আমি এবং আমরা পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

আমি এবং আমরা পর্ব:০৪

মোমেনা খাতুন মিসির আলির কথায় হৃষ্টচিত্তে বললেন, হ্যাঁ, ঠিক কথা।আমি তো তার মা।সন্তান পেটে ধরেছি।সেই আমাকে আমার স্বামী বাড়ি থেকে বের করে দিল। সন্ধ্যারাত্রিতে আমাকে এসে বলল-মোমেনা, বাইরে রিকশা আছে। যাও, রিকশায় ওঠে। তার রাগ বেশি। ভয়ে কিছু জিজ্ঞাস করলাম না।সেই যে রিকশায় উঠলাম-উঠলামই।ঐ বাড়িতে আর ঢুকতে পারলাম না। এখন আমি পড়ে আছি আমার ভাইয়ের বাড়িতে।আমি তো থাকতে পারতাম। আমার ছেলের সঙ্গে। পারতাম না? জি পারতেন।তার উচিত ছিল না। আমাকে তার বাড়িতে রাখা? আমি তার মা।আমি কেন অন্যের ঘাড়িতে থাকব? জি তা তো বটেই। তন্ময়ের বাবার মৃত্যুর পর আপনি ঐ বাড়িতে গিয়ে উঠলেন না কোন?

কেমন করে উঠব! তখন আমার ভাইয়া জোর করে আমার বিয়ে দিয়েছে। লোকটা রেলে চাকরি করত। ছোট চাকরি। তবে মানুষ খারাপ ছিল না।সে মারা গেছে কঁকড়া বিছার কামড়ে। কঁকড়া বিছার কামড়ে মানুষ মারা যায় এমন কথা আগে কখনো শুনেছেন? শুনেন নাই। এটা হল আমার কপাল-। লোকটা রেলের গুদামঘরে ঢুকেছে। টিন না। কী যেন সরাচ্ছে—এমন সময় হাতে কামড় দিল। চিৎকার দিয়ে উঠল, সাপ সাপ। সে ভেবেছিল সাপ। লোকজন দৌড়ে এসে দেখে কঁকড়া বিছা। কেউ কোনো গুরুত্ব দিল না। কামড়ের জায়গায় চুন মাখিয়ে দিল। রাতে লোকটার জ্বর আসল। খুব জ্বর। আমাকে ডেকে তুলে বলল, মোমেনা, বড় পানির পিয়াস লেগেছে! পানি দাও। আমি বাতি জ্বালিয়ে দেখি-হাত ফুলে ঢোল হয়েছে। গা আগুনের মতো গরম। আমি বললাম, ডাক্তার ডাকি। সে বলল, ভোর হোক! এত রাতে ডাক্তার কোথায় পাবে? সেই তোর আর তার দেখা হল না।মিসির আলি ধৈৰ্য নিয়ে অপেক্ষা করছেন। ভদ্রমহিলা কথা বলেই যাচ্ছেন। মৃত্যুর বর্ণনা। মৃত্যুর পরের অবস্থার বর্ণনা। কোনো কিছুই বাদ দিলেন না। একবার কিছুক্ষণের জন্যে থামতেই মিসির আলি বললেন, আপনার ঐ পক্ষের কোনো ছেলেমেয়ে নেই?

থাকবে না কেন, আছে। দুই মেয়ে। একজনকে মেট্রিক পাসের সঙ্গে সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দিলাম। ও এখন আছে কুমিল্লায়। আমার অসুখের খবর পেয়ে দেখতে এসেছিল। একা এসেছিল, জামাই আসতে পারে নি। ছুটি পায় নি। ছোট মেয়ের বিয়ে হয়েছে। গত কৎসর। নানান কাণ্ড করে মেয়ে নিজেই বিয়ে করল। ভদ্র সমাজে তা বলা যায় না। বড়ই লজ্জার ব্যাপার। অথচ এই মেয়েটাই ভালো ছিল। খুব নরম স্বভাবের মেয়ে। রাতে একা ঘুমাতে পারত না। …

ভদ্রমহিলা ছোট মেয়ের ঘটনাও পুরোটা বৰ্ণনা করলেন। দাঁড়ি কমা কিছুই বাদ দিলেন না। মিসির আলি বললেন, আপনার ছেলে তন্ময় সম্পর্কে বলুন। আপনার কাছে ওর কথাই শুনতে এসেছি।ওর কথা আমি কী বলবি? ওকে কি আমি দেখেছি? শুধু পেটেই ধরেছি। ও যখন কথা বলা শিখল তখন তার বাবা আমাকে দূর করে দিল। সন্ধ্যাবেলা আমার ঘরে এসে বলল, মোমেনা, রিকশায় ওঠ— রিকশায় ওঠার ব্যাপারটা আপনি আগে একবার বলেছেন।একবার বললে আবারো বলা যায়। দুঃখের কথা বারবার বললে দুঃখ কমে। সুখের কথা বারবার বললে সুখ বাড়ে। এই জন্যে দুঃখের কথা, সুখের কথা দুটাই বারবার বলতে হয়।আপনার স্বামী আপনাকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছিলেন কেন? সেটা আমি আপনাকে বলব না। সেটা লজ্জার ইতিহাস। আপনি অনুমানে বুঝে নেন। লোকটা পাগল ধরনের ছিল। ছেলেও হয়েছে বাপের মতো। বাপ যদি হয় ছয় আনা, ছেলে হয়েছে দশ আনা।এই কথা কেন বলছেন?

কেন বলব না? একশ বার বলব। আমার ছেলের মুখের উপর বলব। অবস্থা বিবেচনা করেন। অবস্থা বিবেচনা করলে আপনেও বলবেন–তন্ময়ের তখন বাবা মারা গেছে। সে বলতে গেলে দুধের শিশু। আমার বিবাহ হয়েছে। আমি চলে গেছি। জামালপুর। এই অবস্থায় তন্ময়কে মানুষ করেছে তাদের ম্যানেজার। নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছে। তার সঙ্গে আমার ছেলে কী ব্যবহারটাই করল! সন্ধ্যাবেলা বাড়ি থেকে বের করে দিল। আমাকে যেমন সন্ধ্যাবেল বাড়ি থেকে বের করে দিল—তাদেরকেও বের করে দিল। ম্যানেজার, আর তার মেয়ে। মেয়েটা বি.এ. পড়ে। কী সুন্দর পরীর মতো মেয়ে।ঐ মেয়েকে আপনি দেখেছেন?

জিনা দেখি নি। লোকমুখে শোনা। আমার সবই লোকমুখে শোনা! উনারা কি আপনার ছেলের বাড়িতে থাকতেন? হ্যাঁ।কেন বের করে দিলেন কিছু জানেন? কিছুই জানি না। ছেলে শুধু বলেছে—সে এখন থেকে একা থাকতে চায়। মানুষ তার ভালো লাগে না। কয়েকটা কুকুর নাকি পুষেছে। কুকুর নিয়ে থাকে।ম্যানেজার সাহেব এখন কোথায় থাকেন? জানি না কোথায় থাকেন। তবে চাকরি করেন না। চাকরি ছেড়ে দিয়েছেন।আপনার ছেলে এখন ঐ বাড়িতে একাই থাকে? কিছুক্ষণ আগে কী বললাম-কতগুলো কুকুর পালে। আগে দারোয়ান ছিল। কাজের লোক ছিল। একে একে সবাই চলে গেছে। এখন শুনি-একলাই থাকে।চাকরি ছেড়ে চলে গেছে কেন? জানি না কেন। সম্ভবত কুকুরের ভয়ে। দৈত্যের মতো একেকটা কুকুর। এখন আপনি বলেন-জীবন বড়, না চাকরি বড়? আপনার স্বামী কীভাবে মারা গিয়েছিলেন?

একটু আগে তো বলেছি-কাঁকড়া বিছার কামড়ে মারা গেছে। রেলের গুদামে ঢুকেছে… আপনার প্রথম স্বামীর মৃত্যুর কথা জিজ্ঞেস করছি।অপঘাতে মৃত্যু। দোতলার সিঁড়ি থেকে পিছলে পড়ে মরে গেল। সিঁড়ি থেকে পড়ে কেউ মরে? আপনি বলেন। হাত-পা ভাঙে-কিন্তু মরবো কেন? মিসির আলির মনে হল ইনাকে কিছু জিজ্ঞেস করা অর্থহীন। অসুখবিসুখ, দুঃখকষ্ট এই মহিলাকে পর্যুদস্ত করেছে। তিনি তার ব্যক্তিগত হতাশার কথাই বলবেন। তার চিন্তা-চেতনা নিজেকে নিয়েই। ইনি কথা বলতে পছন্দ করেন। যারা কথা বলতে পছন্দ করে তারা অধিকাংশ সময়ই অর্থহীন কথা বলে। কথা বলে আরাম পায় বলেই কথা বলা। সেসব কথার অধিকাংশই হয় বানানো। মিসির আলি যা জানতে চান তা ইনি হয়তো বলতে পারবেন না। তবু চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া– আপনার ছেলের অসুখের কথা কি মনে আছে? ছোটবেলায় অসুখ হয়ে গেল?

কেন মনে থাকবে না। মনে আছে। কালাজুর হয়েছিল। এখন আপনি বলুন–আপনি কি শুনেছেন কারো কালাজ্বর হয়? শুনেন নি। কারণ কারোর হয় না। এটা হল আমার কপাল-যে জিনিস কারোর হবে না-আমার কপালে সেটা থাকবে। কালাজ্বরে ব্ৰহ্মচারী ইনজেকশন দিতে হয়। সেই ইনজেকশন পাওয়া যায় না। উল্টাপাল্টা চিকিৎসা। সেই চিকিৎসায় কী হল দেখেন। জিহ্বা কালো হয়ে গেল। দেখলে ভয় লাগে। তন্ময় যে কারো সঙ্গে মেশে না, কারো সঙ্গে কথা বলে না–এই জন্যেই বলে না। একা একা থাকে। আপনাকে বলে রাখলাম, সে বিয়েও করতে পারবে না। কে বিয়ে করবে। এই ছেলেকে? একবার হী করলে মেয়ে দৌড়ে পালাবে। আমি হলাম মা। আমিই ভয় পেতাম। মুখের দিকে তাকাতাম না। এই বার তার ম্যানেজারকে আমি বলেছি-তোমার সাহেবকে বল কত নতুন নতুন চিকিৎসা বের হয়েছে, এই রোগের চিকিৎসকও আছে।

তোমার সাহেবের তো টাকা পয়সা আছে। বিলাত ও আমেরিক গিয়ে চিকিৎসা যেন করে।উনার কি অনেক টাকা পয়সা? একসময় ছিল। এখন নাই। তার বাবার টাকা পয়সা ছিল। নানান ব্যবসাপাতি ছিল। টঙ্গীতে চামড়ার কারখানা ছিল। নারায়ণগঞ্জে ছিল। সুতার মিল। শেষে মতিভ্রমও হল। সব বিক্রি করে দিল। তন্ময়ের কিছুই নাই। কারখানা সব বিক্রি করে দিয়েছে। ওয়ারীতে একটা দোতলা বাড়ি আছে। বাড়িটার ভাড়া পায়। এখন শুনছি, সেই বাড়িও বিক্রি করে দেবে।কোথায় শুনলেন? সে বলেছে? না, সে বলে নাই। এইসব কথা সে বলে না। লোকমুখে শুনি।তন্ময় কি আপনাকে হাতখরচের টাকা দেয়?

তা দেয়। মাসের প্রথমে, এক-দুই তারিখে ওর নতুন ম্যানেজার টাকা নিয়ে আসে। ম্যানেজারের নাম রশিদ মোল্লা। আমার হাতে দিয়ে বলে-আম্মা, এই কাগজটায় সই করে টাকা গুনে রাখেন। আমি বলি, বাবা, সই করার দরকার কী? সে বলে দরকার আছে, আম্মা, সই করেন। ম্যানেজার। আমাকে খুব সম্মান করে। আম্মা ডাকে।রশিদ মোল্লার কাছ থেকেই কি শুনেছেন যে ওয়ারীর বাড়ি বিক্রি হচ্ছে? জি।উনি কোথায় থাকেন? আপনার ছেলের সঙ্গে? না না। কী বললাম আপনাকে?

তন্ময় তার বাড়িতে কাউকে রাখে না। সে থাকে, দুইটা দারোয়ান থাকে। আর বাড়িভর্তি কুকুর। আমি তাকে বললাম, বাবা, এত কুকুর কেন? কুকুর প্রাণীটা ভালো না। তুমি বিড়াল পোষ। বিড়াল পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। দেখতেও সুন্দর। আমাদের নবীজীও বিড়াল পছন্দ করতেন। তা সে আমার কথা শুনে না। কেন শুনবে? আমি কে? কুকুরগুলো সারা রাত বাড়ির চারদিকে ছোটাছুটি করে। মাঝে মাঝে একসঙ্গে ডাকে। বড়ই ভয়ংকর।ভয়ংকর কী করে বলছেন? আপনি তো ঐ বাড়িতে যানও নি। কুকুরের ডাকও শুনেন নি।রশিদের কাছে শুনলাম। প্রতি মাসে আসে। গল্পটন করে। যাবার সময় পায়ে হাত দিয়ে সালাম করে। ম্যানেজার বলল, আম্মা, বড় ভয়ংকর অবস্থা। নয়টা কুকুর। সারা রাত বাড়ির চারদিকে ঘুরে। ভয়ংকর স্বরে একসঙ্গে ডাকে। গায়ের রক্ত পানি হয়ে যায়।রশিদ সাহেব কোথায় থাকেন, আপনি ঠিকানা জানেন?

কাগজে লেখা আছে। টেলিফোন নাম্বার দেওয়া আছে। সে আমাকে বলল, দরকারে-অদরকারে ডাকবেন! আমি চলে আসব। যত রাতই হোক, খবর পেলে চলে আসব। পরের ছেলে এই কথা বলে কিন্তু নিজের ছেলে কিছু বলে না। খোজও নেয় না। এই ছেলে দিনের বেলা ঘর থেকে বের হয় না। সে ঘর থেকে বের হয় সন্ধ্যার পর।মিসির আলি ম্যানেজারের ঠিকানা নিলেন। উঠবার সময় বললেন, আমি যে আপনাকে এত কথা জিজ্ঞেস করছি-কোনা করছি জানতে চান না?

না। জেনে কী হবে? তার উপর তন্ময় খবর দিয়েছে-আপনার কাছে একজন ভদ্রলোক আসবেন। তাঁর নাম মিসির আলি। উনি আপনাকে অনেক প্রশ্ন করবেন। সব প্রশ্নের জবাব দেবেন। কোনো কিছুই গোপন করবেন না। যা আপনি জানেন। তাই শুধু বলবেন। যা জানেন না তা বলবেন না। নিজে অনুমান করে যদি কিছু বলেন তা হলে সেটাও উনাকে জানাবেন! বলবেন—এটা আমার অনুমান।আপনাকে ধন্যবাদ। আজ তা হলে উঠি? আপনি কি আবার আসবেন?

জি না। আর আসব না।আপনাকে চা পানি কিছুই দিতে পারলাম না। ঘরে অবিশ্যি লোক আছে। থাকলে কী হবে–এদের কিছু বললে বিরক্ত হয়। সেদিন জইতরীর মাকে বললাম–পিয়াস লাগছে, লেবু দিয়ে একগ্লাস শরবত দাও। জাইতরীর মা বলল, পারব না। চুলা বন্ধ। দেখেন অবস্থা। শরবত বানাতে চুলা লাগে? আরেকদিন কী হয়েছে শুনেন– আজ যাই। আমার একটা কাজ ছিল।একটু বসেন না। কথা বলার লোক পাই না। কাউকে যে সুখ-দুঃখের একটা কথা বলব সে উপায় নাই। নিজের ভাইয়ের বাসা, এরা এমন ভাব করে যেন আমাকে দয়া করে আশ্রয় দিয়েছে। অথচ নগদ পয়সা দিয়ে থাকি। মাসের প্রথমে গুনে গুনে দুই হাজার টাকা দেই! আমার পিছনে কি দুই হাজার টাকা খরচ হয়–আপনিই বলেনঃ কী খাই আমিঃ দুই বেলায় এক পোয়া চালের ভাতও খাই না।

মাসে সাত সের চালের ভাতও খাই না। সাত সের চালের দাম কতঃ ধরেন নব্বুই। মাছ তরকারি ধরেন তিন শ-বেশিই ধরলাম। এত খাই না। রাতে এক কাপ দুধ খাই। দুধের দাম কত ধরবেন? এক শ ধরেন। এখন পনের টাকা লিটার। তা হলে কত হল? চার শা। আচ্ছা পাচশই ধরলাম। ঘরটার ভাড়া ধরলাম পাঁচ শ। হল এক হাজার। তারপরেও বাড়তি দেই এক হাজার। দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বসুন। মিসির আলি বসলেন। ভদ্রমহিলা গলা নিচু করে বললেন, তন্ময় আমাকে মাসে পীচ হাজার দেয়। ওরা সেটা জানে না। জানলে উপায় আছে? ওরা জানে মাসে দুই হাজার পাই–সবটাই ওদের দিয়ে দেই। তবে আমার ভাইয়ের বউ সন্দেহ করে। আমি যখন হাসপাতালে ছিলাম তখন আমার ট্রাংকের তালা খুলে দেখেছে। অতি খারাপ মেয়েছেলে। মুখে মধু। হাসি ছাড়া কথা বলে না।আজি উঠি?

আহা বসেন না। একটু বসেন।মিসির আলি আরো এক ঘণ্টা বসলেন। বের হয়ে এলেন প্ৰচণ্ড মাথার যন্ত্রণা নিয়ে।ঘর থেকে বেরুবার পর মনে পড়ল একটি জরুরি কথা জিজ্ঞেস করা হয় নি। উনি কি ম্যাক্টর সাহেবকে দিয়ে কোনো চিঠি পাঠিয়েছিলেন? জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে করছে না। কারণ জিজ্ঞেস করে কোনো লাভ নেই।ভদ্রমহিলা বলবেন না।তিনি কিছু গোপন জিনিস জানেন। এগুলো আড়াল করবার জন্যেই এত অপ্রাসঙ্গিক কথা বলছেন। এত দীর্ঘ সময় কথা বলে একটি মাত্র জিনিস জানা গেল।–নিজের ছেলে প্রসঙ্গে ভদ্রমহিলার কোনো আগ্রহ নেই।তার চেয়ে বরং রশিদ মোল্লার কাছে যাওয়া যাক।রশিদ মোল্লার বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি।মোটাসোটা মানুষ। শরীরের তুলনায় মাথা ছোট। ধূর্ত চোখ। চোখ দেখেই মনে হয়-পৃথিবীর কাউকে তিনি বিশ্বাস করেন না। সম্ভবত নিজেকেও করেন না। কলিংবেল টেপার পর ভদ্রলোক নিজেই দরজা খুলে দিলেন। তবে হাত দিয়ে দরজা ধরে থাকলেন। মনে হচ্ছে তিনি চান না ঘরে কেউ ঢুকুক।মিসির আলি বললেন, আপনি কি রশিদ মোল্লা?

 

জি।একটু কথা ছিল আপনার সঙ্গে।বলুন।দরজায় দাঁড়িয়ে তো কথা বলা যাবে না। বসতে হবে। মিনিট দশেক সময় আমি নেব।এখন আমি নাতনিকে পড়াচ্ছি। ওর এস.এস.সি পরীক্ষা।আমি না হয় অপেক্ষা করি। নাতনির পড়া শেষ করে আসুন।রশিদ মোল্লা বিরস মুখে দরজা ছেড়ে সরে দাঁড়ালেন। বসার ঘর ছোট হলেও সুন্দর করে সাজানো। সবচেয়ে যা আশ্চর্যের ব্যাপার তা হচ্ছে-ফুলদানি ভর্তি টাটকা গোলাপ। মনে হচ্ছে এইমাত্র গাছ থেকে ছিড়ে আনা হয়েছে।রশিদ মোল্লা বিরক্ত গলায় বললেন, কী বলবেন বলুন। আপনার নাম কী? কোত্থেকে এসেছেন?

আমার নাম মিসির আলি।রশিদ মোল্লা চমকাল না। এই নাম আগে শুনেছে তেমন কোনো লক্ষণও দেখাল। না। অথচ তাঁর নাম এই লোক শুনেছে। তাঁর খবর দিয়ে এসেছে মুশফেকুর রহমানের মার কাছে।রশিদ মোল্লা কঠিন গলায় বলল, আমার কাছে কী ব্যাপার? কয়েকটা ব্যাপার জানতে চাচ্ছিলাম। ইচ্ছা হলে জবাব দেবেন। ইচ্ছা না হলে জবাব দেবেন না।আপনি কে, কেন প্রশ্ন করছেন তা তো বলবেন! আপনি কি পুলিশের লোক? জি না।প্রশ্নটা কী? মুশফেকুর রহমানের ম্যানেজার হিসেবে আপনি কতদিন ধরে কাজ করছেন? তা দিয়ে আপনার দরকার কী? আমার জানা দরকার।আপনার দরকার কেন? আমি একটা বিষয় নিয়ে অনুসন্ধান করছি।কী বিষয়?

মুশফেকুর রহমান প্রতি মাসে আপনাকে পাঁচ হাজার টাকা দেন তাঁর মাকে দেওয়ার জন্যে। তাঁর মা দু হাজার টাকা রাখেন। আমার ধারণা-বাকি তিন হাজার টাকা তিনি জমা রাখেন। আপনার কাছে। বছরে হয় ছয়ত্ৰিশ হাজার টাকা। দশ বছরে হবে তিন লক্ষ ষাট হাজার টাকা। আপনি কতদিন ধরে টাকা দিচ্ছেন? আপনাকে কে পাঠিয়েছে? কেউ পাঠায় নি। নিজেই এসেছি। আমি যে আপনার কাছে একেবারেই অপরিচিত, তাও কিন্তু না। আপনার স্যার নিশ্চয়ই আমার কথা আপনাকে বলেছেন। কতদিন ধরে আপনি টাকা দিচ্ছেন? আমার মনে নাই! আপনি তো রসিদ রাখেন। পুরোনো রসিদ কি আপনার কাছে আছে, নাকি অফিসে জমা দিয়েছেন? রশিদ মোল্লা ক্লান্ত গলায় বললেন, স্যার, আপনি বসুন।মিসির আলি বসলেন। রশিদ মোল্লা বললেন, চায়ের কথা বলে আসি। আপনি চা খান তো?

খাই।ভদ্রলোক চায়ের কথা বলে মিসির আলির সামনে বসলেন!। তার চোখে ভীত ভাব। মনে হচ্ছে অসম্ভব ভয় পেয়েছেন। এতটা ভয় পাবার কারণও মিসির আলির কাছে স্পষ্ট নয়।রশিদ সাহেব! জি।ঐ মহিলার কত টাকা আপনার কাছে আছে তা নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। আমি অন্য কিছু আপনার কাছ থেকে জানতে চাই! যা জানতে চাই দয়া করে বলবেন। মিথ্যা বলার চেষ্টা করবেন না। কারণ…থাক, কারণটা এখন আপনাকে না বললেও চলবে।কী জানতে চান, স্যার? মুশফেকুর রহমান সাহেব সম্পর্কে বলুন!কী বলবি? যা জানেন বলুন। উনি লোক কেমন? খুবই ভালো লোক। এটা আমার একার কথা না-যাকে ইচ্ছ। আপনি জিজ্ঞেস করুন। যাকে জিজ্ঞেস করবেন। সেই বলবে। উনার জিহ্বার একটা সমস্যা আছে। তাঁকে নিয়ে এই জন্যে লোকজন নানা আজেবাজে কথা ছড়ায়।কী ধরনের আজেবাজে কথা? যেমন ধরেন। উনার মাথা খারাপ—এইসব আর কি? আপনার ধারণা উনার মাথা ঠিক আছে?

অবশ্যই ঠিক আছে।আমি তো শুনেছি-উনি বিরাট এক বাড়িতে একা থাকেন।একা থাকলেই তো মানুষ পাগল হয়ে যায় না, স্যার। বিয়ের আগে আমিও একা থাকতাম।উনি শুধু যে একা থাকেন তাই না। নটা ভয়ংকর কুকুর পোষেন। এটা কি ঠিক? জি ঠিক। উনার বাবা পুষতেন, এইজন্যে উনিও পুষেন। কুকুর পোষা তো স্যার অপরাধ না।জি না।উনি কি নিজেই বেঁধে খান? জানি না, স্যার। কখনো জিজ্ঞেস করি নি।আপনি কি ঐ বাড়িতে কোনো মহিলা দেখেছেন? আমি ঐ বাড়িতে কখনো যাই নি।

মিসির আলি খানিকক্ষণ চুপচাপ থেকে আন্দাজে ঢ়িল ছুড়লেন, স্বাভাবিক গলায় বললেন–রূপবতী একটি মেয়ে যে মুশফেকুর রহমান সাহেবের কাছে মাঝে মধ্যে আসে তার নাম কী? রশিদ মোল্লা দৃঢ় গলায় বলল, উনার কাছে কোনো মহিলা কখনো আসে না, স্যার।আপনি কি নিশ্চিত? জি স্যার।মিসির আলি বললেন, আগের ম্যানেজার সাহেবের মেয়ের নাম কী? স্যার আমি জানি না।মেয়েটি দেখতে কেমন? উনাকে আমি কোনোদিন দেখি নাই। কী করে বলব দেখতে কেমন? কোনোদিন দেখেন নি, তা হলে মুশফেকুর রহমানের মাকে কী করে বললেন খুব সুন্দর মেয়ে? রশিদ মোল্লা হতভম্ব গলায় বলল, স্যার, আপনি কি আই.বি.-র লোক?

মিসির আলি হাসলেন। হ্যা-না কিছু বললেন না। লক্ষ করলেন রশিদ মোল্লা তীব্র ভয়ে অস্থির হয়ে গেছে! চা এসেছে। সে চায়ে চুমুক দিতে গিয়ে মুখ পুড়িয়ে ফেলেছে। কিছুটা চা ছিলকে তার শার্টে পড়েছে।আগের ম্যানেজার সাহেব কোথায় থাকেন আপনি জানেন? জি না, স্যার, জানি না। বিশ্বাস করুন জানি না। আমার কথা বিশ্বাস না করলে আমি কোরান শরিফে হাত দিয়ে বলতে পারি।আপনার কথা বিশ্বাস করছি। আপনি এত ভয় পাচ্ছেন কেন?

ভয় পাচ্ছি না তো। কেন শুধু শুধু ভয় পাব! আমি কোনো পাপ করলে ভয় পেতাম। আমি কোনো পাপ করি নি।কোনো পাপ করেন নি? ছোটখাটো পাপ করেছি। সে তো স্যার সবাই করে। মানুষ মাত্ৰই পাপ করে।মিসির আলি সিগারেট ধরাতে ধরাতে বললেন, মেয়েটার সঙ্গে শেষ কবে আপনার কথা হয়? রশিদ মোল্লা ভয়ংকর চমকে উঠে বলল, আমার সঙ্গে কোনো কথা হয় নি।মিসির আলি কিছু বললেন না। নিঃশব্দে সিগারেট টানতে লাগলেন। রশিদ মোল্লা রীতিমতো ঘামতে শুরু করল।রশিদ সাহেব! জি স্যার।আপনার ভয়ের কোনো কারণ নেই। আপনি সত্য গোপন করে ভয়ের কারণ ঘটাতে পারেন। কী কথা হল তার সঙ্গে?

Leave a comment

Your email address will not be published.