আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব হুমায়ূন আহমেদ

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

জি আচ্ছাকালকের মধ্যে ঘণ্টা বানাতে হবেঘণ্টা আমি নিজের হাতে পরায়ে দিবজি আচ্ছাআমি হাতির বাচ্চাটা এখনাে দেখি নাইএটা একটা আফসােসকাল দেখবেন। অবশ্যই কাল দেখবনিজের হাতে গলায় ঘন্টা পরায়ে দেবএখন যাইশাে টাইম হয়ে গেছে। আর দশটা মিনিট বসােগ্লাসটা শেষ করিনতুন এক গ্লাস বানায়ে হাতে ধরায়ে দিয়ে যাও। তৈয়ব দাঁড়িয়ে পড়েছিলআবার বসলহারুন সরকার বললচারদিন পার করে দিলাম এখনাে কোনাে ভেজাল হয় নাইবিরাট আশ্চর্য ঘটনাঠিক 

ঠিকতবে ছােট্ট ভেজাল বােধহয় হবে। কী ভেজাল বশির মােল্লা বলে এক লােক মনে হয় ঝামেলা করবেসহজ ঝামেলা নাজটিল ঝামেলাসে সার্কাস কিনে নিতে চায়। কোনখানের ফাজিল ভাটি অঞ্চলেরসে আমাকে দালাল ধরেছেদালালি বাবদ দশ হাজার টাকাও দিয়েছে। বলাে কী ? আমি খোঁজ নিয়েছি— লােক ভয়ঙ্করসার্কাস কিনতে চায় কেন

মেয়ে তিনটার জন্যে কিনতে চায়সার্কাসের যে মালিক সে মেয়ে তিনটারও মালিক, আর কিছু না। হারুন সরকার চিন্তিত গলায় বলল, আমার তাে নেশা কেটে যাওয়া ধরেছেএটা তুমি কী বললা তৈয়ব কিছু বলল নাহারুন বলল, সমস্যার সমাধান কী ? তৈয়ব চুপ করেই রইল হারুন সরকার বলল, লােকের নাম কী ? বশির মােল্লা। 

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

তাকে বলাে যে সার্কাস আমি বেচে দিবকিন্তু দাম এক কোটি টাকাতখন বাপ বাপ করে দৌড় দিয়ে পালায়ে যাবে। তৈয়ব বলল, পালাবে নাসে এই টাকা খরচ করবেআমি নিশ্চিতহারুন সরকার চিন্তিত গলায় বলল, এখন করা যায় কী? ঘণ্টা পড়ে গেছেশাে শুরু হবেতৈয়ব আলী ওঠে দাঁড়াল। রাত দুটা বাজেপয়সা পা ঝুলিয়ে বিছানায় বসে আছেস্বপ্ন দেখে তার ঘুম ভেঙেছে

এখন আর ঘুম আসছে নাস্বপ্নটা তেমন অদ্ভুত নাতার জন্যে সাধারণ স্বপ্ন। সে প্রায়ই দেখেতবে আজকের স্বপ্নটা একটু অন্যরকমসে দেখেছে দড়ির খেলা হচ্ছে, হঠাৎ ব্যালেন্স হারিয়ে সে দড়ি থেকে পড়ে গেলশাঁ শাঁ শব্দ হচ্ছে, সে নিচে নামছে নিচে নামছেচারদিক থেকে চিৎকারবাঁচাও বাঁচাওএই পর্যন্ত স্বাভাবিক স্বপ্নপয়সা নিয়মিতই এই স্বপ্ন দেখে । 

স্বপ্নের পরের অংশটা অস্বাভাবিকস্বপ্নের মধ্যে সে শুনল ভট ভট শব্দ হচ্ছেনিচে তাকিয়ে দেখে বিশাল সমুদ্রসে পড়ে যাচ্ছে সমুদ্রেভট ভট শব্দটা স্পিড বােটেরতাকে বাঁচানাের জন্যে নি পাের্টার স্পিড বােট নিয়ে ছুটে আসছেপয়সার স্বপ্ন এই পর্যন্তসে বাঁচল নাকি সমুদ্রে তলিয়ে গেল সেটা আর দেখা হলাে না। পয়সা। কী হয়েছে ? পয়সা জবাব দিল নাআসমানী বলল, তুই কাঁদছিস কেন ?

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

পয়সা গালে হাত দিয়ে দেখল গাল ভেজাতার চোখ দিয়ে যে পানি পড়ছে এটা সে নিজেও জানে নাএকটা ব্যাপার শুধু জানে তার খুব একলা লাগছেযেন সে এখন আর তিন বােনের একজন নাসে আলাদা। আপা কী ? কাল সকালে আমি কিন্তু বিদেশী সাহেবের কাছে বেড়াতে যাবঠিক আছে তােকে নিয়ে যাব। তােমরা যাবে না আপা, আমি একা যাব| আসমানী ছােট্ট নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আচ্ছা, তাের যদি ভালাে লাগে তুই একাই যাবি। 

তাঁবুর বাইরে পায়ের আওয়াজকে আসবে এত ভােরে ? ভিক্ষুকশ্রেণীর ছেলেপুলে আগে এরকম আসততাঁবুরপাশে ঘুরঘুর করতফেলে দেয়া বিয়ারের ক্যান, কোকের ক্যান নিয়ে যেতএমন কি সিগারেটের খালি প্যাকেটের প্রতিও তাদের আগ্রহইদানীং সিকিউরিটি টাইট হয়েছে

বিদেশীদের তাঁবুর পাশে কাউকে আসতে দেয়া হয় নাতাহলে এত ভােরে কে আসবে ? রহমত উল্লাহ বাবুর্চি মগ ভরতি গরম কফি নিয়ে এসে ঘুম ভাঙায় সেই সময়ও হয় নিঘড়িতে বাজছে সাতটাবাবুর্চির আসার সময় ঠিক আটটায়নি পাের্টার বলল, Who is there ? কে

পয়সা ক্ষীণ স্বরে বলল, আমি। নি পাের্টার তৎক্ষণাৎ তাঁবুর বাইরে এসে চিন্তিত গলায় বলল, তুমি ? Is anything wrong? কোনাে বিপদ হয়েছে পয়সা বলল, নাএসাে, ভেতরে এসাে

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

পয়সা তাঁবুর ভেতর ঢুকলবাইরে দাঁড়িয়ে থাকতে তার খুবই অস্বস্তি লাগছিলসবাই কেমন অদ্ভুত চোখে তাকাচ্ছিলতাঁবুর ভেতর ঢুকে সেই অস্বস্তি পুরােপুরি কেটে গেলসার্কাসের মেয়ে এমনিতেই তাঁবুর ভেতর স্বস্তি বােধ করেতাদের জীবনই কাটে তাঁবুতেতার উপর এই তাবুটা নি পাের্টারেরঅন্য কারাের নামিস কয়েন, ভােরবেলা তােমাকে দেখে বিস্ময় পেয়েছি। 

পয়সা বলল, আমি ভােরবেলা হাঁটতে বের হয়েছিলামতখন ভাবলাম আপনার তাঁবুর পাশ দিয়ে যখন যাচ্ছি তখন দেখে যাই আপনি কী করছেন । নি পাের্টার বলল, তােমার অন্য দুবােন কোথায় ? ওরা তােমার সঙ্গে হাঁটতে বের হয় নি

মিস কয়েন, তুমি যে এই ভােরবেলা হাঁটতে বের হয়েছ এটা ঠিক নাতােমাদের দেশের মেয়েরা এত ভােরে একা একা হাঁটতে বের হয় না। আমি আমাদের দেশের অন্য মেয়েদের মতাে নাআমি আলাদাতুমি আলাদা কেন ? আমি সার্কাসের মেয়ে এই জন্যে আমি আলাদা। 

নি পাের্টার বলল, আচ্ছা তাহলে আমার ত্রুটি হয়েছেতুমি সকালে মর্নিংওয়াক করতে বের হয়েছিলেহঠাৎ মনে হলােবিদেশী সাহেবের সঙ্গে কফি খাবতখন চলে এসেছ। হ্যা তাইকফি খাবার জন্যে আটটা বাজা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবেকফি আসবে আটটায়এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে পারবে?

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

পয়সা জবাব দিল নাসে তার মাথায় প্যাচানাে নীল রঙের স্কার্ফটা খুলে ফেললআঁকি দিয়ে মাথার চুল ঠিক করলতার খুবই অদ্ভুত লাগছেতার কেন জানি মনে হচ্ছে এই তাবুটাই তার ঘরবাড়ি। মিস কয়েন, আমার মনে হয় তুমি আমাকে কিছু বলতে এসেছযা বলতে এসেছ বলে ফেল। 

পয়সা বলল, আপনার চোখের যে নীল রঙ সেটা সব সময় এক রকম থাকে কখনাে বাড়ে কখনাে কমেএটা কি আপনি জানেন তুমি কি এই কথাটাই বলতে এসেছ ? হা চোখের নীল রঙ কি তােমার পছন্দ তােমার কী রঙ পছন্দ? কালােআচ্ছা বেশ, আমি চোখ কালাে করে ফেলবপয়সা বিস্মিত হয়ে বলল, কীভাবে

কালাে রঙের কনট্যাক্ট লেন্স পরলেই চোখ কালাে হয়ে যাবেআবার ধর তুমি যদি নীল রঙের কোনাে কনট্যাক্ট লেন্স পর তাহলে তােমার চোখ..পয়সা আগ্রহের সঙ্গে বলল, দিন আমার চোখ নীল করেদেখি নীল চোখে আমাকে কেমন লাগে । আমার সঙ্গে কনট্যাক্ট লেন্স নেইলেন্স লাগানাের জন্যে ঢাকায় যেতে হবেআচ্ছা আমি ব্যবস্থা করব। কবে ব্যবস্থা করবেন

যত দ্রুত পারি ব্যবস্থা করব শােন মিস কয়েন, একটু আগে তুমি বলছিলে নীল রঙ তােমার পছন্দ নাএখন আবার বলছ তােমার নিজের চোখ নীল করতে চাওব্যাপারটা কী বলাে তােপয়সা বলল, একটু আগে আমি মিথ্যা কথা বলছিলামনীল রঙ আমার পছন্দনি পাের্টার বলল, মিথ্যা কথা দিয়ে দিন শুরু করলে সারা দিন মিথ্যা কথা বলতে হয়, এটা কি তুমি জানাে না

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

এটা হলাে আমার দাদিমার কথাআমার ধারণা কথাটা ঠিকআমি অনেকবার লক্ষ করেছি যেদিনই আমি সকালে মিথ্যা কথা বলেছি, সেদিন ঘুমুতে যাবার আগ পর্যন্ত আমাকে মিথ্যা কথা বলতে হয়েছেএসাে মিস কয়েন, একটা চুক্তি করিতুমি আমার সঙ্গে মিথ্যা কথা বলবে নাযা জিজ্ঞেস করি তার সত্যি জবাব দেবে। আমি সব সময় সত্যি কথা বলি, শুধু আপনার সঙ্গেই মিথ্যা বলিকেন ? আমি জানি না কেন ? আমার ধারণা তুমি জানাে। , আমি জানি নাএই তাে আবার মিথ্যা কথা বলছ। 

পয়সা হেসে ফেললকোনাে কারণ নেই অথচ তার কী যে আনন্দ লাগছে! একটা বড় সমস্যা হয়েছে তার চোখে পানি এসে যাচ্ছেসাহেবের সামনে কেঁদে ফেলা মােটেই ঠিক হবে নাব্যাটা একগাদা প্রশ্ন করবেসত্য কথা বলা হচ্ছে  কি মিথ্যা বলা হচ্ছে এই নিয়ে ঝামেলা করবেপয়সার যে কাজটা করতে হবে তা হচ্ছে ব্যাটা যাতে কিছু বুঝতে না পারে সেইভাবে মাথার স্কার্ফটা হাতে নিতে হবেসেই স্কার্ফ মাথায় জড়াবার সময় কৌশল করে এক ফাঁকে চোখ মুছে ফেলতে হবেসেটা কি সম্ভব হবে। পয়সা, তুমি কাঁদছ কেন ? কাদছি না। 

অবশ্যই কাঁদছতােমার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছেকেন কাঁদছ ? জানি না কেন কাঁদছিঅবশ্যই তুমি জানােজানলে জানিআপনার কী ? আমাকে বলবে না , আমি বলব নাআটটা বেজে গেছেবাবুর্চি কফি নিয়ে এসেছেসে এমনভাবে পয়সার দিকে তাকাচ্ছে যেন চোখের সামনে ভূত দেখছেসার্কাসের একটা মেয়ে চিফ ইঞ্জিনিয়ারের ঘরে বসে আছেভেউ ভেউ করে কাঁদছেএর মানে কী ?

আসমানীরা তিন বােন শেষ:পর্ব

নি পাের্টার বলল, রহমত উল্লাহ, তুমি আরেক কাপ কফি নিয়ে এসােমিস কয়েন আমার সঙ্গে নাশতা করবে সেই ব্যবস্থা করআজ আমার সাইটে যেতে দেরি হবে এই খবরটা দিয়ে এসােআর শােন, তুমি এক দৃষ্টিতে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে আছ কেন ? কারাে দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলে সে খুব অস্বস্তি বােধ করেএবং এটা অদ্রতা। 

রহমত উল্লাহ পয়সার মুখ থেকে চোখ না নামিয়েই বলল, জি স্যার। পয়সা নিজেকে সামলে নিয়েছেসে এখন সহজ এবং স্বাভাবিকগুট গুট করে গল্প করছেহাসছেযেন এই তাবুই তার ঘরবাড়িগল্প শেষ করেই সে যেন তাবু গুছাতে শুরু করবেময়লা কাপড় ধােয়ার জন্যে আলাদা করবে। 

পয়সা বলল, আচ্ছা আপনি কি লক্ষ করেছেন আমরা তিন বােন যখন দড়ির খেলা দেখাই তখন একটা সময় তিন বােন দড়ির মাঝামাঝি চলে আসি এবং কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকিতখন আমাদের তিন বােনেরই চোখ বন্ধ থাকে। আমি লক্ষ করি নিসার্কাস দেখতে আরেকদিন যখন আসবেন তখন লক্ষ করবেন। 

অবশ্যই লক্ষ করবআমরা তিন বােন চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি কেন জানতে চান ? হ্যা, জানতে চাই। আমরা তিন বােন তখন আল্লাহর কাছে একটা প্রার্থনা করিআমরা আল্লাহকে বলিআল্লাহপাক, তুমি আমাদের বাবামাকে ফিরিয়ে এনে দাওআবার যেন আমরা এক সঙ্গে হতে পারি। তােমার বাবামা কোথায় গেছেন

 

Read more

ইমা পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *