মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

তােমার সঙ্গে যে তােমার বাসা পর্যন্ত যাবই তা নিশ্চিত করে বলতে পারছি। পথে নেমে যেতে ইচ্ছা করলে নেমে যাব।………আমি কথা বাড়ালাম না। চুপ করে রইলাম । উনার যদি নেমে যেতে ইচ্ছা করে উনি নেমে যাবেন। এই কথা বারবার শােনানাের কিছু নেই। তবে একটি তরুণী মেয়ের সঙ্গে তার বাসায় যাবার জন্যে গাড়িতে ওঠা এবং মাঝপথে হঠাৎ নেমে যাওয়া তরুণী মেয়েটির জন্যে অপমানসূচক।

মেয়েটি অপমানিত বােধ করবেই। আমি করব না। কারণ যে–কোনাে ঘটনা আমি যুক্তি দিয়ে বােঝার চেষ্টা করি। যে সবকিছু যুক্তি দিয়ে দেখার চেষ্টা করে সে সহজে অপমানিত বােধ করে না, রাগ করে না। যুক্তিবিদ্যা মানুষকে যন্ত্রের কাছাকাছি নিতে সাহায্য করে। মানুষ বদলাচ্ছে। নতুন শতকের মানুষ যন্ত্রের কাছাকাছি যাবে এটাই স্বাভাবিক। 

মৃন্ময়ী! জ্বি। ………..আমি যখন বললাম, তুমি কোন দিকে যাচ্ছ তখন তুমি উত্তর দিলে দিক জানি না। উত্তরটা কি ঠিক হয়েছে ? ………হ্যা ঠিক হয়েছে কারণ আমি দিক জানি না। 

স্থাপত্য বিদ্যার কোনাে ছাত্রী বলবে দিক জানি না— এটা হতেই পারে না। সূর্য কোন দিকে উঠছে, কোন দিকে অস্ত যাচ্ছে এটা তাকে সব সময় জানতে হবে। শীতের সময় সূর্য যে জায়গা থেকে উঠে গরমের সময় ঠিক সে জায়গা থেকে উঠে না। সামান্য সরে যায়। বলতে পারবে কতটুক সরে যায় ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

স্যার, আমরা তাে এখন ক্লাসে বসে নেই। ক্লাসের বাইরে আছি। গাড়ির ভেতর বসেও যদি ভাইভা পরীক্ষা দেই তাহলে কীভাবে হবে? ……..স্যার হেসে ফেললেন। আমি বললাম– আপনি সব সময় ক্লাসে বলেন, আমি তােমাদের শিক্ষক না। আমি নিজেও একজন ছাত্র। কিন্তু আপনি কখনাে ভুলতে পারেন না যে আপনি একজন শিক্ষক। আমি লক্ষ করেছি ক্লাসের বাইরেও আপনি সারাক্ষণই কোনাে না কোনাে প্রশ্ন করছেন। 

আর করব না। এখন ঠিক করে বলুনতাে আপনি কি সত্যি আমার সঙ্গে চা খেতে যাচ্ছেন, পথে নেমে যাবেন ? বুঝতে পারছি না। ………..আচ্ছা মনে করুন আমাদের ক্লাসেরই অন্য কোনাে একটা ছেলে কিংবা মেয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছে তখনাে কি তাকে এসে বলতেন— পথে আমাকে নামিয়ে দিতে পারবে ? আমার মােটর সাইকেলের চাকা পাংচার হয়েছে ? 

কেন ? গাড়িতে যাওয়া আমার জন্যে জরুরি কিছু না। কার সঙ্গে যাচ্ছি সেটা জরুরি। তােমাকে তাে আমি প্রথম দিনই বলেছি তােমাকে আমার পছন্দ। তােমার মতাে মেয়েরা আমান্তে হিসেবে খুব ভালাে হয়। 

আমান্তে কী ? ……….আমান্তে শব্দটা স্প্যানিশ। এর অর্থ হলাে সেন্টিমেন্টাল ফ্রেন্ড। তুমি না চাইলেও তােমাকে আমি দেখছি একজন আমান্তে হিসেবে। ……….আমান্তেকে নিয়ে কি আপনি সাইকোলজির খেলা খেলেন ? মাঝে মাঝে খেলি। তবে সাইকোলজির খেলা না। ম্যাজিকের খেলা। তার মানে ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রথম দিন যা করেছি সেটা হলাে খুব সহজ একটা ম্যাজিক দেখিয়েছি। আমি চারটা কাগজে চার রকম লেখা লিখেছি। একটাতে লিখেছি– মৃন্ময়ী মােটর সাইকেলে চড়তে রাজি হবে না। সেই কাগজটা রেখেছি এক জায়গায়। আরেকটাতে লিখেছি—মােটর সাইকেলে চড়তে সে খুশি মনে রাজি হবে। সেটা রেখেছি অন্য জায়গায়। তুমি যাই করতে আমি সেই কাগজটা বের করে তােমাকে দেখিয়ে বলতাম— তুমি কী করবে তা আমি আগে থেকেই জানি। 

এতে আপনার লাভ কী হয়েছে ? তােমাকে চমকে দিতে পেরেছি– এটাই লাভ। আপনি কি সবাইকে চমক দিয়ে বেড়ান ? ….সবাইকে চমকাতে ইচ্ছা করে না। কাউকে কাউকে করে। আমান্তেকে করে। ………..আপনি যে ভঙ্গিতে আমাকে বলেছেন তার থেকে অামার মনে হয়েছে এ ধরনের কথা আপনি অবলীলায় বলতে পারেন এবং আমার আগে আরাে অনেককে আমান্তে বলেছেন। বলেন নি ? 

হ্যা বলেছি। তুমি বলাে নি? মুখে বলার কথা বলছি না। বাঙালি মেয়ে এ ধরনের কথা অবলীলায় বলতে পারে না। আমি মনে মনে বলার কথা বলছি। ………..আমি মুখে বা মনে মনে কখনাে বলি নি। বলতে ইচ্ছা করে নি ? 

আমার ইচ্ছাও করে নি। ………….তুমি এমন কঠিন গলায় কথা বলছ কেন ? তােমার গলার স্বর শুনে মনে হচ্ছে খুবই অপ্রিয় কোনাে প্রসঙ্গে তুমি কথা বলছ। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

প্রসঙ্গটা আমার অপ্রিয়। কোনাে একটা ছেলের সঙ্গে আমার পরিচয় হবে। আমান্তে টাইপ পরিচয়। রাত বারটার পর নিচু গলায় তার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলব। ছুটি ছাটার দিন ফুচকা খেতে যাব এবং কিছুক্ষণ পর পর চমকে চমকে রাস্তার দিকে তাকাব কেউ দেখে ফেলল কি–না— এটা আমার খুবই অপছন্দ। স্পেনে কী হয় আমি জানি না। ঐ দেশে কখনাে যাই নি তবে আমাদের দেশে প্রেমের ব্যাপারে কিছু সেট রুলস আছে। জানতে চান ? 

হ্যা জানতে চাই। প্রেমে পড়লে ছেলে–মেয়ের ফুচকা খেতে হবে। কারণটা কী ? ………….ফুচকা বিক্রি হয় পার্কে। এবং মেয়েরা খেতে পছন্দ করে। দামে সস্তা বলে ছেলেদের জন্যে খুব সুবিধা হয়। 

স্যার হাসতে হাসতে বললেন তােমার কথা শুনে মজা পাচ্ছি। এবং আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে আমার ফুচকা খেতে ইচ্ছা করছে। কোনাে একটা পার্কে আমাকে নিয়ে চলাে তাে। ফুচকা খাব। আজ আর তােমাদের বাসায় যাব না। ফুচকা খেয়ে বিদায়। 

আপনি সত্যি ফুচকা খাবেন? ………….হা খাব। প্রেমে পড়ার যে সব সেট রুলস এ দেশে আছে তার প্রতিটি আমি মানতে চাই। টেলিফোন কখন করতে হয় বললে— রাত বারটার পর? 

স্যার ঠাট্টা করবেন না। ……….আমি ঠাট্টা করছি না। আমি সিরিয়াস। আমরা কি ফুচকার দোকানের দিকে যাচ্ছি? ………হ্যা যাচ্ছি। ফুচকা খেতে খেতে তােমাকে একটা ইন্টারেস্টিং কথা বলব। এখনই বলুন। 

সব কথা সব জায়গায় বলা যায় না। জনসভায় যে কথা বলা যায়, শশাবার ঘরে সে কথা বলা যায় না। চলন্ত গাড়িতে যে কথা বলা যায় সে কথা বটগাছের নিচে বসে বলা যায় না। কথা হলাে পেইন্টিং–এর মতাে।………………….জয়নাল আবেদিনের দুর্ভিক্ষের ছবি তুমি তােমার ডাইনিং রুমে টানাতে পারাে না। আমি বােধহয় আবার টিচার হয়ে যাচ্ছি। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(১৯)-হুমায়ূন আহমেদ

হ্যা যাচ্ছেন। সরি– চুপ করলাম। ফুচকা মুখে না দেয়া পর্যন্ত আর কথা বলব না। ………..আমরা ফুচকা খেতে এসেছি শেরে বাংলা নগরে। কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে সারি সারি ফুচকার দোকান। স্যার মুগ্ধ গলায় বললেন– বাহ! মৃন্ময়ী তাকিয়ে দেখ এক সারি কৃষ্ণচূড়া গাছ জায়গাটাকে কেমন বদলে দিয়েছে। কৃষ্ণচূড়া গাছের বদলে যদি জারুল গাছ হতাে তাহলে কী হতাে!

 

Read more

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *