অরণ্য পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

অরণ্য পর্ব – ৫

মিলি তাকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিল। রোদের তাপ কমে এসেছে। ঠাণ্ডা বাতাস, দূরে কোথাও বৃষ্টি হচ্ছে হয়তো। সোবাহান বড় রাস্তায় নেমে একবার পেছনে তাকাল। মিলি দাঁড়িয়ে আছে। তার দাঁড়ানোর ভঙ্গিতে একধরনের কাঠিন্য আছে। সোবাহানের তবু মনে হলো, ঠিক এ ধরনের মেয়েদের কাছেই বারবার ফিরে যেতে ইচ্ছে করে।

একটা ভুল হয়ে গেল। মিলির বর কবে আসবে জিজ্ঞেস করা হয়নি। শিগগিরই তো আসার কথা। মিলির বরকে মিলি চোখে দেখেনি। বিয়ে হয়েছে টেলিফোনে। ভদ্রলোক মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি। মিলির মতো একটি মেয়েকে পাশে পাওয়ার জন্যে মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং-এ পিএইচডি করতে ইচ্ছা করে। মেরিন ইঞ্জিনিয়ারিং জিনিসটা কী?

ফরিদ আলির কাছে দু’জন লোক এসেছে নবীনগর থেকে। তিনি তাদের চিনতে পারলেন না। তারা বয়সে ফরিদ আলির কাছাকাছি, কিন্তু দেখা হওয়ামাত্র পা ছুঁয়ে সালাম করল। ফরিদ আলি যথেষ্ট অপ্রস্তুত হলেন। এর জন্যে প্রস্তুত ছিলেন না। লোক দুটির একজন কাঁদো কাঁদো স্বরে বলল, হুজুর, আপনার দোয়া নিতে এসেছি।

ফরিদ আলি খানিকক্ষণ কোনো কথা বলতে পারলেন না। কিছুদিন ধরেই তার কাছে দূর দূর থেকে মানুষজন আসে। গত সপ্তাহেই নান্দাইল রোড থেকে একজন প্রাইমারি স্কুলের টিচার তাঁর ছোট মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিল। সেদিনও তিনি বলেছিলেন–”আমার কাছে কেন এসেছেন? আমি একজন অতি নগণ্য ব্যক্তি। আজও সেই কথা বললেন।

লোক দু’টি কী শুনে তাঁর কাছে এসেছে কে জানে। তারা জড়সড় হয়ে বসে রইল।আপনারা নিশ্চয়ই খাওয়াদাওয়া করেন নাই? জি-না। বসেন। খাওয়াদাওয়া করেন। মাগরেবের নামাজের পর দোয়া করব।হুজুর, ছেলেটা বাঁচবে? ফরিদ আলি তাকালেন। খুব স্পষ্টভাবে বললেন, মানুষের মৃত্যু নাই। আত্মা বেঁচে থাকে। আত্মার কোনো বিনাশ নাই। মৃত্যুর কথা বলছেন কেন?

কথাটা বলে তার নিজেরও ভালো লাগল। সত্যিই তো মৃত্যু নিয়ে এত যে মাতামাতি তার কোনো অর্থ হয় না। আমরা সবাই এক মৃত্যুহীন জগতের বাসিন্দা।

আপনার ছেলেটার বয়স কত?

জোয়ান ছেলে, বিয়ে দিছি গত বৎসর।

কী হয়েছে?

জানি না হুজুর। রক্তবমি করতেছে।

হুজুর বলছেন কেন আমাকে? আমার নাম ফরিদ আলি। আমাকে নাম ধরে। ডাকবেন।লোক দু’টি মুখ চাওয়া-চাওয়ি করতে লাগল।আল্লার নামের সাথে মিল রেখে আমাদের নাম। কাজেই নাম ধরে ডাকলে কোনো অপমান হওয়া ঠিক না। আপনারা হাত-মুখ ধোন, বিশ্রাম করেন, খানা আসবে।এই গ্রামে একটি পাকা মসজিদ আছে।

