গাছ ভর্তি নীল ফুল ব্যাকগ্রাউন্ডে নীল আকাশ। লেকের পানিতেও নীল আকাশের ছায়া... একটা ড্রীম ড্রীম ব্যাপার হতাে কি–না বল।……………………………………. হয়তাে হতাে। ….সােনালু বলে একটা গাছ আছে যার ফুল ছােট ছােট ফুলের রং গাঢ় সােনালি। কৃষ্ণচূড়া গাছের বদলে সোনালু গাছ হলে কেমন হয়।
জানি না কেমন হতাে। চিন্তা করাে । চিন্তা করে বললা । একটা জিনিস মাথায় রেখে চিন্তা করবে— সােনালি রং বলে কিন্তু কিছু নেই। পৃথিবী সাতটা রং নিয়ে খেলা করে। রামধনুর সতি রং। কারণ আমাদের চোখ এই সাতটা রঙই দেখতে পায়।
পৃথিবীতে কিন্তু আরাে অনেক রং আছে। আমরা সেইসব রং দেখতে পাই না কারণ আমাদের চোখ সেইসব রং দেখার জন্যে তৈরি না। সাতটা রং দেখার জন্যে আমাদের চোখ তৈরি হয়েছে বলেই আমরা সাতটা রং দেখছি। ………..নিন ফুচকা খান। খেতে খেতে ইন্টারেস্টিং কী কথা বলবেন বলুন। না–কি রং বিষয়ক এইগুলিই সেই ইন্টারেস্টিং কথা ?
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
রঙের কথাগুলি তােমার কাছে ইন্টারেস্টিং মনে হচ্ছে না ? ……..না তেমন ইন্টারেস্টিং লাগছে না। বুকিস কথা বলে মনে হচ্ছে। মনে হচ্ছে আপনি বই পড়ে থিওরি মুখস্থ করে এসে থিওরি কপচাচ্ছেন। ………………..সরি।
সরি হবার কিছু নেই। আপনি কন্ডিশন্ড হয়ে গেছেন। থিওরি কপচাতে কপচাতে থিওরি কপচাননা আপনার স্বভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। আপনি নিজে সেটা বুঝতে পারছেন না। আপনি কি ইন্টারেস্টিং কথাটা এখন বলবেন?
হ্যা বলব। আমি লক্ষ করেছি— মােটর সাইকেলে করে একটা ছেলে প্রায়ই ইউনিভার্সিটিতে আসে। তােমাকে লক্ষ করে। তারপর চলে যায়। মাঝে মাঝে তােমার গাড়ির পেছনে পেছনে যায়। একদিন সে আমাকেও ফলাে করেছে। ছেলেটা কে ? …….জানি না তাে কে! …..একটা ছেলে দিনের পর দিন তােমাকে ফলাে করছে তারপরেও ব্যাপারটা তােমার চোখে পড়ল না ?
চোখে পড়ে নি। ছেলেটার সঙ্গে আলাপ করতে চাও? …….অবশ্যই চাই। ………..সে মােটর সাইকেল নিয়ে এখানেও আমাদের পেছনে পেছনে এসেছে। এই মুহূর্তে সে আছে তােমার প্রায় বিশ গজ পেছনের কৃষ্ণচূড়া গাছের আড়ালে। তার গায়ে বিসকিট কালারের শার্ট। ছেলেটা সানগ্লাস পরে আছে। তার চুল কোঁকড়ানাে। ………………………….আশ্চর্য কথা তাে!
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
এই আশ্চর্য কথাটা বলার জন্যেই আজ আমি ইচ্ছা করে তােমার গাড়িতে এসেছি। ফুচকা খাওয়া বা তােমাদের বাড়িতে বেড়াতে যাওয়া আমার মূল উদ্দেশ্য না। এই কথাগুলি বলেছি তােমাকে চমকে দেবার জন্যে।
বুঝতে পারছি। কিছু কিছু মানুষকে আপনি চমকে দিতে পছন্দ করেন। তুমি কি ছেলেটার সঙ্গে কথা বলবে ? না আমি বলব ? ………….আমিই বলব। ফুচকা জিনিসটা তাে আমার খেতে খুবই ভালাে লাগছে। আমি বরং এক কাজ করি আরাে হাফ প্লেট ফুচকা খাই— এই ফাঁকে তুমি কথা বলে এসাে। আমি অপেক্ষা করছি।
রাতের অস্পষ্ট আলােয় দেখা মানুষকে দিনের ঝলমলে রােদে দেখলে সম্পূর্ণ অন্যরকম লাগে। রাতে যাকে রহস্যময় মনে হয় দিনে সে–ই সাদামাটা একজন হয়ে যায়। ভাইয়ার যে বন্ধু চোখে সানগ্লাস পরে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছে তাকে বােকা বােকা দেখাচ্ছে। মনে হচ্ছে সে আমাকে দেখে ভয়ও পাচ্ছে। তার ভয় পাওয়া উচিত না। ভয় পাওয়া উচিত আমার। এই ছেলেটা ভয়ঙ্কর মানুষদের একজন।
সে এখন নিজেই ভয় পাচ্ছে অথচ এই মানুষটাই যখন ছাদে ভাত খাচ্ছিল তখন মােটেও ভয় পাচ্ছিল না। তাকে বােকা বােকাও লাগছিল না। চেহারাও রাতে অনেক সুন্দর দেখাচ্ছিল। ভীত মানুষের চেহারা হয়তাে খারাপ হয়ে যায়। আমি তার দিকে তাকিয়ে বললাম, আপনি এখানে কী করছেন? ……….কিছু করছি না। ………….আপনি কী প্রায়ই আমাকে ফলাে করেন ? ………..সানগ্লাস পরা মানুষটা এই প্রশ্নে মনে হয় খুবই বিব্রত হয়েছে। মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে এখন কৃষ্ণচূড়া গাছের সৌন্দর্য দেখায় ব্যস্ত।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
কেন এই কাজটা করছেন? আমাকে কিছু বলতে চান ? …….কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন। কিছু বলতে চাই না। ……………আমাকে ফলাে করবেন না। প্লিজ। লাল শার্ট পরা ঐ লােকটা কে ? …………….লাল শার্ট পরা ঐ লােক কে তা দিয়ে আপনার কোনাে প্রয়ােজন নেই। প্রয়ােজন আছে?
তাহলে চলে যান। আচ্ছা। আচ্ছা বলে দাঁড়িয়ে থাকবেন না। মােটর সাইকেলে উঠে স্টার্ট দিন। প্লিজ। …..মােটর সাইকেল চলে না যাওয়া পর্যন্ত আমি দাঁড়িয়ে রইলাম। স্যার আমার জন্যে অপেক্ষা করছেন। তাঁর কাছে যেতে ইচ্ছা করছে না। হঠাৎ খানিকটা বিষণ বােধ করছি। কেন করছি তাও বুঝতে পারছি না। রাস্তার ওপাশেই আমার গাড়ি।
ড্রাইভার গাড়ির কাচ নামিয়ে কৌতূহলী চোখে আমাকে দেখছে। একটা কাজ করলে কেমন হয় ? স্যারকে কিছু না বলে রাস্তা পার হয়ে গাড়িতে উঠে বসলে হয় না? তিনি খুবই অবাক হবেন। অপমানিত বােধ করার কথা। তাতে সমস্যা কিছু নেই।
আমি ক্লান্ত ভঙ্গিতে রাস্তা পার হলাম। স্যার কী করছেন বুঝতে পারছি না। তিনি নিশ্চয়ই ফুচকার প্লেট ফেলে দিয়ে দৌড়ে আমার দিকে আসছেন না। ঘটনাটা হজম করছেন। স্যারের মতাে মানুষকে অনেক কিছু হজম করতে হয়।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
গাড়িতে উঠে ড্রাইভারকে গাড়ি চালাতে বললাম। স্যার কী করছেন দেখতে ইচ্ছা করছে। সেটা সম্ভব না। ভদ্রলােক এখন কী করবেন? প্রথমেই ছােট্ট একটা বিপদে পড়বেন। ফুচকার দাম দিতে পারবেন না। ফুচকার প্লেট হাতে নিয়েই তিনি বলেছেন– মৃন্ময়ী, একটা ভুল করে ফেলেছি। মানিব্যাগ আনি নি। তােমার সঙ্গে টাকা আছে তাে?
ফুচকার দাম দেয়ার মতাে টাকা সঙ্গে নেই এটা কোনাে বুদ্ধিমান মানুষের জন্যে বড় সমস্যা না। এই সমস্যার সমাধান বার করা যাবে। তিনি সুন্দর করেই এই সমস্যার সমাধান করবেন। তারপর কী হবে? তিনি চিন্তিত হয়ে বাসায় ফিরবেন। আমার সঙ্গে যােগাযােগ করতে চাইবেন কিন্তু করতে পারবেন না । আমার টেলিফোন নাম্বার তার কাছে নেই।
ড্রাইভার বলল, বাসায় যাব আপা। আমি বললাম, না। কোন দিকে যাব ? ….আপনার ইচ্ছামতাে যে–কোনাে জায়গায় ঘােরাঘুরি করতে থাকুন। আধ ঘণ্টা এই রকম ঘুরবেন, তারপর বাসায় যাবেন।
ড্রাইভারের মুখ শুকিয়ে গেল। আমাদের ড্রাইভার তিনজন। তিন ড্রাইভারের একই অবস্থা হয়। যখনই বলি— আপনার ইচ্ছা মতাে কিছুক্ষণ গাড়ি নিয়ে চক্কর দিন। তখন তাদের দেখে মনে হয় তারা অথই সাগরে পড়ে গেছে। পরের ইচ্ছায় কাজ করতে এদের সমস্যা নেই। নিজের ইচ্ছায় তারা কিছু করতে পারে না। …নিজের স্বাধীন ইচ্ছায় কাজ করার ক্ষমতা এদের নষ্ট হয়ে গেছে।
মৃন্ময়ী-পর্ব-(২০)-হুমায়ূন আহমেদ
দোতলার টানা বারান্দায় বাবা বসে আছেন। বাবার পাশে আজহার চাচা। বারান্দায় চেয়ারগুলি এমনভাবে পাতা যে মুখােমুখি বসার উপায় নেই। দুজন পাশাপাশি বসে আছেন। কথা বলার সময় আজহার চাচা বাবার দিকে তাকাচ্ছেন— হাত–পা নাড়ছেন।
বাবা মূর্তির মতাে সামনের দিকে তাকিয়ে আছেন। ঠোট নাড়া দেখে আলাপের বিষয়বস্তু বােঝা যাচ্ছে না, তবে আজহার চাচার মুখ ভর্তি হাসি দেখে মনে হয় দারুণ মজার কোনাে কথা হচ্ছে। বাবাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বিরক্তির শেষ সীমায় পৌছে গেছেন। যে–কোনাে মুহূর্তে তিনি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়াবেন। সামনের বেতের গােল টেবিলটা লাথি দিয়ে ফেলে দেবেন। এতে যদি বিরক্তি কাটা যায় তাহলে কাটা যাবে। যদি কাটা না যায় তিনি হয়তােবা দোতলার বারান্দা থেকে লাফ দেবেন।
Read more
