হুমায়ূন আহমেদের লেখা ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের শেষ খন্ড

ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের শেষ খন্ড

তুমি কোথায় ডুব মেরে ছিলে ?

মামার বাড়ি গিয়েছিলাম ।

মামা বাড়ি ? ক্লাস ফাঁকি দিয়ে মামার বাড়ি ?

হ্যাঁ, মামার বাড়ি । হঠাৎ ওদের খুব দেখতে ইচ্ছা করল ।

তারা কি খুব চমৎকার মানুষ ?

না । তারা পিশাচশ্রেণীর ।

কী সব কথা যে তুমি বল!

সত্যি বলছি । আমার তিন মামা । তিনজনই পিশাচ । তবে একজন মারা গেছেন । এখন দুজন আছেন । তারা পিশাচ হলেও আমাকে খুব স্নেহ করেন । তোমার বাবা-মার কথা বল ।

মার কথা বলতে পারব না । তেমন কিছু জানি না ।

তোমার বাবার কথা বল ।

বাবা ছিলেন একজন চমৎকার মানুষ । তবে বাবা একবার একটা টিয়া পাখিকে গলা টিপে মেরে ফেলেছিলেন ।

তুমি এমন সব অদ্ভুত কথা বল কেন ?

কী করব বল, আমার চারপাশে অদ্ভুত সব ঘটনা ঘটে ।

রূপা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, তুমি কি জানো আমি তোমার কথা খুব ভাবি ?

 

ময়ূরাক্ষী শেষ খন্ড 

 

আমি জানি ।

সত্যি জানো ?

হ্যাঁ জানি ।

কী করে জানো ?

ভালোবাসা টের পাওয়া যায় ।

অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে রূপা বলল, কেন জানি তোমার কথা আমার সবসময় মনে হয় । এর নাম কি ভালোবাসা ?

আমার জানা নেই, রূপা ।

তুমি আসবে আমাদের বাসায় ?

আসব ।

কখন আসবে ?

এক্ষুনি আসছি ।

এত রাতে বাবা হৈচৈ শুরু করবেন । তুমি কি সকালে আসতে পার না ?

না রূপা, আমাকে এক্ষুনি আসতে হবে ।

আচ্ছা বেশ, আস ।

তোমার কি কোনো নীল রঙের শাড়ি আছে ?

কেন বল তো ।

যদি থাকে তাহলে নীল রঙের শাড়ি পরে গেটের কাছে থাক । আমি এলই গেট খুলে দেবে ।

আচ্ছা । আমি গেলাম না । আবারো মাসখানিকের জন্যে ডুব দিলাম । কারণ ভালোবাসার মানুষদের খুব কাছে কখনো যেতে নেই।

আমি রূপাকে কখনো চিঠি লিখিনি । একবার হঠাৎ একটা চিঠি লিখতে ইচ্ছা হলো । লিখতে বসে দেখি, কী লিখব ভেবে পাচ্ছি না । অনেকবার করে একটি লাইন লিখলাম -‘রূপা তুমি কেমন আছ ? সমস্ত পাতা জুড়ে একটিমাত্র বাক্য ।

সেই চিঠির উত্তরে রূপা খুব রাগ করে লিখল- তুমি এত পাগল কেন ? এতদিন পর একটা চিঠি লিখলে- তার মধ্যেও পাগলামি । কেন এমন কর ? তুমি কি ভাব এইসব পাগলামি দেখে আমি তোমাকে আরো বেশি ভালোবাসব ? তোমার কাছে আমি হাতজোড় করছি- স্বাভাবিক মানুষের মতো আচরণ কর । ঐদিন দেখলাম দুপুরের কড়া রোদে কেমন পাগলের মতো হাঁটছ। বিড়বিড় করে আবার কী- সব যেন বলছ । দেখে আমার কান্না পেয়ে গেল । তোমার কী সমস্যা তুমি আমাকে বল ।

ময়ূরাক্ষী শেষ খন্ড 

আমার সমস্যার কথা রূপাকে কি আমি বলতে পারি ? আমি কি বলতে পারি- আমার বাবার স্বপ্ন সফল করার জন্যে সারাদিন আমি পথে পথে ঘুরি । মহাপুরুষ হবার সাধনা করি । যখন খুব ক্লান্তি অনুভূব করি তখন একটি নদীর স্বপ্ন ‍দেখি । যে নদীর জল ছুঁয়ে ছুঁয়ে একজন তরুণী ছুটে চলে যায় । একবার শুধু থমকে দাঁড়িয়ে তাকায় আমার দিকে । তার চোখে গভীর মায়া ও গাঢ় বিষাদ । এই তরুণীটি আমার মা । আমার বাবা যাকে হত্যা করেছিলেন ।

এইসব কথা রূপাকে বলার কোনোই অর্থ হয় না । বরং কোনো-কোনোদিন তরঙ্গিনী স্টোর থেকে তাকে টেলিফোন করে বলি- রূপা, তুমি কি এক্ষুনি নীল রঙের একটা শাড়ি পরে তোমাদের ছাদে উঠে কার্নিশ ধরে নিচের দিকে তাকাবে ? তোমাকে খুব দেখতে ইচ্ছা করছে । একটুখানি দাঁড়াও । আমি তোমাদের বাসার সামনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে চলে যাব ।

আমি যানি রূপা আমার কথা বিশ্বাস করে না । তবু যত্ন করে শাড়ি পরে । চুল বাঁধে । চোখে কাজলের ছোঁয়া লাগিয়ে ছাদের কার্নিশ ধরে দাঁড়ায় । সে অপেক্ষা করে । আমি কখনো যাই না ।

আমাকে তো আর-দশটা সাধারণ ছেলেদের মতো হলে চলবে না । আমাকে হতে হবে অসাধারণ । আমি সারাদিন হাঁটি । আমার পথ শেষ হয় না । গন্তব্যহীন গন্তব্যে যে যাত্রা তার কোনো শেষ থাকার তো কথাও নয়

 

Read More

হুমায়ূন আহমেদের লেখা উপন্যাস দরজার ওপাশে খন্ড -১

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *