যেন এক মজার খেলা। এক সময় লিলিয়ান লক্ষ্য করল সে লােহার পঁাচানাে সিড়িতে দাঁড়িয়ে। বাইরের অন্ধকার গাঢ় নয়। অস্পষ্টভাবে সব কিছুই দেখা যাচ্ছে। এখন আর কেউ তার হাত ধরে নেই। এতক্ষণ যা ঘটেছিল সবই কল্পনা।

মস্তিষ্ক তার নিজস্ব নিয়মে তৈরি করেছে বিভ্রম, এবং তাকে নিয়ে এসেছে ঘরের বাইরে। অশরীরি বলে কিছু নেই, কিছু থাকতে পারে না। লিলিয়ান খুব সাবধানে লােহার সিঁড়ি দিয়ে নামছে এতটুকু শব্দও যেন না হয়। তাকে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যেতে হবে। অনেক দূর যেতে হবে, যেন কেউ তার নাগাল না পায়। সিড়ি এত দুলছে কেন? মনে হচ্ছে ভেঙে পড়ে যাবে। খুব হাওয়া। উড়িয়ে নিয়ে যাবার মত হাওয়া। এই ব্যাপারগুলি তাে স্বপ্নে ঘটেছিল। এখনো কি সে স্বপ্ন দেখছে? পুরােটাই কি স্বপ্ন ? লিলিয়ানের শরীর অবসন্ন, অসম্ভব ক্লান্ত। ঘুমে চোখ জড়িয়ে আসছে। ইচ্ছা করছে সিড়ির রেলিং জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে পড়ে। মনে হচ্ছে সে জেগে আছে হাজার বছর ধরে।
সে একতলায় নেমে এসেছে। তার সামনেই এ বাড়ির ভাঙা প্রাচীর। ফিসফিস কথা শােনা যাচ্ছে। নিচেও কি কেউ অপেক্ষা করছে তার জন্যে? না–কি ওরাই নেমে এসেছে নিচে? দোতলা থেকে টর্চের আলাে ফেলল সিড়িতে। আলাে এদিক–ওদিক যাচ্ছে। খুঁজে বেড়াচ্ছে লিলিয়ানকে। আর একটু হলেই সে আলাে পড়ত লিলিয়ানের মুখে। লিলিয়ান ক্লান্ত গলায় ফিসফিস করে বলল, “আমাকে সাহায্য করুন। আমাকে সাহায্য করুন, Please help me. ”
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
কার কাছে সে সাহায্য চেয়েছে ? উত্তেজিত বিভ্রান্ত মস্তিষ্কের কাছে, না–কি যে অশরীরি নারী তার হাত ধরেছিল তার কাছে। লিলিয়ান জানে না। সে জানতেও চায়।
প্রয়ােজন হলে সে চোখ বন্ধ করে থাকবে। অশরীরি নারীমূর্তি তার হাত ধরে টেনে নিয়ে যাক। লিলিয়ান আবারাে বলল, আপনি কোথায়? আপনি আমাকে সাহায্য করুন।
আর ঠিক তখন সে নারীমূর্তিকে দেখতে পেল। ভাঙা দেয়ালের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রকাণ্ড শিরীষ গাছের আড়ালে সে দাঁড়িয়ে। সে হাত ইশারায় লিলিয়ানকে ডাকল। লিলিয়ান মন্ত্রমুগ্ধের মত এগিয়ে গেল।
নারীমূর্তি সহজ স্বাভাবিক ভঙ্গিতে আগে আগে যাচ্ছে। পেছনে পেছনে এগুচ্ছে লিলিয়ান। পাঁচিলের বাইরে এসেই নারীমূর্তি ছুটতে শুরু করল। সে লিলিয়ানকে কিছুই বলেনি। তবু লিলিয়ানের মনে হল তাকে যেন এই অশরীরি মূর্তি বলছে –
ভয় পেও না। তুমি আমার পেছনে পেছনে দৌড়াতে থাক।
আমবাগান ছাড়িয়ে, খােলা মাঠ, আবার খানিক ঝোপঝাড়, চষা ক্ষেত। নারীমূর্তি দ্রুত ছুটছে। একবারও পেছন ফিরে তাকাচ্ছে না। লিলিয়ান কাতর গলায় বলল, পারছি না। আমি পারছি না একটু থামুন, please একটু থামুন। নারীমূর্তি থামছে না। ছুটছে, আরাে দ্রুত ছুটছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
তারা একসময় চলে এল নদীর তীরে। আর তখনি মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ স্পষ্ট হল। ঝলমল করে উঠল নদী ও নদীর ওপাশের বনভূমি। নারীমূর্তি থমকে দাঁড়িয়েছে। হাত ইশারায় নদীর তীরে পড়ে থাকা কি একটা যেন দেখাচ্ছে। লিলিয়ান সেদিকে তাকাচ্ছে না। সে মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে আছে নারীমূর্তির দিকে।
কি সুন্দর মায়াময় একটি মুখ। লম্বা বিনুনী করা চুল। শাড়ির আঁচল হাওয়ায় উড়ছে। লিলিয়ান বলল, আপনি কে? আপনি কি আমার কল্পনা না–কি সত্যি কিছু?
নারীমূর্তি হাসল। কি সুন্দর সে হাসি। লিলিয়ান হাসির শব্দও শুনল। • ‘আপনি কি বলবেন না আপনি কে ?
ছায়ামূর্তি নসূচক মাথা নাড়ল এবং প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই যেদিক থেকে এসেছিল সেদিকে ছুটতে শুরু করল। লিলিয়ান চেঁচিয়ে বলল, আপনি কোথায় যাচ্ছেন?
ছায়ামূর্তি ছুটতে ছুটতে কি যেন বলল, বাতাসের শব্দে তা শােনা গেল না।
লিলিয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখ ফিরিয়ে নিতে পারছে না। চোখ ফিরিয়ে নিয়ে আশেপাশে তাকালেই দেখতে পেত নদীর তীরে চিৎ হয়ে যে মানুষটি শুয়ে আছে সে তাহের। এখনাে তার দেহে প্রাণ আছে, সে বেঁচে যাবে সে নিশ্চয়ই বেঁচে যাবে।। | জ্যোৎস্না প্লাবিত জলরাশি, তার ধার ঘেঁসে ছুটে যাচ্ছে এক নারীমূর্তি। বাতাসে তার শাড়ির আঁচল উড়ছে। রিণরিণ করে বাজছে হাতের চুড়ি।
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
পনের বছর পর লিলিয়ান আবার তাহেরকে নিয়ে ইন্দারঘাটে এসেছে। তাদের সঙ্গে দু‘টি ফুটফুটে মেয়ে। এগার বছরের সারা, সাত বছরের রিয়া। দু‘জনই হয়েছে মারি মত, শুধু চোখ পেয়েছে বাবার। বড় বড় কালাে চোখ। মা’র নীল চোখ কেউই পায় নি। দু‘জনই খুব হাসিখুশি মেয়ে, কিন্তু এদের চোখের দিকে তাকালে মনে হয় – চোখ ভর্তি জল। এক্ষুণি বুঝি কাঁদবে।
তাদের আসা উপলক্ষে বাড়িঘর ঠিক করা হয়েছে। বাড়ির চারপাশের বাগান। পরিষ্কার করা হয়েছে। মেয়ে দুটি মহানন্দে বাগানে ছােটাছুটি করছে। রিয়া ছুটতে গিয়ে উল্টে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছে। হাঁটুর চামড়া ছিলে গেছে। কিন্তু রিয়া হাঁটু চেপে ধরে হাসছে। যেন এই বাগানবাড়িতে ব্যথা পাওয়াও এক আনন্দ জনক
অভিজ্ঞতা।
তাহের নিজেও বাগানে। সে খুব ব্যস্ত। আমগাছের ডালে দোলনা টানানাের চেষ্টা করছে। ডাল উঁচু। চেয়ারে দাঁড়িয়ে নাগাল পাওয়া যাচ্ছে না। বড় মেয়ে সারা বাবাকে সাহায্য করবার জন্য এগিয়ে এল। সে গম্ভীর গলায় বলল, বাবা শােন তুমি যদি দু’দিন পর বল, বেড়ান শেষ হয়েছে এখন আমেরিকা ফিরে যাব। তাহলে কিন্তু হবে না। আমরা খুব রাগ করব।
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
‘তাহলে আমাকে কি করতে হবে? ‘এখানে থাকতে হবে। ‘কতদিন?” For eternity.’
তাহের হাে–হাে শব্দে হাসছে। হাসির শব্দে লিলিয়ান এসে দোতলার বারান্দায় দাঁড়াল। তাহের উঁচু গলায় বলল, এই যে বিদেশিনী ! দয়া করে মগভর্তি কাপাচিনো কফি বানিয়ে নিচে এসে আমাকে সাহায্য কর।
‘এখন কফি বানান যাবে না। সরঞ্জাম নেই। ‘কোন অজুহাত শুনতে চাই না। কফি বানাতে হবে। ছােট মেয়ে রিয়া চেঁচিয়ে বলল, বাবার জন্যে কফি বানাতেই হবে। লিলিয়ান রান্নাঘরের দিকে গেল না। সে ঢুকল আয়নাঘরে। দরজা বন্ধ করে
দিল। অন্ধকার হয়ে গেল আয়নাঘর। সে গলার স্বর নামিয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলল, আপনাকে দেখানাের জন্যে আমি আমার বাচ্চা দু‘টিকে নিয়ে এসেছি। আপনি কি দেখেছেন তাদের ?
কেউ জবাব দিল না। লিলিয়ান বলল, আপনি কি তাদের একটু আদর করে দেবো না ?
নীরবতা ভঙ্গ হল না। আয়নাঘরের স্তব্ধতা ভাঙল না। লিলিয়ানের চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়ছে। পনের বছর আগে এক ভয়ংকর জটিল সময়ে কেউ একজন তার হাত ধরে বলার চেষ্টা করেছিল – কোন ভয় নেই। সেই দুঃসময় আজ আর তার নেই। জীবন তার মঙ্গলময় বিশাল বাহু মেলে লিলিয়ানকে জড়িয়ে ধরেছে। আজ আর আশ্বাসের বাণী শােনার তার প্রয়ােজন নেই। লিলিয়ান আবার বারান্দায় এসে দাঁড়াল। নিচে খুব মজা হচ্ছে। দোলনা তৈরি হয়ে গেছে। তাহের দোল খাচ্ছে।
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
মেয়েরা বাবাকে নামিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে, পারছে না। লিলিয়ান আপন মনে বলল, আমি কেউ না, অতি তুচ্ছ একজন, তবু ঈশ্বর কেন এত সুখ আমার জন্যে রেখেছেন? খুট করে শব্দ হল। আয়নাঘরের দরজা খুলে গেল। লিলিয়ানের মনে হল, নূপুর পায়ে কে যেন আসছে তার দিকে। এই তাে লিলিয়ান তার পা ফেলার ছােট ছােট শব্দ শুনতে পাচ্ছে। লিলিয়ান বাগানের দিকে ইশারা করে স্পষ্ট স্বরে বলল – ঐ দেখুন ও হচ্ছে সারা। আমার বড় মেয়ে। আর নীল জামা পরা মেয়েটা রিয়া। দুজনই খুব দুষ্টু।
আয়নাঘর-পর্ব-(শেষ)-হুমায়ূন আহমেদ
তাহের দোল খাওয়া বন্ধ করে উঁচু গলায় বলল, মেয়েরা! তােমাদের মাকে দেখ। অকারণে কাঁদছে। ব্যাপারটা কি বল তো, এই মহিলার অকারণে কাঁদার রােগ আছে। আগেও কয়েকবার লক্ষ্য করেছি। রিয়া বড়দের মত গম্ভীর গলায় বলল, আমার মনে হয় মা’র চোখে কোন প্রবলেম আছে।
লিলিয়ান খুব কাঁদছে। অসম্ভব সুন্দর এই দিনে কেউ কাঁদে না। লিলিয়ান কাঁদছে, কাঁদতে তার বড় ভাল লাগছে।
Read more