ফরিদ আলি আগে মসজিদে যেতেন। গত কয়েক মাস ধরে যান না। বাংলাঘরে একা একা নামাজ পড়েন। ইদানীং অবশ্য একা একা নামাজ পড়া হয় না। অনেকেই এখানেই চলে আসে। কেন আসে? তিনি জানেন না, জানতেও চান না। নামাজের শেষে মাঝে মাঝে দু’একটা কথা বলতে চেষ্টা করেন। সেগুলি কি ওদের ভালো লাগে? বোধহয় লাগে। আজও দেখা গেল অনেকেই এসেছে। নামাজের শেষে তিনি অন্যদিনের। মতো কিছু কথাবার্তা বললেন সুখ ভোগ করবার জন্যে আমরা আসি নাই।

পৃথিবীতে সুখ নাইরে ভাই। চারদিকে দুঃখ আর কষ্ট। এখানে কেউ কি আছেন যিনি বলতে পারেন তার কোনো দুঃখ নাই। আছেন কেউ? মৃদু একটা গুঞ্জন উঠল। নবীনগর থেকে আসা লোকটি চোখ মুছতে লাগল। কথা বলতে বলতে ফরিদ আলির মনে গভীর আবেগের সৃষ্টি হলো এবং তার নিজের চোখ দিয়েও টপ টপ করে পানি পড়তে লাগল এমন কেউ কি আছেন যিনি আমাদের দুঃখহীন জগতে নিয়ে যাবেন? যে জগতে মৃত্যু নাই, ক্লান্তি নাই। দুঃখ নাই। হতাশা নাই। বঞ্চনা নাই।

ফরিদ আলি কথা শেষ করে যখন উঠলেন তখন অনেক রাত। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। নবীনগরের লোক দুটিকে রাতে থেকে যেতে বলা হলো। তারা থাকল না। যাওয়ার সময় তারা আবার তাঁর পা ছুঁয়ে সালাম করতে এল। তিনি গম্ভীর গলায় বললেন, আল্লাহ ছাড়া অন্য কারও কাছে মাথা নিচু করা ঠিক না। তারা কী করবে বুঝতে পারল না। ফরিদ আলি বললেন, চলেন আপনাদের একটু এগিয়ে দিয়ে আসি।জি-না, জি-না। হুজুর, লাগবে না।

ফরিদ আলি তাদের কথা শুনলেন না। তাদের এগিয়ে দিলেন নিমাই খালের পুল পর্যন্ত। জায়গাটা ঘন অন্ধকার। আকাশে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ফরিদ আলি আকাশের দিকে তাকালেন। তারপর হঠাৎ বলে ফেললেন–চিন্তা করবেন না, আপনার ছেলে ভালো হয়ে যাবে। এই কথাটা কেন বললেন তিনি বুঝতে পারলেন না। কিন্তু বলেই সংকুচিত হয়ে পড়লেন।

এই কথাটি কেন তিনি বললেন? কেন, কেন? তারা অবাক হয়ে তাকাল তাঁর দিকে। অন্ধকারে তাঁর মুখ দেখা গেল না। লোকটি তাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল। ফরিদ আলি গাঢ় স্বরে বললেন, ভয়ের কিছু নাই, যান, বাড়ি যান।বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। ফরিদ আলি ভিজতে ভিজতে রওনা হলেন। বেশ লাগছে। তাঁর। কিছুক্ষণের মধ্যেই তার গা বেয়ে পানি পড়তে লাগল।

তিনি বাড়ির দিকে না গিয়ে উল্টোদিকে রওনা হলেন। সেখানে একটা শিমুল গাছ আছে। তার নিচে বসে থাকতে কেমন লাগে এটাই তার দেখার ইচ্ছা। কিংবা তেমন কোনো ইচ্ছা নেই, বসার জন্যেই বসা।ঘণ্টাখানিকের মধ্যে বৃষ্টি থেমে গেল। তারও বেশ কিছুক্ষণ পর হারিকেন হাতে তাকে খুঁজতে এল বাড়ির কামলা। ফরিদ আলি হাসি মুখে বললেন, কিরে রশীদ?

রশীদ বলল, ছোড ভাই আইছে।

তাই নাকি?

জি। সঙ্গে তাইনের বন্ধু আছে।

ফরিদ আলির মন আনন্দে ভরে গেল। তিনি উল্লসিত বোধ করলেন।বুলু মুগ্ধ হয়ে গেল–আরে এ তো দেখি পোবন! সোবাহান নিজেও কম অবাক হয়নি। বাড়িঘর চেনা যাচ্ছে না। ঝকঝক তকতক করছে। নামাজঘরের সামনে চমৎকার বাগান। করা হয়েছে। বাড়ির উত্তরের বিশাল আমগাছটির নিচে লাল সিমেন্ট দিয়ে বাঁধানো। বুলু বলল, কেমন যেন শান্তি শান্তি ভাব চলে আসছে। থেকে যেতে ইচ্ছে হচ্ছে।

থেকে যা। দাড়ি রেখে মুরিদ হয়ে যা।

তুই মনে হচ্ছে বিরক্ত।

বিরক্ত ফিরক্ত না।

সন্ধ্যাবেলা অনেক লোকজন এল ফরিদ আলির কাছে। বুলু মহা উৎসাহে গেল কথাবার্তা শুনতে। সোবাহান বসে রইল গম্ভীর হয়ে। ভাবি বললেন–তুমি যাও, শুনে আসো। আমাদের বলো। মেয়েমানুষেরা তো আর শুনতে পারে না।

বহু লোকজন আসে নাকি ভাবি?

তা আসে। বড় বড় লোকজনও আসে।

বড় বড় লোকজন মানে?

গত সপ্তায় এক জজ সাহেব আসছিলেন।

বলো কী?

জিপ গাড়ি নিয়ে এসেছে। রাত আটটা পর্যন্ত ছিল।

জ্ঞানের কথা সব শুনল?

কী কথা শুনল জানি না। আমি মূর্খ মেয়েমানুষ। এত সব কি জানি? বুলু খুব আগ্রহ নিয়ে বক্তৃতা শুনল। ফরিদ আলি কখনো মৃদুস্বরে কখনো নিচুগলায় কথা বলতে লাগলেন মানুষ পশুর মতো, তবে পশুর মধ্যেও ভালো জিনিস থাকে। যেমন বাঘ। বাঘের ভালো জিনিসটা হচ্ছে তার সাহস। সেরকম মানুষের মধ্যে, খারাপ জিনিসের মধ্যে অনেক ভালো জিনিস থাকে।

ওই ভালোটা রেখে খারাপটা বাদ দিতে হবে। রসুল করিম হযরত মুহম্মদ সাল্লাল্লাহু আলয়হেস সাল্লামের মধ্যেও কিছু খারাপ জিনিস ছিল। সেই জন্যে ফিরিশতা পাঠায়ে আল্লাহপাক তার বুক কেটে সেটা পরিষ্কার করলেন। আর আমরা তো অতি নিম্নশ্রেণীর মানুষ, আমাদের মধ্যে খারাপ ভাবটা আরও বেশি। কাজেই রাত দিন আল্লাহপাকের কাছে আমাদের বলতে হবে, হে পাওয়ারদেগার, আমাদের ভালো করেন।

সমবেত প্রতিটি মানুষ একসঙ্গে বলল, আমাদের ভালো করেন। বুলুও বলল।গভীর রাতে জিগির শুরু হলো, তবে ফরিদ আলি জিগিরে সামিল হলেন না। তিনি তাঁর নামাজঘরে ঢুকে পড়লেন। সেখানে কোনো বাতি জ্বালানো হলো না। অন্ধকারে ছোট্ট ঘরটিতে তিনি এক রহস্যময় পুরুষের মতো বসে রইলেন। বাংলাঘরের মুসল্লিরা। তালে তালে আল্লাহু আল্লাহু করতে লাগল। তাদের মাথা নড়ছে গা কাঁপছে। চোখমুখ আনন্দে উদ্ভাসিত।

যারা এখানে জমা হয়েছে তারা সবাই কি রাতে ভরপেট খেয়েছে? বোধহয় না। অনাহারক্লিষ্ট মুখ দেখলেই টের পাওয়া যায়। এরা কি এখানে ক্ষুধা ভুলে থাকার জন্যে এসেছে? বুলু জিগির করার ফাঁকে ফাঁকে গভীর আগ্রহে সবার মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তার বড় ভালো লাগছে।এক সপ্তাহ থাকার কথা ছিল। তৃতীয় দিনেই সোবাহান ঠিক করল চলে আসবে। ফরিদ আলি বেশ কয়েকবার থাকতে বললেন। সোবাহান প্রতিবারই বলল, না আমার ভালো লাগছে না।

কী, ভালো লাগছে না?

এইসব জিগির ফিগির।

না হয় এই কদিন জিগির হবে না। সবদিন তো হয়ও না।সোবাহান ক্রুদ্ধ স্বরে বলল, আপনি সারা রাত ওই বাংলাঘরে বসে থাকেন কেন? মানুষের ঘুমের দরকার নাই? ঘুমাই তো। দিনে ঘুমাই।বুলুর আরও কিছুদিন থাকার ইচ্ছা ছিল। সোবাহান তাকে নিয়ে জোর করে চলে এল।

ফরিদ আলি স্টেশন পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এলেন। সারা পথে অসংখ্য লোক তাকে সালাম করল। একজন এগিয়ে এল ছাতা হাতে। রোদে যেন তার কষ্ট না হয়। তিনি মৃদু হেসে তাকে বললেন, রোদ তো আল্লাহর দান। রোদে কষ্ট হবে কেন? কোনো কিছুতেই কষ্ট নাই। কষ্ট মনে করলেই কষ্ট! সুখ মনে করলেই সুখ!সোবাহান অফিসে ঢোকামাত্র রিসিপিশনের মেয়েটি বলল, আপনি অনেকদিন পরে এলেন। কী ব্যাপার, অসুখ-বিসুখ নাকি?

সোবাহান অবাক হলো। ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাচ্ছে না।বড় সাহেব আপনার খোঁজ করছিলেন।উনি কি আছেন? আছেন। আপনি বসুন। খবর পাঠাচ্ছি।সে বসে রইল। রিসিপশনের মেয়েটিকে আজ আরও সুন্দর লাগছে। আজ সে। কালো রঙের একটি শাড়ি পরেছে। কালো রঙের শাড়িতে মেয়েদের এতটা সুন্দর লাগে তা তার জানা ছিল না।যান, আপনি স্যারের ঘরে যান।

রহমান সাহেবের বয়স প্রায় পঞ্চাশ। মাথার চুল সব পেকে গিয়েছে। অসম্ভব গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ। কথা বলবার সময় চোখে পলক পড়ে না। এদের দেখলেই মনে হয় এরা। জন্মেছে বস হওয়ার জন্যে।বসুন। আপনার নাম সোবাহান? জি।ওইদিন আপনি এরকম অশালীন আচরণ করলেন কেন? একজন মেয়েমানুষকে অপমান করে পৌরুষ দেখালেন? সোবাহান জবাব দিল না। লোকটির ব্যক্তিত্বের তারিফ করল মনে মনে।আপনি পড়াশুনা কতদূর করেছেন?

বিএ পাস করেছি।

কোন ক্লাস?

সেকেন্ড ক্লাস।

যে মহিলাদের সম্মান দেখাতে জানে না তাকে আমি এই অর্গানাইজেশনে চাকরি দিতে পারি না।সম্মান অর্জন করতে হয়। অনেক মহিলা আছেন যাদের সম্মান দেখানোর কোনো কারণ নেই।আপনি যেতে পারেন।সোবাহান উঠে দাঁড়াল। রহমান সাহেব বেল টিপতেই পিএ ছুটে এল এবং এমন ভাব করল যেন সে সোবাহানকে চিনতে পারছে না। রহমান সাহেব বললেন, ফরেন করেসপনডেন্স ফাইলে কোরিয়া ট্রেডার্সের কোনো চিঠি আছে কি না দেখুন তো।

সোবাহান লোকটির ব্যক্তিত্বের আবার প্রশংসা করল। লোকটি কত সহজেই বুঝিয়ে দিল–তুমি কীটস্য কীট। সোবাহান হাসিমুখে বলল, স্লমালিকুম।রহমান সাহেব চোখ তুলে তাকালেন। শীতল স্বরে বললেন, আপনি নিচে অপেক্ষা করুন, আমি ডাকব।সে নিচে নেমে এল। রিসিপশনের মেয়েটি কার সঙ্গে যেন কথা বলছে। যাওয়ার সময় তাকে কি কিছু বলে যাওয়া উচিত? এখানে আর তো নিশ্চয়ই আসা হবে না। সোবাহান ইতস্তত করতে লাগল। কিন্তু কথা শেষ হচ্ছে না। বেশ মেয়েটি।

চলে যাচ্ছেন?

হ্যাঁ।

স্যার কী বললেন?

তেমন কিছু না।

মেয়েটি মনে হলো বেশ অবাক হয়েছে। অবাক হওয়ার কিছু কি আছে এর মধ্যে?

সোবাহান হঠাৎ বলে বসল, আপনার নাম জানা হয়নি।

আমার নাম ইয়াসমিন। নাম দিয়ে কী করবেন?

এমনি জিজ্ঞেস করলাম। কিছু মনে করবেন না।

চা খাবেন?

নাহ্।

খান, এক কাপ চা খান।

মেয়েটি কাকে যেন ইশারা করল। হালকা গলায় বলল, আমার ধারণা ছিল আপনার। চাকরিটা হবে।এরকম ধারণার কারণ কী? কারণ স্যারকে দেখলাম আপনাকে নামে চেনেন। আমাকে বলে রেখেছিলেন সোবাহান নামের কেউ এলে তাকে খবর দিতে। আপনার নিশ্চয়ই ভালো রেফারেন্স আছে।নাহ, তেমন ভালো নেই। থাকলে এ অবস্থা হওয়ার কথা না।

তাও ঠিক।সোবাহান লক্ষ করল মেয়েটি তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকে দেখছে। কী দেখছে কে জানে। দেখার মতো কী আছে তার মধ্যে? আপনি রুমাকে যে ট্রিটমেন্ট দিয়েছেন তাতে আমরা সবাই খুব খুশি। থ্যাংকস।রুমা কে? রহমান সাহেবের পিএ? হ্যাঁ। সোবাহান বেতের সোফায় বসে রইল সন্ধ্যা পর্যন্ত। সন্ধ্যাবেলা পিএ এসে বলল, আজ দেখা হবে না। স্যারের প্রেসার বেড়েছে।

সোবাহানের চোখের সামনেই রহমান সাহেব বের হয় গেলেন। পলকের জন্যে তাকালেন সোবাহানের দিকে।রিসিপশনিস্ট মেয়েটি বলল, আপনি পরশু আসুন। একটা কিছু নিশ্চয়ই হবে।দেখি।না, দেখাদেখি না। আসুন। এত অল্পতে ধৈর্য হারানো ঠিক না।ধৈর্য আছে। এখনো হারাইনি।তারা দুজন একসঙ্গে বেরুল। সোবাহান পাশাপাশি হাঁটছিল। তার ইচ্ছা হচ্ছিল বলে–কোনো রেস্টুরেন্টে বসে এক কাপ চা খাবেন?

কিন্তু বলল না। বাংলাদেশে মেয়েরা সন্ধ্যাবেলা কোনো রেস্টুরেন্টে বসে চা খায় না। সোবাহান বলল–আচ্ছা চলি? মেয়েটি মিষ্টি করে হাসল। হয়তো অভ্যাসের হাসি, তবু দেখতে ভালো লাগে। এই মেয়েটির দাঁতগুলি সুন্দর। কোন টুথপেস্ট ব্যবহার করে কে জানে।সোবাহান ঘরে ফিরল রাত এগারোটায়। জলিল সাহেব বললেন, এত দেরি করলেন? আপনার বন্ধু বুলু সাহেব সন্ধ্যা থেকে বসে ছিলেন। খুব নাকি দরকার।কী দরকার?

তা তো বলেন নাই, চিঠি লিখে গেছেন। ড্রয়ারে চিঠিটা আছে, পড়ে দেখেন।চিঠিতে তেমন কিছু লেখা নাই। ইংরেজি বাংলা মিশানো যা আছে তার কোনে পরিষ্কার অর্থও হয় না। বোঝা যায় যে, একটা ইম্পর্টেন্ট খবর আছে। সে খবরটি কী সে সম্পর্কে কিছুই নাই।জলিল সাহেব চিন্তিত ভঙ্গিতে বললেন, ব্যাপারটা কি কিছু বুঝতে পারছেন?

নাহ্।

খারাপ কিছু না তো?

না, খারাপ আর কী হবে? চাকরি হয়েছে বোধহয়।

চলেন না যাই খোঁজ নিয়ে আসি।

এত রাতে কোথায় যাব!

সোবাহান কোনো উৎসাহ দেখাল না। নির্বিকার ভঙ্গিতে ঘুমোতে গেল। ঘুম আসবে না জানা কথা। অনেক রাত জেগে থাকার পর খানিকটা তামতে হবে। ব্যস। কিংবা এও হতে পারে সারা রাত জেগে কাটবে।রাত একটা পর্যন্ত ঘুমোবার চেষ্টা করে সোবাহান মশারির ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। জলিল সাহেব আলো জ্বালিয়ে কী যেন পড়ছেন।কী পড়ছেন? তেমন কিছু না রে ভাই। ফুটপাতের একটা বাজে বই। আপনার মতে ইয়াংম্যানদের পড়া ঠিক না।জলিল সাহেব, আপনি কি কোনো মেয়েকে দেখে বলতে পারেন মেয়েটি বিবাহিতা অবিবাহিতা?

জলিল সাহেব খানিকক্ষণ কুঁচকে রেখে বললেন, বলাটা ডিফিকাল্ট। বলতে হলে বিছানায় নিতে হবে। হা হা হা।সোবাহান বারান্দায় গিয়ে বসল। জলিল সাহেব ভেতর থেকে বললেন, কি ভাই রাগ করলেন নাকি? বয়স হয়েছে, দুএকটা বেফাঁস কথা বলে বসি। এতে মাইন্ড করা ঠিক না।মাইন্ড করিনি।

আপনি কি ভাই বিবাহিতা কারুর সঙ্গে কিছু বাধিয়ে বসেছেন? সিংকিং সিংকিং ড্রিকিং ওয়াটার। সুখে আছেন ভাই। বয়সটাই আপনাদের ফেভারে। জীবনটা কেটে গেল ভেজিটেবলের মতো। বহুত আফসোস হয়, বুঝলেন? জলিল সাহেব বারান্দায় এসে বসলেন। সিগারেট ধরালেন। ক্লান্ত স্বরে বললেন, ফ্যামিলি লাইফের একটা চার্ম আছে। এই ধরেন, ফ্যামিলি থাকলে এ সময়ে লেবুর শরবত বানিয়ে খাওয়াত। মাথা টিপে দিত।

সোবাহান বলল, আপনার মাথা ধরেছে নাকি?

জলিল সাহেব জবাব দিলেন না।

মাথা ধরা থাকলে সিগারেট খাবেন না।

মাথা ধরে নাই। কটা বাজে?

একটার উপরে।

সামনের রাস্তায় লোক চলাচল নেই। গলির মোড়ের সিগারেটের দোকান একটার। দিকে ঝাঁপ ফেলে দেয়। আজ ফেলছে না। অল্পবয়েসী কিছু ছোঁকরা ঘোরাঘুরি করছে সেখানে। জলিল সাহেব ওই দিকে তাকিয়ে মৃদু গলায় বললেন, ওদের মতলবটা কিছু বুঝতে পারছেন?

জি-না।

গাঁজা খাবে। রাত একটার পর ওই দোকানে গাঁজা বিক্রি হয়।

তাই নাকি?

হুঁ। খাবেন নাকি?

নাহ্।

ইচ্ছা হলে চলেন যাই, দেখি জিনিসটা কী! দু’টাকা করে নেয়। সিগারেটের মধ্যে ভরে দেয়।না, ইচ্ছা করছে না।সবকিছু ট্রাই করতে হয়। জীবনে আছে কী বলেন? মরবার সঙ্গে সঙ্গেই তো ফুটটুস। কি ঠিক বললাম না? জি ঠিকই বলেছেন।আচ্ছা ঠিক আছে, চলেন যাই চা খেয়ে আসি।রাতে চা কোথায় পাবেন? ঢাকা শহরে একটার সময় চা পাওয়া যাবে না? বলেন কী? যান সার্টটা গায়ে দিয়ে আসেন।

 

Read more

অরণ্য পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *