আয়নাঘর-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

আয়নাঘর-হুমায়ূন আহমেদ

আমি আমেরিকা ফিরে যাচ্ছি। দ্বিতীয় কাজ, ট্রাভেল এজেন্সিতে টেলিফোন করে বলল, আমি আমার স্ত্রীকে নিয়ে দু‘মাস ঘুরে বেড়াব। খুব ইন্টারেস্টিং একটা ট্যুর প্ল্যান তুমি তৈরি করে দাও।

আয়নাঘর

ট্যুর প্ল্যানে সমুদ্র, পাহাড়, অরণ্য – এই তিনটি জিনিসই। থাকতে হবে। আমরা বিয়ের পর একসঙ্গে বাইরে কোথাও যাই নি। এটা হবে আমাদের হানিমুন ট্যুর। 

‘অ্যাডভেঞ্চার চাও – না smooth প্ল্যান চাও ?” ‘দুই–ই চাই‘। ‘ট্যুর প্ল্যানে হােটেলের ব্যবস্থাও থাকবে ? ‘হ্যা থাকবে। ‘ইকনমি হােটেল – না এক্সপেনসিভ হােটেল ?” 

‘এক্সপেনসিভ হােটেল। ইকনমি হােটেলে আমি থাকতে পারি না – দম বন্ধ হয়ে আসে। 

‘কোন্ মহাদেশ ঘুরতে চাও? ইউরােপ, এশিয়া ও ইণ্ডিয়া দেখে আস। ইণ্ডিয়া এবং নেপাল। পাহাড়, সমুদ্র, অরণ্য – সবই পাবে। তাজমহল আছে – সপ্তম আশ্চর্য ... 

তাহের হঠাৎ তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, তুমি বরং আমাদের দু‘জনের জন্যে বাংলাদেশে একটা ট্যুরের ব্যবস্থা কর। 

আয়নাঘর-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

‘বাংলাদেশ খুব ইন্টারেস্টিং হবে বলে আমার মনে হয় না। ‘আমার নিজেরাে মনে হয় না। তবু কর। ‘পুরাে ট্যুরটাই হবে বাংলাদেশে? 

‘কিছু মনে করবে না – বাংলাদেশে হানিমুন ট্যুরে যেতে চাওয়ার কারণ কি জানতে পারি? 

‘হ্যা পার। এটা আমার নিজের দেশ। হাে হাে হাে। হা হা হা। 

অনেকদিন পর তাহের প্রাণখুলে হাসল। অনেক কষ্টে হাসি থামিয়ে বলল, হ্যালাে মিস, আমাকে মন্টানা যাবার একটা টিকিটের ব্যবস্থা করে দাও। এমনভাবে করবে যেন আমি রাতদুপুরে উপস্থিত হতে পারি। আমি আমার স্ত্রীকে চমকে দিতে চাই। হা হা হা। 

রাত তিনটায় লিলিয়ান দরজা খুলল। 

তাহের দাড়িয়ে আছে। বাচ্চাদের খেলনার দোকান থেকে অদ্ভুত একটা মুখােশ কিনে মুখে পরেছে। মুখােশে তাকে ভয়ংকর দেখানাের কথা। কেন জানি তা দেখাচ্ছে না। বরং হাস্যকর লাগছে। লিলিয়ান শিশুদের মত চেঁচিয়ে উঠে বলল – এ কি ! তুমি ? 

তাহের মুখােশের আড়াল থেকে হাসতে হাসতে বলল, ইয়েস বিদেশিনী, আমি। ‘চলে এলে যে? “তােমাকে দেখতে এলাম, তুমি কেমন আছ?” 

লিলিয়ান ঝলমলে গলায় বলল, খুব খারাপ ছিলাম। এখন আর খারাপ নেই। আমি এখন ভাল আছি। খুব ভাল আছি। | ‘ভাল থাকলে চমৎকার করে কাপাচিনাে কফি বানাও। প্রচুর ফেনা যেন হয়, এবং জিনিসপত্র গােছগাছ করা শুরু কর।”

আয়নাঘর-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

‘আমরা কোথায় যাচ্ছি? ‘আমরা যাচ্ছি বাংলাদেশের একটি জেলা নেত্রকোনায়। নেত্রকোনা থেকে নান্দাইল রােড স্টেশন বলে অখ্যাত একটা রেল স্টেশনে। সেখান থেকেও কুড়ি মাইল দূরের অতি দুর্গম এক স্থানে। যেখানে আমার পূর্বপুরুষরা বােকার মত এক বিশাল অট্টালিকা বানিয়েছিলেন। সেই অট্টালিকার ধ্বংসাবশেষ তােমাকে দেখিয়ে নিয়ে আসব। ঐ অঞ্চলে পৌঁছতে যেসব যানবাহনে আমরা চড়ব সে সব হচ্ছে – প্লেন, রেল, নৌকা, মহিষের গাড়ি, সবশেষে ‘হন্টন। 

‘হন্টন মানে কি? 

‘হন্টন মানে আমি বলব না। বাংলাদেশে যাচ্ছ, কাজেই এখন থেকে কথাবার্তা হবে বাংলায়। তুমি বুঝতে পারলে ভাল কথা, বুঝতে না পারলে নেই। 

‘এত দ্রুত কথা বললে বুঝব কি করে? স্লোলি বল, আমি সবই বুঝব। 

‘বাংলা এমনই ভাষা যা স্লো বলা যায় না। অতি দ্রুত বলতে হয়। দ্রুত কথা বলা শিখে নাও। আমাদের দেশের লােকজন কাজকর্ম করে ঢিমাতালে কিন্তু কথা বলে দ্রুত — হা হা হা। 

রেল, নৌকা, মহিষের গাড়ি এবং হন্টনের কথা বলা হলেও ট্রেন থেকে নেমে সরাসরি নৌকা নিয়ে বাড়ির ঘাটে যাওয়া যায়। ঘাটের নাম ইন্দারঘাট, গ্রাম তিলতলা। তাহের নৌকা নিয়েছে, ঠাকরাকোনা থেকে ইন্দারঘাট যাবে। দুই মাঝির নৌকা। দুই মাঝির। একজনের বয়স দশ–এগার। সে আবার দার্শনিক প্রকৃতির। বেশির ভাগ সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকে। প্রশ্ন করলে মুখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে নেয়। তার নীরবতা অন্যজন পুষিয়ে দেয়। একটা কথা জিজ্ঞেস করলে দশটা কথা বলে।

আয়নাঘর-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

তাহের বলল, কতক্ষণ লাগবে? 

বালক মাঝি উত্তর দিল না, মুখ ঘুরিয়ে নিল। বালক মাঝির বাবা হাসিমুখে বলল, একটানে লইয়া যামু। একটানের মামলা। 

‘টান দিতে পারবেন তাে? আপনার নিজের অবস্থা দেখছি কাহিল – ছেলেটাও নিতান্তই শিশু। 

‘বিছনা কইরা দিতাছি। শুইয়া ঘুমান। ইন্দারঘাটে ঘুম থাইক্যা ডাইক্যা তুলব। সাথের মেমসাব আফনের কি লাগে?”। 

‘আমার স্ত্রী। 

‘গত বছর একজন মেমসাব দেখছিলাম। হাফপেন্ট পরা। নবীনগর হাটবারে মােটর সাইকেল নিয়া আসছে। একটা কুমড়া কিনছে। কুমড়া এরা খুব ভাল পায়।। শখ কইরা খায়। 

‘আপনি নৌকা ছাড়ার ব্যবস্থা করুন তাে দেখি।‘ ‘সব ব্যবস্থা হইতেছে। নূর মিয়ার নৌকায় উঠছেন। আর চিন্তার কিছু নাই। – 

নৌকা ছাড়ার পর মনে হল চিন্তার অনেক কিছুই আছে। নূর মিয়া নিজে কিছুই করছে না, হাল ধরে বসে আছে। বাচ্চা ছেলে একা দাড় টেনে নিয়ে যাচ্ছে। দশ মাইল পথ যেতে দীর্ঘ সময় লাগবে। দিনে দিনে পৌছানাের আশা মনে হচ্ছে ছেড়ে দিতে হবে। | লিলিয়ান খুব আগ্রহ নিয়ে নদী দেখছে। তার কেমন লাগছে বােঝা যাচ্ছে না। কালাে চশমায় তার চোখ ঢাকা। তাহের বলল, কেমন লাগছে লিলিয়ান ?

আয়নাঘর-পর্ব-(১৩)-হুমায়ূন আহমেদ

‘খুব ভাল লাগছে – অদ্ভুত লাগছে। আশা করি খুব অল্প সময়ের মধ্যে এই জার্নি শেষ হবে না। 

না, এই জার্নি বলতে গেলে অনন্তকাল ধরে চলবে। তুমি ইচ্ছা করলে ঘুমিয়ে পড়তে পার। 

‘আমি ঘুমুব না। ‘খিদে পেয়েছে ? 

‘স্টেশনে কিছু খেয়ে নেয়া দরকার ছিল। অল্পক্ষণের ভেতর খিদে পাবে। তখন নদীর পানি ছাড়া কিছুই খেতে পারবে না। নূর মিয়া তাদের দিকে তাকিয়ে হাসিমুখে বলল, খাওয়া–দাওয়া নিয়া কোন চিন্তা কইরেন না। বসিরহাট বাজারে নৌকা ভিরামু। বাজার সদাই কইরা রান্ধা চাপামু, খাওয়া–দাওয়া শেষ কইরা বেলাবেলি চইল্যা যামু ইন্দারঘাট। একটানের মামলা। 

তাহের দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। তার কাছে মনে হচ্ছে নূর মিয়া খুব যন্ত্রণ করবে। তাদের প্রতিটি কথায় অংশগ্রহণ করবে। নিজস্ব মতামত দেবে। রান্নাবান্নায় অনেক সময় নষ্ট করার পরিকল্পনাও নূর মিয়ার আছে বলে মনে হচ্ছে। 

‘স্যার, আপনের পরিবার বাংলা কথা কয়?” 

‘ঐ মটর সাইকেলের মেমসাবও বাংলায় কথা কয়। কুমড়া কিনতে গিয়া পরিষ্কার বলছে – কুমড়ার কত দাম?” 

“ঠিকমত নৌকা চালান নূর মিয়া। বেশি কথা বলার দরকার নেই। 

‘এইটা স্যার আপনার বলা লাগব না। বেশি কথার মইদ্যে নূর মিয়া নাই। দেশটা নষ্ট হইতাছে অধিক কথার কারণে।

 

Read more

আয়নাঘর-পর্ব-(১৪)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *