মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২১)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

বিয়ের পর সে একবার মাত্র তিনদিনের জন্যে বাপের দেশে যাবার সুযােগ পেয়েছিল। যেতে হয়েছে বােরকা পরে। সুলেমান কঠিন নিষেধ করে দিয়েছিল, পুরুষ আত্মীয়ের সামনেও বােরকার মুখ খােলা যাবে না। বাবা এবং ভাইদের সামনে খােলা যেত। জুলেখার বাবা কোথায় কেউ জানে না। ভাই যারা তারা সৎ মায়ের গর্ভের, কাজেই বােরকার মুখ খােলার প্রয়ােজন পড়ছে।

মধ্যাহ্ন-পর্ব-২১

হাট থেকে সুলেমান ফেরে সন্ধ্যায়। সেদিন কোনাে কারণে বা ইচ্ছা করেই সে হাটে না গিয়ে দুপুরের দিকে বাড়ি ফিরল। বসত বাড়ির সদর দরজা দিয়ে সাড়াশব্দ করে না ঢুকে ঢুকল বাড়ির পেছন দিয়ে। চুপি চুপি ঘাটলার কাছে এসে থমকে দাড়াল। কী দেখছে সে! জুলেখা সাঁতার কাটছে। চোখ বন্ধ করে চিৎ সাঁতার দিচ্ছে। তার নগ্ন শরীরের পুরােটাই পানির উপর ভাসছে। গুনগুন শব্দও আসছে। গান করছে না–কি! সুলেমান চাপা গর্জন করল— এই বান্দি! তুই করস কী ? 

মুহূর্তের মধ্যে জুলেখা পানিতে ডুব দিল । মানবী জলকন্যা না, দীর্ঘ সময় সে জলে ডুবে থাকতে পারে না। জুলেখাকে ভেসে উঠতে হলাে। সে অতি দ্রুত গায়ে কাপড় জড়াল। আতঙ্কে অস্থির হয়ে সে তাকাল সুলেমানের দিকে। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-২১-হুমায়ূন আহমেদ

সুলেমান বলল, কারে শরীর দেখানাের জন্যে নেংটা হইছস ? জুলেখা বলল, কাউরে দেখানাের জন্যে না। …………সুলেমান বলল, মিথ্যা বইল্যা আইজ পার পাবি না। অবশ্যই কেউ আছে । তারে খবর দেয়া আছে। সে জংলার কোনাে চিপায় আছে। তার নাম বল ।। 

এমন কেউ নাই।…মুরগি যেমন জবেহ করে তাের গলা সেই মতাে কাটব । নাম বল। তুই তাে কারণে অকারণে ঐ হিন্দুর বাড়িতে বইসা থাকস। তার ঘর ঠিক করস। উঠান ঝাড় দেস। তার সাথে তাের কী ? …..উনারে আমি বাবা ডেকেছি। উনার বিষয়ে কিছু বলবেন না । মালাউন হইছে তাের বাবা ? আমারে বাবা শিখাস ? 

জুলেখা চুপ করে গেল। রাগে উন্মাদ একজন মানুষের সঙ্গে যুক্তি তর্ক করা অর্থহীন। সুলেমান দা হাতে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘাটে বসে রইল। দু’জন মুখােমুখি বসা। জহির এখনাে ফিরে নি। এটা ভালাে। হরিবাবুর বাড়িতে আরাে কিছুক্ষণ থাকুক। হাতি দেখবে। খেলবে। রাতে তাকে নিয়ে আসবে। সবচে‘ ভালাে হয় রাতে ছেলে ঐ বাড়িতে যদি থেকে যায়। এখানে কী ঘটনা ঘটবে কিছুই বলা যায় না। খুন খারাবিও হয়ে যেতে পারে। পুলাপানদের এইসব দেখা ঠিক না। 

সুলেমান ফিরল বিছুটি পাতার বড় একটা ঝাড় হাতে নিয়ে। তার মুখভঙ্গি শান্ত। রাগের প্রথম ঝড় পার হয়েছে। প্রথম ঝড়ের পর দ্বিতীয় ঝড় আসতে কিছু সময় নেয়। সুলেমান কুপি জ্বালিয়ে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, নেংটা হইতে তাের মজা লাগে। এখন নেংটা হ। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-২১-হুমায়ূন আহমেদ

