ফরিদা বলল, আমি ছাড়া সবাই এনেছে। তুমি আনাে নি কেন? আমি কখনােই সময় মতাে কোনাে প্রজেক্ট জমা দিতে পারি না।কোনাে সমস্যা নেই। তােমার যখন প্রজেক্ট জমা দিতে ইচ্ছা করবে জমা দেবে। এতে নাম্বার কাটা যাবে না। আমার ক্লাসে নাম্বার কাটা যাবার কোনাে সিস্টেম নেই। আর আমার ক্লাসে দাঁড়িয়ে প্রশ্নের জবাব দেবার কিছু নেই। প্রজেক্ট জমা নেওয়া শুরু করার আগে কিছুক্ষণ গল্প করলে কেমন হয় ?
ফরিদা বলল, ভালাে হয় স্যার। ………কাওসার বলল, একটু আগেই বলেছি আমাকে স্যার’ ডাকা যাবে না। আমি প্রশ্নটা আবার করছি—প্রজেক্ট জমা নেওয়া শুরু করার আগে কিছুক্ষণ গল্প করলে কেমন হয় ? ……………….ফরিদা বলল, ভালাে হয় ভাইয়া।
আমরা সবাই হেসে উঠলাম। আমার মনে হচ্ছে এই ভদ্রলােক নিজেকে ইন্টারেস্টিং করার প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। এক্ষুণি হয়তাে পকেট থেকে কয়েন বের করে কয়েন ভ্যানিসের একটা ম্যাজিক দেখাবেন। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে জোক বলে সবাইকে হাসাবেন। কিছু জোক থাকবে মােটামুটি অশ্লীল। এবং তিনি যে মহাজ্ঞানী এই ব্যাপারটা বােঝানাের জন্যে কঠিন কঠিন সব তত্ত্ব কথা বলবেন।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
সদ্য আমেরিকা ফেরত শিক্ষকরা আমেরিকান শিক্ষকদের কাছ থেকে অনেক ফাজলামি শিখে আসে। সেই জিনিস যে বাংলাদেশে চলে তা বুঝতে পারে না। কিছুদিন আমেরিকান ফাজলামি করে ঠাণ্ডা হয়ে যায়। আমি নিশ্চিত এই ভদ্রলােক দু‘তিন মাসের মধ্যেই বদলাবেন এবং সময়মতাে প্রজেক্ট জমা না দেয়ার জন্যে নাম্বার কাটা শুরু করবেন।
আচ্ছা বলাে, সুন্দর ব্যাপারটা কী? কিছু কিছু বস্তু দেখে আমরা বলি ‘সুন্দর। কেন বলি ? এই ছেলে নারিকেলের মালা দিয়ে একটা টেবিল ল্যাম্প বানিয়েছে। আমরা বললাম—সুন্দর হয়েছে। কেন বললাম! ………কেউ জবাব দিল না। দ্রলােক বললেন, সুন্দর অসুন্দরের প্রভেদটা আমরা কীভাবে করি ?
এবারও সবাই চুপ করে রইল। ভদ্রলােক তিনটা ফুলস্কেপ কাগজ দিয়ে দলা পাকিয়ে তিনটা বলের মতাে বানালেন। তিনটা তিন ধরনের বল। তারপর বললেন, টেবিলের ওপর তিনটা বল দেখতে পাচ্ছ। তিনটা বলের মধ্যে একটা অনেক সুন্দর লাগছে। বলাে দেখি কোনটা?
বেশ কয়েকজন ছাত্র এক সঙ্গে বলল, মাঝেরটা। ………..ভদ্রলােক বললেন, এখন দেখ কী করি বলগুলাের ওপর আমি আলাে ফেলব। আলাে এমনভাবে ফেলা হবে যে মাঝের বলটা আর সুন্দর লাগবে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
আমি অবাক হয়েই দেখলাম দ্রলােকের কথা ভুল না। মাঝখানের বলটা এখন আর সুন্দর লাগছে না, বরং প্রথম বলটা সুন্দর লাগছে। …………ভদ্রলােক মাথার চুল আঁকিয়ে বললেন, এখন বলাে দেখি সুন্দর কী ? Define beauty. মৃন্ময়ী তুমি বলাে সুন্দর কী ?
আমি চুপ করে আছি। সুন্দর অসুন্দরের কচকচানিতে যেতে চাচ্ছি না। তাছাড়া আমার মােবাইল বাজতে শুরু করেছে। মা টেলিফোন করেছেন। হয়তাে শাড়ি বিষয়ক কিছু বলবেন। সিল্ক এগজিবিশনে মা যাবেন না তা হবে । আমি মােবাইল অফ করে দিলাম।
মৃন্ময়ী চুপ করে আছ কেন? বলাে সুন্দর কী ? উঠে দাঁড়াতে হবে না। বসে বসে বলল। মােবাইলে মনে হয় কেউ একজন তােমাকে ফোন করেছে। নাম্বারটা দেখে রাখ। আমার প্রশ্নের জবাব দিয়ে কল ব্যাক করাে।
আমি বললাম, যা দেখতে ভালাে লাগে তাই সুন্দর। তুমি বলতে চাচ্ছ যা দেখে চোখ আরাম পায় তাই সুন্দর ? ……………জ্বি। …………..তার মানে হলাে চোখ সব সময় আরাম পায় না। সব সময় একটা কষ্টের মধ্যে থাকে। মাঝে মাঝে সে আরাম পায়। যা দেখে সে আরাম পায় তাকে বলি সুন্দর। এই তাে ?
আমি বুঝতে পারছি না—একটু কনফিউজড বােধ করছি। ……কনফিউজড বােধ করলে লজ্জা পাবার কিছু নেই। সৌন্দর্যের ব্যাখ্যার ব্যাপারে অনেক বিখ্যাত মানুষই কনফিউজড বােধ করেছেন। নােবেল পুরস্কার পাবার পর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর গিয়েছিলেন আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করার জন্যে। আইনস্টাইন হঠাৎ করে তাঁকে প্রশ্ন করলেন, সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা কী ? রবীন্দ্রনাথকে থমকে যেতে হয়েছিল। যাই হােক, মৃন্ময়ী সৌন্দর্যের ব্যাখ্যা দিতে পারছে না।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
ভদ্রলােক হাসি হাসি মুখে একেকজনের দিকে তাকাচ্ছেন। তার দৃষ্টি হঠাৎ থমকে গেল। তিনি বললেন— Young man আসগার না তােমার নাম ? …..আসগার খুবই হকচকিয়ে গেল। উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ইয়েস স্যার। তােমার নাম যে আসগার এটা কী করে জানলাম বলাে তাে? বলতে পারছি না স্যার।
আমি রােল কল করার সময় সবার নাম দেখে নিয়েছি । সতেরােটা নাম মনে রাখা এমন কোনাে কঠিন ব্যাপার না। নাম মনে রাখারও পদ্ধতি আছে। তােমরা চাইলে তােমাদের শিখিয়ে দেব। এখন তুমি বলাে— সৌন্দর্য কী?
জানি না স্যার। ……….মনে করাে তুমি গুলশান এলাকায় হেঁটে যাচ্ছ। চারপাশে দালান। তুমি কোনােটাকে বলছ সুন্দর, কোনােটাকে বলছ অসুন্দর। কেন বলছ ? বিচার বিবেচনাটা কীভাবে করছ ? | আসগার বলল, আমি কোনাে বিবেচনা করি না স্যার। আমি হেঁটে চলে যাই। হাঁটার সময় মাটির দিকে তাকিয়ে হাঁটি।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ
ক্লাসের সবাই হেসে উঠল। সবচে বেশি হাসলেন কাওসার সাহেব। হাসি থামিয়ে বললেন, ভালাে আর্কিটেক্ট হবার সম্ভাবনা তােমার সবচে‘ বেশি। যারা সারাক্ষণ সুন্দর সুন্দর নিয়ে চিন্তা–ভাবনা করে তারা আসল কাজ পারে না। যেমন ধরাে আমি। আমি যে কটা ডিজাইন করেছি তার সবকটাই অতি নিম্নমানের। যাই হােক, এসাে মূল বক্তব্যে ফিরে যাই— সৌন্দর্য সম্পর্কে আমার নিজের ব্যাখ্যাটা বলি। খাতা খুলবে না—আমি যা বলব শুধু শুনে যাবে, খাতায়
নােট করবে না। ……….আমার নিজের ধারণা জীবন্ত কিছু মানেই সুন্দর। জড় বস্তুকে তখনি সুন্দর মনে হবে যখন মনে হবে এর ভেতর প্রাণ আছে। প্রাণটা স্পষ্ট না, অস্পষ্ট। তবে আছে। যখন মনে হবে আছে তখনি সেটা আমাদের কাছে সুন্দর লাগে। এক গাদা রট আয়রন তুমি ফেলে রাখলে— এর প্রাণ নেই কাজেই অসুন্দর।
ওয়েল্ডিং মেশিন এনে জোড়া লাগিয়ে লাগিয়ে তুমি একটা খাট তৈরি করলে। খাটের মধ্যে প্রাণ তৈরি হলাে। খাটটাকে দেখে মনে হচ্ছে কেউ যখন খাটে ঘুমুতে আসে তখন সে আনন্দিত হয়। কাজেই খাটে সৌন্দর্য তৈরি হলাে। এই প্রাণ যে যত বেশি তৈরি করতে পারবে সে তত বড় শিল্পী। আমার বক্তৃতা কি কঠিন মনে হচ্ছে ?
Read more
মৃন্ময়ী-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ
