপনার পরিচয় ? | শশী মাস্টার বললেন, আমার বর্তমান পরিচয় আমি একজন দৌড়বিদরােগী ধরার জন্যে দৌড়াচ্ছি। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

আচ্ছা! আপনি পাগলা মাস্টারআপনার কথা শুনেছিআমার নাম শশাংক পাল জমিদারি ছিলহাতিতে চড়ে ঘুরতামএখন হাঁটাহাঁটি করিশশী মাস্টার বললেন, হাঁটাহাঁটি করা শরীরের জন্যে ভালােভিক্ষুক শ্রেণীর যারা সারাদিন হাঁটার মধ্যে, তারা রােগমুক্ত। 

শশাংক পাল বললেন, আমি বর্তমানে ভিক্ষুক শ্রেণীতেই পড়ি, তবে রােগমুক্ত না। নানান রােগ শরীরে স্থায়ী হয়েছেভালাে কথা, আপনি কি মদ্যপান করেন

শশাংক পাল বললেন, মদ্যপানের অভ্যাস থাকলে ভালাে হতােআপনার সঙ্গে মদ্যপান করতামএকা মধ্যপান করা বড়ই কষ্টের। 

শশী মাস্টার বললেন, আপনি বােতল নিয়ে আমার এখানে চলে আসবেনআপনি বােতল নামাবেন আমি ব্যাঞ্জো বাজাবকলের গানের গানও শুনতে পারেনআমার একটা কলের গানও আছে। 

আপনার কলের গানের কথা শুনেছিকলের গানের গান আমি পছন্দ করিযে গানে গায়ককে দেখা যায় না সেই গান মূল্যহীনআপনার চামড়ার বাক্সে কি ওষুধ ? লিভারের ব্যথার কোনাে ওষুধ যদি থাকে দিনখেয়ে দেখি আমি আবার ওষুধ খেতে খুব পছন্দ করিযেকোনাে ওষুধ আগ্রহ করে খাই। 

বৈশাখ মাসের এক রাতের কথাআকাশে নবমীর চাঁদ উঠেছে। শশী মাস্টারের টিনের চালে চাঁদের আলাে পড়েছেটিনের চাল ঝলমল করছেবনভূমির ঝাকড়া সব গাছ মাথায় জোছনা মেখে দুলছেসৃষ্টি হয়েছে অলৌকিক এক পরিবেশশশী মাস্টার কলের গান ছেড়ে জোছনা দেখতে ঘরের বার হয়ে থমকে দাঁড়ালেনজামঘাছের নিচে টুকটুকে লালশাড়ি পরে এক তরুণী দাড়িয়ে আছে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

শশী ভট্টাচার্যের হঠাৎ মনে হলাে, কোনাে মানবী নানিশ্চয়ই স্বর্গের উর্বশীদের কেউকিংবা দেবী স্বরস্বতী স্বয়ং মর্তভূমে নেমে এসেছেনশশী ভট্টাচার্য বললেন, কে ? ………তরুণী চমকে উঠলকিন্তু জবাব দিল নাছুটে পালিয়েও গেল না শশী ভট্টাচার্য বললেন, আপনি কে ? এখানে কী করেন ? তরুণী নিচু গলায় বলল, গান শুনিআপনি কি এই অঞ্চলের

তরুণী হঁসূচক মাথা নাড়লশশী ভট্টাচার্য বললেন, কলের গানে গান হচ্ছেচোঙের ভেতর দিয়ে গান আসেএকটা যন্ত্র হাত দিয়ে দম দিতে হয়আপনি কি যন্ত্রটা দেখবেন ? …….আপনি কি প্রথম গান শুনতে এসেছেন ? নাকি আগেও এসেছেন ? আগেও আসছিতরুণী চারটা আঙুল দেখালশশী মাস্টার বললেন, গান শুনতে ভালাে লাগছে

আরেকটা খাল দিব! থাল কী ? গােল থালের মতাে জিনিসযেখানে গান বাঁধা থাকে। ………তরুণী বলল, গান কি দই যে বাঁধা থাকব? ………একটা থাল এনে আপনাকে দেখাই ? থালটা যন্ত্রের ভেতর দিয়ে হ্যান্ডল চাপলেই খাল থেকে গান হয়। 

তরুণী হাসূচক মাথা নাড়লশশী মাস্টার বললেন, আপনার নাম কী ? নাম বলব নাবলতে না চাইলে বলবেন নাআপনি দাঁড়ান, আমি থাল এনে দেখাচ্ছি তরুণী বলল, আচ্ছা

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

শশী মাস্টার রেকর্ড নিয়ে এসে তরুণীকে দেখতে পেলেন নাজামগাছের নিচে কেউ নেইআশেপাশেও নেইকোনাে এক বিচিত্র কারণে তার সারারাত ঘুম হলাে নাতিনি গভীররাতে ডায়েরি খুলে লিখলেন— 

I saw an Indian lady at the dead of night. Her captivating beauty was all engulfing. For a moment I lost all my senses, I felt like bowing down at her feet

শ্রাবণ মাসহাওরে পানি এসেছেনদীনালা ফুলে ফেঁপে উঠছেধনু শেখ তার একতলা লঞ্চ বিক্রি করে দোতলা লঞ্চ কিনেছেনএই লঞ্চের প্রধান বিশেষত্ব তার হনঘাটে ভিড়েই এমন বিকট শব্দে ভোদেয় যে বাজারের লােকজন চমকে উঠেলঞ্চের দ্বিতীয় বিশেষত্ব হিন্দু মুসলিমের আলাদা আসনহিন্দুরা দোতলায়

মুসলমানরা একতলায়কোনাে মুসলমান দোতলায় উঠতে পারবে দোতলায় ভাতের হােটেল আছেব্রাহ্মণ বাবুর্চির হাতে হােটেলছয় আনায় অতি উত্তম ব্যবস্থাপেটচুক্তি ভাতসবজি, ডাল, ছােট মাছের চচ্চড়িখাওয়ার শেষে একবাটি মিষ্টি দই

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৬)-হুমায়ূন আহমেদ

মুসলমানদের জন্যে আলাদা হােটেল নেইযারা খেতে চায় দোতলার খাবার নিচে চলে আসেতবে মুসলমানরা সাধারণত কিছু খায় নাতাদের এত পয়সাকড়ি নেই। ……দোতলা লঞ্চ চালুর দিনও ধনু শেখ গেল নিবারণ চক্রবর্তীর কাছেতার আশীর্বাদ নিতে । 

নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, দোতলা লঞ্চ কিনেছ খবর পাইছিঅল্পদিনে ভালাে দেখাইলা। ……..ধনু শেখ বিনীত গলায় বলল, আপনার আশীর্বাদআপনার আশীর্বাদ বিনা এই কাজ সম্ভব ছিল না। 

লঞ্চের নাম নাকি দিছজয় মা কালী সার্ভিস ? …………জে কর্তা. তুমি মুসলমান হইয়া লঞ্চের নাম দিলা জয় মা কালী ? …………ধনু শেখ বলল, বাতাস বুইজ্যা পাল তুলছিহিন্দু যাত্রী বেশিসেই কারণে হিন্দু নাম। 

নিবারণ চক্রবর্তী বললেন, মুসলমান যাত্রী যদি বেশি হওয়া শুরু করে তখন কি নাম পাল্টাইবা ? ……..ধনু শেখ হাসিমুখে বললেন, অবশ্যইতখন নাম হইব মা ফাতেমা সার্ভিস। ………মা ফাতেমাটা কে ? আমাদের নবিজির কন্যাভালােভালােখুব ভালাে। 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(১৭)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *