রঙিলা বাড়িতে প্রথম ঢােকার পর মালেকাইন তাকে সামনে বসিয়ে গায়ে হাত রেখে যে কথাগুলি বলেন, সে কথাগুলি চান বিবির মনে গেঁথে আছে। তিনি কথা বলেন বাংলা এবং হিন্দুস্থানি মিশিয়ে । সেই কথাও চান বিবির গানের মতাে লাগে।
| শােন জুলেখা, তুমি রূপ নিয়ে দুনিয়াতে আসছ। গরিব ঘরের মেয়ে। এইটাই তােমার পাপ। যে নিজেই পাপ তার কপালে পাপ ছাড়া আর কী থাকবে ? সে তাে পাপের বাড়িতেই ঢুকবে। এই বাড়িতে পাপ কাটার ব্যবস্থা কিন্তু আছে। যে পুরুষ তােমার কাছে আসবে, সে যদি তােমার সেবায় সন্তুষ্ট হয় তাহলে তােমার কিছু পাপ কাটা যাবে।
কারণ মানুষ ভগবান। মানুষকে তুষ্ট করা ভগবানকে তুষ্ট করা একই জিনিস। তােমার রূপ আছে। সেই রূপ ধরে রাখতে হয়। রূপ ধরে রাখার নিয়মকানুন আছে। আমি তােমাকে শেখাব। তােমার যদি গানের গলা থাকে আমি তােমাকে গান শেখাব। নাচ শেখাব। যদি তােমার কপালে থাকে, তুমি বহু টাকা উপার্জন করবে। যারা তােমার কাছে আসবে, তাদের মধ্যে কারাে সঙ্গে যদি আশনাই হয় তাকে বিবাহ করতে পার। আমার কোনাে অসুবিধা নাই । খাওয়া খাদ্যের মধ্যে নিরামিষ খাবে। নিরামিষ শরীর ঠিক রাখবে। শরীরই আমাদের সম্পদ— এটা মাথায় রাখবে।
ড্যান্স মাস্টার তােমাকে নাচ শেখাবে। শরীরের ভেতরে যদি না থাকে তাহলে নাচ শিখতে পারবে। যদি না থাকে, তাহলে শিখতে পারবে না। তারপরেও ড্যান্স মাস্টার তােমাকে নাচ শেখাবে। নাচ করলে শরীর ঠিক
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
থাকবে । ঠিকমতাে নাচ করলে মন ঠিক থাকে। সেবাদাসীরা মন্দিরে দেবতার সামনে নাচ করে শরীর এবং মন দুটাই ঠিক রাখে। আমাদের এই বাড়িটাও মন্দির। যেসব পুরুষ এই বাড়িতে আনন্দের খোঁজে আসে তারা দেবতা।
কখনাে নিলাজ হবে না। পুরুষমানুষ নটি বেটির কাছেও লজ্জা আশা করে । কোনাে যক্ষ্মারােগীকে ঘরে নিবে না। যত টাকাই সে দিক তাকে ঘরে নেয়া যাবে।
যক্ষ্মারােগী চেনার উপায় আছে। আমি তােমাকে শিখায়ে দেব। তােমার স্বামী, স্বামীর দিকের আত্মীয় কাউকে ঘরে নিবে না। স্বামীকে কোনাে অবস্থাতেই না। খদ্দেরদের কারাে কারাে স্ত্রীরা তােমার সঙ্গে দেখা করতে আসবে। তাদের সঙ্গে কখনাে কোনাে অবস্থায় দেখা করবে না। খদ্দের আমাদের দেবতা। খদ্দেরের স্ত্রীরা উপদেবতা। উপদেবতারা ভয়ঙ্কর। তাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হয়।
যদি কখনাে মনে কর এই জায়গা, এই জীবন তােমার পছন্দ না, তুমি চলে যেতে চাও, তাহলে চলে যাবে। কেউ তােমাকে আটকাবে না। আমি জেলখানা খুলে বসি নাই। দুঃখী মানুষের জন্যে আনন্দ–ফুর্তির ব্যবস্থা করেছি। মানুষকে আনন্দ দেয়ার মধ্যে পুণ্য আছে। তুমি নিজেও আনন্দে থাকার চেষ্টা করবে।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
চান বিবি আনন্দে থাকার চেষ্টা ছাড়াই আনন্দে আছে। নতুন জীবনের শুরুতে প্রথম পুরুষটিকে তার বেশ পছন্দ হয়েছে। ভাটি অঞ্চলের বােকাসােকা চেহারার একজন মধ্যবয়স্ক মানুষ। ফর্সা, লম্বা । চোখেমুখে দিশাহারা ভাব। সে খুব ভয়ে ভয়ে বিছানায় পেতে রাখা শীতলপাটিতে বসল। পকেট থেকে ফুলতােলা ময়লা রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। বিড়বিড় করে বলল, পানি খাব।
চান বিবি ঝকঝকে কাঁসার গ্লাসে পানি এনে দিল। লােকটা এক চুমুক পানি খেয়েই গ্লাস নামিয়ে রাখতে রাখতে মাটির দিকে তাকিয়ে বলল, খুবই গরম। চান বিবি বলল, বাতাস করব ? , বাতাস লাগবে না। দরজার আড়ালে হাছুন উকিঝুঁকি দিচ্ছিল। চান বিবি তাকে ইশারা করতেই সে তালপাতার পাখা দিয়ে বাতাস শুরু করল। লােকটি বিস্মিত হয়ে বলল, আপনার মেয়ে ?
চান বিবি বলল, আমার মেয়ে না। তবে মেয়ের মতােই। আমাকে আপনি আপনি বলতেছেন কী কারণে? আমি বয়সে আপনার ছােট। …..লােকটি চট করে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, যাই । চান বিবি বলল, চলে যাবেন ? কিছুক্ষণ জিরান। বাতাস খান। শরীর ঠাণ্ডা। করেন। মন ঠাণ্ডা করেন। আসেন, গল্প করি।
মধ্যাহ্ন-পর্ব-(২৪)-হুমায়ূন আহমেদ
লােকটা সঙ্গে সঙ্গে বসল। আবার পকেট থেকে রুমাল বের করে কপালের ঘাম মুছল। তবে এবার রুমালটা পকেটে ঢুকাল না। হাতে নিয়ে বসে রইল। চান বিবি বলল, রুমালে সুন্দর ফুলের কাজ। কে করেছে ? আপনার স্ত্রী ? আপনার ছেলেমেয়ে আছে ? দুই মেয়ে। তারা দেখতে সুন্দর ? আপনার স্ত্রীর চেহারা কেমন ? সুন্দর ? ………..আমার চেয়েও সুন্দর ? আপনি কি কিছু খাবেন ? শরবত বানায়ে দিব ? ……ঘরে মিষ্টি আছে। মিষ্টি দিব ? বেগমগঞ্জের লাড়ু।
