বাবা শীতল গলায় বললেন, প্রতিপদ শুরু হয়ে গেছে । দ্বিতীয়য় আমার মৃত্যু হবার কথা । কাজেই আমাকে বিরক্ত করবেন না । সবচে’ জরুরি কথাটাই আমার ছেলেকে বলা হয়নি – শোন হিমু, কোনোরকম উচ্চাশা রাখবি না । টাকাপয়সা করতে হবে, বড় হতে হবে, এইসব নিয়ে মোটেও ভাববি না । সমস্ত কষ্টের মূলে আছে আমাদের উচ্চাশা । আমার উচ্চাশা ছিল বলে প্রথমদিকে খু্বই কষ্ট পেয়েছি ।
শেষেরদিকে উচ্চাশা ত্যাগ করতে পেরেছিলাম । তাই খানিকটা আনন্দে ছিলাম । আনন্দে থাকাটাই বড় কথা । সবসময় আনন্দে থাকার চেষ্টা করবি ।
বাবা কথা বলতে বলতে একটু থামলেন, হঠাৎ গভীর আগ্রহ এবং বিস্ময়ের সঙ্গে চারদিকে তাকালেন । তারপর মৃদুস্বরে বললেন, ও আচ্ছা, তাহলে এর নামই মৃত্যু । এটা মন্দ কী ? মৃত্যু তাহলে খুব ভয়াবহ নয় । তার কিছুক্ষণের মধ্যেই বাবার মৃত্যু হলো ।
আমি কিছুদিন আমার দাদাজানের সঙ্গে থাকলাম । তিনি আমার প্রসঙ্গে বারবার বিস্ময় প্রকাশ করতে লাগলেন । আরে, এটা কেমন ছেলে! বাবা মরে গেল, একফোঁটা চোখর পানি নেই । এ তো দেখি তার বাপের চেয়ে বড় পাগল হয়েছে । এইদিকে আয় । বাপ-মা মারা গেলে চোখের পানি ফেলতে হয় ।
আমি শীতল গলায় বললাম, আমাকে তুই তুই করে বলবেন না ।
তিনি চোখ বড় বড় করে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন । দাদাজানের বাড়িটা বিশাল । সেই বিশাল বাড়ির দোতলায় একটা ঘর আমাকে দেয়া হলো । সেই ঘরে এই বাড়ির ছেলেমেয়েদের জন্যে সার্বক্ষণিক প্রাইভেট টিউটর থাকেন । তার নাম কিসমত মোল্লা।
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১১
তিনি যখন শুনলেন আমি কোনো স্কুলে পড়ি না, এতদিন বাবার কাছে পড়েছি , তখন একেবারে আকাশ থেকে পড়লেন । কী পড়েছ বাবার কাছে ?
ইংরেজি, বাংলা, অঙ্ক, ভূগোল, আর নীতিশাস্ত্র ।
নীতিশাস্ত্রটা কী ?
কোনটা ভালো, কোনটা মন্দ, কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এইসব ।
কী বলছ কিছুই তো বুঝলাম না ।
যেমন ধরুন মিথ্যা । মিথ্যা বলা মন্দ । তবে আনন্দের জন্যে মিথ্যা বলায় অন্যায় নেই । মিথ্যা দিয়ে আমরা সত্যকে চিনতে পারি । বলছ কী এসব ? বুঝিয়ে বল ।
যেমন ধরুন, গল্প উপন্যাস এসব মিথ্যা । কিন্ত্ত এসব মিথ্যা দিয়ে আমরা সত্যকে চিনতে পারি । মাস্টার সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে রইলেন । নিজেকে অতিদ্রুত সামলে নিয়ে বললেন,- অমাবস্যা ইংরেজি কি জানো ?
জানি । অমাবস্যা হল নিউমুন, বলে নিউমুন কিন্ত্ত আকাশে তখন চাঁদ থাকে না ।
মৃন্ময় শব্দের মানে কী ?
মৃন্ময় হলো মাটির তৈরি ।
মাস্টার সাহেব আমার কথাবার্তায় অত্যন্ত চমৎকৃত হলেন । কিন্ত্ত এই বাড়ির অন্য কেউ হলো না । আমার দাদাজান ত্রূমাগত বলতে লাগলেন- তোর বাবা ছিল পাগল । উন্মাদ । ও যেসব শিখিয়েছে সব ভুলে যা । সব নতুন করে শিখবি । তোকে ভালো ইংরেজি স্কুলে ভর্তি করে দেব । আর শোন, তোর নাম দিলাম চৌধুরী ইমতিয়াজ । মনে থাকবে ?
ময়ূরাক্ষী উপন্যাসের খন্ড- ১১
দাদাজান বাড়িতে ঘোষণা করে দিলেন – একে কেউ হিমালয় বা হিমু, কিছই ডাকতে পারবে না । এর নাম ইমতিয়াজ চৌধুরী, ডাক নাম টুটুল । মনে থাকবে ? এই ছেলের মাথার ভিতর এই নাম দু’টা ঢুকিয়ে দিতে হবে । সারাদিনে খুব কম করে হলেও একে পঁচিশ বার চৌধুরী এবং পঁচিশ বার টুটুল ডাকতে হবে, its an order . প্রথম দিন স্কুল থেকে ফিরে এসে দেখি ময়লা পায়জামা-পাঞ্জাবির উপর একটা কোট চড়িয়ে অত্যন্ত রুগ্ন এক লোক বসার ঘরে বসে আছে । তার হাতে চকচকে নতুন একটা ছাতা মনে হচ্ছে আজই কেনা হয়েছে । ভদ্রলোকের মুখভর্তি পান । এস্ট্রেতে সেই পানের পিক ফেলেছেন । তার বসে থাকার ভঙ্গি, পান খাওয়ার ভঙ্গি এবং পানের পিক ফেলার ভঙ্গিতে কোনো সংকোচ নেই । যেন এই বাড়ির সঙ্গে তার ভালো পরিচয় ।
যেন এটা তার নিজেরই ঘরবাড়ি ।
আমি ঘরে ঢোকামাত্রই বললেন- বাবা হিমালয়, আমি তোমাকে নিতে এসেছি ।
আমি তোমার বড়মামা । আমাকে সালাম কর ।
দাদাজান গম্ভীর গলায় বললেন, আমি তো আপনাকে বলেছি তাকে নিতে পারবেন না ।
সে গ্রামে গিয়ে কী করবে ? সে এইখানের থাকবে
Read more
