মৃন্ময়ী-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

মৃন্ময়ী

যেন ডেনটিস্টের কাছে এসেছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার ডাক পড়বে। আমাকে দেখেই সে অতি ব্যস্ত ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়াল। যেন আমি ডেনটিস্টের এসিসটেন্ট। তাকে বলতে এসেছি— আসুন আপনার ডাক পড়েছে।

আমি বললাম, আপনি আজহার চাচার ছেলে শুভ ? ছেলেটা মেঝের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়ল। দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। ছেলেটি সঙ্গে সঙ্গে বসে পড়ল। আপনি কি কিছু খাবেন ? চা–কফি কিংবা ঠাণ্ডা কিছু? 

ছেলেটা না সূচক মাথা নাড়ল। আমি ঘরে ঢােকার পর থেকে সে একবারও আমার দিকে তাকায় নি। অথচ এই ছেলেই না–কি ছােটবেলায় আমাকে বিয়ে করার জন্যে ব্যস্ত ছিল। ……..আপনি একা একা বসে আছেন, আপনার খারাপ লাগছে না ? 

আমি সামান্য চমকালাম। ছেলেটার গলার স্বর অস্বাভাবিক সুন্দর। বিষাদময়। প্রকৃতি কোনাে মানুষকেই পুরােপুরি নিঃস্ব করে পাঠান না। কিছু না কিছু দিয়ে পাঠান। একে হয়তাে অপূর্ব কণ্ঠস্বর দিয়ে পাঠিয়েছেন। কিংবা ছেলেটার কণ্ঠস্বর সুন্দর এটা আমার কল্পনাও হতে পারে। 

বেচারা একা একা অন্ধকারে চুপচাপ বসে আছে দেখে আমার মনে হয়তাে তার সম্পর্কে এক ধরনের করুণা তৈরি হয়েছে। করুণার কারণেই মনে হচ্ছে ছেলেটার গলার স্বর সুন্দর। শুধু একটি মাত্র শব্দ না শুনে বলা যায় না কারাের গলার স্বর সুন্দর না অসুন্দর। আমি নিশ্চিত হবার জন্যে বললাম, আপনি মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? লজ্জা লাগছে ? ছেলেটা হ্যা সূচক মাথা নাড়ল। আমার নিজের উপরই রাগ লাগছে— আমি ঠিকমতাে প্রশ্ন করতে পারছি না । এমনভাবে প্রশ্ন করছি যে সে কথা না বলেও জবাব দিতে পারছে। আমার প্রশ্নগুলি এমন হওয়া উচিত যেন উত্তর দিতে হলে কথা বলতে হয়। 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

আপনি কি নিজের বাড়িতেও এরকম চুপচাপ একা বসে থাকেন ? ছেলেটা আবারাে হ্যা সূচক মাথা নাড়ল। আবারাে ভুল প্রশ্ন করেছি। বসে বসে সময় কাটিয়ে দিচ্ছেন। ……..হ্যা সূচক মাথা নাড়া । আমি তো দেখি ভালােই বিপদে পড়েছি‘। যে প্রশ্নই করছি সে মাথা নেড়ে নেড়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। 

আমি যে একের পর এক প্রশ্ন করে যাচ্ছি আপনার কি খারাপ লাগছে ? ……..ছেলেটা না সূচক মাথা নাড়ল। আমি হতাশ হয়ে বললাম, কিছু মনে করবেন না। আমি যে প্রশ্নই করছি আপনি মাথা নেড়ে জবাব দিয়ে যাচ্ছেন। আমি আপনার গলার স্বর শুনতে চাচ্ছি। এইবার আমি যে প্রশ্ন করব তার জবাব দয়া করে কথা বলে দেবেন। লম্বা একটা সেনটেন্স বলবেন।

একটা লম্বা সেনটেন্সে জবাব দিলে আমি আর আপনাকে প্রশ্ন করে বিরক্ত করব না। প্রশ্নটা হচ্ছে আমি মার কাছে শুনেছি ছােটবেলায় আপনি না–কি আমাকে বিয়ে করার জন্যে ব্যস্ত ছিলেন। সেই ঘটনা কি আপনার মনে আছে? ..ছেলেটা ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, মনে আছে। তখন খুব বােকা ছিলাম। এখনাে বােকা। 

যে বােকা সে কিন্তু বুঝতে পারে না যে সে বোেকা। আমি বুঝতে পারি। …….আপনাকে কি এর আগে কেউ বলেছে যে আপনার গলার স্বর অস্বাভাবিক সুন্দর ? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

হ্যা বলেছে। একজন মওলানা সাহেব ছিলেন। আমাকে কেরাত শিখাতেন উনি বলেছেন। …আর কেউ বলে নি ? আপনি বলেছেন। ………………..ও হ্যা আমি তাে একটু আগেই বললাম। আচ্ছা আমি যাই। আপনি আপনার মতাে বসে থাকুন। 

রাত এগারােটার দিকে কাওসার স্যার টেলিফোন করলেন। খুব সহজ গলায় বললেন, মৃন্ময়ী ভালাে আছ ? …………….আমি বললাম, জ্বি স্যার ভালাে আছি। আমার টেলিফোন নাম্বার পেলেন কোথায় ? …….জোগাড় করেছি। কীভাবে জোগাড় করেছি সেই ইতিহাস বলে সময় নষ্ট করার প্রয়ােজন দেখছি না। তুমি সত্যি ভালাে তাে? 

জ্বি ভালাে। হঠাৎ করে চলে গেলে আমি দুশ্চিন্তায় পড়ে গিয়েছিলাম। ..রাগ করেন নি তাে স্যার ? আপনার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আসা উচিত ছিল । ….উচিত অনুচিত বিচার করে তাে মানুষ সব সময় কাজ করতে পারে না। তােমার সেই মুহূর্তে চলে যেতে ইচ্ছা করেছে। তুমি চলে গিয়েছ। ভালাে। করেছ। 

আপনার কাছে তাে টাকা ছিল না। ফুচকাওয়ালাকে কী বলেছেন? ………ঐটা কোনাে সমস্যা হয় নি। যে ছেলেটি তােমাকে ফলাে করে তার নাম কী? 

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২২)-হুমায়ূন আহমেদ

নাম জানি না। জিজ্ঞেস করাে নি ? ………..জিজ্ঞেস করি নি। ছেলেটা কে, কী করে? ঠিক জানি না। তার সঙ্গে তােমার কী কথা হয়েছে ? স্যার আমার বলতে ইচ্ছা করছে না। ………..বলতে ইচ্ছা না করলে বলতে হবে না। তুমি কোন সমস্যায় পড়লে আমাকে বলতে পারাে। আমি খুব ভালাে কাউন্সেলর। 

সব সমস্যার সমাধান আপনার কাছে আছে ? …………সমস্যা থাকলে সমাধান থাকবেই। সমাধান আছে অথচ সমস্যা নেই তা কি হয় ? …… তা হয় না। তােমাদের ওদিকে কি বৃষ্টি হচ্ছে না–কি ? আমি বৃষ্টির শব্দ শুনছি। 

বৃষ্টি হচ্ছে না। আমার একটা ঝড় বৃষ্টির সিডি আছে। ঐ সিডিটা শুনছি। আমার মন যখন খুব ভালাে থাকে তখন এই সিডি শুনি। আবার মন যখন খুব খারাপ থাকে তখনও এই সিভি শুনি। 

 

Read More

মৃন্ময়ী-পর্ব-(২৩)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *