রমিলা বিষন্ন গলায় বলল, তাের চাচা থাকে বৈদেশে। তার জন্যে মনটা সব সময় খারাপ থাকে। তার যেন বিপদ আপদ না হয় এই জন্যে ছদগা দিলাম। গত রাইত একটা খারাপ খােয়াবও দেখছি। মনটা পেরেশান। খােয়াবে দেখলাম তাের চাচা সাদা চাদ্দর গায়ে দিয়া বিছানায় শুইয়া আছে। একটু পরে পরে বলতেছে— বৌ, আমারে পানি দেও। বড় তিয়াস লাগছে। আমি পাগলের মতাে পানি খুঁজতেছি। পানি পাইতেছি না। সবই আছে, পানি নাই। তখন ঘুম ভাঙ্গছে, সারা রাইত আর ঘুম হয় নাই।
আসমানী কলপাড়ে বসল। রমিলা চাচির সঙ্গে গল্প–গুজব করতে তার খুব ভালাে লাগে।রমিলা বলল, চুলে তেল দেস না ? চুলে জট পইড়া গেছে। সাবান দিয়া ভালােমতাে গােসল দিবি। চুলে তেল দিবি। রাজরানীর মতাে চেহারা, ময়লা মাইখ্যা ঘুইরা বেড়াস। ঘরে সাবান আছে ?
সাবান নিয়া যাইস। বিকালে আইস্যা সাবান আর মুরগি নিয়া যাবি। আইচ্ছা।আসমানী বসে আছে। রমিলা কাপড় ধুচ্ছে। রমিলার চোখে পানি। স্বামীর প্রসঙ্গে কথা বললেই রমিলার চোখে পানি আসে।রমিলা বলল, চুপচাপ বইস্যা থাকবি না। এখন সামনে থাইক্যা যা। নয়া আবুর কিছু লাগলে আমারে খবর দিস।আসমানী চলে গেল না। বসে রইল। রমিলা চাচি কাঁদছে। তাকে ফেলে রেখে চলে যেতে আসমানীর খুব মায়া লাগছে।
জামদানী হাঁটুগেড়ে পয়সার কাছে বসে আছে। তার দুধ খাওয়া শেষ হয়েছে। এখন সে হাত–পা ছুঁড়ছে। মাঝখানে সে একবার কান্না থামিয়েছে। জামদানী তার বাবার কাছ থেকে ভিক্ষার গান শিখেছে। টেনে টেনে সুর করে ভালােই গায়। এই ধরনের গানের বিষয়ে জমির আলীর বক্তব্য হলাে— ফকিরি গানে এক সঙ্গে তিন কাম হয়— গান গাইয়া আনন্দ, যে শুনে তার আনন্দ, আর গানের মধ্যে আল্লাহ খােদা নবিজির নাম থাকে বিধায় সােয়াবও হয়।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
জামদানী বােনকে ফকিরি গান শুনিয়ে কান্না একবার থামিয়েছে। সে মনে হয় আবার কান্না শুরু করবে। মুখ বাকাচ্ছে। জামদানী গান ধরল—
দিনের নবি মুস্তফায় । রাস্তা দিয়া হাইট্যা যায়
একটা পাখি বইস্যা ছিল গাছেরও ছেমায় গাে গাছেরও ছেমায়...
আষাঢ় মাসের কড়া রােদ উঠেছে। কোথাও ছায়া নেই। রােদে শরীর পুড়ে যাচ্ছে। রােদ মাথায় নিয়ে জমির আলী খেয়াঘাটে বসে আছে। কাছেই বড় ছাতিম গাছ আছে। ছাতিম গাছের নিচে বসলে ছায়া পাওয়া যায়। সেটা করা যাচ্ছে না। যে ভিক্ষুক আরাম করে গাছের ছায়ায় বসে আছে তাকে কেউ ভিক্ষা দেবে না। যে ভিক্ষুক রােদে–পুড়ে কষ্ট করছে তার প্রতি মানুষের দয়া হবে।
রােদে ভাজা ভাজা হয়ে তেমন লাভ হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত জমির আলী মানুষের দয়ার কোনাে লক্ষণ দেখছে না। মাঝে মাঝে খারাপ দিন আসে— সারাদিন বসে থেকেও কিছু পাওয়া যায় না। আজ মনে হচ্ছে সে–রকম খারাপ একটা দিন। জমির আলী চিন্তিত বােধ করছে। আধা কেজি চালের পয়সাটা তাে উঠা দরকার। বউ চলে যাওয়ায় একটা সুবিধা হয়েছে চালের খরচ কমেছে। এখন আধা কেজি চালে তিনজনের ভালােমতাে হয়ে যায়।
সব খারাপ জিনিসের মধ্যে আল্লাহপাক ভালাে একটা জিনিস ঢুকিয়ে দেন, আবার ভালাের মধ্যে খারাপও ঢুকিয়ে দেন। শুধু মন্দ কিংবা ভালাে বলে কিছু তার কাছে নেই।রােদের কষ্ট ভােলার জন্যে জমির আলী চিন্তা–ভাবনার লাইনে যাবার চেষ্টা করল। কোনাে চিন্তা–ভাবনাই পরিষ্কার আসছে না। গরমে সব আউলায়ে যাচ্ছে। জমির আলী আকাশের দিকে তাকাল। আকাশ ঝকঝকে নীল। মেঘের চিহ্ন মাত্র নেই। ছােটখাট একটা মেঘের টুকরা থাকলেও আশায় আশায় রােদে বসে থাকা যেত— এই মেঘের টুকরা এক সময় বড় হবে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
রোদের পাছায় লাথি মেরে রােদ দূর করবে। সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় নামবে ঝুম বৃষ্টি। গরম কাটান দিতে গরম লাগে। আগুন গরম এক কাপ চা খেলে গরম কাটবে। জমির আলী মজিদের চায়ের স্টলের দিকে রওনা হলাে। এক সময় মজিদ তার বন্ধু মানুষ ছিল। এক সঙ্গে মাটি কেটেছে। এখন চায়ের স্টল দিয়ে ভদ্রলােক হয়ে গেছে। কাপড়–চোপড় পরে ভদ্রলােকের মতাে, কথাবার্তাও বলে ভদ্রলােকের মতাে।
দোকানে সে একটা সাইনবাের্ডও টানিয়েছে বাকি চাহিয়া লজ্জা দিবেন না। তারপরেও জমির আলী তার চায়ের স্টলে চা খেতে গেলে সে পয়সা নেয় না। তবে মুখটা গম্ভীর করে রাখে।মজিদ চায়ের কাপ জমির আলীর দিকে এগিয়ে দিতে দিতে বলল, তােমার স্ত্রীর কোনাে সন্ধান পেয়েছ ? চেহারা ছবি ভালাে মেয়ে হারায়ে গেলে খারাপ পাড়ায় দাখিল হয়। ঘণ্টায় দশ টেকা হিসাবে ভাড়া খাটে।
জমির আলীর মনটা খারাপ হয়ে গেল। মজিদ তার বন্ধু মানুষ। বন্ধু মানুষ হয়ে বন্ধুর স্ত্রীকে নিয়ে এ ধরনের কথা কী করে বলে ? তার কাছে চা খেতে আসাই উচিত না। হাতের চায়ের কাপের গরম চা মজিদের উপর ঢেলে। দিলে ভালাে হতাে। সেটা উচিত হবে না। একজন মন্দ হলেই যে আরেকজনের মন্দ হতে হবে তা না। জমির আলী চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, তােমার ভাবির খবর পেয়েছি। (সবই মিথ্যা কথা। মান রাখার জন্যে মিথ্যা বলা।) সে সুসং দুর্গাপুরে তার বােনের বাড়িতে আছে।
তারা বিরাট বড়লােক। বাজারে টিনের ঘর আছে তিনটা। তারা তােমার ভাবিকে খুবই পেয়ার করে বলে আসতে দেয় না। মজিদ বিরস গলায় বলল, আসতে না দিলে তােমারই গিয়া নিয়া আসা উচিত। বড়লােকের কায়–কারবার ভিন্ন। দেখা গেল তােমার স্ত্রীর সাথে লটর পটর শুরু কইরা দিছে। কিছুই বলা যায় না, তারে বিবাহও কইরা ফেলতে পারে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
জমির আলী চা শেষ না করেই উঠে পড়ল। বসল আগের জায়গায়। সকালের দিকে কিছু পাওয়া যায় নি। এখন যদি পাওয়া যায়! জমির আলী ঠিক করেছে একটা টাকাও যদি পাওয়া যায় সে টাকাটা দিয়ে আসবে মজিদকে। চায়ের দাম। মজিদকে বলবে— ফকির জমির আলী দয়ার চা খায় না। সূর্য হেলে পড়তে শুরু করেছে। দুপুরের গাড়ি চলে আসার সময় হয়ে এসেছে। এখন জমির আলী যাবে রেলস্টেশনে। যদি পাওয়া যায় তাহলে কুলির কাজ করবে।
যাত্রীদের ব্যাগ–সুটকেস নামাবে। আজকাল যাত্রীরাও চালাক হয়ে গেছে। খালি হাতে ঘুরাফিরা করে। ব্রিফকেস হাতে নিয়ে নেমে যায়। দুনিয়াটা চলে যাচ্ছে চালাকের হাতে। বিরাট আফসােস! | শুধু যে কুলির কাজের জন্যে জমির আলী স্টেশনে যায় তাও না। তার মনে। আশা কোনাে একদিন সে দেখবে আসমানীর মা ট্রেন থেকে নামছে। তখন জমির আলী কাছে এগিয়ে যাবে, কিছুই হয় নি এমন ভাব ধরে বলবে— কেমন আছ বউ ?
এদিকে খবর সবই মঙ্গল। কোনাে চিন্তা করবা না। বউকে নিয়ে বাড়িতে রওনা হবার আগে আগে রেলস্টেশনের টি–স্টলে টোস্ট বিস্কিট দিয়ে এক কাপ চা খাওয়াবে। এরা চা–টা ভালাে বানায়। আসমানীর মা’র সঙ্গে সে অতি ভদ্রলােকের মতাে ব্যবহার করবে। কেন সে কাউকে না বলে বাড়ি থেকে চলে গেল, কোথায় গিয়েছিল— এইসব কিছুই জিজ্ঞেস করবে না। কী দরকার ? ফিরে এসেছে এই যথেষ্ট। আল্লাহপাকের দরবারে হাজার শুকুর।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
দুপুরের ট্রেনে কোনাে যাত্রী নামল না। এটা খুবই আশ্চর্য ব্যাপার। একটা এত বড় ট্রেন— এলাে, চলে গেল— একজন যাত্রীও নামল না। এরকম ঘটনা কি আগে কখনাে ঘটেছে ? মনে হয় ঘটে নাই। স্টেশনমাস্টারকে জিজ্ঞেস করলে হয়তাে জানা যাবে। স্টেশনমাস্টারের এইসব হিসাব থাকে। জমির আলী এগিয়ে গেল। কোনাে যাত্রী ট্রেন থেকে নামে নি এমন ঘটনা আগে ঘটেছে কি–না তা
জেনে গেলে মনে একটা খুঁতখুঁত থাকবে। জেনে যাওয়াই ভালাে।স্টেশনমাস্টার ধমক দিয়ে জমির আলীকে বিদায় করলেন। গলার রগ ফুলিয়ে চিৎকার করে বললেন— যা ভাগ, এক থাপ্পর খাবি । জমির আলী বিস্মিত হয়ে বলল, থাপ্পর খাওনের মতাে অপরাধ কী করলাম ? মনের মধ্যে একটা জিজ্ঞাসা ছিল...
আবার কথা বলে! ভাগ! জমির আলীর মনটাই খারাপ হয়ে গেল। কোনাে কারণ ছাড়াই মানুষ এত খারাপ ব্যবহার কী জন্যে করে ? ভালাে ব্যাবহার করার জন্যে তাে টাকা খরচ করা লাগে না। মুখের মিষ্ট কথা নিঃখরচা জিনিস। এক লাখ মিষ্ট কথার দাম ‘শূন্য’। জমির আলীর মন এতই খারাপ হলাে যে মন খারাপ ভাব কাটাবার জন্যে মিষ্ট কথার সন্ধানে বের হলাে।
একটা তিক্ত কথা কাটান দিতে একটা মিষ্ট কথা লাগে। তিক্ত কথা কাটান না দেয়া পর্যন্ত মনে অশান্তি থাকবে। কী দরকার মন অশান্ত রেখে! জমির আলী ইয়াকুব সাহেবের সন্ধানে বের হলাে।ইয়াকুব সাহেব কী একটা এনজিওর কাজ নিয়ে এসেছেন। থানা কমপ্লেক্সের পাশে টিনের একচালা ঘর ভাড়া নিয়ে একা থাকেন। অতি বিশিষ্ট ভদ্রলােক। মধুর ব্যবহার। রমিজ আলীর ধারণা এই মানুষটা শুধু মধুর ব্যবহারের কারণে বেহেশতে যাবে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
খাওয়া–দাওয়ার পর ইয়াকুব সাহেব কিছুক্ষণ ঘুমান। জমির আলী ঠিক করে ফেলল সে যদি গিয়ে দেখে ইয়াকুব সাহেব ঘুমিয়ে পড়েছেন তাহলেও চলে আসবে না। ঘুম ভাঙার জন্যে অপেক্ষা করবে। দু’টা মিষ্ট কথা শুনে মনটা ঠিক করবে।ইয়াকুব সাহেব জেগেই ছিলেন। বারান্দায় রাখা টানা বেঞ্চের এক মাথায় বসে খবরের কাগজ পড়ছিলেন। জমির আলীকে দেখে তিনি হাসিমুখে বললেন, ভিক্ষুক সাহেবের খবর কী ? রােজগারপাতি কিছু হয়েছে ?
জমির আলীর মন ভালাে হয়ে গেল। একে বলে ভদ্রলােক। শরিফ খানদান। জমির আলী বলল, স্যারের শরীরের অবস্থা কী ?
অবস্থা ভালােই, তােমার খবর কী ? বউ ফিরেছে ? জে–না।। কোথায় আছে খোঁজ–খবর কিছু করেছ ?
বাপের বাড়িতে যায় নাই, সে খবর পেয়েছি। মনে হয় সুসং দুর্গাপুরে আছে। তার এক বােনের বিবাহ হয়েছিল সুসং দুর্গাপুরে। আমার বিশ্বাস সেইখানেই আছে।চলে যাও। বউ নিয়ে আস। বেকায়দায় পড়ে গেছি স্যার। ঘরে ছােট আবু। কার কাছে রাখি! তােমার বাচ্চাটা আছে কেমন ? কী যেন তার নাম— পয়সা না ?
জে স্যার, আপনার দেখি সবই ইয়াদ থাকে।জমির আলী, দুপুরের খাওয়া হয়েছে ? না হয়ে থাকলে অল্প কিছু ভাত তরকারি আছে। খেয়ে নাও। খাবে ?
জে স্যার। যাওয়ার সময় থালাবাসন ধুয়ে যেও। জে আচ্ছা। জমির আলী মনে মনে বলল, হে আল্লাহপাক! তােমার দরবারে দরখাস্ত করলাম— ইয়াকুব সাহেবরে তুমি বেহেশত নসিব করবে। তাকে বেহশত নসিব করলে আমি তােমার বেহেশতে ঢুকব না। এইটা আমার ওয়াদা।জমির আলী যে বেহেশতে যাবে এ বিষয়ে সে নিশ্চিন্ত। কারণ সে স্বপ্নে একবার নবিজিকে দেখেছে। যারা নবিজিকে স্বপ্নে দেখে তাদের বেহেশত নসিব হয়। মুনশি মােল্লার কথা।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
খাওয়া–দাওয়ার পর রান্নাঘরেই জমির আলী কাত হয়ে শুয়ে পড়ল। ভাত ঘুমের মতাে আরামের ঘুম আল্লাহপাক তৈরি করেন নাই। ভরপেট খাওয়ার পর ‘বিসমিল্লাহ বলে শুয়ে পড়া। পেট যত ভরা থাকবে ঘুম হবে তত আরামের। ইয়াকুব আলী যদিও বলেছেন— অল্প ভাত তরকারি আছে। ঘটনা ভিন্ন। সব কিছুই পরিমাণ মতাে ছিল। ডাল টকে গিয়েছিল, এতে স্বাদ বরং বেড়েছে।
ঘুমের মধ্যে জমির আলী ভালাে একটা স্বপ্ন দেখল। আসমানীর মা ফিরে এসেছে। ট্রেন থেকে নামার সময় সে গলা বাড়িয়ে চিৎকার করছে— কুলি! কুলি! এইখানে কুলি আছে ? আমার অনেক মাল–সামান। জমির আলী এগিয়ে গেল। আছিয়া তাকে চিনতে পারল না। আলীশান এক ট্রাঙ্ক তার মাথায় তুলে দিল। মাথায় ট্রাঙ্ক, এক হাতে স্যুটকেস, এক হাতে বিরাট এক পুটলি নিয়ে জমির আলী যাচ্ছে।
পেছনে পেছনে আছিয়া আসছে। স্বপ্ন বলেই এতগুলি মাল সামান নিয়ে এত সহজে হাঁটা যাচ্ছে। জমির আলী বলল, বউ তােমার খবর কী? অমনি আছিয়া রেগে গিয়ে বলল, ঐ ব্যাটা মাডি লাউগরা, তুই আমারে বউ ডাকস কোন সাহসে ? লাথ মাইরা তাের কোমর ভাঙব। জমির আলী হাসতে হাসতে বলল, লাথ মার তাে! দেখি তােমার ঠ্যাঙে কত জোর! আছিয়া সত্যি সত্যি লাথ মারার জন্যে এগিয়ে এসে জিভে কামড় দিয়ে বলল, ও আল্লা! আপনে ?
বিরাট অন্যায় করেছি, মাপ দেন। জমির আলী দরাজ গলায় বলল, স্বামী যেমন স্ত্রীর উপর অন্যায় করতে পারে, স্ত্রীও পারে। এতে দোষ হয় না। তারপর বউ বলাে—ট্রাঙ্কে কইরা কী আনছ ? আছিয়া বলল, টেকা আনছি। ট্রাঙ্ক ভরতি টেকা। আইজ থাইক্যা আপনের ভিক্ষা বন্ধ। ট্রাঙ্ক খুইল্যা টেকা বাইর করবেন আর খরচ করবেন।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
স্বপ্নের এই পর্যায়ে জমির আলীর ঘুম ভেঙে যায়। তার মনটা হয় উদাস। স্বপ্নে আছিয়াকে খুবই সুন্দর লাগছিল। কানে ছিল স্বর্ণের দুল। এই দুল জোড়া আসমানীর অসুখের সময় বিক্রি করতে হয়েছে। দুল আর কিনে দেয়া হয় নি।বিবাহিত মেয়েদের গায়ে স্বর্ণের ছোঁয়া না থাকলে দোষ লাগে। এক আনা সােনা হলেও গায়ে রাখতে হয়। সেটা করা সম্ভব হয় নি বলেই আছিয়ার গায়ে দোষ লেগে গেছে। সে সংসার ছেড়ে চলে গেছে। মেয়েদের যেমন স্বর্ণ পুরুষদের তেমন আকিক পাথর। নবিজি নিজে আকিক পাথর পরতেন।
জমির আলী বাড়ি ফিরল সন্ধ্যার মুখে মুখে। বাড়িতে পা দিয়ে মন ভালাে হয়ে গেল। সব ঠিক–ঠাক আছে। কলসি ভর্তি পানি আছে। উঠান পরিষ্কার। চুলার কাছে শুকনা খড়ি সাজানাে। অজু করার জন্যে জলচৌকির কাছে বদনা ভর্তি পানি। উঠানের খুঁটির সঙ্গে সাদা রঙের একটা মুরগি বাঁধা। জমির আলী বিস্মিত গলায় বলল, এই মুরগি কার ?
আসমানী বলল, আমরার মুরগি। ছদগা পাইছি। বাপজান, তুমি আস্তে কথা বলাে, পয়সা হবে ঘুমাইছে। বাবার সাড়া পেয়ে জামদানী গামছা হাতে বের হয়ে এসেছে। সে বাবার হাতে গামছা দিতে দিতে লজ্জিত গলায় বলল, পােলাও দিয়া মুরগির সালুন। খাইতে মনে চায় বাপজান। জমির আলী দরাজ গলায় বলল, মনে চাইলে খাবি। আইজ রাইতেই খাবি। এইটা কোনাে বিষয় না। সত্যই ?
অবশ্যই সত্য। জমির আলী ফকির হইলেও তার কথার দাম রাজা–বাদশার কথার দামের সমান। পােলাও কোর্মা আইজ রাইতেই হবে।পােলাও–এর চাউল, ঘি গরম মশল্লা কই পাইবা ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০৩
এইগুলা নিয়া তাের চিন্তা করনের প্রয়ােজন নাই। এইগুলা আমার বিষয়। মেয়েছেলে করব সংসার, পুরুষ করব চিন্তা— এইটা জগতের নিয়ম। এখন কথা বাড়াইস না। মাগরেবের ওয়াক্ত চইল্যা যাইতেছে। মাগরেবের ওয়াক্ত অতি অল্প সময়ের জন্যে থাকে। যদি দেখস গায়ের পশম দেখা যাইতেছে না তাহলে বুঝবি ওয়াক্ত শেষ হয়েছে।
সত্যি সত্যি পােলাও–কোরমা রান্না হয়েছে। দুই বােন নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে। জমির আলী পয়সাকে কোলে নিয়ে পাশেই বসে আছে। আনন্দিত চোখে মেয়ে দু’টির খাওয়া দেখছে। সে নিজে খেতে বসে নি। পােলাও–এর পরিমাণ কম। তিনজন খেলে কম পড়বে। শুধু দুই বােন যদি খায় আরাম করে খেতে পারবে। আসমানী বলল, বাপজান, তুমি খাইবা না ?
Read more
