আজ আমি কোথাও যাব না পর্ব – ৮ হুমায়ূন আহমেদ

আজ আমি কোথাও যাব না পর্ব – ৮

এরপরেও ভালো সংবাদ আছে। ভালো সংবাদটা হলো পারিবারিক সব আলোচনা হবার পর আমি আমার মাকে ছাদে ডেকে নিয়ে বলেছি–মা, আমাকে কেটে টুকরা টুকরা করে ইছামতি নদীতে ফেলে দেয়ার ব্যবস্থা কর। আমার কথার মানে বুঝতে না পেরে মা হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে বইলেন। আমার ধারণা আপনিও আমার কথার মানে বুঝতে পারছেন না। কারণ আপনিও হা করে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে আছেন। আপনি কি . আমার কথার মানে বুঝতে পেরেছেন?

না।থাক মানে বোঝার দরকার নেই। আপনি আপনার চাচা শামসুদ্দিন সাহেবকে আমাদের বাসায় পাঠাবেন। বাবা বিয়ের তারিখ নিয়ে কথা বলবেন।ও, আচ্ছা।বিয়ে যে করবেন সে রকম টাকা-পয়সা কি আছে? বিয়ের শাড়ি, গয়না তো লাগবে। লোকজন খাওয়াতে হবে। আপনার অবস্থা দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার টাকা-পয়সা আছে। আমার তো মনে হচ্ছে আমেরিকা যাবার টিকিটের টাকাও আপনি এখনো জোগাড় করতে পারেন নি।জয়নাল চুপ করে রইল। তার কাছে সব কিছু কেমন যেন অদ্ভুত লাগছে। অপরূপ রূপবতী একটি মেয়ে তার ঘরের খাটে বসে আছে, পা দুলিয়ে দুলিয়ে এইসব কী বলছে?

জয়নালের গলার কাছটা শক্ত হয়ে আসছে। খুব খারাপ লক্ষণ। চোখে পানি এসে যাবার সম্ভাবনা আছে। সম্ভাবনা নষ্ট করতে হবে। চোখে পানি এসে গেলে বিরাট বেইজ্জতি ব্যাপার হবে। জয়নাল মনে মনে বলল, হে আল্লাহপাক, হে পরওয়ারদেগার। চোখে যেন পানি না আসে। এই মেয়েটার সামনে চোখে পানি আসলে আমি বিরাট বেইজ্জতি হব। যদি পানি না আসে তাহলে আমি দশ রাকাত নফল নামাজ পড়ব। একটা ফকিরকে চা নাশতার পয়সা দেব। তোমার কাছে ওয়াদা করলাম।ইতি পা নাচাতে নাচাতে বলল, আপনি আমার পেছনে লুকিয়ে আছেন কেন? আপনার চোখে কি পানি এসেছে নাকি?

আরে না, পানি আসবে কেন। একটা জিনিস খুঁজছি। কোথায় যে রাখলাম।জিনিসটা কী? জয়নাল জবাব দিতে পারল না। আগে থেকে ঠিকঠাক করে না রাখলে মিথ্যা বলা বেশ কঠিন। ইতি বলল, আপনাকে একটা ব্যাপার বলা দরকার। আমার কিন্তু খুব বুদ্ধি। আমাকে বিয়ে করে আপনি মহাবিপদে পড়বেন, কাজেই আনন্দে চোখের পানি ফেলার মতো কোনো ঘটনা ঘটে নি।বিপদে পড়ব কেন? বিপদে পড়বেন কারণ আমি খুবই বুদ্ধিমতী একজন মেয়ে। প্রেম করার জন্যে বুদ্ধিমতী মেয়ে ভালো। বিয়ে করার জন্য বুদ্ধিমতী মেয়ে ভালো না।

বিয়ে করার জন্যে ভালো জি জনাব টাইপ মেয়ে! স্বামী যা বলবে মেয়ে ঘাড় কাত করে বলবে–জি জনাব। স্বামী যদি নামাজি হয় সে সঙ্গে সঙ্গে বোরকা পরা শুরু করবে। স্বামীর যদি মদ খাওয়ার অভ্যাস থাকে সেও মদ ধরবে।জয়নাল মুগ্ধ হয়ে ইতির কথা শুনছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, এই মেয়ে চ্যাঙ বেঙ টাইপ মেয়ে না। এ হলো সিরিয়াসিং কন্যা। যে কন্য সব বিষয়ে সিরিয়াস সেই কন্যাই সিরিয়াসিং কন্যা।ইতি বলল, এখন আপনি ঝেড়ে কাশুন। আয়োজন করে বিয়ে করার মতো টাকা পয়সা কি আপনার আছে?

না।ধারটার করে জোগাড় করতে পারবেন? টিকিটের টাকার জোগাড় এখনো হয় নি।আমার কাছে বুদ্ধি চান? চাই।আমার দায়িত্ব হলো–বিয়েতে সবাইকে রাজি করানো। সেটা আমি করাব।কীভাবে? আমি শুধু আমার মাকে রাজি করবি। আমার মাও আমার মতোই বুদ্ধিমতী। তিনি রাজি হলে বাকি সবাইকে তিনিই রাজি করাবেন। তখন আপনাদের খবর দেওয়া হবে পান-চিনির অনুষ্ঠানে। আপনি একটা আংটি নিয়ে উপস্থিত হবেন। আংটি কেনার পয়সা কি আছে?

আছে।আংটি প্রদান অনুষ্ঠান সুসম্পন্ন হবার পর আপনার চাচা শামসুদ্দিন সাহেব কথায় কথায় বলবেন বিয়ে বাকি রেখে লাভ কী? একটা কাজি ডেকে নিয়ে বিয়ে পড়িয়ে দিলে কেমন হয়। আপনার চাচার এই কথার পর আমাদের তরফ থেকে একজন বলবে, মন্দ কী? তারপর কাজি আনতে লোক চলে যাবে।এত সহজ? অবশ্যই সহজ। আপনার বিশ্বাস হচ্ছে না? না।আপনাকে যেভাবে বলেছি পুরো ঘটনা আমি এইভাবে ঘটাব। কোনো রকম উনিশ-বিশ হবে না।জয়নাল অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। মেয়েটির আহ্লাদি ধরনের কথার সঙ্গে তার পরিচয় আছে। এই রূপের সঙ্গে পরিচয় নেই। ইতি মাখা দোলাতে দোলাতে বলল, এই কাজটা আমি কেন করছি জানতে চান?

আপনার মনে যাতে কোনো ভ্রান্ত ধারণা না থাকে সে জন্যেই আমার বলে দেওয়া উচিত কাজটা কেন করছি। আপনি মজনু না, আমিও লাইলি না যে আপনার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে এই কাজ করছি। আমার দিক থেকে কারণটা সহজ। খুবই সহজ। আপনি বোকা টাইপের হলেও মানুষ হিসেবে ভালো। যে-কোনো মেয়ে ভালো মানুষ মন্দ মানুষ ব্যাপারটা ধরতে পারে। যে-কোনো মেয়ের চেয়ে আমি আরো তাড়াতাড়ি ধরতে পারি।ও, আচ্ছা।আংটি প্রদান অনুষ্ঠানকে বিয়ের অনুষ্ঠানে রূপান্তরিত করার পরিকল্পনা কেন করেছি সেটাও বলি। আপনার প্রতি মমতাবশত এই কাজটা কিন্তু আমি করছি না। আমার বাবার প্রতি মমতাবশত কাজটা করছি।জয়নাল বলল, তুমি কী বলছ বুঝতে পারলাম না।

বাবা সরকারি চাকরি করেন। আগামী বছর রিটায়ার করবেন। সরকারি বাসা ছেড়ে আমাদের একটা ভাড়া বাড়িতে উঠতে হবে। সেই বাড়ির ভাড়া বাবা কীভাবে দেবেন তা তিনি জানেন না। প্রভিডেন্ট ফান্ডে কোনো টাকা নেই। আমার বড় বোনের বিয়ের সময় এক লাখ টাকা ধার নিয়েছিলেন, সেই ঋণ এখনো শোধ হয় নি। বাবার যা অবস্থা আমার বিয়েতে দশ হাজার টাকা খরচ করার সামর্থ্যও তার নেই। ফাঁকতালে আমার বিয়ে হয়ে গেলে বাবার জন্যেও সুবিধা। টাকা-পয়সা ছাড়া আমার বিয়ে হয়ে গেলে বাবার উচিত কবি নজরুলের বিখ্যাত গানটা গাওয়া–রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।

জয়নাল মুগ্ধ গলায় বলল, তুমি দেখি খুবই আশ্চর্য মেয়ে! ইতি বলল, আমি মোটেই আশ্চর্য মেয়ে না। আমি সাধারণ মেয়ে, তবে বুদ্ধিমতী মেয়ে। আমার বুদ্ধি নিয়ে চললে আপনার জীবনটা অন্যরকম হয়ে যাবে। তবে আমি কোনো বুদ্ধি আপনাকে দেব না।কেন? যে সব স্বামীরা স্ত্রীর বুদ্ধিতে চলে তারা কেমন ভিজা বিড়ালের মতো হয়ে যায়। তাদের দেখলেই মনে হয় দুবলা পাতলা শিং ভাঙা কালো রঙের একটা গরু। গরুর গলায় দড়ি বাধা আছে। তার সামনে কিছু প্রকনা খড়। মাঝে মাঝে সে খড় খাচ্ছে আর করুণ চোখে এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। আপনার সঙ্গে কথা বলতে বলতে আমার ক্ষিধে লেগে গেছে। ডিম ভাজাটা দিন আর একটা চামচ দিন। আমি ডিম ভাজা খাব। দেখি আপনার রান্নার হাত কেমন।

ইতি বেশ আয়োজন করে ডিম ভাজা খাচ্ছে। জয়নালের আফসোস হচ্ছে। ইতি ভিম খাবে জানলে এক বোতল টমেটো সস কিনে রাখত। মিষ্টি ছাড়া যে. কোনো জিনিস মেয়েরা সস দিয়ে খায়। জয়নাল বলল, আমি একটা বিপদে পড়েছি। বিপদ থেকে উদ্ধারের কোনো বুদ্ধি কি তোমার কাছে আছে? ইতি বলল, বিপদটা কী রকম? আমার চাচা আমার দেশের বসত-বাড়ি দখল করে বসে আছেন। চাচার কাছে আমি একটা চিঠি লিখেছি। চিঠিটা পড়লে বুঝবে।আপনি পড়ে শোনান। জয়নাল চিঠি বের করে পড়তে শুরু করল।

জনাব মুখলেসুর রহমান,

চাচাজি আমার সালাম নিবেন। কুরিয়ারে পাঠানো আপনার আগের চিঠি পেয়ে আমি খুবই অবাক হয়েছি। আপনি হঠাৎ করে এখন বলছেন যে আমাদের বসত-বাড়ি আপনি নগদ টাকায় বাবার কাছ থেকে কিনেছেন। আপনার কাছে কাগজপত্র আছে। আপনার কাছে খাজনার রশিদও আছে। আপনার কথা পুরোপুরি মিথ্যা। এটা যে মিথ্যা তা আপনি যেমন জানেন, গ্রামবাসীও জানে। বাংলাদেশ মগের মুল্লুক না। এখানে আইন-কানুন আছে। আপনি আমার আপন চাচা, মুরব্বি মানুষ, তারপরেও আমি অবশ্যই থানা পুলিশ করব। ইতিমধ্যে আমি উকিলের সঙ্গে পরামর্শ করেছি। আদালতে দেওয়ানি মামলা রুজু করার সমস্ত প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে। তারপরেও মিটমাটের সুযোগ আছে। বিদেশ যাত্রার আগে আগে আমার টাকা-পয়সা প্রয়োজন। আপনি জমি বিক্রির ব্যবস্থা করে টাকাটা আমাকে দিয়ে দিলে আমার বিরাট উপকার হয়। আত্মীয়স্বজনের মধ্যে তুচ্ছ বিষয় নিয়ে মনোমালিন্য বাঞ্ছনীয় নয়। চাচিকে আমার সশ্রদ্ধ সালাম ও কদমবুসি। অন্যদের শ্রেণীমতো সালাম ও দোয়া।

ইতি

আপনার স্নেহের জয়নাল

ইতির ডিম খাওয়া শেষ হয়েছে, সে পানি খেল, শাড়ির আঁচলে মুখ মুছতে মুছতে বলল, চিঠিটা ছিড়ে ফেলে দিন। এই চিঠিতে কাজ হবে না। আরেকটা চিঠি লিখুন—

চাচাজি, আমার সালাম নিন। পত্রে জানলাম বাবার কাছ থেকে আপনি বসত-বাড়ি কিনে নিয়েছিলেন। খবরটা জানা ছিল না বলে আপনাকে এমন একটি চিঠি লিখেছি। আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। জমির দলিল এবং খাজনার রশিদ দেখাতে চেয়েছেন। চাচাজি, তার কোনো প্রয়োজন নেই। আপনার মুখের কথাই যথেষ্ট। এখন চাচাজি আমি বিপদে পড়েছি। আমেরিকা যাবার ভাড়া জোগাড় করতে পারছি না। আপনি যদি আমেরিকা যাবার টিকিটের টাকা আমাকে ধার দেন তাহলে খুব উপকার হয়। চাচাজি, আপনি আমার এই উপকারটা করুন। আমি অবশ্যই তিন থেকে চার মাসের মধ্যে টাকাটা ফেরত দেব। চাচিজিকে আমার সালাম।

ইতি

আপনাদের স্নেহের জয়নাল

ইতি উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল, যেভাবে বললাম, ঠিক সেইভাবে চিঠি লিখে দেখুন উনি যদি কিছু পাঠান সেটাই হবে আপনার লাভ। অন্য কোনোভাবে কিছু করতে পারবেন না।

জয়নাল মুগ্ধ চোখে ইতির দিকে তাকিয়ে আছে। এমন এক আশ্চর্য মেয়ের সঙ্গে তার বিয়ে হতে যাচ্ছে ভাবতেই কেমন লাগছে।পৃথু কাঁদছে।শামসুদ্দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে ছেলেটার কান্না শুনছেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না। বেচারা কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করছে, পারছে না। নিশ্চয়ই কোনো কঠিন শাস্তির ভেতর দিয়ে তাকে যেতে হচ্ছে। শামসুদ্দিনের ইচ্ছা করছে ছেলেটাকে উদ্ধার করার চেষ্টা করেন। সকালে ঘুম ভাঙবে বাচ্চা একটা ছেলের কান্নায় এটা কেমন কথা? রাহেলাকে কি বুঝিয়ে ব্যাপারটা বলা যায়?

শামসুদ্দিন উঠে বসেছেন। কী করবেন মনস্থির করতে পারছেন না। রফিক বাসায় আছে। তার কথা শোনা যাচ্ছে। ছেলের মহাবিপদ হলে সে এগিয়ে যাবে, কাজেই তাকে খুব বেশি চিন্তিত না হলেও হবে। তিনি ঘড়ির দিকে তাকালেন, আটটা পাঁচ। অনেক বেলা হয়ে গেছে। অন্যদিন ভোর ছটার আগেই তার ঘুম ভাঙে। আজ আটটা পর্যন্ত একটানা ঘুমিয়েছেন। গত রাতে ঘুম ভালো হয়েছে। শরীর প্রফুল্ল। শুধু পৃথুর ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদার কারণে মনটা খারাপ হয়ে আছে। এমন কোনো দোয়া কি আছে যা পড়লে মায়ের মনে শিশুদের প্রতি করুণা জাগে?

ভাইজানের ঘুম ভেঙেছে? শামসুদ্দিন দেখলেন হাসিমুখে রফিক ঢুকেছে। তার হাতে ট্রে। ট্রেতে দুকাপ চা। একটা পিরিচে দুটা টোস্ট বিস্কিট। এক গ্লাস পানি। রফিক টেবিলে ট্রে নামিয়ে রাখতে রাখতে বলল, বেড-টি এনেছি।শামসুদ্দিন বললেন, এখনো মুখ ধোয়া হয় নি।রফিক হাসতে হাসতে বলল, বেড-টি বাসিমুখে খেতে হয়। বিদেশে যাচ্ছেন বেড-টি খেতে হবে। এখন থেকে প্র্যাকটিস করুন। খুব বেশি অস্বস্তি লাগলে কুলি করে নিন। বাসিমুখে চা খেতে পারবেন না ভেবেই পানি নিয়ে এসেছি। বেড-টি খাওয়ার নিয়ম অবশ্যি তা না।

প্রথম যে জিনিসটা মুখে ঢুকবে সেটা হচ্ছে গরম চা, কিংবা গরম কফি। গরম পানিতে মুখের ময়লা ধুয়ে স্টমাকে চলে যাবে। মুখ হবে ক্লিন।শামসুদ্দিন বললেন, পৃথু কাঁদছে কেন? রফিক বলল, তাকে নাঙ্গু বাবা করা হয়েছে, এই জন্যে কাঁদছে।নাঙ্গু বাবা মানে কী? আবার বিছানা ভিজিয়েছে বলে রাহেলা তাকে শাস্তি দিয়েছে। পৃথু আজ সারাদিন কোনো প্যান্ট পরতে পারবে না। নেংটো হয়ে ঘুরে বেড়াতে হবে। পৃথু কাঁদছে লজ্জায়।শামসুদ্দিন মন খারাপ করে বললেন, বাচ্চা একটা ছেলেকে এটা কেমন শাস্তি?

রফিক বলল, আপনি আরাম করে চা-টা খান তো ভাইজান! আমি পৃথুকে উদ্ধারের ব্যবস্থা করব। রাহেলার মেজাজ আজ অতিরিক্ত খারাপ, এই জন্যে তাকে ঘাটাচ্ছি না। মেজাজ নামুক।শামসুদ্দিন চায়ে চুমুক দিচ্ছেন। পৃথুর ফুঁপিয়ে কান্নাটা মন থেকে দূর করতে পারছেন না।রফিক বলল, চা-টা ভালো হয়েছে ভাইজান? আমি বানিয়েছি।ভালো হয়েছে।আজ এক কৌটা কফি কিনে আনব। কফি খাওয়ার অভ্যাস হওয়া দরকার। আমেরিকায় শুনেছি সবাই কফি খায়। চায়ের চল নেই। বৃটিশরা চা ভক্ত।কফি আনতে হবে না রফিক।ভাইজান, যাবার তারিখ কি ঠিক হয়েছে?

খুব সম্ভব আগামী মাসের ৭ তারিখে যাব। জয়নাল ছেলেটা সে-রকমই ঠিক করেছে।জয়নালের সঙ্গে এখনো ঝুলে আছেন? বললাম না এই ছেলের কাছ থেকে দূরে থাকতে! আমেরিকায় পৌঁছেই এই ছেলে আপনার ডলার নিয়ে কেটে পড়বে।ছেলেটা ভালো।আপনার কাছে তো সবই ভালো। আমার সাবধান করে দেবার কথা, সাবধান করে দিলাম। আগামী মাসের সাত তারিখে চলে যাবেন, হাতে তো তাহলে সময় একেবারেই নেই। আপনার কী কী খেতে ইচ্ছা করে দয়া করে বলবেন। ব্যবস্থা করব।শামসুদ্দিন বললেন, তুমি এমনভাবে কথা বলছ যেন আমি মারা যাচ্ছি। মৃত্যুর আগে প্রিয় খাবারগুলি খেতে হবে।

সাত সমুদ্র তের নদী পার হচ্ছেন। দেশী খাওয়া-খাদ্য কতদিন পাবেন না। কচুর লতি, মলা মাছ, উচ্ছে ভাজি, মাষকলাইয়ের ডাল–আমেরিকায় এইসব পাবেন না।আমার খাওয়া নিয়ে তুমি মোটেই চিন্তা করবে না। তুমি রাহেলার দিকে একটু নজর দাও। ইদানীং তার মেজাজ এত খারাপ হয়েছে।রফিক সিগারেট ধরাতে ধরাতে বলল, মেজাজ আসলেই বেশি খারাপ হয়েছে। পেটের সন্তান খালাস না হওয়া পর্যন্তু মেজাজ ঠিক হবে না। পৃথু যখন পেটে ছিল তখনো এরকম মেজাজ খারাপ থাকত। একবার তো ছাদে গিয়ে উঠল–তিনতলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে পড়বে এরকম প্ল্যান। আমি হাতে পায়ে ধরে নামিয়ে এনেছিলাম। একেক মেয়ের একেক নেচার।ডাক্তারের সঙ্গে কথা বললে হয় না?

কথা বলেছি। ডাক্তার বলেছে এটা এমন কিছু না। হরমোনাল ইমব্যালান্স থেকে এরকম হয়। ঠিক হয়ে যাবে। আমাকে বলেছে তাকে ভুলিয়ে-ভালিয়ে খুশি রাখার চেষ্টা করতে। আমি চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। রাহেলা যাই বলছে আমি তাতেই সায় দিচ্ছি। রাহেলা বলল, বিছানা ভিজাননার শাস্তি হিসেবে পৃথু সারাদিন পান্ট ছাড়া থাকবে। আমি বলেছি, অবশ্যই তাই থাকবে। ভাইজান কি চায়ের সঙ্গে একটা সিগারেট খাবেন? শামসুদ্দিন সিগারেট নিলেন। রফিক সিগারেট ধরিয়ে দিতে দিতে বলল, রাহেলাকে খুশি করার আরেকটা বুদ্ধি বের করেছি ভাইজান! কী বুদ্ধি?

ভালো সেন্ট ওর পছন্দ। ভালো সেন্টের এমন দাম, কিনে দেওয়া সম্ভব না। তারপরও দু বোতল সেন্ট কিনে এনেছি। সেন্ট পেলে সে এক সপ্তাহ খুশি থাকবে। ফুস ফুস করে গায়ে সেন্ট ছাড়বে আর হাসবে।রাহেলার সেন্ট এত পছন্দ জানতাম না তো! খুবই পছন্দ। মাঝে মাঝে যখন দোকানে নিয়ে যাই ও কী করে জানেন? দুনিয়ার সেন্ট নেড়ে-চেড়ে দেখে। হাতে স্প্রে করে। গন্ধ শোঁকে। তখন তাকে দেখলে আপনার মনে হবে সে জগতের সুখী মহিলাদের একজন।

বলো কী! রফিক সিগারেটে লম্বা টান দিয়ে বলল, সেন্টের শিশি দুটা আমি আপনার ড্রয়ারে রেখে দিচ্ছি ভাইজান। এক সময় তাকে ডেকে বলে দেবেন যে আপনি তার জন্যে কিনে এনেছেন। আপনার কাছ থেকে সেন্ট পেলে সে অনেক বেশি খুশি হবে।শামসুদ্দিন তাকিয়ে রইলেন। সেন্টের শিশি তিনি দিলে রাহেলা বেশি খুশি হবে কেন ঠিক ধরতে পারছেন না।রফিক বলল, আমার উপরে সে নানান কারণে রেগে আছে। আমি যদি দিই তাতে লাভ হবে না। হয়তো ছুড়ে ফেলে দেবে। দামি একটা জিনিস নষ্ট হবে।শামসুদ্দিন বললেন, আমি সেন্টের শিশি দিয়ে তাকে কী বলব?

বলবেন আপনি তার জন্যে কিনেছেন।মিথ্যা কথা বলা হবে তো।সংসারে থাকতে হলে দুএকটা মিথ্যা কথা বলতে হয় ভাইজান। এতে দোষ হয় না। তারপরও আপনার যদি খারাপ লাগে আপনি আমাকে টাকা দিয়ে দেবেন। নেন, আরেকটা সিগারেট নেন। দেশে যেমন যে-কোনো জায়গায় আরাম করে সিগারেট ধরাতে পারবেন, আমেরিকায় পারবেন না। স্মোকিং ওরা দেশ থেকে তুলে দিচ্ছে। খুব হেলথ কনশাস জাতি।

শামসুদ্দিন আরেকটা সিগারেট ধরালেন। পৃথুর ফেঁপানি শোনা যাচ্ছে না। তিনি এতে স্বস্তি পাচ্ছেন। মনে হচ্ছে তার উপর দিয়ে ঝড় যা যাবার চলে গেছে। বাচ্চাটা আজকের মতো রেহাই পেয়েছে। শামসুদ্দিন মনে মনে ঠিক করে ফেললেন আজ বিকেলে পৃথুকে নিয়ে বের হবেন। তার পছন্দের কোনো খেলনা কিনে দেবেন। একটা কোন-আইসক্রিম কিনে দেবেন। বাবার হাত ধরে আইসক্রিম খেতে খেতে বাচ্চা একটা ছেলে গুট গুট করে এগুচ্ছে। কী সুন্দর দৃশ্য। পৃথুর মতো একটা ছেলে যদি তার থাকত!

পৃথু দরজার আড়ালে দাড়িয়ে আছে। তার খুবই লজ্জা লাগছে, কারণ তার পরনে প্যান্ট নেই। তার গায়ে হালকা গোলাপি রঙের একটা হাফশার্ট। শার্টের ঝুল এমন যে তার লজ্জা ঢাকা পড়ে। ঘরের ভেতর শুধু শার্ট পরে থাকতে হচ্ছে এই লজ্জাতেই সে মরে যাচ্ছে। লজ্জার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ভয়, কারণ মা একটু আগে বলেছে পঞ্চকে এইভাবেই কাল স্কুলে যেতে হবে। মা এত নিষ্ঠুর আচরণ করবে বলে পৃথুর মনে হয় না। তবে করতেও পারে। রেগে গেলে মা নিষ্ঠুর আচরণ করে। সত্যি সত্যি তাকে যদি কাল এইভাবে স্কুলে যেতে হয় তাহলে কী হবে! সবাই তাকিয়ে থাকবে তার দিকে। হাসাহাসি করবে। ক্লাসের টিচার বলবেএই পৃথু, ছিঃ ছিঃ তুমি নেংটো হয়ে স্কুলে এসেছ কেন?

Leave a comment

Your email address will not be published.