সাতকাহন পর্ব-(৮)-সমরেশ মজুমদার

সাতকাহন

‘স্যার, একেবারে নিঃস্বার্থ বলবেন না। ‘মানে ? এদের জল পাইয়ে দিয়ে আপনার কি লাভ হবে ? 

হবে স্যার। আমার ব্যবসায় বিভিন্ন কাজে আমি ওদের নিয়োেগ করি, মাইনে দিই। জলের অভাবে ওদের যদি শরীর দুর্বল হয়ে যায় তাহলে কাজ করতে পারবে না, আমারও ক্ষতি হবে। হাত কচলে যাচ্ছিল অর্জুন। 

‘আপনি ওদের কাজ দেন ? ‘হ্যাঁ স্যার। আমার লােকের প্রয়ােজন আর এদের রােজগারের। ‘গুড। কিন্তু কটা মালিকের এমন মানসিকতা থাকে। তারা গরিবকে শােষণ করে বড়লােক হয়। যে কাজ করতে পারবে না তাকে বরখাস্ত করে অন্য লোেক নেয়। খুব ভাল লাগল আপনার মত একজন উদার যুবককে দেখে। তারপর দীপাবলীর দিকে ঘুরে বললেন, “তুমি ঠিক লােককে বলেছ হে। চল, এবার একটু ঘুরে দেখি । 

মন্ত্রী এবং দলবল গ্রামের কিছুটা ঘুরে দেখলেন। মানুষের বেঁচে থাকা যেখানে উপহাস ছাড়া কিছু নয় সেখানে বেশীক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা খুব মুশকিল। মন্ত্রীমশায়েরও ভাল লাগল । তবু তিনি একটি প্রৌঢ়কে ডাকলেন। লােকটি কাছে আসতেই চাইছিল না। সতীশবাবু ধমকে কাছে নিয়ে এলেন। 

মন্ত্রী তাকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তিনটে কুয়াে হয়ে গেলে তোমাদেব সুবিধে হবে ? | লােকটি মাথা নাড়ল, কুয়াে হবে কিন্তু জল থাকবে না। আর জল থাকলেও পেট ভরবে না । যদি জলে পেট ভরে যায় তাে জল খেয়ে মানুষ কদিন বাঁচবে ?’ লােকটা চেঁচিয়ে কথাগুলাে বললাে । সুতরাং, দূরে দাঁড়ানাে গ্রামের মানুষজন তা শুনতে পেল । তৎক্ষণাৎ বক্তব্যের সমর্থনে গুঞ্জন উঠল ।। 

মন্ত্রীমশাই সবিস্ময়ে লােকটিকে দেখে বললেন, ‘পাগল নাকি হে। 

সঙ্গে সঙ্গে লােকটি বলে উঠল, ‘পাগল হলে তা ভাল হত।

আপনি দেশের মন্ত্রী, আপনি আমাদের পাগল তাে বলবেনই।

কুয়াে খোঁড়া হচ্ছে কিন্তু পেটে ভাত নেই। 

সাতকাহন পর্ব-(৮)

মন্ত্রীমশাই অর্জন নায়েকের দিকে তাকালেন, এ আপনার ওখানে কাজ করে না ? | ‘করত স্যাব। কিন্তু এত ফাঁকি মাবত আব অন্যদের ক্ষ্যাপা যে বাধ্য হয়েছি ছাড়িয়ে দিতে। অর্জুনের কথা শেষ হওয়ামাত্র লােকটি ক্ষিপ্ত হয়ে তেড়ে যেতে চাইল দুর্বল শরীরে। সঙ্গে সঙ্গে দু’জন পুলিশ তাকে ধরে ফেলে প্রায় চ্যাংদোলা করে সরিয়ে নিয়ে গোল সামনে থেকে। লােকটা সমানে চেঁচিয়ে গালমন্দ করে যাচ্ছিল কিন্তু গ্রামের মানুষরা নিবাক রইল। মন্ত্রীমশাই বিড় বিড করলেন, ‘এসব গ্রামে কম্যুনিস্টরা আসাযাওয়া শুরু করেছে নাকি! 

অর্জুন বলল, “হ্যাঁ স্যার। দু-একজন সন্দেহজনক, শহুবে বাবু আসে। 

মন্ত্রীমশাই বললেন, ‘ডি এমের দিকে তাকিয়ে, বাপা লক্ষ্য রাখুন। এমন হলে কোন ভাল কাজ না করতে দেবে না। দারােগা কোথায় ? তাকে বলুন নজর রাখতে। 

ডি এম অত্যন্ত বিনয়ে সঙ্গে বললেন, “স্যার, ডেমােক্রেটিক কান্ট্রিতে কোন দলকে তাে কাজ থেকে কারণ না দেখিয়ে নিরস্ত করা যায় না। এই তাে মুশকিল। 

হুম। তাহলে এদের বলুন যাবা মন্ত্রণা দিতে আসে তাদের দিয়ে কুয়াে খুঁড়িয়ে নিক। তারাই খাবারের ব্যবস্থা করবে। চলুন, অনেক দেরি হয়ে গিয়েছে। মন্ত্রীমশাই হন হন করে জিপের দিকে এগিয়ে গেলেন। ডি এম এবং এস ডি ও তাঁর সঙ্গী হয়েছিলেন। জিপের সামনে দাঁড়িয়ে মন্ত্রীমশাই একটু ভাবলেন। তিনি না উঠলে বাকিরা উঠতে পারছিলেন না। হঠাৎ মন্ত্রীমশাই অর্জুন নায়েককে আঙুল তুলে কাছে ডাকলেন, ‘আপনি আমার গাড়িতে চলুন। এলাকার কিছু ব্যাপার নিয়ে আপনার সঙ্গে আলােচনা আছে। তারপর ডি এমকে বললেন, ‘বাকি দুটো জিপে আপনাদের যেতে নিশ্চয়ই খুব অসুবিধে হবে না ? 

ডি এম বললেন, ‘ন্যা সার, অসুবিধে কিসের! 

মন্ত্রীমশাই সামনে বসলেন, অর্জুন পেছনে। এবার দীপাবলীর দিকে নজর পড়ল মন্ত্রীমশাইয়ের। তিনি বললেন, তুমি এখানে এসাে। তিন মিনিটেই তত তােমাকে পৌছে দিতে পারব, তারপর কথা বলা যাবে ওর সঙ্গে। 

দীপাবলী আপত্তি করতে যাচ্ছিল, “আমি এটুকু পথ হেঁটেই।। ‘আঃ, ঝামেলা কোরাে না তাে ! মন্ত্রীমশাই ঝাঁঝিয়ে উঠলেন, ‘যা বলছি তাই করাে।’ 

সাতকাহন পর্ব-(৮)

অগত্যা দীপাবলীকে উঠতে হল। চুপচাপ পথটুকু পার হয়ে মােড়ের মাথায় তাকে প্রায় নিঃশব্দে নামিয়ে দিয়ে তিনটে জিপ চলে গেল। 

‘আপনি এখানে দাঁড়িয়ে ? 

সতীশবাবুর গলা কানে আসতে চমক ভাঙল দীপাবলীর । পাতলা অন্ধকার চুইয়ে নামছে পৃথিবীতে। পথটুকু হেঁটে এসেছেন সতীশবাবু। সে সহজ হবার চেষ্টা করল, এমনি। 

‘এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা ঠিক না ম্যাডাম। আর কিছু না হােক, অন্ধকারে সাপ বেরিয়ে আসে মাটি থেকে। দিনেরবেলায় তাপ থেকে বাঁচতে ওরা মাটির নিচে লুকিয়ে থাকে। অন্ধকারে ওদের গায়ে পা পড়ে গেলে। | সাপে চিরকালই দীপাবলীর ভয়। ছবি দেখলেই গা ঘিনঘিন করে। সে প্রায় বাচ্চা মেয়ের মত সতীশবাবুকে বলল, “আপনি একটু আমার সঙ্গে যাবেন ? 

‘হ্যাঁ, নিশ্চয়ই। সতীশবাবু আগে আগে হাঁটতে লাগলেন। হাঁটতে হাঁটতেই দীপাবলী জিজ্ঞাসা করল, ‘সতীশবাবু, আজ সব দেখে কি মনে হল ? ‘ছােট মুখে বড় কথা বলা ঠিক হবে না ম্যাডাম। ‘নেখালির লােকগুলাে উপকৃত হবে ? 

হবে। কুয়াে তাে খোঁড়া হচ্ছে ম্যাডাম। এটা ভাবতে পারিনি আমি। অর্জুন নায়েককে গতকাল আমি খুব রেগে গিয়ে যেসব কথা বলেছিলাম ও যে আজ সকালে তাই করবে কে জানত। তিরির কাছে ওর সম্পর্কে যা শুনেছি তাতে এমন ব্যাপার ভাবা যায় না। 

‘ম্যাডাম, আমিও অবাক হয়েছি। কিন্তু দেখুন কাজটা করেছিল বলে মন্ত্রী ওকে নিজের জিপে ডেকে নিলেন। দেখবেন পাঁচ শশা টাকা খরচ করে ও পাঁচ হাজার টাকা রােজগারের ব্যবস্থা করে নিল। ভগবান সবসময় ধান্দাবাজদের সাহায্য করেন। 

সাতকাহন পর্ব-(৮)

‘হুম । অর্জুন নায়েককে এস ডি ও পর্যন্ত খাতির করেন কেন ? ‘এসব প্রশ্ন আমাকে করবেন না ম্যাডাম । তবে আমি একটা কথা বলি, ওকে এড়িয়ে চলাই ভাল । লােকটা সাপের মতন। 

শরীর ঘিন ঘিন করে উঠল সাপ শব্দটি শুনে। দীপাবলী দাঁতে দাঁত চাপল। না, এড়িয়ে চলা তার পক্ষে সম্ভব নয়। এস ডি ও কিংবা ডি এম অর্জুনকে যে কারণে হাতে রাখতে চান তার সেটার কোন প্রয়ােজন নেই। লােকটা যদি কোঅন্যায় করে সে প্রতিবাদ করবে। দরকার হলে আইনসঙ্গত ব্যবস্থাও। চাকরিসূত্রে সে কিছু অধিকার পেয়েছে। সাপকে তােয়াজ করলে ছােবল খেতে হবেই। কিন্তু তার মাজা ভেঙে দিলে নিজের প্রাণ বাঁচাননা সম্ভব। 

সাতকাহন পর্ব-(৮)

অফিসের সামনে এসে সতীশবাবু বললেন, ‘ম্যাডাম, একটা কথা বলব ? ‘বলুন। ‘আগামীকাল সন্ধের পর কি আপনার একটু সময় হবে ? ‘কেন বলুন তাে ? ‘আমার বড় মেয়ে এসেছে। নাতনির মুখেভাত কাল। সেই উপলক্ষে কয়েকজনকে খেতে বলেছি। যদি আপনি অনুগ্রহ করে। 

‘নিশ্চয়ই। এত কুণ্ঠা করছেন কেন আপনি ? নিশ্চয়ই যাব। তাহলে তাে কাল অফিসে আসছেন না, বাড়িতে যখন কাজ রয়েছে। 

‘না, না, অফিসে আসব। দশটায় ফিরে গিয়ে ওসব হবে। 

‘না, সতীশবাবু। আমার বাবা যদি নাতনির জন্মদিনে অফিসে যেতেন তাহলে আমার ভাল লাগত না। আপনি কাল ছুটি নিন। 

‘অনেক ধন্যবাদ ম্যাডাম। আমি কামাই করলে আপনি কিছু যদি মনে করেন তাই আসতে চেয়েছিলাম। জানেন, আমার মেয়ের বিয়ের দিনেও আমাকে অফিস করতে হয়েছিল। আচ্ছা, আসি আজকে। সতীশবাবু নমস্কার করে বিদায় নিলেন। 

দীপাবলী চারপাশ তাকাল। অন্ধকার যেন কিছুটা পাতলা। চাঁদ উঠবে নাকি। ফালি চাঁদের আসার সময় হয়ে গিয়েছে। কিন্তু এখনও গরম নিঃশ্বাস মিলিয়ে যায়নি। সে দরজায় আওয়াজ করতে তিরির গলা ভেসে এল, কে? 

‘আমি, খোেল।। দরজা খুলল তিরি হাতে হ্যারিকেন নিয়ে,সবাই চলে গিয়েছে ? ‘হ্যাঁ। তােদের গ্রামে কুয়াে খোঁড়া হচ্ছে। এখানে আর কেউ তােকে বিরক্ত করতে আসবে না। দীপাবলী নিজেই দরজা বন্ধ করল। 

‘তিরি বলল, নিচুগলায়, একটা লােক এসেছিল। ‘কে?’ অবাক হল দীপাবলী ।। 

 

Read more

সাতকাহন পর্ব-(৯)-সমরেশ মজুমদার

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *