এপিটাফ পর্ব:০১ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:০১

শেফার স্মৃতির উদ্দেশে

কালান্তক ব্যাধি বাসা বেঁধেছিল মেয়েটির ছোট্ট শরীরে। সে সেই ব্যাধিকে অগ্রাহ্য করল। মৃত্যুকে গ্রহণ করল অসীম সাহসিকতায়। কে জানে মেয়েটির সাহস দেখে হয়তো মৃত্যুও লজ্জা পেয়েছিল।

“অন্ধকারের উৎস হতে উৎসারিত আলো

সেই তো তোমার আলো।”

– রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর

০১.

কাল রাতে আমার খুব ভালো ঘুম হয়েছে। ঘুমের মধ্যে কোনো দুঃস্বপ্ন দেখি নি। শুধু সারাক্ষণই কেমন যেন শীত শীত করছিল, একটা হিম হাওয়া শরীরের উপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছিল। মাঝেমাঝেই অস্পষ্টভাবে মনে হচ্ছিল কেউ যদি গায়ে একটা পাতলা চাঁদর টেনে দিত। আবার মনে হচ্ছিল, গায়ে চাঁদর না থাকাই ভালো। চাঁদর থাকা মানেই হিম হিম ভাব নষ্ট হয়ে যাওয়া।

সকালে ঘুম ভাঙার পর দেখি গায়ে চাঁদর আছে। গলা পর্যন্ত টেনে দেয়া পাতলা সুতির চাঁদর। ঘুমুতে যাবার সময় আমার বিছানায় কোনো চাঁদর ছিল না। এই কাজটা নিশ্চয়ই মা করেছেন। মার ঘর আর আমার ঘরের মাঝখানে একটা দরজা আছে। আগে দরজা বন্ধ থাকত কিংবা ভেজানো থাকত। এখন খোলা থাকে। একমাস আগেও দরজায় সাদার উপর সবুজ প্রিন্টের একটা পর্দা ঝুলত। এখন সেই পর্দাও মা সরিয়ে ফেলেছেন। এটা করা হয়েছে যাতে তার খাটে শুয়ে মা আমাকে দেখতে পারেন। মাঝেমাঝে গভীর রাতে ঘুম ভেঙে গেলে দেখি মা একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। এটা আমার অপছন্দ, খুব বেশিরকম অপছন্দ। কেন মা গভীর রাতে আমার দিকে তাকিয়ে থাকবেন? আমার বয়স এখন তের। এই বয়সের মেয়েরা তাদের অপছন্দের কথা কঠিন গলায় বলতে পারে। আমিও পারি, কিন্তু বলি না। আমার বলতে ইচ্ছা করে না।

আমি মেয়েটা আসলে কেমন তা আমার মা জানেন না। আমার বাবাও জানেন না। আমি সারাক্ষণ ভান করি, কেউ তা ধরতে পারে না। মাঝে মাঝে আমি নিজেও ধরতে পারি না। নিজের ভানগুলি আমার নিজের কাছেই একসময় সত্যি বলে মনে হয়। তখন নিজেরই খুব আশ্চর্য লাগে।ভোরবেলা মা আমার ঘরে ঢুকে প্রথম যে বাক্যটি বলেন তা হচ্ছে– কী রে নাতাশা, আজ শরীরটা কেমন? আমি মুখ টিপে হাসি, যে হাসির অর্থ শরীর খুব ভালো। এবং আমি মার মুখ থেকে দিনের শুরুর প্রথম বাক্যটি শুনে আনন্দে আত্মহারা হয়েছি। আসলে পুরোটাই ভান। আমার শরীর মোটেই ভালো না। এবং আমি দিনের প্রথম বাক্যটি শুনে রাগ করেছি কারণ নাতাশা আমার নাম না।

আমার খুব সুন্দর একটা নাম আছে– টিয়া। আমার জন্ম হয় নেত্রকোনার নান্দাইলে, আমার দাদার বাড়িতে। হিসেব মতো আমার জন্য আরো মাসখানিক পরে হওয়ার কথা। বাবা মাকে নিয়ে অসুস্থ দাদাজানকে দেখতে নান্দাইল গিয়েছিলেন। যেদিন পৌঁছলেন সেদিন সন্ধ্যাবেলা হঠাৎ মা’র প্রসবব্যথা উঠে গেল। বাবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ল। ভয়াবহ ধরনের গণ্ডগ্রামে কোথায় পাওয়া যাবে ডাক্তার, কোথায় কী? খুঁজে পেতে দাই আনার আগেই আমি পৃথিবীতে চলে এলাম। আমার জন্মের পর পর দাদাজানের কাঁঠাল গাছ থেকে ঝাকে ঝাকে টিয়া পাখি আকাশে উড়ে গিয়েছিল। আমার বাবা বারান্দায় খুব মন খারাপ করে বসেছিলেন।

টিয়া পাখির ঝাক দেখে তার মনে খুব আনন্দ হলো। তার কিছুক্ষণ পরেই বাবাকে আমার জনের খবর দেয়া হলো। বাবা বললেন, আমার মেয়ের নাম হলো টিয়া।টিয়া নামটা কাবোরই পছন্দ না, কারণ পাখির নামে নাম রাখলে পাখির মতো। স্বভাব হয়। ঘরে নাকি মন টেকে না। কিন্তু নামটা আমার খুব পছন্দ। মা আমার এত পছন্দের নাম ধরে না ডেকে নাতাশা ডাকেন। আমার রাগ লাগে, তারপরেও আমি মুখ টিপে হাসি। আনন্দের ভান করি। মা সেই ভান ধরতে পারেন না। তিনিও হাসেন। আমার মতোই মুখ টিপে হাসেন।মুখ টিপে হাসলে মাকে অসম্ভব সুন্দর লাগে। অবশ্যি না হাসলেও তাকে সুন্দর লাগে। তিনি যখন রাগ করে থাকেন তখনো সুন্দর লাগে।

তখনো তার দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। যারা সুন্দর তারা সবসময় সুন্দর, হাসিতেও সুন্দর কান্নাতেও সুন্দর। আমার চেহারা মোটামুটি। এখন অবশ্যি খুব খারাপ হয়েছে। আমি যখন হাসি তখন আমাকে খুব সম্ভব অতি কুৎসিত লাগে। হাতের কাছে একটা আয়না থাকলে একবার দেখতাম।হাতের কাছে কোনো আয়না নেই। মা’র কঠিন নির্দেশে আমার ঘর থেকে সব আয়না সরিয়ে ফেলা হয়েছে। কারণ আমি এখন প্রায় একটা পোকার মতো হয়ে গেছি। মানুষের মতো হাত-পাওয়ালা একটা পোকাকে সুন্দর জামা-কাপড় পরিয়ে শুইয়ে রাখলে যেমন দেখায়, আমাকেও নিশ্চয়ই সেরকম দেখায়।

আমি সেটা বুঝতে পারি মানুষের চোখের দিকে তাকিয়ে। যারা প্রথমবারের মতো আমাকে দেখে তাদের চোখে একটা ধাক্কা লাগে। সেখানে একটা ঘৃণার ভাব ফুটে ওঠে। সেই ঘৃণার জন্যে তারা লজ্জিত হয়। লজ্জা ঢাকার চেষ্টা করতে গিয়ে তাদের চোখে একটা অসহায় ভাব জাগে। আমি বুঝতে পারি। দিনের পর দিন বিছানায় শুয়ে শুয়ে আমি অনেক কিছু শিখেছি। সেই অনেক কিছুর একটা হচ্ছে চোখের ভাষা বুঝতে পারা।

ভোরবেলা ঘুম ভেঙেই একটা কুৎসিত পোকা দেখতে কারো ভালো লাগার কথা না। আমার মা’রও নিশ্চয়ই ভালো লাগে না। আমি জানি, ভালো না লাগলেও আমার মাকে এই দৃশ্য আরো কিছুদিন দেখতে হবে। কত দিন তা কি মা’র জানা আছে? মনে হয় না। তবে ডাক্তার সাহেব নিশ্চয়ই জানেন। জানলেও তারা মাকে জানাবেন না। কোনো ডাক্তারের পক্ষেই কোনো মাকে বলা সম্ভব না আপনার মেয়ের মৃত্যুর দিন ঘনিয়ে এসেছে। সে আর মাত্র এতদিন বাঁচবে।

ডাক্তার সাহেব আমাকে যদি চুপি চুপি ব্যাপারটা জানিয়ে দিতেন তাহলে আমার খারাপ লাগত না। কে জানে, হয়তো ভালোই লাগত। ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখতাম। সেই দাগ দেয়া তারিখের দিকে তাকিয়ে অনেক কিছু ঠিক করে ফেলতে পারতাম। কিন্তু কেউ ব্যাপারটা আমার মতো করে দেখছে না। সবাই ভাবছে, আমি খুব বাচ্চা একটা মেয়ে। মৃত্যু কী তা-ই আমি পরিষ্কার জানি না। আমাকে নানান ধরনের মিথ্যা কথা বলে ভুলিয়ে-ভালিয়ে রাখতে হবে। আমাকে ভুলানোর তাদের চেষ্টা এত হাস্যকর! আমার পেটের ভেতর হাসি গুড় গুড় করে ওঠে। কিন্তু আমি তাদের তা বুঝতে দেই না।

আমি ভান করি যেন তাদের প্রতিটি বাক্য আমি বিশ্বাস করছি।মা আমাকে গত মাসের ৯ তারিখে পিজির নিওরোসার্জন প্রফেসর ডা. ওসমানের কাছে নিয়ে গেলেন। মা’র সঙ্গে ভদ্রলোকের আগেও কয়েকবার দেখা হয়েছে। আমি এই প্রথম তাকে দেখছি। খুব ফর্সা ছোটখাটো ধরনের মানুষ। চোখে সোনালি ফ্রেমের চশমা। চশমার কাঁচ ভারি বলে চোখ দেখা যাচ্ছে না, তবে আমার মনে হলো দ্রলোকের চোখ সুন্দর। খুব সুন্দর।

আমার কিছু অদ্ভুত ব্যাপার আছে। এই যেমন চোখ দেখছি না, তারপরেও মনে করে নিলাম চোখ সুন্দর। মাঝে মাঝে একটা গল্পের বই হাতে নিয়ে বইয়ের নাম, লেখকের নাম না পড়েই মনে হয়– বইটা খুব সুন্দর। হয়ও তাই। এই ডাক্তার সাহেবের চোখ নিশ্চয়ই খুব সুন্দর হবে। আমি অপেক্ষা করছি কখন তিনি চোখ থেকে চশমা সরাবেন। আমার কেন জানি মনে হচ্ছে একসময় তিনি চোখ থেকে চশমা সরাবেন। কিংবা চশমাটা আপনাতেই একটু নিচে নেমে যাবে। ডাক্তার সাহেব খুব মন দিয়ে কাগজপত্র দেখছেন। আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি। হঠাৎ লক্ষ করলাম, কাগজপত্র দেখতে দেখতে ভদ্রলোকের চেহারাটা কেমন যেন অন্যরকম হয়ে গেল।

তিনি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। একবার মার দিকে, একবার আমার দিকে তাকাতে লাগলেন। তারপর হঠাৎ খুব স্বাভাবিক হবার চেষ্টা করতে লাগলেন। এখন তিনি আর কোনো কাগজই মন দিয়ে দেখছেন না, আবার আমার দিকেও তাকাচ্ছেন না। শুধু পাতা ওল্টাচ্ছেন। আমার মনে হলো তিনি নিজেই এখন নিজের উপর বিরক্ত হচ্ছেন। তারপর হঠাৎ হাতের কাগজগুলি একপাশে সরিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন খুকি, তুমি কিছু খাবে না? কোল্ড ড্রিংকস বা অন্য কিছু? আমি কিছু বলার আগেই মা বললেন, ও কিছু খাবে না। ওকে আপনি কেমন দেখলেন বলুন?

মা’র গলা খুব কঠিন শুনাল। যেন তিনি খুব বিরক্ত। এমনিতে মা’র গলার স্বর নরম ও আদুরে। শুধু বাবার সঙ্গে কথা বলার সময় সেই স্বর কঠিন হয়ে যায়। এখন দেখছি এই ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে কথা বলার সময়ও স্বর কঠিন হয়ে গেল। শুধু তাই না, তার ভুরু কুঁচকে গেল।ডাক্তার সাহেব চোখ থেকে চশমা সরিয়ে এখন চশমার কাঁচ পরিষ্কার করছেন। আমি অবাক হয়ে ভদ্রলোকের চোখ দেখছি। আশ্চর্য, এত সুন্দর চোখ! ডাক্তার সাহেব চুপ করে আছেন। মা আবারো বললেন, আমার মেয়ের অবস্থা কেমন দেখলেন বলুন? ডাক্তার সাহেব শান্ত গলায় বললেন, ভালোই।আমি লক্ষ করলাম তিনি শুধু ভালো বললেন না। ভালোর সঙ্গে একটা ‘ই’ যোগ করে দিলেন। ভালোটাকে করলেন ভালোই। যার মানে আসলে ভালো নয়।মা বললেন, ভালোই বলতে কী বুঝাচ্ছেন?

অবস্থা যা ছিল তারচে’ খারাপ হয় নি। মনে হচ্ছে লোকালাইজড গ্রোথ। যাই হোক, আরেকটা রেডিও নিওক্লাইড ব্রেইন স্কেন করাতে হবে।সেটা তো একবার করানো হয়েছে।ঐ স্কেন করাতে টেকনিসিয়াম ডিটিপিএ ইনজেকশান দিতে হয়। রেডিওঅ্যাকটিভ মেটিরিয়েলের ইনজেকশান। আগেরবার ইনজেকশানে কিছু সমস্যা ছিল, স্কেনিং ভালো হয় নি।মা কঠিন গলায় বললেন, এবার যে ভালো হবে তার নিশ্চয়তা কী?

এবারে আমি পাশে দাঁড়িয়ে থেকে করাব।মা হ্যান্ডব্যাগ থেকে রুমাল বের করতে করতে বললেন, আপনারা শুধু টেস্টের পর টেস্ট করছেন। আজ এই টেস্ট, কাল ঐ টেস্ট। চিকিৎসা শুরু করছেন না। দয়া করে চিকিৎসা শুরু করুন। আর আপনারা যদি মনে করেন চিকিৎসা করার মতো বিদ্যাবুদ্ধি আপনাদের নেই তাহলে সেটাও পরিষ্কার করে বলুন। আমার মেয়েকে আমি বাইরে নিয়ে যাব। দেশের ডাক্তারদের উপর থেকে আমার বিশ্বাস চলে যাচ্ছে।

এ জাতীয় কথায় যে-কোনো ডাক্তারের রাগ হবার কথা। তিনি রাগ করলেন। তিনি তার অবিশ্বাস্য সুন্দর চোখে মার দিকে তাকিয়ে রইলেন। যেন মা অবুঝ এক কিশোরী যার কথা ধরতে নেই।আমার গাল ঘামছে, মা রুমাল দিয়ে গালের ঘাম মুছে দিচ্ছেন। মানুষের কপাল ঘামে, আমার ঘামে শুধু গাল। অসুখের পর এটা হয়েছে। আমি কাউকে বলি নি। অসুখের কথা কারো সঙ্গে বলতে আমার ভালো লাগে না। ডাক্তারের সঙ্গেও না।ডাক্তার সাহেব চশমা চোখে পরে মা’র দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনি কি কফি খাবেন?

মা বললেন, না।

এক কাপ কফি খান। আমিও আপনার সঙ্গে খাব।

ডাক্তার সাহেব আবারো আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, খুকি, তুমি কিছু খাবে?

আমি হাসিমুখে বললাম, হ্যাঁ।

কী খাবে? জুস?

উঁহু, আমিও আপনাদের মতো কফি খাব।

তিনি কফি আনার জন্যে কাউকে বললেন না। তাঁর ঘরেই কফিপটে কফি জ্বাল হচ্ছে। কফির গন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। এতক্ষণ গন্ধ পাওয়া যাচ্ছিল না। যেই কফি পট দেখলাম, ওমনি গন্ধ পাওয়া শুরু করলাম। ডাক্তার সাহেব নিজেই মগে করে কফি এনে দিলেন। বালতির মতো সাইজের মগ। কফির মগে চুমুক দিতে দিতে বললেন, প্রফেসর এলেনা এডবার্গ নামে একজন বিখ্যাত নিওরোসার্জন আছেন– ফিলাডেলফিয়াতে থাকেন। তার সঙ্গে আমার খুব ভালো পরিচয় আছে। টরেন্টোর এক কনফারেন্সে প্রথম আলাপ হয়। ভদ্রমহিলার বয়স চল্লিশের নিচে কিন্তু পৃথিবীজোড়া খ্যাতি। আপনার মেয়ের সব কাগজপত্র আমি তার কাছে পাঠিয়ে দেব। তার একটা মতামত নেব।কবে পাঠাবেন?

কাল-পরশুর মধ্যেই পাঠাব।কাগজপত্র পৌঁছতে পৌঁছতেই তো একমাস লাগবে।না, তা লাগবে না। ফ্যাক্স চালু হয়েছে। আমেরিকায় চিঠি যেতে পাঁচ-ছ মিনিটের বেশি লাগার কথা না। আপনি কিন্তু কফি খাচ্ছেন না।আমি তো আগেই বলেছি কফি খাব না।তাহলে কি চা দেব? টি ব্যাগস আছে।মা বিরক্ত গলায় বললেন, কিছুই দিতে হবে না। আমি আবার কবে আসব বলুন।দিন পনের পরে আসুন।আপনি বললেন কাগজপত্র যেতে লাগবে পাঁচ-ছ মিনিট। আমাকে পনের দিন পরে আসতে বলছেন কেন?

উনি তো আর সঙ্গে সঙ্গে জবাব দেবেন না। তাছাড়া আরেকটা স্কেনিং-এর রিপোর্ট লাগবে।ঠিক করে বলুন তো–আমার মেয়ের সমস্যাটা কি আপনারা ধরতে পারছেন না।পারছি– মেনিনজিওমা, তবে ঠিক নিশ্চিত হতে পারছি না। মাঝে মাঝে মেনিনজিওমার গ্রোথ ইলিউসিভ হয়। ধরা দিতে চায় না।ভালোমতো ধরার চেষ্টা করছেন না বলে ধরতে পারছেন না।আমি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছি না মা ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে এত খারাপ ব্যবহার করছে কেন। এমনভাবে কথা বলছে যেন আমার অসুখটার জন্যে ডাক্তার সাহেবই দায়ী।

এরকম ব্যবহার সাধারণত খুব পরিচিত মানুষের সঙ্গেই করা যায়। অপরিচিতের সঙ্গে করা যায় না। আমার ক্ষীণ সন্দেহ হলো, মা এই ডাক্তার সাহেবকে চেনেন। হয়তো ছোটবেলায় পরিচয় ছিল। হয়তো এই ডাক্তার সাহেবের সঙ্গে তাঁর বিয়ের কথা হয়েছিল, শেষটায় আর বিয়ে হয় নি। কিংবা কে জানে হয়তো প্রেম ছিল। বিবাহিত মেয়েদের সঙ্গে পুরনো প্রেমিকের দেখা হলে মেয়েরা চট করে রেগে যায়।

মেজোখালার বেলা এটা আমি দেখেছি। মেজোখালার সঙ্গে মনসুর সাহেবের খুব প্রেম ছিল। এসব অবশ্যি আমার শোনা কথা, আমি তাদের প্রেম-ট্রেম দেখি নি। আমার জন্মের আগের ব্যাপার। মেজোখালার যখন অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হলো তখন তার একেবারে মাথা খারাপের মতো হয়ে গেল। এই কাঁদেন, এই হাসেন। তারপর ঘুমের ওষুধ খেয়ে ফেললেন। যমে-মানুষে টানাটানি অবস্থা। সেই মনসুর সাহেবের সঙ্গে দেখা হলে এখন তিনি ফট করে রেগে যান। নানান ধরনের অপমানসূচক কথা বলতে চেষ্টা করেন। আড়ালে ডাকেন ছাগলা বাবা। একেবারে রামছাগলা।

আমরা ফিরছি রিকশায়। আমাকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে আসার সময় মা কীভাবে কীভাবে একটা গাড়ি জোগাড় করেন। আজ জোগাড় করতে পারেন নি। সেই জন্যেই কি তার মন খানিকটা খারাপ? তাকে কেমন রাগী রাগী লাগছে। রিকশায় চড়তেই আমার বেশি ভালো লাগে। রিকশার হুড ফেলে মাথা একটু উপরের দিকে তুললেই মনে হয় আমি শূন্যে ভাসছি। কিন্তু মা কখনোই রিকশার হুড ফেলবে না। বাবার বেলা সম্পূর্ণ উল্টো ব্যাপার। রিকশায় উঠেই বাবা বলবে–মাই ডিয়ার টিয়া পাখি, হুড ফেলে দে।

বাবার স্বভাবের সঙ্গে মা’র স্বভাবের কোনো মিল নেই। রিকশায় উঠে মা কোনো কথা বলবেন না, মূর্তির মতো বসে থাকবেন। আর বাবা সারাক্ষণ কথা বলবেন। দুটাই অবশ্যি অস্বাভাবিক। একেবারে কথা না বলাও যেমন অস্বাভাবিক আবার সারাক্ষণ কথা বলাও অস্বাভাবিক।আমার সঙ্গে বাবার একটা মিল হলো– বাবাও রিকশায় চড়তে খুব ভালোবাসেন। কথা নেই বার্তা নেই হঠাৎ এসে বলবেন, মাই ডিয়ার টিয়া পাখি, রিকশায় করে খানিকক্ষণ ঘুরবি নাকি? মা গেছে তোর মেজোখালার বাসায়। ঘণ্টা দুইয়ের আগে ফিরতে পারবে না। তার আগেই আমরা ফিরে আসব এবং আমরা আমাদের গোপন অ্যাডভেঞ্চারের কথা কাউকে কিছু বলব না। যাবি? আমি খুশি খুশি গলায় বললাম, যাব। বাবা বললেন–

টিং টিং টিটিং টিং।

রেবা রেবা লিং লিং।।

এটা হলো তাঁর চায়নিজ গান। বিভিন্ন ভাষায় তাঁর কিছু গান আছে। আরবি ভাষায় তার গানটা হলো

আহলান আহ আবু।

কাহলান কাহ কাবু৷।

চায়নিজ গানটাই তাঁর সবচেয়ে প্রিয়। যখন তখন গুন গুন করেন।

Leave a comment

Your email address will not be published.