মৃন্ময়ী-পর্ব-(১০)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

বুঝলে না বুঝবে– মা আমি গেলাম । আজও আমার দেরি হয়ে গেল ফজলু মিয়ার কফি খাওয়া হলাে না।…মা উৎসাহী গলায় বললেন, ফজলু মিয়ার কফি ব্যাপারটা কীরে? তাের মুখে আগেও কয়েকবার শুনেছি।আমি জবাব না দিয়ে দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে নামছি। মা–ও নামছেন। তাঁকে দেখেই মনে হচ্ছে তিনি টেনশনে পড়েছেন। ফজলু মিয়ার কফির রহস্য ভেদ 

হওয়া পর্যন্ত টেনশন কমবে না। আমি নিশ্চিত গাড়িতে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে আমার মােবাইল বেজে উঠবে। মা জিজ্ঞেস করবেন ফজলু মিয়ার কফি ব্যাপারটা কী–রে? ফ্লাস্কে করে আমার জন্যে নিয়ে আসিস তাে। 

মােবাইল টেলিফোনের ঝামেলা ক্লাসের মধ্যেও চলতে থাকবে। মা যদি শেষ পর্যন্ত শাড়ির এ এগজিবিশনে যান তাহলে সেখান থেকে সাজেশান চেয়ে টেলিফোন আসবে, হালকা গােলাপি রঙটা তাের কাছে ভালাে লাগে না হালকা আকাশি ? গাঢ় রঙের কোন শাড়ি কিনব? মােটা মানুষদের নাকি গাঢ় রঙ মানায়। তাদের চিকন দেখা যায়। সত্যি না–কি ? 

যথারীতি আজও ক্লাসে দেরি হলাে। নতুন একজন টিচার এসেছেন। রােল কল শুরু হয়েছে। তিনি ডাকলেন, রােল ফিফটিন। আমি ক্লাসে ঢুকতে ঢুকতে বললাম, ইয়েস স্যার । পুরাে ক্লাস এক সঙ্গে হেসে উঠল । আমাদের এই ক্লাসের হাসি রােগ আছে। অতি তুচ্ছ কারণে সবাই আমরা এক সঙ্গে হাসি। নতুন টিচার আমার দিকে তাকিয়ে বললেন তােমার নাম কী ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১০)

মৃন্ময়ী। ………..নামটা রেজিস্টার খাতায় আছে, তারপরেও আলাদা করে নাম জিজ্ঞেস করায় আনন্দ আছে। তাই না? ………………….জ্বি স্যার। ………..ভদ্রলােক বললেন, আমাকে স্যার ডাকবে না। স্যার ডাক আমার খুবই অপছন্দের। ডিজাইন ক্লাসে আমরা সবাই ছাত্র। ঠিক আছে ? 

জ্বি, ঠিক আছে। যাও বােস। তুমি বসার পর ক্লাশ শুরু হবে। …….আমি ফরিদার দিকে এগুচ্ছি। ফরিদার পাশের চেয়ারটা আমার। সব সময় সেখানেই বসি। কিছু একটা সমস্যা মনে হয় হয়েছে। সবাই তাকিয়ে আছে আমার দিকে। একজন ছাত্রী সামান্য দেরি করে ক্লাসে এসেছে। সে তার জন্যে নির্দিষ্ট করা চেয়ারটায় বসতে যাচ্ছে— এটা এমন কোনাে দৃশ্য না যে দম বন্ধ করে তাকিয়ে থাকতে হবে।

এটা তাে আলফ্রেড হিচককের ছবির সেট না। আর্কিটেকচার বিভাগের ফোর্থ সেমিস্টারের ডিজাইন ক্লাস। নতুন টিচারও যে তাকিয়ে আছেন সেটা উনার দিকে না তাকিয়েও বুঝতে পারছি। মেয়েদের মাথার পেছনে দু’টা অদৃশ্য চোখ থাকে। কোনাে পুরুষ যদি পেছন থেকে তার দিকে তাকায় তাহলে সে অদৃশ্য চোখ দিয়ে দেখতে পায়। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১০)

মৃন্ময়ী। জ্বি। তুমি কি সব সময় এই চেয়ারটায় বস? জুি। …….আজ প্রথমদিন, কাজেই আমি কিছু বলছি না। সবাই আজ তাদের পছন্দের জায়গায় বসবে। কাল থেকে এই নিয়ম থাকবে না। একই চেয়ারে কেউ দ্বিতীয় দিন বসবে না। মানুষ Conditional হতে পছন্দ করে। খাবার টেবিলে দেখবে প্রত্যেকের জন্যে জায়গা ঠিক করা। এই চেয়ারটা মা’র। এই চেয়ারটা বড় মেয়ের। খেতে বসলে ঐ চেয়ার ছাড়া কেউ বসবে না। মানুষ খুবই স্বাধীন প্রাণী কিন্তু অদ্ভুত কারণে সে ভালােবাসে শিকল পরে থাকতে। আমরা যারা ডিজাইন ক্লাসের ছাত্র তাদেরকে শিকল ভাঙতে হবে সবার আগে। মৃন্ময়ী কী বলছি বুঝতে পারছ? 

পারছি স্যার। আগে একবার বলেছি। আবারাে বলি আমাকে স্যার ডাকবে না । ফরিদা উঠে দাঁড়িয়ে বলল, স্যার না ডাকলে আপনাকে কী ডাকব ? …….নাম ধরে ডাকবে। আমার নাম কাওসার। বাের্ডে লিখে দিচ্ছি। ভদ্রলােক বাের্ডের কাছে গিয়ে বড় করে লিখলেন— 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১০)

COW-SIR আমি ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেললাম। ভদ্রলােক তাকিয়ে আছেন আমার দিকে। নামের বিচিত্র বানান দিয়ে তিনি কি সবাইকে অভিভূত করতে চাইছেন ? নাম নিয়ে এই রসিকতা তৈরি করতে তার নিশ্চয়ই বেশ কষ্ট করতে হয়েছে। এই রসিকতায় নিশ্চয়ই অতীতে অনেকে মজা পেয়েছে। আমি পাচ্ছি না। আমার বিরক্তি লাগছে। আচ্ছা আমি কি আমার নাম নিয়ে এমন কিছু করতে পারি ? Mrinmoye–কে লেখা যেতে পারে MR IN MOYE তাতে লাভ কি কিছু হয় ? নামের আগে MR চলে আসে এইটুকু লাভ। 

ভদ্রলােকের বয়স কত হবে ? পঁয়ত্রিশ কিংবা তারচেয়ে কম। পাঁচমিশালী রঙে ভর্তি শার্ট পরে আছেন। ডান হাতে লাল রঙের ব্যান্ড জাতীয় কিছু। পাংকু বলতে পারলে ভালাে হতাে। তা বলা যাবে না। দ্রলােকের Ph.D ডিগ্রি আছে। আমাদেরকে জানানাে হয়েছে— অসম্ভব মেধাবী একজন টিচার জয়েন করছেন।

তিনি ডিজাইন ক্লাস নেবেন। বড়লােকের ফেলটুস ছেলে হাতে লাল ব্যান্ড পরলে পাংকু হয়ে যায়, কিন্তু Ph.D ওয়ালা অসম্ভব মেধাবী কেউ কি তা হন ? সহজ সাধারণ কিছু পরে থাকলে তাকে অনেক সুন্দর লাগত। আমার ধারণা ভদ্রলােক যদি কালাে প্যান্টের ওপর হালকা হলুদ পাঞ্জাবি পরতেন তাকে অনেক বেশি মানাত। 

ফরিদা ফিসফিস করে বলল, এই লােক না–কি দারুণ ব্রিলিয়ান্ট। আমেরিকান ইউনিভার্সিটি থেকে রেকর্ড নাম্বার পেয়ে পাস করেছে কিন্তু নিজের নাম নিয়ে কী ছাগলামি করছে দেখেছিস? আমাদের স্কুলের ছাত্র ভাবছে কি–না কে জানে। যখন ধরা খাবে তখন টের পাবে। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১০)

ভদ্রলােক ফরিদার দিকে তাকিয়ে বলবেন— তুমি মনে হয় আমাকে নিয়ে মাছ মাছ করছ। ………ফরিদা মুখ শুকনা করে বলল, মাছ মাছ করছি মানে কী স্যার? ……..মাছ মাছ মানে Fish Fish. তুমি আমাকে নিয়ে ফিসফিস করছ। যাই হােক ভালাে করে লক্ষ কর 

আমার নামের মধ্যেই Sir আছে। নামের শুরুতে একটি নিরীহ প্রাণী আছে। আমি নিজেও ঐ প্রাণীটির মতােই নিরীহ। আমি যতদূর জানি আজ তােমাদের একটা প্রজেক্ট জমা দেবার কথা। টেবিল ল্যাম্প। তােমরা প্রজেক্ট এনেছ?

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *