সংসারের মধ্যে নাই। অনেক সংসার করলাম। অখন অসিসালামু আলায়কুম। তােমার কথাবার্তা কিছুই বুঝতেছি না। বুঝলে নাই। আছিয়া উঠানে চলে গেল। জলচৌকিতে বসে বাঁশঝাড়ের দিকে তাকিয়ে রইল। জমির আলী চিন্তিত মুখে শিশুর কান্না সামলানাের জন্যে এগিয়ে গেল। তার সঙ্গে যুক্ত হলাে আসমানী ও জামদানী । বাচ্চাটাকে এখন আরো ফরসা লাগছে।
হাত–পা ছুড়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে কাদছে। জমির আলী মেয়ের মুখের দিকে ঝুঁকে এসে বলল, এই পয়সা— এই । পয়সা কান্না থামাচ্ছে না। আসমানি বলল, বাপজান, গীত গাও। জমির আলী গীত ধরল। বানিয়ে বানিয়ে সুর করে কথা বলা। ভিক্ষুকরা এটা খুব ভালো পারে এই পয়সা কান্দে রে তার ভইন রে বান্দে রে ভইনের নাম আসমানী হে দেশের রাজরানী। তার ছােটটা জামদানী ঘরে টেকার আমদানি টেকা বলে পয়সা কই হে আমার প্রাণের সই।
জামদানী উৎফুল্ল গলায় চেঁচিয়ে উঠল, কান্দন বন্ধ হইছে। কান্দন বন্ধ হইছে। জমির আলী অবাক— আরে তাই তাে, পিচকা কান্না বন্ধ করে তাকাচ্ছে।আসমানী বলল, বাপজান, তােমারে দেখে। তােমারে দেখে।
জমির আলী বলল, কী দেখসরে বেটি ? আমি কে—ক দেহি। আমি তাের পিতা জমির আলী। তাের মাতার নাম আছিয়া। দুই ভইনের একজনের নাম আসমানী, আরেকজনের নাম জামদানী। আমাদের সবেরে যে সৃষ্টি করেছেন তার নাম আল্লাহ। সাত আসমানের উপরে তার সিংহাসন। জামদানী বলল, তােমার সব কথা শুনতাছে। মনে হয় বুঝতাছে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
জমির আলী গম্ভীর গলায় বলল, বুঝনের কথা। শিশুরা ফিরিশতার সামিল। ফিরিশতা কথা বুঝব না এইটা কেমন কথা ? আমার পয়সা আম্মা সব বুঝতাছে। বুঝতাম না মা?
কী আশ্চর্য কথা, পিচকি চোখ মিটমিট করছে! পাখির পালকের মতাে একটা হাত এগিয়ে দিল বাবার মুখের দিকে। আসমানী উত্তেজিত গলায় বলল, বাপজান, তােমার নাক ধরতে চায় ।। জমির আলী নাক বাড়িয়ে দিয়ে হৃষ্ট গলায় বলল, ধর বেটি নাক ধর। জন্মের পরেই নাক ধইরা টানাটানি এ কেমন মাইয়া! বয়সকালে এর খবর আছে। কন্যা নিয়ে উল্লাস দীর্ঘস্থায়ী হলাে না।
সন্ধ্যা নামার পর পর সে কাঁদতে শুরু করল। দিনও খারাপ করল। ঝুম বৃষ্টি। মাঝে মাঝে বাতাস দিচ্ছে। বাতাসে ঘরের চালা নড়বড় করছে। বাড়ি–ঘরের যে অবস্থা বাতাসের বেগ আরেকটু বাড়লে বাড়ি উড়ে যাবে। আছিয়া তার রােরুদ্যমান কন্যার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছে না। সে ভেতরের বারান্দায় মাদুর পেতে বসে আছে। মনে হচ্ছে গভীর আগ্রহে সে ঝড়–বৃষ্টি দেখছে। আসমানী মায়ের কাছে এসে ভয়ে ভয়ে বলল, পয়সা কানতেছে।
আছিয়া বলল, কান্দুক। কান্দনের কপাল নিয়া আসছে, কানব না তাে কী করব! মনে হয় ক্ষিধা লাগছে। তাের বাপরে দুধ খাওয়াইতে ক। আমি আর ঝামেলার মইদ্যে নাই।বাচ্চার কান্নার চেয়েও যে দুশ্চিন্তা জমির আলীকে কাতর করে ফেলল সেটা দিনের অবস্থা। ভাবভঙ্গি মােটেই সুবিধার না। অনেক দূর থেকে গুম গুম শব্দ আসছে। সবাইকে নিয়ে কেরামতের পাকা দালানে চলে যাওয়া দরকার।
জামদানী ভীত গলায় বলল, ঘর–বাড়ি কাঁপতাছে বাপজান। জমির আলী বলল, কোনাে চিন্তা করিস না। আমরার সাথে ছােট শিশু আছে। ছােট শিশু ফিরিশতার সামিল। ফিরিশতার বিপদ–আপদ নাই। আসমানী বলল, কেরামত চাচার বাড়িত যাইবা ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
জমির আলী বলল, মনে হয় যাইতে হবে। তাের মা’রে বল ।... আচ্ছা আমিই বলব। ঝড়–তুফানরে সমীহ করা লাগে। ঝড়–তুফান কারাের খালাতাে ভাই মামাতাে ভাই না।আছিয়া বলল, আপনের যেইখানে ইচ্ছা সেইখানে যান। গুষ্ঠী সাথে লইয়া যান। আমি যাব না। জমির আলী চিন্তিত মুখে বলল, ঘর-বাড়ি তাে পইড়া যাইতেছে। যাউক পইড়া। সত্যি যাইবা না ?
বউ তােমারে আল্লাহর দোহাই লাগে। আফনেরে আল্লাহর দোহাই লাগে কানের কাছে ভ্যানভ্যান কইরেন না। ঝড় প্রবল হয়েছে। বাড়ির চালার একটা অংশ উড়ে চলে গেল। আসমানী এবং জামদানী দু’দিক থেকে বাবাকে জাপ্টে ধরে আছে। জমির আলী শিশু সন্তানটিকে কথায় মুড়ে বুকের কাছে দু’হাতে ধরে রেখেছে।
ঝড়–ঝঞার জন্যই হােক বা পরিশ্রান্ত হবার কারণেই হােক সে কাঁদছে না। জমির আলী বলল, চল রওনা দেই। দুইজন আমারে শক্ত কইরা ধর । মনে মনে নুহ নবির নাম নে। ঝড়–তুফানের সময় নুহ নবির নাম খুব কামে দেয়। আসমানী বলল, তুমি অত কিছু জান ক্যামনে?
আছিয়া তিক্ত গলায় বলল, তাের বাপ বিরাট তালেবর বিদ্যার মটকি। হে জানব না তাে কে জানব ? যা বাপের সাথে যা। পথে পিছলাইয়া পইড়া পাও ভাঙ। এক আধজন লুলা হইলে সুবিধা আছে। ভিক্ষা বেশি পাওন যাইব। | ঘনঘন বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকের আলাে দেখে দেখে এগুতে হচ্ছে। এমিতে চারদিক ঘন অন্ধকার। বৃষ্টির পানি বরফ শীতল।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
বন–জঙ্গলের ভেতর দিয়ে পথ। বৃষ্টির পানিতে পিছল হয়ে আছে। বুড়াে আঙুলটি টিপে টিপে খুব সাবধানে এগুতে হচ্ছে। ঝড় এমন ঝাপটা দিচ্ছে যে জমির আলীর মনে হচ্ছে, তার দুটি মেয়ের একটিকে বুঝি উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। জমির আলী বলল, শক্ত কইরা ধইরা থাক। প্রয়ােজনে পাও ধইরা ঝুইলা পড়। মনে মনে বল— লাইলাহা ইল্লাল্লাহ।
পথের উপর বাঁশঝাড়ের বাঁশ ভেঙে পড়েছে। ডিঙিয়ে যাবার কোনাে উপায় নেই। বাঁ দিকের ফাঁকা জায়গাটা দিয়ে কিছুদূর যাওয়া যাবে, সেটিও বিপদজনক। রুস্তমের ভিটার উপর দিয়ে যেতে হবে। রুস্তমের ভিটার উপর দিয়ে দিনমানেও কেউ যায় না। ঝড়–বৃষ্টির নিশুতি রাতে অভিশপ্ত ভিটার ধারে কাছে যাওয়ার প্রশ্নই উঠে না। হয়তাে দেখা যাবে উঁচু ভিটার উপর সাদা থান পরা রুস্তমের দাদি বসে আছে।
বহু বছর আগে মৃত এই খুনখুনি বুড়িকে দেখে নাই এমন লােকের সংখ্যা এই গ্রামে খুবই কম। বুড়ি ভিটার উপর বসে পান খায়। পানের পিক ফেলে। পিকের বর্ণ টকটকে লাল। মনে হয় যেন পিক না— তাজা রক্ত। মনের ভুলে রাতে বিরাতে কেউ যদি রুস্তমের ভিটার পাশ দিয়ে যায় তাহলেই বুড়ি মধুর গলায় ডাকবে— যায় কেডা ? বদরুলের বেটা ছদরুল ?
কেমন আছসরে ভাইটি ? আয় কাছে আয়, পান খাইয়া যা। মনের ভুলে কেউ যদি বুড়ির সঙ্গে গল্পগুজব শুরু করে তাহলেই সর্বনাশ। সে বাড়ি ফিরে আসবে প্রবল জ্বর নিয়ে। খিচুনি শুরু হবে। মুখ দিয়ে গেজলা বেরুবে। ডাক্তার–কবিরাজ করার আগেই শেষ। এই গ্রামের দুইজন আর ভিনদেশী একজন এইভাবে শেষ হয়েছে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
জমির আলী ভীত গলায় বলল, আসমানী জামদানী, আমরা রুস্তম আলীর ভিটার উপর দিয়া যাব। বুড়িরে যদি দেখস ভয় খাইস না। আর বুড়ির কোনাে কথার জবাব দিবি না। খবরদার কইলাম । আমি মনে মনে আয়াতুল কুরশি পড়তে থাকব। ভয়ের কিছু নাই। আয়াতুল কুরশির কাছে কেউ ভিড়তে পারে। বড় শক্ত সূরা । জীন–ভূতের জন্যে কোরামিন ইনজেকশন। আসমানী কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, আইচ্ছা।
আয়াতুল কুরশি পড়ার ব্যাপারটা জমির আলী মেয়েদের সাহস দেবার জন্যে বলেছে। আয়াতুল কুরশি সে জানে না। আল্লাহর পাক কালাম নিয়ে মিথ্যা কথা বলা মহাঅপরাধ। মেয়ে দুটিকে সাহস দেবার জন্যে জমির আলী এত বড় অপরাধ করল। মেয়েরা সাহস পেল কি–না বুঝা গেল না, তবে ভয়ে জমির আলীর বুকে ব্যথা শুরু হয়ে গেল। সে নিশ্চিত রুস্তম আলীর দাদিকে দেখা যাবেই। বুড়ি পানের পিক ফেলতে ফেলতে মধুর গলায় বলবে— ‘কে যায় ? আমরার ফকির জমির আলী না ? ঝড়–বৃষ্টির মধ্যে তিন কইন্যা লইয়া কই যাস? একটারে আমার কাছে থুইয়া যা। আদর কইরা পালব।‘
মেয়ে তিনটিকে কেরামতের পাকাবাড়ির বারান্দায় রেখে জমির আলী আবার বের হলাে। আছিয়ার খোঁজ নেয়া দরকার। রাগ ভাঙায়ে তাকে নিয়ে আসতে হবে। প্রয়ােজনে কোলে করে আনতে হবে। স্ত্রী স্বামীকে কোলে নিতে পারে না, তবে স্বামী স্ত্রীকে কোলে নিতে পারে। তাতে দোষ হয় না।আছিয়াকে পাওয়া গেল না। সে উঠানে বসে নেই। ঘরের ভেতরে নেই । আশেপাশে কোথাও নেই। ঝড়–বৃষ্টির মধ্যে অসুস্থ মানুষটা যাবে কোথায় ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
এমন কি হতে পারে মেয়ে তিনটার টানে সে ঘুরপথে কেরামতের পাকা দালানে উপস্থিত হয়েছে! সন্তানের টান বড় মারাত্মক টান। লােহার শিকলের টান। জমির আলী আবারাে কেরামতের বাড়িতে উপস্থিত হলাে। | দুই বােনই জড়সড় হয়ে উঠানে বসে আছে। আসমানীর কোলে পয়সা। সে কুঁকুঁ শব্দ করছে। দুটি মেয়েই শীতে কাঁপছে। কেরামত দরজা খুলে মেয়েগুলিকে ভিতরে ঢুকতে দেয় নি। আসমানী বলল, বাপজান, মা কই ?
জমির তখন বলল, এখনাে খুঁজতে যাই নাই, তরার কী অবস্থা দেখতে আসছি। অবস্থা কী ?
আসমানী বলল, শীত লাগে।ভিজা কাপড়ে শীত তাে লাগবই। তােরা টাইট হইয়া বইয়া থাক। তাের মারে নিয়া আসতাছি। নয়া আবুর খবর কী ?
একটু পরে পরে কান্দে। কান্দুক, জন্মের সময় যে সব সন্তান বেশি কান্দে তারা বড় হইয়া এমন সুখে থাকে যে কান্দন কী জিনিস ভুইল্যা যায়। তাের ছােট ভইন বড়ই ভাগ্যবতী। তার ভাইগ্য দেইখা অবাক হইতেছি। জমির আলী আবারাে স্ত্রীর সন্ধানে বের হলাে। তাকে খুঁজে পাওয়া গেল।চুকচুক শব্দ হচ্ছে।
পয়সা দুধ খাচ্ছে। দুধের বাটিতে কড়ে আঙুল ডুবিয়ে সেই আঙুল ঠোটের কাছে ধরতেই পয়সা আঙুল মুখে নিয়ে চুকচুক শব্দ করছে। বড়ই মজার দৃশ্য। জামাদানীর খুব ইচ্ছা সেও বড়বােনের মতাে দুধ খাওয়ায়। কথাটা বলতে কেন জানি তার লজ্জা করছে। তার লজ্জা একটু বেশি; তবে সে মােটামুটি নিশ্চিত আসমানী দয়াপরবশ হয়ে এক সময় বলবে, নে তুই দুধ খাওয়া। জামদানী সেই মাহেন্দ্রক্ষণের অপেক্ষায় আছে।
দুধ খাওয়ানাে উৎসব হচ্ছে বাড়ির উঠোনে। অনেক আয়ােজন করা হয়েছে। পাটি বিছানাে হয়েছে। কাঁথা বালিশ আনা হয়েছে। জলচৌকিতে রাখা হয়েছে দুধের বাটি এবং সরিষার তেলের বাটি। দুধ খাওয়ানাে শেষ হলেই পয়সার গায়ে তেল মাখিয়ে রােদে শুইয়ে রাখা হবে। সমস্ত শরীরটা থাকবে। রােদে, শুধু মাথার উপর ছায়া ফেলে একজনকে ছাতা ধরে রাখতে হবে। জমির আলী সেই নির্দেশ দিয়ে গিয়েছে।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
আঙুল চুবিয়ে দুধ খাওয়ানাের কৌশলটা আসমানী বের করেছে। আগে ন্যাকড়া দুধে ডুবিয়ে মুখে ধরা হতাে। এতে সময় লাগত অনেক বেশি। আঙুল পদ্ধতিতে সময় কম লাগছে। পুরাে ব্যাপারটায় আনন্দও আছে। এই আনন্দ স্থায়ী হবে না। জমির আলী বলেছে– ‘এক মাস কষ্ট কর। এক মাস পরে আবু শিশি দিয়া দুধ খাইব। তখন নয়া আবুর মুখে শিশি ধরার কষ্ট ছাড়া আর কষ্ট নাই।
তখন খালি আরাম। আসমানী এবং জামদানীর কাছে আঙুল দিয়ে দুধ খাওয়ানাের ব্যাপারটা কষ্টের না, বরং আনন্দের। এই আনন্দ এক মাসের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে ভাবতে ভালাে লাগে না। জামদানী অনেকক্ষণ হলাে চুপচাপ বসে আছে। আসমানী তাকে কিছুই বলছে না। লজ্জা ভেঙে সে নিজেই মিনমিন করে বলল, বুবু, আমি দুধ খাওয়াই ?
আসমানী গম্ভীর গলায় বলল, হাত ধুইয়া আয়। ভালােমতাে ধুবি। জামদানী প্রায় দৌড়ে গেল হাত ধুতে। এই ফাঁকে আসমানী তার বােনের সঙ্গে কিছু গল্পগুজব করল— এখন তােমারে কে দুধ খাওয়াইব জানাে ? তােমার ভইন। তার নাম জামদানী। হে তােমারে খুবই পেয়ার করে। ও আমার পয়সা ভইন, তােমার মনটা খারাপ কেন গাে ? মা’র জন্যে পেট পুড়ে ? আহারে লক্ষ্মী। আহারে কুটুরা পক্ষী। মা চইল্যা আসব। কয়েকটা দিনের মামলা। মা আইস্যা তােরে কুলে নিয়া খালি হাঁটব, খালি হাঁটব। হাঁটতে হাঁটতে গীত গাইব। গীত শুইন্যা তুই ঘুমাইয়া পড়বি।
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
বােনের হাতে দায়িত্ব দিয়ে আসমানী উঠে পড়ল। তার অনেক কাজ। কলসিতে খাওয়ার পানি নাই। টিউব কল থেকে জগে করে পানি এনে এনে কলসি ভরতে হবে। তাকে আসা যাওয়া করতে হবে পনের বার। কলসি ভরতে পনের জগ পানি লাগে। সব তার হিসাব করা। গাঙ্গের পাড়ে কচুগাছে প্রচুর লতি এসেছে। লতি তুলে আনতে হবে । রুস্তমের ভিটার সবরি গাছে সবরির বান ডাকছে। সেইখানে একলা যাওয়া যাবে। ভয় লাগে। বাপজানকে সাথে নিয়ে যেতে হবে ।
জঙ্গলার ভেতর লটকন গাছ ঝেপে লটকন এসেছে। এখনাে পাকে নি, তবে পাকার সময় হয়ে এসেছে। রােজ একবার খবর না নিলে পাকা লটকন অন্য কেউ নিয়ে যাবে। জঙ্গলা থেকে খড়ির ব্যবস্থাও করতে হবে। রান্ধাবাড়ার ঝামেলা অবশ্যি নাই। জমির আলী সন্ধ্যাবেলা বাড়ি ফিরে রাঁধতে বসবে। রান্না হয় একবেলা, তাতে কষ্ট হয় না। দুইবােন চিড়া খেয়ে থাকে। চিড়া খুবই গুণের খাদ্য।
গুড় দিয়ে দুই মুঠ চিড়া খেয়ে ভরপেট পানি খেলে সারাদিন আর ক্ষিধে লাগে না। ক্ষিধা লাগতে থাকে আছরের পর থেকে। সন্ধ্যাবেলায় ক্ষিধায় চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। তখন গরম গরম ভাত কী যে ভালাে লাগে! টিউব কলটা সরকার বাড়ির পিছনে। সরকার বাড়ির বড় বউ রমিলা টিউব কলে কাপড় ধুচ্ছিল। আসমানীকে দেখে বলল, আসমানী, তাের ভইন কেমন আছে ?
আসমানী বলল, ভালাে । তাের মার কোনাে খোঁজ আছে ?
সংসার ফালাইয়া তাের মা গেল কই ?
আসমানীরা তিন বােন পর্ব:০২
আসমানী জবাব দিল না। জবাব দেবার কিছু নেই। তার মা কোথায় গিয়েছে সে জানে না। তাের বাপও তাে বাদাইম্যা। শইল্যে শক্তি আছে, অসুখ নাই বিসুখ নাই— করে ভিক্ষা। এমন মানুষরে কানে ধইরা গেরামের বাইরে বাইর কইরা দেওন। দরকার । ছিঃ ছিঃ!
আসমানীর মনটা খারাপ হলাে। তার বাপজানরে কেউ কিছু বললে মন খারাপ লাগে। রাগ হয়। সে রমিলা চাচির উপর রাগ করতে পারছে না। রমিলা চাচি অসম্ভব ভালাে একজন মানুষ। সব সময় তাদের খোঁজখবর করছে। এটা সেটা দিচ্ছে। সে এখন যে হলুদ জামাটা পরে আছে এটাও রমিলা চাচির দেওয়া।রমিলা বলল, তুই কেমন মেয়েরে আসমানী, তাের বাপরে নিয়া দুইটা মন্দ কথা বললাম সাথে সাথে মুখ কালা। যে মন্দ তারে মন্দ বলব না ?
আসমানী নিচু গলায় বলল, বাপজান মন্দ না। রমিলা হাসি মুখে বলল, আচ্ছা যা তাের বাপজান মন্দ না। হে রসগােল্লা। রসের মইধ্যে ডুইব্যা আছে। কি খুশি হইছস ?
আসমানী কিছু বলল না। রমিলা বলল, একটা মুরগি ছদগা দিছি। মনে কইরা নিয়া যাবি। ছদগা কী জন্যে দিছেন ? বিপদ আপদ হইছে ?
Read more
