আপনার স্ত্রীর নাম কী ? বলতে না চাইলে বলতে হবে না। বলতে ইচ্ছা করলে বলেন। তার নাম বলব না।মেয়ে দু’টার নাম কী ? বলতে না চাইলে বলতে হবে না। বলতে ইচ্ছা করলে বলেন। বড় মেয়ের নাম শরিফা। ছােট মেয়ের নাম তুলা। তুলা নাম রেখেছেন কেন? জন্মের সময় খুব হালকা ছিল ?
হু। সাত মাসে হয়েছে। বাঁচার আশা ছিল না। হালিমা তাকে শিমুল তুলার বস্তায় ভরে বাচায়ে রেখেছিল। এখন তুলার স্বাস্থ্য খুবই ভালাে। সারাদিন মারামারি করে। কামড় দেয়া শিখেছে। কামড় দিয়ে রক্ত বের করে দেয়।
আপনার স্ত্রীর নাম হালিমা ? ….হুঁ। …….নাম বলে ফেলেছেন, এখন কি আপনার খারাপ লাগছে ? …….লােকটা চুপ করে রইল। প্রসঙ্গ পাল্টে জুলেখা বলল, আপনার মেয়ে তুলা আপনাকে কামড়ায় ? ………অনেকবার। আমার সারা গায়ে তার কামড়ের দাগ। সে শুধু তার মা‘রে কামড়ায় না।
চান বিবি বলল, আপনার মেয়েটাকে দেখতে ইচ্ছা করছে। লােকটা সঙ্গে সঙ্গে গুটিয়ে গেল । কয়েকবার ঢোক গিলে পাঞ্জাবির পকেট থেকে কালাে কাপড়ের ছােট্ট থলি বের করে পাশে রাখতে রাখতে বলল, এখানে দশটা রুপার টাকা আছে। টাকার পরিমাণ কি ঠিক আছে ?
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
চান বিবি হা–সূচক মাথা নাড়ল। লােকটা উঠে দাড়াল। চান বিবি বলল, চলে যাবেন ? …..বিশ্রাম করেন। রাতটা থাকেন, সকালে যান। ………তাহলে আরেকদিন আসেন। সেদিন টাকা ছাড়াই আসেন। আমি আর আসব না। আমার উপর কোনাে কারণে কি আপনি নারাজ হয়েছেন ?
তুমি ভালাে মেয়ে। আপনার স্ত্রীর চেয়েও কি ভালাে? ………লােকটার চেহারা সামান্যক্ষণের জন্যে কঠিন হয়ে গেল। চান বিবি আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে আছে । কঠিন মুখভঙ্গি সহজ হলাে। লােকটা ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, না।
রুপার টাকার থলেটা চান বিবি সরজুবালার কাছে পাঠিয়ে দিল। এটাই নিয়ম। সরজুবালা সেখান থেকে নিজের অংশ রেখে ফেরত পাঠাবেন। চান বিবির পুরাে টাকাই সরজুবালা ফেরত পাঠালেন। প্রথম রােজগারে ভাগ বসালেন না। চান বিবি প্রথম রােজগারের টাকায় তার ছেলে জহিরের জন্যে জামা, জুতা কিনল। বান্ধবপুর জুম্মা মসজিদের ইমাম সাহেবের জন্যে একটা তুর্কি ফেজ টুপি কিনল। শশী মাস্টারের জন্যে কিনল নকশি করা সিলেটের শীতলপাটি। জিনিসগুলি হাতে নিয়ে সে কিছুক্ষণ কাঁদল।
ভদ্রঘরের একটি মেয়ের স্থান হয়েছে রঙিলা বাড়িতে এই ঘটনা বান্ধবপুরে কোনাে আলােড়ন তুলল না। অনেক দিন এই বিষয়টা কেউ জানলও না। সুলেমান সবাইকে বলল, স্ত্রীকে সে তালাক দিয়েছে। স্ত্রী চলে গেছে তার বাপ
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
ভাইয়ের কাছে। মুসলমান সমাজে স্ত্রীকে তালাক দেয়া এবং স্ত্রীর বাপ–ভাইয়ের কাছে চলে যাওয়া অতি স্বাভাবিক ঘটনা। এক স্ত্রী চলে যাবে অন্য স্ত্রী আসবে। স্ত্রী একা আসবে না, সঙ্গে দাসী নিয়ে আসবে। স্ত্রীর গর্ভে যেমন সন্তান হবে, দাসীর গর্ভেও হবে। স্ত্রীর গর্ভের সন্তানরা সম্পত্তির ভাগ পাবে। বান্দির গর্ভের সন্তানরা পাবে না। তারা কামলা খাটবে। তাদের বিয়েশাদি হবে তাদের মতােই বান্দি বংশের লােকজনদের সঙ্গে। সহজ হিসাব।
তখনকার ব্যবস্থায় রঙিলা বাড়ি এমন কিছু খারাপ জায়গা না। পুরুষ মানুষদের আমােদ–ফুর্তির অধিকার আছে। তারা খাটাখাটনি করে অর্থ উপার্জন করে। সেই অর্থের খানিকটা যদি নিজের আনন্দের জন্যে ব্যয় করে, তাতে ক্ষতি কী ? পুরুষ মানুষ দিনরাত স্ত্রীর আঁচলে বাধা থাকলে ধরতে হবে সে পুরুষ মানুষই না। তার কোনাে সমস্যা আছে। ক্ষমতাবান পুরুষদের হতে হবে শৌখিনদার। তারা বন্দুক দিয়ে পাখি শিকার করবে। রঙিলা বাড়িতে যাবে। কিছুদিনের জন্যে বাড়িতে ঘাটুগানের ছেলে নিয়ে আসবে। ঘাটুগানের এইসব ছেলে নৃত্যবিদ্যা এবং সঙ্গীতে পারদর্শী। শৌখিনদার পুরুষের নানান আবদার (!) এরা মিটাবে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৫)-হুমায়ূন আহমেদ
এইসব কর্মকাণ্ডে স্ত্রীদের মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ার কিছু নাই। ঘাটুছেলেরা তাদের সতিন না। এরা কিছুদিনের জন্যে এসেছে। সতিনের মতাে চিরস্থায়ী সত্ত্ব নিয়ে আসে নি। | বান্ধবপুর সেই সময় অতি বর্ধিষ্ণু অঞ্চল । রমরমা পাটের ব্যবসা। লবণের ব্যবসা। মাছের ব্যবসা। নতুন লঞ্চঘাট হয়েছে। দিনরাত লঞ্চের ভো শােনা যায়। বরফকল বসেছে। প্যাটরায় বরফ ভর্তি হয়ে দৈত্যকৃতির মাছ চলে যায় নারায়ণগঞ্জ, কোলকাতায়। জলমহাল নিয়ে মারামারি খুনাখুনি হয়। সাহেব পুলিশ অফিসার হাতিতে করে তদন্তে আসেন। তদন্ত শেষে পাখি শিকার করেন। সন্ধ্যার পর তাঁবুতে রঙিলা উৎসব হয়। নর্তকীরা নাচ–গান করে। ঘাটছেলেরা বুকে নারিকেলের মালা বেঁধে ঠোটে রঙ দিয়ে অশ্লীল ভঙ্গিমায় অতি নােংরা গান ধরে। সাহেবরা ঘনঘন মাথা নেড়ে বলেন, Not bad, Not bad at all.
এই বিপুল কর্মকাণ্ডে আমাদের জুলেখা অতি নগণ্য একজন। আপাতত তার কথা থাকুক। আমরা চলে যাই হরিচরণের স্কুলে। স্কুলের ছাত্র সংখ্যা নয়। নয়জনের মধ্যে একজন মাত্র মুসলমান। তার নাম জহির। এই ছেলেটা পড়াশােনায় ভালাে। শুধু ভালাে বললে কম বলা হবে। অতিরিক্ত ভালাে । স্মরণশক্তি অসাধারণ।
