মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

মাওলানা ইদরিস বললেন, হে আল্লাহপাক, তুমি আমাকে শয়তানের ধোকা থেকে রক্ষা করতিনি আয়াতুল কুরসি পাঠ শুরু করলেনতার দৃষ্টি কাঠাল গাছের দিকেমেয়েটা এখনাে আছেমাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুই কে ?

নগ্ন মেয়ে কাঠাল গাছের আড়ালে চলে গেল। মাওলানা বললেন, ইবলিশ দূর তােকে আল্লাহর দোহাই লাগে তুই দূর দূর কইলাম। মেয়েটা দূর হলাে নাকাঠাল গাছের আড়াল থেকে বের হয়ে এলােমাওলানা জ্ঞান হারালেন। 

গভীর রাতে তার জ্ঞান ফিরলতিনি বারান্দাতেই শুয়ে আছেনতবে তার গায়ে চাদরমাথার নিচে বালিশ তারচেয়ে আশ্চর্য কথা, শয়তানরূপী মেয়েটা আছেহারিকেন হাতে তার পাশেই গুটিসুটি মেরে বসে আছে তার গায়ে বিছানার চাদর জড়ানাে। মাওলানা ভীত গলায় বললেন, তুমি কে ? মেয়েটা জবাব দিল নাস্থির চোখে তাকিয়ে রইল। 

মাওলানা দৃষ্টি ফেরাতে পারলেন নাকী সুন্দরই না মেয়েটার মুখ! বেহেশতের হুরদের যে বর্ণনা আছে এই মেয়ে সেরকমমাওলানা আবারাে বললেন, তুমি কে

মেয়েটা বলল, আমি জুলেখামাওলানা বিড়বিড় করে বললেন, জুলেখাজুলেখাজুলেখাকোরান মজিদে জুলেখার কথা উল্লেখ না থাকলেও তার স্বামী নবি ইউসুফের কথা অনেকবার বলা হয়েছে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

মেয়েটা বলল, আপনের কলেরা হয়েছেমাওলানা বললেন, জুলেখা, পানি খাব। …জুলেখা বলল, কলেরা রােগীরে পানি দেওয়া যায় নাপানি খাইলে রােগ বাড়ে। ….মাওলানা বললেন, পানি খাবজুলেখা পানি খাব। 

জুলেখা ঘরে ঢুকে গেলমাওলানার মনে হলাে, শয়তান তাকে নিয়ে যে খেলা দেখাচ্ছিল সেই খেলার অবসান হয়েছেমেয়েটা ফিরবে না। 

মেয়েটা কিন্তু ফিরল হাতে কাঁসার গ্লাস নিয়ে ফিরল মাওলানা আবার বমি করতে শুরু করলেনজুলেখা তাঁকে এসে ধরলমাওলানা বললেন, তুমি কে গাে ? ………..জুলেখা জবাব দিল না। 

বাজারের দিক থেকে কাঁসার ঘণ্টা বাজার শব্দ শুরু হয়েছেখুব হৈচৈ হচ্ছেকেউ একজন মারা গেছে কলেরায়ঘণ্টা বাজিয়ে ওলাউঠা দেবীকে দূরে সরানাের চেষ্টাদেবী একবার যখন এসেছেন এত সহজে যাবেন নাতিনি এসেছেন মায়ের বাড়ির দেশে

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ 

ওলাউঠা দেবী কোনাে সহজ দেবী নাবড়ই কঠিন দেবীতিনি যখন দেখা দেন অঞ্চলের পর অঞ্চল শেষ করে দেনশীতলা দেবীর মতাে তিনি তার চেহারা দেখান নাতিনি ঘােমটায় মুখ আড়াল করে হাঁটেনহৈচৈ পছন্দ করেন নাধূপ ধােনর গন্ধ পছন্দ করেন নাতাঁর সবচেয়ে অপছন্দ নদী শীতলা দেবী যেমন অনায়াসে নদীর পানির উপর দিয়ে হেঁটে চলে যান, তিনি তা পারেন নাতাঁকে খেয়ামাঝির সাহায্য নিয়ে নদী পারাপার করতে হয়| ওলাদেবীর হাত থেকে বান্ধবপুরের হিন্দুদের রক্ষার জন্যে বটকালীর মন্দিরে কালীপূজা দেয়া হয়েছে

পাঠা বলি হয়েছেমাটির হাড়িতে পশুর রক্ত সংগ্রহ করা হয়েছেসেই রক্ত দিয়ে সবাই ভক্তিভরে কপালে ফোটা দিয়েছেকপালে যতক্ষণ এই রক্ত থাকবে ততক্ষণ ওলাউঠা দেবী কাছে ভিড়বে নাতিনি পূজার পশুর রক্ত পছন্দ করেন নামন্ত্রপূত একটা কালাে ছাগলের গলা সামান্য কেটে ছেড়া দেয়া হলােযন্ত্রণাকাতর এই পশু যেদিকে যাবে তার পেছনে পেছনে যাবেন ওলাদেবীছাগল যদি ভিন্ন গ্রামে গিয়ে মরে যায় দেবীকে সেখানেই থাকতে হবেএই ছাগলটা প্রথমে ছুটে গ্রাম সীমানার বাইরে গিয়েও কী মনে করে আবার ফিরে এলােমারা গেল বাজারের মাঝখানে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

ওলাদেবীকে দূর করার জন্যে মুসলমানরাও কম চেষ্টা চালাল নাতারা গায়ে আতর মেখে ধূপকাঠি হাতে বের হলােওলাদেবী তাড়ানাের মুসলমানী মন্ত্র একটু ভিন্নদলের প্রধান বলেন— 

বলা দূর যাওরে আলী জুলফিকার এই গেরাম ছাড়িয়া যাও ..দোহাই আল্লাহর। …দলের প্রধানের বক্তব্য শেষ হওয়া মাত্র বাকি সবাই বুক থাপড়ে জিগির ধরে হক নাম, পাক নাম নাম আল্লাহর হুআল্লাহর নূরে নবী পয়দা হু আল্লাহ হু 

হরিচরণ খুব চেষ্টা করলেন ভয়াবহ এই দুর্যোগে কিছু করার জন্যেকোনাে হিন্দুবাড়িতে তিনি ঢুকতে পারলেন নাএই সময়েও জাত অজাত কাজ করতে লাগল ওলাদেবী কিন্তু জাতভেদ করলেন নাতিনি শূদ্রের ঘরে যেমন উপস্থিত হলেন, ব্রাহ্মণের ঘরেও গেলেনদেখা গেল তার কাছে সবই সমানঝাঁপ দিয়ে পড়ল শশী মাস্টারযেখানেই রােগী সেখানেই তিনিঅতি আদরে রােগীর শুশ্রুষা করছেনডাবের পানি খাওয়াচ্ছেনকোলে করে রােগীকে ঘর থেকে বের করছেন, আবার উঠান থেকে ঘরে নিয়ে যাচ্ছেন। 

রােগের প্রকোপ সবচেবেশি জেলেপল্লীতেশশী মাস্টার সেখানে উপস্থিত হতেই একজন জোড়হস্ত হয়ে বলল, বাবু আমার নমশূদ্রআপনি ব্রাহ্মণ, আমাদের এখানে ঢুকবেন না। শশী মাস্টার বললেন, কিছুদিনের জন্যে আমিও নমশূদ্র। এখন ঠিক আছে

ওলাদেবীকে আটকানাের জন্যে প্রথম খেয়া পারাপার বন্ধ করে দেয়া হয়েছিলবান্ধবপুরের মুরুব্বিরা পরে চিন্তাভাবনা করে ঠিক করল, খেয়া বন্ধ করার সিদ্ধান্তটা ভুলতাদের উচিত ওলাদেবীকে নদী পার করে দেয়াদেবীর বিদায় মানেই রাহুমুক্তিখেয়া বন্ধ করে দেবীকে আটকে রাখার অর্থ বিপদমাথায় নেয়া। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

দেবী দিনে চলাফেরা করেন নাউনার হাঁটাচলা সূর্য ডােবার পরবড়গাঙে সন্ধ্যার পর খেয়া চলাচলের ব্যবস্থা নেয়া হলােখেয়া পারাপার করবে শেখ মর্দঅতি সাহসী মানুষতাকে বলে দেয়া হলাে, ঘােমটায় মুখ ঢাকা কেউ যদি উঠে তাকে পার করতে হবেতার সঙ্গে কোনাে কথা বলা চলবে নাপারানি চাওয়া যাবে নাদেবী যেন নৌকায় উঠেন সেই ব্যবস্থাও করা হলোবান্ধবপুরে সন্ধ্যার পর থেকে কাঁসার ঘণ্টা বাজে, ঢােল খােল করতাল বাজে। মশাল হাতে লােকজন ছােটাছুটি করে । 

এমন অবস্থায় রাত্রির দ্বিতীয় প্রহরে ঘােমটায় মুখ ঢেকে কেউ একজন শেখ মর্দর নৌকার পাশে এসে দাঁড়ালঅসীম সাহসী শেখ মর্দর বুক কেঁপে উঠলসে কোনাে কথা না বলে নৌকা ছাড়ল। 

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *