হিমু পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

হিমু পর্ব – ৩

‘গাধা একধরণের আদরের ডাক। অপরিচিত বা অর্ধ-পরিচিতদের গাধা বলা যাবে না। বললে মেরে তক্তা বানিয়ে দেবে। প্রিয় বন্ধুদেরেই গাধা বলা যায়। এতে প্রিয় বন্ধুরা রাগ করে না। বরং খুশি হয়।’ ‘আপনি কি জানেন ইয়াদ অন্য দশজনের মতো নয়? সে সবকিছু সিরিয়াসলি নেয়। আপনি গাধা বলায় সে সারা রাত ঘুমায়নি—জেগে বসে ছিল—একটা খাতায় নোট করছিল কেন তাকে গাধা বলা যাবে না।’

‘আমি হাসতে-হাসতে বললাম, সে যা করছিল গাধা বলার জন্যে তা কি যথেষ্ট নয়?’ ‘না, যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যতে কখনো তাকে গাধা বলবেন না এবং তার মাথায় কোন অদ্ভুদ আইডিয়া ঢুকিয়ে দেবেন না।’ ‘আমি ওর মাথায় কোনো অদ্ভুদ আইডিয়া ঢোকাইনি।’

‘ঢুকিয়েছেন—আপনি ওকে বলেছেন ভিক্ষুকদের জানতে হলে ভিক্ষুক হতে হবে। ওদের সঙ্গে থাকতে হবে। ওদের মতো ভিক্ষা করতে হবে। বলেননি এমন কথা?’ ‘বলেছি?’ ‘আপনি তা বিশ্বাস করেন?’ ‘করি।’ ‘তার মানে আপনি বলতে চাচ্ছেন, কেউ যদি পিঁপড়াদের সম্পর্কে গবেষণা করতে চায়, তা হলে তাকে পিঁপড়া হতে হবে, এবং পিঁপড়াদের সঙ্গে থাকতে হবে, পিঁপড়াদের খাবার খেতে হবে?’

‘ওদের ভালমতো জানতে হলে তাই করতে হবে, কিন্তু সে উপায় নেই। ভিক্ষুকদের ব্যাপারে উপায় আছে। তা ছাড়া পিঁপড়া মানুষ না, ভিক্ষুকরা মানুষ।’ ‘আমি যে আপনাকে কী পরিমাণ অপছন্দ করি তা কি আপনি জানেন?’ ‘না, জানি না।’

‘মাকড়সা আমি যতটা অপছন্দ করি আপনাকে তারচেয়ে বেশি অপছন্দ করি।আজ আমি বারান্দায় বসে ছিলাম। আপনি যখন আসছিলেন তখন ইচ্ছা করছিল—টুর্টি-ফুর্টিকে বলি—ধর্ ঐ লোকটাকে, ছিঁড়ে টুকরো-টুকরো করে ফেল। বলেই ফেলতাম। নিজেকে সামলেছি। আমি নিজেকে কনট্রোল করেছি। আজ যা করেছি অন্য একদিন যে তা করতে পারব তা তো না। একদিন হয়তো সত্যি কুকুর লেলিয়ে দেব। নিন, আরেক কাপ চা খান।’

আমি আরেক কাপ চা নিলাম। নীতু বলল, আপনার সম্পর্কে অনেক গল্প প্রচলিত আছে।আপনি নাকি মহাপুরষজাতীয় মানুষ। মানুষের ভবিষ্যৎ বলতে পারেন। আমি তার একবিন্দুও বিশ্বাস করি না। ‘আমি নিজেও করি না।’

‘কিন্তু কেউ-কেউ করে।আপনার অদ্ভুদ জীবনযাপন প্রণালীর জন্যেই করে। নোংরা কাপড় পরে রাস্তায়-রাস্তায় ঘুরে বেড়ালেই মানুষ মহাপুরুষ হয় না। যদি হত, তা হলে ঢাকা শহরে তিন লক্ষ মহাপুরুষ থাকত। এই শহরে রাস্তায় ঘুরে-বেড়ানো মানুষের সংখ্যা তিন লক্ষ। বুঝতে পারছেন?’ ‘পারছি।’

‘আপনার কোনো ক্ষমতা নেই তা বলছি না। একটা ক্ষমতা আছে। ভালই আছে। সেটা হল—সুন্দর করে কথা বলা। আপনি যা বলেন তা-ই সত্যি বলে মনে হয়। বিশ্বাস করতে ইচ্ছা করে। এই ক্ষমতা নিম্নশ্রেণীর ক্ষমতা। রাস্তায়-রাস্তায় যারা অষুধ বিক্রি করে তাদেরও এই ক্ষমতা আছে। আপনি যদি দাঁতের মাজন কিংবা সর্বব্যথানিবারণী অষুধ বিক্রি করেন তাহলে বেশ ভাল বিক্রি করবেন।’

নীতুর সঙ্গে অন্যদের এক জায়গায় বেশ ভাল অমিল আছে। রাগের কথা বলতে-বলতে অন্যদের রাগ পড়ে যায়। তার রাগ বাড়তেই থাকে। আস্তে-আস্তে মুখ লাল হতে থাকে। একসময়-সারা মুখ লাল টকটকে হয়ে যায়।এখন যেমন হয়েছে। নীতু বলল, আমি অনেক কথা বললাম, আপনি তার উত্তরে কিছু বলতে চাইলে বলতে পারেন। ‘আমি কিছু বলতে চাচ্ছি না।’

‘তা হলে আপনি কি স্বীকার করে নিলেন, আমি যা বললাম সবই সত্যি?’ ‘হ্যাঁ।’ ‘ইন দ্যাট কেইস আপনি কি আমার পরামর্শ শুনবেন?’ ‘হ্যাঁ, শুনব। ‘আপনি একজন সাইকিয়াট্রিস্টের সঙ্গে কথা বলুন। আপনার মধ্যে যেসব অস্বাভাবিকতা আছে—একজন ভাল সাইকিয়াট্রিস্ট তা দূর করতে পারবে। আপনি অনেক দিন থেকেই মহাপুরুষের ‍ভূমিকায় অভিনয় করছেন। অভিনয় করতে-করতে আপনার ধারণা হয়েছে আপনি একজন মহাপুরুষ।’

‘এরকম কোনো ধারণা আমার হয়নি।’ ‘হয়েছে।ইয়াদের কাছে শুনেছি আপনি মজনু মিয়ার মাছ-ভাতের হোটেল নামে একটা হোটেলে ভাত খান। সেখানে এক রাতে বললেন—হোটেলের মালিক দু’ দিন হোটেলে আসবে না।এবং এই বলে কর্মচারীদের প্ররোচিত করলেন রোস্ট, পোলাওটোলাও রাঁধার জন্যে। করেননি?’

‘হ্যাঁ, করেছি।’ ‘এগুলি হচ্ছে মহাপুরুষ সিনড্রম। নিজেকে আপনি অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন ভাবতে শুরু করেছেন।’ ‘মজনু মিয়া কিন্তু দু’ ‍দিন ঠিকই হোটেলে আসেনি।’ ‘তা আসেনি। কাকতালীয় ব্যাপার। মাঝে-মাঝে কাকতালীয় ব্যপার ঘটে। কেউ-কেউ সেসব ব্যাপার কাজে লাগাতে চেষ্টা করে, যেমন আপনি করেছেন। আপনি একজন অসুস্থ্ মানুষ। আপনার চিকিৎসা হওয়া দরকার।’

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, আমি চিকিৎসা করাব। আপনি সাইকিয়াট্রিস্টের ঠিকানা দিন।’ ‘সত্যি করাবেন?’ ‘হ্যাঁ, সত্যি। ‘আমার কাছে কার্ড আছে। কার্ড দিয়ে দিচ্ছি। আমি টেলিফোনেও উনার সঙ্গে কথা বলে রাখব।’ ‘আচ্ছা। আজ তা হলে উঠি?’ ‘আপনার বন্ধুর জন্যে অপেক্ষা করবেন না?’

আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম,ও আজ রাতে বাসায় ফিরবে না।নীতু তীক্ষ্ণ গলায় বলল, তার মানে কি? আপনি কী বলতে চাচ্ছেন? আপনি কি আপনার তথাকথিত অলৌকিক ক্ষমতার নমুনা আমাকে দেখাতে চাচ্ছেন? আমাকে ভড়কে দিতে চাচ্ছেন? ‘তা না। আপনি শুধুশুধু রাগ করছেন। আমার মনে হচ্ছে ইয়াদ আজ রাতে বাসায় ফিরবে না। বললাম।’ ‘শুনুন হিমু সাহেব, আমার সঙ্গে চালাকি করতে যাবেন না। আমি চালাকি পছন্দ করি না।’

নীতু বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এল। টির্টি-ফুর্টি বারান্দায় বসে ছিল। নীতুকে দেখেই উঠে দাঁড়াল। লেজ নাড়তে লাগল।লেজ নাড়া দিয়ে কুকুর কী বোঝাতে চেষ্টা করে? লেজ নেড়ে সে কি বলে—আমি তোমাকে ভালবাসি? ভালবাসার পরিমাণও কি সে লেজ নেড়ে প্রকাশ করে? কেউ কি এই বিষয়টি নিয়ে রিসার্চ করেছে? ইয়াদের মতো কেউ একজন এসে ব্যাপারটা নিয়ে রিসার্চ করলেই পারে। ‘কুকুরের লেজ এবং ভালবাস।’

আমি মেসে ফিরলাম না।এত সকাল-সকাল ফেরা ঠিক হবে না। ইয়াদ হয়তো বসে আছে। রাস্তায় হাঁটতেও ইচ্ছা করছে না। ক্লান্তি লাগছে। কেন জানি মাথায় ভোঁতা ধরণের যন্ত্রনা হচ্ছে। মেসে ফিরে যাওয়াই ভাল। মাথার যন্ত্রনা ইদানীং আমাকে কাবু করে ফেলছে। হালকাভাবে শুরু হয়—শেষের দিকে ভয়াবহ অবস্থা। এক সময় ইচ্ছা করে কাউকে ডেকে বলি, ভাই, আপনি আমার মাথাটা ছুরি দিয়ে কেটে শরীর থেকে আলাদা করে দিতে পারেন?

রুপার চিঠি এখনো পড়া হয়নি। বিছানায় শুয়ে-শুয়ে চিঠিটা পড়া যায়। আমি একটা রিকশা নিয়ে নিলাম।ইয়াদ আমার জন্যে মেসে বসে নেই। এটা একটা সুসংবাদ। আগের মতো টাইপ করা ইংরেজি নোট রেখে গেছে— ‘খুঁজে পাচ্ছি না। জরুরি প্রয়োজন।দয়া করে যোগাযোগ কর। ভিডিও ক্যামেরা কিনেছি।ইয়াদ।’

দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ার সময় মনে হল রুপার চিঠি আমার সঙ্গে নেই।নীতুদের বাসায় পুরানো কাপড়ের সঙ্গে ফেলে এসেছি। কাপড়গুলি ইতমধ্যে নিশ্চয়ই ধোপার বাড়িতে চলে গেছে।মাথার যন্ত্রনা বাড়ছে। এই অসহ্য তীব্র যন্ত্রনার উৎস কি? তীব্র আনন্দ যিনি দেন, তীব্র ব্যথাও কি তাঁরই দেয়া? কিন্তু তা তো হবার কথা না। যিনি পরম মঙ্গলময়, ব্যথা তাঁর সৃষ্টি হতে পারে না।

পাশের ঘরে হৈচৈ হচ্ছে। তাসখেলা হচ্ছে নিশ্চয়ই। আজ বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে এই একটা দিন মেসে তাস খেলা হয়। শুধু তাস না, অতি সস্তার বাংলা মদ আনা হয়। যারা এই জিনিস খান না, তাঁরাও দু’-এক চুমুক খান। সারা রাতই তাঁদের আনন্দিত কথাবার্তা শোনা যায়। এই আনন্দও কি তাঁর দেয়া? ধুম-ধুম করে দরজায় কিল পড়ছে।আমি ঘুমের ঘোরে বললাম, কে? কেউ জবাব দিল না। দরজায় শব্দ হতে থাকল। আমার সমস্যা হচ্ছে—শীতের ভোরে একবার লেপের ভেতর থেকে বের হলে আবার ঢুকতে পারি না।

এখনো ঠিকমতো ভোর হয়নি—চারদিক আঁধার হয়ে আছে। কাঁচের জানালায় গাঢ় কুয়াশা দেখা যাচ্ছে। এত ভোরে আমার কাছে আসার মতো কে আছে ভাবতে-ভাবতে দরজা খুলে দেখি—ইয়াদ। এই প্রচণ্ড শীতে তার গায়ে একটা ট্রাকিং স্যুট। পায়ে কেড্‌স জুতা। নিশ্চয় দৌড়ে এসেছে। চোখ-মুখ লাল। বড়-বড় করে শ্বাস নিচ্ছে। ইয়াদ বলল, জগিং করতে বের হয়েছিলাম। ভাবলাম, একটা চান্স নিয়ে দেখি তোকে পাওয়া যায় কিনা।কতবার যে এসেছি তোর খোঁজে। এই ক’দিন কোথায় ছিলি?

আমি জবাব না দিয়ে বাথরুমে ঢুকে গেলাম। বাথরুমের দরজা ঠেলে ইয়াদও ঢুকে গেল। আমি মুখে পানি দিচ্ছি। ইয়াদ পাশে। সে বলল, ছিলি কোথায় তুই?ইয়াদের স্বভাব-চরিত্রের একটি ভাল দিক হচ্ছে অধিকাংশ প্রশ্নেরই সে কোনো জবাব শুনতে চায় না। প্রশ্ন করা প্রয়োজন বলেই প্রশ্ন করে। জবাব দিলে ভাল, না দিলেও ক্ষতি নেই। সে প্রশ্ন করে যাবে তার মনের আনন্দে। ‘হিমু।’ ‘কি?’ ‘কাল রাতে আমার বউকে তুই খামোকা ভয় দেখালি কেন?’ ‘ভয় দেখিয়েছে?’

‘অফকোর্স ভয় দেখিয়েছিস—তুই তাকে বললি আমি নাকি রাতে ফিরব না। এদিকে আমি সত্যি-সত্যি আটকা পড়ে গেলাম ছোটখালার বাসায়। ফিরতে ফিরতে রাত দু’টা বেজে গেছে। এসে দেখি নীতুর মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে—পরিচিত-অপরিচিত সব জায়গায় টেলিফোন করা হয়েছে। ম্যানেজারকে পাঠানো হয়েছে সব হাসপাতালে খোঁজ নিয়ে আসতে। ম্যানেজার ব্যাটা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে সেই গাড়ি ড্রেনে ফেলে দিয়েছে।

‘এই অবস্থা?’ ‘হ্যাঁ, এই অবস্থা। নীতুর হাইপারটেনশান আছে। অল্পতেই এমন নার্ভাস হয়। ওর একজন পোষা সাইকিয়াট্রিস্ট আছে।দু’দিন পরপর তার কাছে যায়। একগাদা করে টাকা নিয়ে আসে।’ ‘তোর তো টাকা খরচ করার পথ নেই—কিছু খরচ হচ্ছে, মন্দ কি?’ ‘টাকা কোনো সমস্যা না, নীতুই সমস্যা। অল্পতেই এত আপসেট হয়—এই কারণেই তোকে খুঁজছি। নীতুকে সামলানোর ব্যাপারে কী করা যায়?’ ‘সামলানোর দরকার কী?’

‘দরকার আছে। তোর প্রস্তাব আমি গ্রহণ করেছি। ভিখিরি হয়ে যাব। সাত দিনের ক্র্যাশ প্রোগ্রাম। সাত দিন ভিখিরি হয়ে ওদের সঙ্গে সঙ্গে ঘুরব। ভিক্ষা করব।’ ‘সাত দিনে কিছু হবে না।’ ‘কত দিন লাগবে?’ ‘দু’ বছর।’ ‘বলিস কী!’ ‘ঠিকমতো ওদের জানতে হলে ওদের একজন হতে হবে। ওদের একজন হতে সময় লাগবে।’ ‘নীতুকে সামলাবো কী করে?’

‘যারা ছোটখাট ঘটনাতে আপসেট হয় তারা বড় ঘটনায় সাধারণত আপসেট হয় না। নীতু সামলে উঠবে। আরো বেশি-বেশি করে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে যাবে। তুই ঘর ছাড়ছিস কবে?’ ইয়াদ বিরক্ত গলায় বলল, আমাকে জিজ্ঞেস করছিস কেন? এটা তো তোর উপর নির্ভর করছে। আমি মানসিকভাবে প্রস্তুত।তুই বললেই শুরু করব—তুই একটা ডেট বল। আমি নীতুকে বলি।

‘আমি ডেট বলব কেন?’ ‘তুইও তো যাবি আমার সঙ্গে। আমি একা-একা পথে-পথে ভিক্ষা করব?’ ‘হ্যাঁ, করবি। তোরই ভিক্ষুকদের জীবনচর্চা দরকার। আমার না।’ ‘তুই আমার সঙ্গে যাচ্ছিস না?’ ‘না।’ ‘ও মাই গড! আমি তো ধরেই রেখেছি তুই যাচ্ছিস। সেইভাবেই প্রস্তুতি নিয়েছি।’

সকালবেলা খালিপেটে আমি সিগারেট খেতে পারি না। শুধুমাত্র বিরক্তিতে আমি সিগারেট ধরালাম। বিরক্তি ভাব গলার স্বরে যথাসম্ভব ফুটিয়ে তুলে বললাম—তুই ভিক্ষা করতে যাবি, সেখানেও একজন ম্যানেজার নিয়ে যেতে চাস? তুই ভিক্ষা করবি। তোর ম্যানেজার টাকাপয়সার হিসাব রাখবে। খাওয়াদাওয়া দেখবে। ইট বিছিয়ে আগুন করে পানি ফোটাবে যাতে তুই ফুটন্ত পানি খেতে পারিস। যা ব্যাটা গাধা! ইয়াদ আহত গলায় বলল, গাধা বলছিস কেন?

‘যে যা তাকে তাই বলতে হয়। তুই গাধা, তোকে আমি হাতি বলব? যা বলছি, বিদেয় হ।’ ‘চলে যেতে বলছিস?’ ‘হ্যাঁ, চলে যেতে বলছি—আর আসিস না।’ ‘আর আসব না?’ ‘না। তোকে দেখলেই বিরক্তি লাগে।’ ‘বিরক্তি লাগে কেন?’ ‘বেকুবদের সঙ্গে কথা বললে বিরক্তি লাগবে না?’ ‘গাধা বলছিস ভাল কথা, বেকুব বলছিস কেন?’ ‘বাথরুমে ঢুকে পড়েছিস-এই জন্যে বেকুব বলছি।’ ইয়াদ বলল, ভুল করে বাথরুমে ঢুকে পড়েছি, খেয়াল করিনি। যাই। আমি ওর দিকে না তাকিয়ে বললাম, আচ্ছা যা, আর আসিস না।’

ইয়াদ বের হয়ে গেল। আমার মনে হল এতটা কঠিন না হলেও বোধহয় হত। তবে আমার কাছ থেকে এ ধরণের ব্যবহার পেয়ে সে অভ্যস্ত। তার খুব খারাপ লাগবে না।লাগলেও সামলে উঠবে। ইয়াদকে আমার পছন্দ হয়। শুধু পছন্দ না, বেশ পছন্দ। রুঢ় ব্যবহার করতে হয় পছন্দের মানুষদের সঙ্গে। আমার বাবার উপদেশনামার একটি উপদেশ হল—

হে মানব সন্তান, ‍তুমি তোমার ভালবাসা লু্কাইয়া রাখিও। তোমার পছন্দের

মানুষদের সহিত তুমি রুঢ় আচরণ করিও, যেন সে তোমার স্বরুপ কখনো

বুঝিতে না পারে। মধুর আচরণ করিবে দুজনের সঙ্গে। নিজেকে অপ্রকাশ্য

রাখার ইহাই প্রথম পাঠ।

আমাদের মেসে সকালবেলা চা হয় না। চা খেতে রাস্তার ওপাশে ক্যান্টিনে যেতে হয়। সেই ক্যান্টিনে পৃথিবীর সবচে’ মিষ্টি এবং একই সঙ্গে পৃথিবীর সবচে’ গরম চা পাওয়া যায়। এই চা প্রথম দু’ দিন খেতে খারাপ লাগে। কিন্তু তৃতীয় দিন থেকে নেশা ধরে যায়। ঘুম থেকে উঠেই কয়েক কাপ চা খেতে ইচ্ছা করে।

ক্যান্টিনে পা দেয়ার সঙ্গে-সঙ্গে দেখলাম ইয়াদ আবার আসছে। সে আমাকে দেখতে পেয়েছে। হয়তো আশা করছে আমি হাত ইশারা করে তাকে ডাকব। আমি কিছুই করলাম না। মুখ কঠিন করে অন্যদিকে তাকিয়ে রইলাম।

ইয়াদ সামনের চেয়ারে বসতে-বসতে বলল, তুই কাল রাতে আমাদের বাড়িতে একটা চিঠি ফেলে এসেছিলি। নিয়ে এসেছিলাম, দিতে ভুলে গেছি। আমি ইয়াদের হাত থেকে চিঠি নিয়ে পকেটে রেখে দিলাম।ইয়াদ বলল, পড়বি না?’ ‘একসময় পড়ব। তাড়া নেই।’ ‘নীতু বলে দিয়েছে এটা নাকি জরুরি চিঠি।’ ‘ও পড়েছে বুঝি?’ ইয়াদ অপ্রস্তুত গলায় বলল, মনে হয় পড়েছে। ওর খুব সন্দেহবাতিক। হাতের কাছে খাম পেলে খুলে পড়ে ফেলে। খামে যার নামই থাকুক সে পড়বেই। সরি।

‘তোর সরি হবার কিছু নেই। চা খাবি?’ ‘খাব।’ আমি ইয়াদকে চা দিতে বলে উঠে দাঁড়ালাম। সে বিস্মিত হয়ে বলল,যাচ্ছিস কোথায়? ‘কাজ আছে।’ ‘চা-টা শেষ করি—তারপর যা।’ ‘সময় নেই—খুব তাড়া।’ আমি ইয়াদকে রেখে মেসে ফিরে এলাম। দরজা বন্ধ করে লেপের ভেতর ঢুকে পড়লাম। আজ আমার কোনো প্ল্যান নেই—সারাদিন ঘুমাব। ঘুম এবং উপবাস। সন্ধ্যায় উপবাস ভঙ্গ করব এবং বিছানা থেকে নামব।

বিশ্রামের সবচে’ ভাল টেকনিক হল—কুকুরকুণ্ডলী হয়ে শুয়ে পড়া। মায়ের পেটে আমরা যে-ভঙ্গিতে থাকি—সেই ভঙ্গিটি নিয়ে আসা। মায়ের পেটে গাঢ় অন্ধকার। তাপ হতে হবে সামান্য বেশি। কারণ জরায়ুর তাপ শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রার চেয়ে তিন ডিগ্রী বেশি।

আমার ঘর এম্নিতেই অন্ধকার। কম্বলে নাক-মুখ ঢেকে অন্ধকার আরও বাড়ানো হল। আমি কুণ্ডলী পাকিয়ে শোয়ামাত্র দরজার কড়া নাড়ল। আমাদের মেসের মালিক এবং ম্যানেজার জীবনবাবু মিহি গলায় ডাকলেন—হিমু ভাই, হিমু ভাই।

জীবনবাবুর ডাকে সাড়া দিতেই হবে এমন কোনো কথা নেই, তিনি আমার কাছে মেসভাড়া পান না। মাসের শুরুতেই ভাড়া দেয়া হয়েছে। ইচ্ছা করলেই চুপচাপ শুয়ে থাকা যায়, তবে তা করা সম্ভব না। কারণ জীবনবাবুর ধৈর্য রবার্ট ক্লসের চেয়েও বেশি। তিনি ডাকতেই থাকবেন। কড়া নাড়তেই থাকবেন। সিল্কের মতো মোলায়েম গলায় ডাকবেন। চুড়ির শব্দের মতো শব্দে কড়া নাড়বেন।

‘হিমু ভাই, হিমু ভাই।’ ‘কি ব্যাপার?’ ‘ঘুমুচ্ছেন?’ ‘যদি বলি ঘুমুচ্ছি তাহলে কি বিশ্বাস করবেন?’ ‘একটু আসুন, বিরাট বিপদে পড়েছি।’ দরজা খুলতে হল। জীবনবাবু ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। ফিসফিস করে বললেন, মাথায় বাড়ি পড়েছে হিমু ভাই। অকুল সমুদ্র পড়েছি। ‘বলুন কি ব্যাপার?’

জীবনবাবু গলার স্বর আরো নামিয়ে ফেললেন। কোনো সাধারণ কথাই তিনি ফিসফিস না করে বলতে পারেন না। বিশেষ কিছু নিশ্চয়ই ঘটেছে, কারণ আমি তাঁর কোনো কথাই প্রায় শুনতে পারছি না। ‘আরেকটু জোরে বলুন জীবনবাবু। কিছু শুনতে পাচ্ছি না।’ ‘প্রতি বৃহস্পতিবার মেসের ছয় নম্বর ঘরে তাসখেলা হয় জানেন তো?’ ‘জানি।’

‘গত রাতে তাসখেলা নিয়ে মারামারি। মুর্শিদ সাহেব মশারির ডাণ্ডা খুলে জহির সাহেবের মাথায় বাড়ি মেরেছে। রক্তারক্তি কাণ্ড!’ ‘আমি হাই তুলতে তুলতে বললাম, জহির সাহেব কি মারা গেছেন?’ ‘মারা যায় নাই—তবে বেকায়দায় বাড়ি পড়লে উপায় ছিল? ‍খুনখারাবি হলে পুলিশ আগে কাকে ধরত? আমাকে। আমি হলাম মাইনোরিটি দলের লোক। হিন্দু। সব চাপ যায় মাইনোরিটির উপর। আপনারা মেজরিটি হয়ে বেঁচে গেছেন।’ ‘এইটাই আপনার বিশেষ কথা?’

‘জ্বি।’ ‘আমাকে কিছু বলছেন? তাস ওদেরকে কি না-খেলতে বলব?’ ‘না না, আপনার কিছু বলার দরকার নেই। ঘটনাটা আপনাকে জানিয়ে রাখলাম। খুনখারাবি যদি সত্যি কিছু হয়—তা হলে পুলিশের কাছে—আমার হয়ে দু’-একটা কথা বলবেন।’

‘আচ্ছা বলব। এখন তাহলে যান। আজ সারা দিন ঘুমাব বলে প্ল্যান করেছি। আজ হল আমার ঘুম-দিবস।’ জীবনবাবু নড়লেন না। চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলেন। আমি বললাম, আরো কিছু বলবেন? ‘জ্বি, বলব। মনে পড়ছে না। মনে করার চেষ্টা করছি।’ ‘তেমন জরুরি কিছু নয়। জরুরি হলে মনে পড়ত।’ ‘মনে পড়েছে—একজন মহিলা এসেছিলেন আপনার কাছে।’ ‘রূপা?’

‘জ্বি-না—উনি না। উনাকে তো চিনি। যিনি এসেছিলেন তাঁকে আগে কখনো দেখেনি—নাম বলেছিলেন। নামটা মনে পড়ছে না। স্মৃতিশক্তি পুরোপুরি গেছে। মাইনোরিটির লোক তো—সারাক্ষণ টেনশনে থেকে থেকে ব্রেইন গেছে।’ ‘মেয়েটা কিছু বলে গেছে?’ ‘মেয়ে না তো, পুরুষমানুষ। আমাকে নাম বললেন, একবার না, কয়েকবার বললেন।’ ‘আপনি দয়া করে বিদেয় হন।’

‘নামটা মনে করার চেষ্টা করছি। মনে পড়ছে না। বললাম না। আপনাকে—ব্রেইন একেবারে গেছে। কিছুই মনে থাকে না। ঐদিন দুপুরে ভাত খেতে গেছি—অতসী, বলল—বাবা, তুমি না একটু আগে ভাত খেয়ে গেল। বুঝুন অবস্থ। এদিকে ব্লাডপ্রেশারও নেমে গেছে। ব্রাডপ্রেশার হয়েছে সিক্সটি। সিক্সটি। সিক্সটি ব্লাডপ্রেশার মানুষের হয় না। গরু-ছাগলের হয়। গরু-ছাগলের পর্যায়ে চলে গেছি হিমু ভাই…’

জীবানবাবুকে বিদেয়ে করে বিছানায় শুয়ে পড়লাম। আশঙ্কা নিয়ে শুয়ে আছি। যে-কোনো মুহূর্তে ভদ্রলোকের নাম জীবনবাবুর মনে পড়বে।তিনি দরজায় ধাক্কা দিতে-দিতে ডাকবেন—হিমু ভাই, হিমু ভাই।

 

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *