তুমি কোথায় ডুব মেরে ছিলে ?
মামার বাড়ি গিয়েছিলাম ।
মামা বাড়ি ? ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মামার বাড়ি ?
হ্যাঁ, মামার বাড়ি । হঠাৎ ওদের খুব দেখতে ইচ্ছা করল ।
তারা কি খুব চমৎকার মানুষ ?
না । তারা পিশাচশ্রেণীর ।
কী সব কথা যে তুমি বল!
সত্যি বলছি । আমার তিন মামা । তিনজনই পিশাচ । তবে একজন মারা গেছেন । এখন দুজন আছেন । তারা পিশাচ হলেও আমাকে খুব স্নেহ করেন । তোমার বাবা-মার কথা বল ।
মার কথা বলতে পারব না । তেমন কিছু জানি না ।
তোমার বাবার কথা বল ।
বাবা ছিলেন একজন চমৎকার মানুষ । তবে বাবা একবার একটা টিয়া পাখিকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিলেন ।
তুমি এমন সব অদ্ভুত কথা বল কেন ?
কী করব বল, আমার চারপাশে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে ।
রূপা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি কি জানো আমি তোমার কথা খুব ভাবি ?
ময়ূরাক্ষী শেষ খন্ড
আমি জানি ।
সত্যি জানো ?
হ্যাঁ জানি ।
কী করে জানো ?
ভালোবাসা টের পাওয়া যায় ।
অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে রূপা বলল, কেন জানি তোমার কথা আমার সবসময় মনে হয় । এর নাম কি ভালোবাসা ?
আমার জানা নেই, রূপা ।
তুমি আসবে আমাদের বাসায় ?
আসব ।
কখন আসবে ?
এক্ষুনি আসছি ।
এত রাতে বাবা হৈচৈ শুরু করবেন । তুমি কি সকালে আসতে পার না ?
না রূপা, আমাকে এক্ষুনি আসতে হবে ।
আচ্ছা বেশ, আস ।
তোমার কি কোনো নীল রঙের শাড়ি আছে ?
কেন বল তো ।
যদি থাকে তাহলে নীল রঙের শাড়ি পরে গেটের কাছে থাক । আমি এলই গেট খুলে দেবে ।
আচ্ছা । আমি গেলাম না । আবারো মাসখানিকের জন্যে ডুব দিলাম । কারণ ভালোবাসার মানুষদের খুব কাছে কখনো যেতে নেই।
আমি রূপাকে কখনো চিঠি লিখিনি । একবার হঠাৎ একটা চিঠি লিখতে ইচ্ছা হলো । লিখতে বসে দেখি, কী লিখব ভেবে পাচ্ছি না । অনেকবার করে একটি লাইন লিখলাম -‘রূপা তুমি কেমন আছ ? সমস্ত পাতা জুড়ে একটিমাত্র বাক্য ।
সেই চিঠির উত্তরে রূপা খুব রাগ করে লিখল- তুমি এত পাগল কেন ? এতদিন পর একটা চিঠি লিখলে- তার মধ্যেও পাগলামি । কেন এমন কর ? তুমি কি ভাব এইসব পাগলামি দেখে আমি তোমাকে আরো বেশি ভালোবাসব ? তোমার কাছে আমি হাতজোড় করছি- স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ কর । ঐদিন দেখলাম দুপুরের কড়া রোদে কেমন পাগলের মতো হাঁটছ। বিড়বিড় করে আবার কী- সব যেন বলছ । দেখে আমার কান্না পেয়ে গেল । তোমার কী সমস্যা তুমি আমাকে বল ।
ময়ূরাক্ষী শেষ খন্ড
আমার সমস্যার কথা রূপাকে কি আমি বলতে পারি ? আমি কি বলতে পারি- আমার বাবার স্বপ্ন সফল করার জন্যে সারাদিন আমি পথে পথে ঘুরি । মহাপুরুষ হবার সাধনা করি । যখন খুব ক্লান্তি অনুভূব করি তখন একটি নদীর স্বপ্ন দেখি । যে নদীর জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একজন তরুণী ছুটে চলে যায় । একবার শুধু থমকে দাঁড়িয়ে তাকায় আমার দিকে । তার চোখে গভীর মায়া ও গাঢ় বিষাদ । এই তরুণীটি আমার মা । আমার বাবা যাকে হত্যা করেছিলেন ।
এইসব কথা রূপাকে বলার কোনোই অর্থ হয় না । বরং কোনো-কোনোদিন তরঙ্গিনী স্টোর থেকে তাকে টেলিফোন করে বলি- রূপা, তুমি কি এক্ষুনি নীল রঙের একটা শাড়ি পরে তোমাদের ছাদে উঠে কার্নিশ ধরে নিচের দিকে তাকাবে ? তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে । একটুখানি দাঁড়াও । আমি তোমাদের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাব ।
আমি যানি রূপা আমার কথা বিশ্বাস করে না । তবু যত্ন করে শাড়ি পরে । চুল বাঁধে । চোখে কাজলের ছোঁয়া লাগিয়ে ছাদের কার্নিশ ধরে দাঁড়ায় । সে অপেক্ষা করে । আমি কখনো যাই না ।
আমাকে তো আর-দশটা সাধারণ ছেলেদের মতো হলে চলবে না । আমাকে হতে হবে অসাধারণ । আমি সারাদিন হাঁটি । আমার পথ শেষ হয় না । গন্তব্যহীন গন্তব্যে যে যাত্রা তার কোনো শেষ থাকার তো কথাও নয়
Read More