জুলেখা বলল, না। সুলেমান বলল, কোনাে কথা না। যা করতে বললাম করবি। শাড়ি খােল ।  …আবার বলে না! এক্ষণ খুলবি। তাের নেংটা হওনের স্বাদ জন্মের মতাে মিটায়ে দিব। শাড়ি খােল। জুলেখা শাড়ি খুলল। সুলেমান বিছুটি পাতার বাড়ি শুরু করল।

দু’হাতে মুখ ঢেকে জুলেখা পশুর মতাে গােঙাতে শুরু করল। তার শরীর ফুলে গেল সঙ্গে সঙ্গে। জায়গায় জায়গায় কেটে রক্ত বের হচ্ছে। ফর্সা শরীর হয়েছে ঘন লাল। বিষাক্ত বিছুটি পাতার জ্বলুনিতে জায়গায় জায়গায় চামড়া জমে গেছে। জুলেখার মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। দু’টা চোখই টকটকে লাল। 

সুলেমান বিছুটি পাতার ঝাড় ফেলে দিয়ে বলল, শাস্তি শেষ, এখন শাড়ি পর। …….জুলেখা পশুর মতাে গােঙাতে গােঙাতে বলল, শাড়ি পরব না। এই বাড়িতে আমি যতদিন থাকব নেংটা থাকব। ….সুলেমান বলল, কী বললি ? 

জুলেখা বলল, কী বলেছি আপনি শুনেছেন। আমি বাকি জীবন এই বাড়িতে নেংটা ঘুরাফেরা করব। .সুলেমান বলল, জহিররে আনতে যাইতেছি। কাপড় পর। ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা কইরা দেখ— আমার জায়গায় অন্য কোনাে পুরুষ হইলে শাস্তি আরাে বেশি হইত। 

সুলেমান ছেলেকে নিয়ে রাত ন‘টার দিকে ফিরল । দরজায় খিল দেয়া। অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কানাের পর খিল খুলল । জুলেখা কাপড় পরে নি। সে সম্পূর্ণ নগ্ন। এক হাতে কেরােসিনের কুপি নিয়ে সে স্বাভাবিকভাবেই দাড়িয়ে আছে। যেন কিছুই হয় নি। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-২১-হুমায়ূন আহমেদ

সুলেমান স্ত্রীর হাত থেকে কুপি নিয়ে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল। এমন দৃশ্য ছেলের দেখা ঠিক না। জহির কাদতে শুরু করল। ……..সুলেমান চাপা গলায় বলল, তুই নেংটা থাকবি ? …..তােরে তাে জিনে ধরেছে। ধরলে ধরেছে। আমার ঘরে তাের জায়গা নাই । না থাকলে চইল্যা যাৰ । 

তােরে তালাক দিলাম। তালাক। তালাক। তালাক। এখন ঘর থাইকা যাবি। নেংটা অবস্থায় যাবি । …….জুলেখা স্বাভাবিক গলায় বলল, আচ্ছা । মাওলানা ইদরিসের জ্বর আরাে বেড়েছে। শরীর এবং হাত–পা অবশ হয়ে আসছে। আরেকবার বমি আসছে।

দ্বিতীয়বার বিছানা নষ্ট করা কোনাে কাজের কথা না। তিনি অনেক কষ্টে হারিকেন হাতে দরজা খুলে বারান্দায় এসে খুঁটি ধরে বসলেন। শরীর উল্টে বমি আসছে, তিনি চোখে অন্ধকার দেখছেন। মনে হচ্ছে তিনি অজ্ঞান হয়ে যাবেন এবং আজ রাত্রিতেই তার মৃত্যু হবে। 

শরীরের এই অবস্থায় তার মনে হলাে, অতি রূপবতী এক নগ্ন তরুণী উঠানের কাঠাল গাছের পেছনে এসে দাড়িয়েছে। শয়তান তাকে ধান্ধা দেখাতে শুরু করেছে। মৃত্যুর সময় তিনি যাতে আল্লাহখােদার নাম নিতে না পারেন শয়তান সেই ব্যবস্থা করেছে। পরীর মতাে এক মেয়ের রূপ ধরে এসেছে। 

 

Read More

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *