মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মধ্যাহ্ন

হরিচরণ মেয়েটির কণ্ঠস্বর শুনেও মুগ্ধ হলেনকী সুরেলা কণ্ঠ! ঈশ্বর যার প্রতি করুণা করেন সর্ব বিষয়েই করেনমেয়েটি খালি পায়ে উঠানে দাঁড়িয়ে আছেহরিচরণের মনে হলাে, মেয়েটির পায়ের কারণেই উঠান ঝলমলকরছেএত রূপবতী কেউ কি এর আগে উঠানে এসে দাড়িয়েছে মাগাে! আপনার ছেলেকে আমার কোলে দেনআপনার ছেলে কোলেনিয়ে আমি একটা প্রার্থনা করবহরিচরণ ঠাকুরঘরে বসে আছেনতার কোলে জহিরজহির ঘুমাচ্ছেশান্তির ঘুম

হরিচরণ হাতজোড় করে বললেন, হে পরম পিতাহে দয়াময়আজ রাতে আমি তােমার কাছে একটা প্রতিজ্ঞা করতে চাইআমি আমার এক জীবনে যা উপার্জন করেছি, সবই জনহিতকর কার্যে দান করবআমি যেনআমার প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারি এইটুকু শুধু তুমি দেখবেআমি পৃথিবীতে নগ্ন অবস্থায় এসেছিলাম, পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নগ্ন অবস্থায় বিদায় নিব। 

হরিচরণের চোখ দিয়ে পানি পড়তে লাগলপরদিন সকালেই একটি মুসলমান ছেলেকে ঠাকুরঘরে প্রবেশ করানাের অপরাধে হরিচরণকে সমাজচ্যুত করা হলােসােনাদিয়ার জমিদার শশাংক পালের বৈঠকখানায় সমাজপতিদের বৈঠক বসলবৈঠকের প্রধান বক্তা ন্যায়রত্ন রামনিধি চট্টোপাধ্যায়তিনি শাস্ত্র ভালাে জানেনতাঁকে আনা হয়েছে শ্যামগঞ্জ থেকেশশাংক পাল ঘােড়া পাঠিয়ে আনিয়েছেনধর্মবিষয়ক অনাচার তিনি নিতেই পারেন নান্যায়রত্ন রামনিধি চট্টোপাধ্যায় কঠিন কঠিন কথা বললেন

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

মহাভারতের কিছু কাহিনীও বললেন যার সঙ্গে হরিচরণের সমস্যার কোনাে সম্পর্কই নেইসুশােভনার গর্ভে পরিক্ষীতের তিন পুত্রশল, দল এবং বলের গল্পশল রাজা হয়েছেন, তিনি ব্রাহ্মণ বামদেবের কাছ থেকে দুই ঘােড়া ধার হিসেবে নিয়ে এসেছেন হরিণ শিকারের জন্যেহরিণ শিকার হলাে কিন্তু রাজা শল দুই ঘােড়া ফেরত পাঠালেন নাবামদেব যখন ঘােড়া ফেরত চাইলেন, তখন রাজা শল বললেন, আপনার ঘােড়ার প্রয়ােজন কী ? বেদই তাে আপনার বাহন। 

গল্প শেষ করে ন্যায়রত্ন কিছুক্ষণ চোখ বন্ধ রেখে চোখ খুলে বললেন, হরিচরণের সর্বনিম্ন শাস্তি সমাজচ্যুতি। অম্বিকা ভট্টাচার্য ক্ষীণস্বরে প্রায়শ্চিত্যের কথা বলে ধমক খেলেন। ……….ন্যায়রত্ন বিরক্ত গলায় বললেন, তুমি পূজারি বামুন শাস্ত্র জানাে না বলে প্রায়শ্চিত্যের কথা বললা ঠাকুরঘর যে অপবিত্র করেছে তার আবার প্রায়শ্চিত্য 

কী ? ……অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, ঠিক ঠিক এই বিষয়টা মাথায় ছিল নান্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, ………………….কালী করালী মনােজবা সুলােহিতা যা সুধূম্রবর্ণাস্কুলিঙ্গিনী বিশ্বরুচি দেবী ………..লেলায়মানা ইতি সপ্তজিহ্বাঃ অম্বিকা ভট্টাচার্য আবারাে বললেন, ঠিক ঠিক ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, ব্যাখ্যা করব ? অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, আমি প্রয়ােজন দেখি নাবিধান শুধু বলে দেন। 

ন্যায়রত্ন রামনিধি বললেন, বিধান আগে একবার বলেছিআরেকবার বলিবিধান হলাে, হরিচরণ সমাজচ্যুতহরিচরণের সঙ্গে যারা বাস করে তারাও সমাজচ্যুততবে তাদের জন্যে প্রায়শ্চিত্যের সুযােগ আছেতারা টাটকা গােবর ভক্ষণ করে এবং সাধ্যমতাে দান করে শুদ্ধ হতে পারেঅন্যথায় তাদের সবার জন্য ধােপানাপিত বন্ধসামাজিক আচার বন্ধ। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

হরিচরণ হতাশ চোখে তাকিয়ে আছেনহরিচরণের পেছনে হাতজোড় করে মুক দাড়িয়ে আছেসে সামান্য কাপছেতার চোখ ভেজামুকন্দের শব্দ করে কাদার ইচ্ছাসে ভয়ে কাঁদতে পারছে নান্যায়রত্ন বললেন, হরিচরণ

তুমি কিছু বলতে চাও? ………..হরিচরণ নাসূচক মাথা নাড়লেন। ……..অম্বিকা ভট্টাচার্য বললেন, হরিচরণের ঘরে রাধাকৃষ্ণ আছেঠাকুর পূজা হয়এর কী বিধান

ন্যায়রত্ন বললেন, মূর্তি সরিয়ে নিতে হবেগাভী যদি থাকে গাভী নিয়ে নিতে হবেসে গাভী সেবা করতে পারবে না। …….হরিচরণ বললেন, অন্য জাতের মানুষও গাভী পালন করেআমার জাত গিয়েছে, আমি গাভী পালন করতে পারব না কেন

শশাংক পাল হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে বললেন, ভালাে যুক্তিঅতি উত্তম যুক্তি। ………..ন্যায়রত্ন বললেন, ধর্ম যুক্তিতে চলে নাধর্ম চলে বিশ্বাসেধর্মের সপ্ত বাহনের এক বাহন বিশ্বাস। ….শশাংক পাল বললেন, এইটাও ভালাে যুক্তি। 

ন্যায়রত্ন বললেন, ধর্ম থেকে যে পতিত তার স্থান পাতালের রসাতলেপাতালের সাত স্তর, যেমনঅতল, বিতল, সুতল, তলাতল, মহাতল, রসাতলও পাতালরসাতল হলাে পাতালের ষষ্ঠ তলএই তলে যে পতিত, তার গতি নাই

হরিচরণ বললেন, পাতালের সপ্তম তলে কার স্থান ? ………..মাতৃহন্তার স্থান যাই হােক, তােমার সঙ্গে শাস্ত্র আলােচনায় আমি যাব না। আমার বিধান আমি দিলাম তুমি ধনবান ব্যক্তিপ্রয়ােজনে কাশি থেকে নতুন বিধান নিয়া আসতে পার। ….হরিচরণ বললেন, আমি কোনাে বিধান আনব নাআপনার বিধান শিরােধার্য। 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৪)-হুমায়ূন আহমেদ

শশাংক পাল হুকোয় লম্বা টান দিয়ে বললেন, যাগযজ্ঞ করে কিছু করা যায় না ? সপ্তাহব্যাপী যাগযজ্ঞ, নাম সংকীর্তন। হরিচরণ বিত্তবান। সে পারবে। ………ন্যায়রত্ন কঠিন গলায় বললেন, নাএই বিষয়ে বাক্যালাপে সময় নষ্ট করা অর্থহীন। …….শশাংক পাল বললেন, এটাও ঠিক কথাতুচ্ছ বিষয়ে সময় হরণ । 

হরিচরণ জাতিচ্যুত হলেন সকালেদুপুরের মধ্যে তার ঘর জনশূন্য হয়ে গেলমুকন্দ চোখের জল ফেলতে ফেলতে বিদায় হলােতাকে তিনি দুটো দুধের গাই দিয়ে দিলেনরান্নাবান্নার জন্যে যে মৈথিলি ঠাকুর ছিল, সে চুলা ভেঙে চলে গেলনিয়ম রক্ষা করল। পতিতজনের ঘরের চুলা ভেঙে দেয়া নিয়মযে কোনাে একটা ঘরের চালাও তুলে ফেলতে হয়। আত্মীয়স্বজনরা সেই চালা মাড়িয়ে চলে যাবেহরিচরণের আত্মীয়স্বজন কেউ নেই বলে চালা ভাঙা হলাে না

| বৃদ্ধা মায়ালতাকে সন্ধ্যার মধ্যে তিনি নৌকায় কাশি পাঠাবার ব্যবস্থা করলেনমায়ালতা সঙ্গে করে কষ্টিপাথরের রাধাকৃষ্ণ মূর্তি নিয়ে গেলেনবিদায়ের সময় হরিচরণ জেঠিমাকে শেষ প্রণাম করতে গেলেনমায়ালতা আঁৎকে উঠে বললেন, খবরদার পায়ে হাত দিবি নাতুই ডুবছস, আমারে ডুবাইস নামায়ালতার বিদায়ের সঙ্গে সঙ্গে হরিচরণের বিশাল বাড়ি হঠাৎ খালি হয়ে গেল

 

 

মধ্যাহ্ন-পর্ব-(৫)-হুমায়ূন আহমেদ

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *