দু বছরের মাথায় সাব্বির দেশে এল। রহমান সাহেবের জন্যে প্রচুর উপহার নিয়ে এল। সাৰ্বিরের আত্মীয়স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ হল তখন। পি-এইচ.ডি শেষ করে আবার সে দেশে এল। শারমিনের সঙ্গে বিয়ের কথাবার্তা হল সেই সময়। শারমিন তখন মাত্র কলেজে। সেকেণ্ড ইয়ারে উঠেছে।দুপুরের খাওয়া সারতে-সারতে দুটা বেজে গেল। খাবার টেবিলে সাব্বির খুব গম্ভীর হয়ে রইল। রহমান সাহেব বললেন, তোমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী? কোন পরিকল্পনার কথা বলছেন? আমেরিকাতেই থাকবে, না দেশে আসবে?
দেশে আসব। আমেরিকায় থাকব। কেন? পোস্ট ডক শেষ করে ফিরব। এখানকার ইউনিভার্সিটিতে সহজেই আমার চাকরি হবার কথা।অনেকেই তো ফিরতে চায় না।আমি চাই। বিদেশের জন্যে আমার কোনো মোহ নেই।শারমিন বলল, আপনি এত তাড়াহুড়া করছেন কেন, আস্তে আস্তে খান।দেরি হয়ে যাচ্ছে। জামালপুর যেতে হবে তো।আজ না গেলে হয় না? আমার হাতে সময় বেশি নেই। আজই যাব। বাসে করে চলে যাব।রহমান সাহেব বললেন, বাসে যেতে হবে না। ড্রাইভারকে বলে দিচ্ছি, ও তোমাকে নিয়ে যাবে। তিনটা সাড়ে-তিনটার দিকে রওনা হলেই হবে, তুমি কিছুক্ষণ বিশ্রাম কর।সাব্বিরকে বিশ্রামের ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী বলে মনে হল না। যেন এই মুহূর্তে তার রওনা হওয়া দরকার। শারমিন বলল, আপনি কি সব সময়ই এমন ছটফট করেন?
তা করি।এ রকম ভাব করছেন, যেন দু মিনিটের মধ্যে আপনার গাড়ি ছেড়ে দিচ্ছে। আপনি আরাম করে বসুন তো, আমি চা এনে দিচ্ছি। শান্ত হয়ে চা খান।চা আন। আমি বসছি শান্ত হয়ে।আর শোনেন সাব্বির ভাই, আপনি তো গাড়ি চালাতে জানেন? জানি। কেন? আপনি আবার বাহাদুরি করে গাড়ি চালাতে যাবেন না। যা ছটফটে স্বভাব আপনার, এ্যাকসিডেন্ট করবেন।সাৰ্বির হেসে ফেলল এবং পরীক্ষণেই গম্ভীর হয়ে বলল, শারমিন, তুমিও চল না। আমার সঙ্গে, মা খুব খুশি হবে।শারমিন হকচকিয়ে গেল।গাড়ি যখন যাচ্ছে, তখন তো অসুবিধা হবার কথা নয়।না-না, আমি এখন যাব না।কেন, অসুবিধাটা কী?
শারমিন কী বলবে ভেবে পেল না। সাব্বির বলল, গল্প করতে—করতে যাব, তোমার ভালোই লাগবে।চট করে রেডি হওয়া যাবে না। তৈরি হতেও সময় লাগবে! বেশ তো, না হয়। কাল সকালে যাই। তৈরি হবার সময় পাবে। পাবে না? শারমিন বিব্রত স্বরে বলল, আমি এখন যাব না, সাব্বির ভাই।কেন? আমার যেতে ইচ্ছা করছে না।সাব্বিরকে দেখে মনে হল, তার আশাভঙ্গ হয়েছে। যেন সে ধরেই নিয়েছিল শারমিন যাবে।বিকেলে শারমিনের নিজেরও কেমন যেন নিঃসঙ্গ লাগতে লাগল। মনে হল—গেলেই হত। যার সঙ্গে সারা জীবন কাটানো হবে, তার সঙ্গে বিয়ের আগে কিছু সময় কাটানোয় এমন কোনো মহাভারত অশুদ্ধ হত না। নাকি হত?
শারমিন বাগানে বেড়াতে গেল।মার্টি বরই গাছের নিচে গা এলিয়ে শুয়ে আছে। সারা গা কাদায় মাখামাখি।এই মাটি, তোমার এ কি অবস্থা।মার্টি শুয়েই রইল, ছুটে এল না। ওর শরীর ভালো নেই। শরীর ভালো থাকলে এভাবে শুয়ে থাকতে পারত না। ডাকামাত্র ছুটে আসত। শারমিন তীক্ষ্ণ কণ্ঠে ডাকল, জয়নাল, জয়নাল।জয়নাল অল্প কিছু দিন হল চাকরিতে যোগ দিয়েছে। তার আসল কাজ হচ্ছে মাটির দেখাশোনা। একটি কুকুরকে দেখাশোনার কাজ তার কাছে খুব অপমানজনক মনে হয়েছে বলেই বোধহয় সে কখনো মাটির ধারে কাছে থাকে না। আজও ছিল না। শারমিনের গলা শুনে ছুটে এল।মার্টিকে গোসল করিয়েছিলে?
জ্বি, আফা।ওর গা এত ময়লা কেন? কাদার মইধ্যে খালি গড়াগড়ি করে। কি করমু আফা।যাও, আবার ওকে পরিষ্কার কর। মাটি উঠে আয়।মাটি উঠে এল না। ঝিমুতে লাগল। জয়নাল বলল, এ আর বাঁচত না, আফা!বুঝলে কী করে? লেজ নাইম্যা গেছে দেখেন না? লেজ নামলে কুত্তা বাঁচে না।জয়নালকে খুব উল্লসিত মনে হল। যেন সে একটা সুসংবাদ দিচ্ছে।জয়নাল।জ্বি আফা।কাল ভোরেই ওকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে।জ্বি, আইচ্ছা।খাওয়াদাওয়া করছে ঠিকমতো? জ্বি, করতাছে।রাতের খাবার কখন দেওয়া হবে? সইন্ধ্যাবেলা।আমাকে খবর দেবে তখন। আমি দেখব ঠিকমত খায় কিনা।শারামিনের অত্যন্ত মন খারাপ হয়ে গেল। মাটি কি সত্যি সত্যি মারা যাবে? মৃত্যুর পর পশুরা কোথায় যায়? ওদেরও কি কোনো স্বৰ্গ-নরক
শারমিন দোতলায় উঠে গেল। বাড়ি এখন একেবারে খালি। বাবা গিয়েছেন মতিঝিল। কখন আসবেন কোনো ঠিক নেই। কী একটা মিটিং নাকি আছে। এসব মিটিং শেষ হতে অনেক দেরি হয়। কোনো কোনো দিন ফিরতে রাত একটা-দেড়টা বেজে যায়। আজও হয়তো হবে। শারমিন কিছুক্ষণ একা একা বারান্দায় বসে রইল। কেমন যেন ক্লান্ত লাগছে। সবচে বড়ো কথা কিছুই করার নেই।লাইব্রেরি থেকে একগাদা বই, আনা হয়েছে। কোনোটাই পড়া হয় নি। মাঝে মাঝে এমন খারাপ সময় আসে, কোনো কিছুতেই মন বসে না। বেঁচে থাকা অর্থহীন মনে হয়।সন্ধ্যা হয়ে আসছে। মার্টিকে খাওয়াবার সময় হয়েছে বোধহয়। শারমিন নিচে নেমে এল, এবং অবাক হয়ে দেখল রফিক বসে আছে।আরে, তুমি কখন এসেছ? প্রায় মিনিট পাঁচেক। দেখলাম দরজা খোলা, আশেপাশে কেউ নেই। চুপচাপ বসে আছি।ভালো করেছি। এস আমার সঙ্গে।কোথায়?
মাটি সাহেবকে ডিনার দেয়া হবে। আমরা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব।কুকুর খাবে আর আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখব, এত শখ আমার নেই। তুমি খাইয়ে আসা। আমি বসছি। এখানে! অসময়ে হঠাৎ কোত্থেকে এলে? রফিক গম্ভীর হয়ে বলল, এখানে এক বন্ধুর বাসায় এসেছিলাম, তারপর ভাবলাম এসেছি। যখন, তখন দেখা করে যাই।বাজে কথা বলবে না। এখানে তোমার কোনো বন্ধুর বাসা নেই। তুমি আমার কাছেই এসেছিলে। ঠিক কিনা বল।রফিক কিছু বলল না। শারমিন বলল, চা খাবে? খাব।চায়ের সঙ্গে আর কিছু? খাব, তবে মিষ্টি না। আমি মিষ্টি খাই না। ঘরে তৈরি সন্দেশও না।তোমাকে রোগ লাগছে কোন রফিক? ভাবীকে নিয়ে রাজশাহী গিয়েছিলাম। এক সপ্তাহ খুব ছোটাছুটি করেছি। ভাবীর এক বোন মারা গেছে। একটা ছোট্ট ছেলে আছে তার। ছেলেটিকে নিয়ে এমন মুশকিলে পড়েছে সবাই! মুশকিল কেন?
কোথায় রাখবে, কার কাছ রাখবে-এত ছোট বাচ্চার দায়িত্ব কেউ নিতে চাচ্ছে না।বল কি।দ্যাটস ফ্যাকট। তোমাদের মাটির জন্যে নিশ্চয়ই তিন-চার জন লোক আছে। কিন্তু এই বাচ্চাটির জন্যে কেউ নেই।শারমিন কিছু বলল না। রফিক বলল, রাগ করলে নাকি? না, রাগ করিনি। তুমি বস, চা নিয়ে আসছি। দুধ-চা না লেবু-চা? আদা-চা। গলা খুশখুশ করছে।রফিক ভেবেছিল দশোক গল্পসল্প করে চলে যাবে, কিন্তু সে রাত আটটা পর্যন্ত থাকল। এর মধ্যে যে কবারই সে উঠতে চেয়েছে, শারমিন বলেছে, আহ, বস না। এত ব্যস্ত কেন? রাত হয়ে যাচ্ছে, অনেক দূর যাব।যাবার ব্যবস্থা আমি করব। আজ আমার সঙ্গে ভাত খাবে।সে কি, কেন? কেন আবার কি? খেতে বলেছি তাই খাবে।তোমাদের রান্না কী? জানি না কি।তোমাদের কখন কী রান্না হয় তা তোমরা জান না? শারমিন কিছু বলল না।খাও কিসে? রুপোর থালাবাটিতে?
বকবক করবে না। খেতে বসলেই টের পাবে কিসে খাই।খাওয়াটা হবে কখন? একটু দেরি হবে। বাবুর্চিকে নতুন একটা আইটেম রান্না করতে বলেছি।আইটেমটি কী? খেতে বসলেই টের পাবে! এখন আমার সঙ্গে এস, মার্টিকে খাওয়ান হবে।আসতেই হবে? হ্যাঁ, আসতেই হবে।রহমান সাহেব ফিরলেন রাত দশটায়। শারমিন একটি ছেলের সঙ্গে ডিনার খাচ্ছে, এবং কিছুক্ষণ পরপর শব্দ করে হেসে উঠছে। এই দৃশ্যটি তিনি অবাক হয়ে দেখলেন। শারমিন বাবাকে দেখতে পায় নি।রহমান সাহেব নিঃশব্দে দোতলায় উঠে গেলেন। তাঁর কপালে সূক্ষ্ম কিছু ভাঁজ পড়ল।মনোয়ারার গাল ফুলে একটা বিশ্ৰী কাণ্ড হয়েছে।
সারা দিন কিছুই মুখে দেন নি। ব্যথায় ছটফট করেছেন। ব্যথা কমানোর কোনো ওষুধ কাজ করছে বলে মনে হচ্ছে না।সবচে মুশকিল হয়েছে হোসেন সাহেবের। তাঁকে দেখামাত্র মনোয়ারার রাগ চড়ে যাচ্ছে। যা মনে আসছে, তাই বলছেন। হোসেন সাহেব অনেকক্ষণ সহ্য করলেন। কিন্তু এক সময় স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁর ধৈর্য্যচ্যুতি হল। তিনি থমথমে মুখে বললেন, আমার উপর রাগ করছ, কেন? তোমার দাঁতব্যথা তো আমি তৈরি করিনি। সে-রকম কোনো ইচ্ছা আমার নেই।মনোয়ারা চোখ-মুখ কুঁচকে বললেন, আমার সামনে থেকে যাও তো। শুধু শুধু ভ্যাজভ্যাজ করবে না।যাবিটা কোথায়? যেখানে ইচ্ছা যাও। শুধু চোখের সামনে থাকবে না।আই সি। .কী, দাঁড়িয়ে আছ কেন? যাচ্ছি, শেষে আফসোস করবে কিন্তু।
হোসেন সাহেব কিছুক্ষণ গুম হয়ে রইলেন। নীলু কাপড় ইন্ত্রি করছিল, তাকে গিয়ে বললেন, চললাম মা। নীলু আশ্চর্য হয়ে বলল, কোথায় চললেন? তিনি তার জবাব দিলেন না। অনেক সময় নিয়ে হ্যাণ্ডব্যাগ গোছালেন এবং এক সময় সত্যি সত্যি বেরিয়ে গেলেন।নীলু খুব একটা বিচলিত হল না। হোসেন সাহেব প্রায়ই এ রকম গৃহত্যাগ করেন, ঘণ্টা দু-এক রাস্তায় ঘোরাঘুরি করেন এবং এক সময় বাড়ি ফিরে আসেন। এবারও তার ব্যতিক্রম হবে না।অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার হচ্ছে, হোসেন সাহেবের গৃহত্যাগের কিছুক্ষণের ভেতরই মনোয়ারার দাঁতের ব্যথার আরাম হল। তিনি এক কাপ লেবু-চা এবং দু স্নাইস রুটি খেলেন। রাতের বেলা কী রান্না হচ্ছে খোঁজ নিলেন, তারপর শাহানার সঙ্গে ছোটখাটো একটা ঝগড়া বাধিয়ে বসলেন। ঝগড়া বাধানোর ইচ্ছা তাঁর ছিল না। তিনি বেশ স্বাভাবিকভাবেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, তোদের রেজাল্ট বেরুতে এত দেরি হচ্ছে কেন?
শাহানা গম্ভীর গলায় বলল, আমি কী করে বলব। এত দেরি হচ্ছে কেন।মনোয়ারা অবাক হয়ে বললেন, তুই এমন ক্যাটক্যাট করে কথা বলছিস কেন? একটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করলাম, আর ছ্যাৎ করে উঠলি? তোর সঙ্গে কি কথাও বলা যাবে না? শাহানা থমথমে মুখে তাকাল। তিনি তীক্ষ্ণ কষ্ঠে বললেন, তোর তেল বেশি হয়েছে। কাজকর্ম নেই তো, শুধু বসে বসে খাওয়া। বসে-বসে খেলে এমন তেল হয়ে যায়।এ-রকম বাজে করে তুমি আমার সঙ্গে কথা বলবে না, মা।বাজে করে কথা বলব না? না।কেন? তুই কি রানী ভিকটোরিয়া?
হ্যাঁ, আমি রানী ভিকটোরিয়া।চড় দিয়ে দাঁত ফেলে দেব। মুখে-মুখে কথা।শাহানা নিঃশব্দে উঠে গিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে পড়ল, এবং দরজা বন্ধ করে দিল। শাহানার দরজা বন্ধ করা একটা ভয়াবহ ব্যাপার, সহজে এ দরজা সে খুলবে না। ক্রমাগত দুদিন দু রাত দরজা বন্ধ রাখার রেকর্ড তার আছে। এ দরজা কবে খুলবে কে জানে।মনোয়ারা কিছুক্ষণ কাঁদলেন, তারপর নিজের ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়লেন।নীলু বড়ো অস্বস্তির মধ্যে পড়ল। এ বাড়ির সবার এখন মেজাজ খারাপ যাচ্ছে। তুচ্ছ ব্যাপার নিয়ে রাগোরাগি। নীলুর নিজের মন-মেজাজও ভালো না। এসব নিয়ে মাথা ঘামাতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু মাথা ঘামাতে হয়, এক-এক করে সবার রাগ ভাঙাতে হয়। ভালো লাগে না।
সংসারে অভাব-অনটন বাড়ছে। অনেক চেষ্টা করেও কিছু করা যাচ্ছে না। প্রভিডেন্ট ফাণ্ডের লোনের টাকা কাটতে শুরু করেছে। বাড়িভাড়া বেড়েছে এক শ টাকা। নীলুর ধারণা ছিল, খুব সহজেই রফিকের চাকরি হয়ে যাবে। ধারণা ঠিক হয় নি। রফিকের কিছুই হচ্ছে না। সপ্তাহে দু-তিনটা করে ইন্টারভ্যু দিয়ে হাসিমুখে ঘরে ফিরছে, ভাবী, একেবারে মেরেকেটে দিয়েছি।তাই নাকি? ইয়েস। স্মার্টলি সব প্রশ্নের উত্তর দিলাম! যেখানে হাসার দরকার সেখানে মৃদু হাসলাম। যেখানে গভীর হওয়ার দরকার সেখানে গম্ভীর হলাম।পেরেছ সবকিছু? এইট্টি পারসেন্ট পেরেছি। যেগুলি পারিনি, সেগুলি পারার কথা নয়।চাকরি হবে বলছ? এক জনের হলেও আমার হবে।বল কি! দ্যাটস রাইট। এখন চট করে চা-সিগ্রেট খাওয়াও। আমাকে খুশি রাখার চেষ্টা কর। ভবিষ্যতে লাভ হবে। বেতনের দিন ভালোমন্দ কিছু পেয়েও যেতে পার।
শেষ পর্যন্ত অবশ্যি কিছুই হয় না। রফিক নতুন কোনো ইন্টারভুর জন্যে তৈরি হয়। নীলুর বড়ো মায়া লাগে। মনোয়ারা রাগারগি করেন, দুনিয়াসুদ্ধ লোকের চাকরি হয়, তোর হয় না কেন? হবে। আমারো হবে।কবে সেটা? ভেরি সুন। কোনো এক সুপ্রভাতে দেখবে রেজিস্ট্রি ডাকে চিঠি এসে হাজির? আমি আর দেখে যেতে পারব না।এখনো তো পাঁচ মাস হয় নি। পাশ করেছি, এর মধ্যে এত ব্যস্ত হয়ে পড়লে কেন? যারা হয় না পাঁচ মাসে, তার হয় না পাঁচ বছরে।চিঠি অবশ্যি একটা আসে রফিকের। রেজিস্ট্রি ডাকে নয়-সাধারণ ডাকে। মনসুর আলি কলেজের প্রিন্সিপ্যালের চিঠি। ইতিহাসের প্রভাষক পদে নিয়োগপত্র। যেতে হবে বরিশালের কোনো এক গ্রামে।নীলু জিজ্ঞেস করল, যাবে নাকি? যাব না মানে? অফ কোর্স যাব।থাকতে পারবে গ্রামে?
খুব পারব। গ্রামের ঠাণ্ডা আবহাওয়ায় বিসিএস-এর জন্য সিরিয়াস এপ্রিপারেশন নিয়ে নেব। দেখবে ফার্স্ট-সেকেন্ড কিছু একটা হয়ে বসে আছি।রফিক মহা উৎসাহে বরিশাল চলে গেল। এবং এক সপ্তাহের মধ্যে মুখ অন্ধকার করে ফিরে এল। শফিক অবাক হয়ে বলল, চলে এলি কেন? রফিক বিরক্ত হয়ে বলল, আরে দূর, যত ফালতু ব্যাপার! অলরেডি সেখানে একটা ভালো কলেজ আছে। রেষারেষি করে আরেকটা কলেজ দিয়েছে। না। আছে মাস্টার, না আছে ছাত্র। এগার জন টীচার আছে, এরা গত পাঁচ মাস ধরে বেতন পাচ্ছে না।বলিস কি।আমি যাওয়ামাত্র প্রিন্সিপ্যাল আমার জন্যে একটা জায়গীরের ব্যবস্থা করে ফেলল। নাইনে পড়ে এক মেয়ে, তাকে পড়াতে হবে। তার বিনিময়ে থাকা-খাওয়া। চিন্তা কর অবস্থা।শফিক কিছু বলল না। রফিক শুকনো মুখে বলল, বুলে থাকতাম সেখানেই, কিন্তু মেয়ের বাবার কথাবার্তা যেন কেমন-কেমন।কেমন–কেমন মানে?
ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় মেয়ে বিয়ে দিতে চায় আমার কাছে।বলিস কি! হ্যাঁ। ভদ্রলোক প্রথম প্রথম আমাকে ভাই বলত, তারপর বলা শুরু করল-আপনি আমার ছেলের মতো।নীলু বলল, মেয়েটি দেখতে কেমন? দেখতে ভালোই। বরিশালের মেয়েরা খুব সুন্দর হয়। হাসছ কেন তুমি ভাবী? এর মধ্যে হাসির কিছু নেই। এটা একটা সিরিয়াস ব্যাপার।বিয়ের ভয়েই পালিয়ে এসেছ? সবকিছু নিয়ে ঠাট্টা ভালো লাগে না।তুমি ওদের বলে এসেছি তো, নাকি না-বলে রাতের অন্ধকারে পালিয়ে এসেছে? রফিক কোনো উত্তর দিল না। পরবর্তী বেশ কিছুদিন কাটাল গম্ভীর হয়ে। নীলু ঠাট্টা-টাট্টা করবার চেষ্টা করল, কী রফিক, বরিশাল-কন্যার জন্যে মন খারাপ নাকি?
একটা বাচ্চা মেয়েকে নিয়ে কী সব ঠাট্টা কর, ভালো লাগে না।মেয়েটির দিকে দরদ একটু বেশি বেশি মনে হচ্ছে।স্টপ ইট ভাবী। প্লীজ।বিসিএস পরীক্ষাও রফিকের ভালো হল না। ইংরেজি এবং ইতিহাস দুটার কোনোটাতেই নাকি পাশ মার্ক থাকবে না। রফিকের ধারণা, এগজামিনররা খাতা দেখে হাসাহাসি করবে। হোসেন সাহেব বললেন, এতটা খারাপ হল কেন? বোগাস সব কোশ্চেন করেছে, খারাপ হবে না? বিসিএস-এ বোগাস প্রশ্ন করবে। কেন? করলে তুমি কী করবে বল? সব মাথা-খারাপের দল। ইতিহাসের প্রশ্ন পড়লে মনে হয় জিওগ্রাফির কোশ্চেন।বলিস কি?
বিশ্বাস না হলে তুমি পড়ে দেখ।পরীক্ষা খারাপ দিয়ে রফিক খুবই মুষড়ে পড়ল। সে ধরেই নিয়েছিল, ভালো করবে। বাড়ির সঙ্গে সম্পর্কও কমে গেল নাশতা খেয়ে বেরিয়ে যায়, রাত দশটা—এগারটায় ফেরে। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করলেই রেগে যায়। কথাবার্তা যা হয় নীলুর সঙ্গেই। তাও সব দিন নয়, যেদিন মেজাজ ভালো থাকে সেদিন।নীলু বুঝতে পারে, রফিক হীনমন্যতায় ভুগতে শুরু করেছে। এটা কাটিয়ে তোলার জন্যে তার কিছু করা উচিত, কিন্তু সে কী করবে বুঝতে পারে না। আগে মাসের মধ্যে বেশ কয়েক বার রফিক টাকা চাইত। এখন আর চাচ্ছে না। চাইতে লজ্জা পাচ্ছে বোধহয়! দিন দশেক আগে হঠাৎ করে চাইল, ভাবী, তোমার গোপন সঞ্চয় থেকে কিছু দিতে পারবে? কত?
সামান্য কিছু, ধর পঞ্চাশ।নীলু এক শ টাকা এনে দিল।গোটাটা দিলে নাকি ভাবী? হুঁ, দিলাম।থ্যাংকস। মেনি থ্যাংকস।আমাকে থ্যাংকস্ কেন? তোমার ভাইকে দাও। আমি তো তার ধনেই পোদারি করছি।ভাইয়াকেও থ্যাংকস। আমি ভাবী, সব লিখে রাখছি। ভেরি সুন তোমাদের সব পয়সা ফেরত দেব, উইথ ইন্টারেস্ট।ঠিক আছে, দিও।মনে হচ্ছে খুব শিগগিরই একটা কিছু হবে।তাই নাকি? সেভেন্টি পারসেন্ট পসিবিলিটি। জেনারেল ম্যানেজারের সঙ্গে কথা বলেছিলাম। সে বলেছে।–আপনার মত ইয়াং এ্যাকটিভ ম্যানদেরই এখন দরকার। নিউ ব্লাড। নিউ আইডিয়া।বেতন কেমন?
ফ্যানটাস্টিক বেতন। বিদেশী কোম্পানি।তোমার ভাইয়েরটাও তো বিদেশী কোম্পানি। বেতন তো এমন কিছু না।কোম্পানিতে কোম্পানিতে বেশিকম আছে ভাবী।তোমাদেরটা খুব রমরমা কোম্পানি বুঝি? খুবই রমরমা। গাড়ি এসে দিয়ে যাবে, নিয়ে যাবে।বল কি! কোম্পানির নিজস্ব ফ্ল্যাট আছে। গ্ৰী বেড রুম। দেখলে মাথা ঘুরে যাবে।ফ্ল্যাট দেখে এসেছ? না, আমি দেখি নি। ঐ অফিসের অন্য অফিসারদের সঙ্গে আলাপ হল। সবাই বেশ মাইডিয়ার।তাই নাকি?
হুঁ। বেশ কয়েক জন মহিলা আছেন। বড়ো বড়ো পোস্টে! বুঝলে ভাবী, মেয়েদের জন্যে আজকাল চাকরির খুব সুবিধা। তুমি যদি চেষ্টা কর, উইদিন টুমানথাস একটা কিছু জুটিয়ে ফেলতে পারবে।সত্যি।ইউ বেট। বি. এ. পাশ আছ। দেখতে–শুনতেও মোটামুটি খারাপ না! চলে যাও।চলে যায় মানে?
