এপিটাফ পর্ব:০৪ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:০৪

ওয়াদুদুর রহমান তৎক্ষণাৎ মোটা শাশুড়ি আর চিকন বৌয়ের গল্প শুরু করলেন। রেখে-ঢেকে বলার পরেও গল্পের শেষটা শুনে দিলশাদের হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাবার উপক্রম হলো। তার বড় আপা হাসতে হাসতে বিষম খেয়ে হেঁচকি উঠিয়ে ফেলল। দিলশাদ ভেবে পেল না তার আপা কী করে এমন আপত্তিকর একটা গল্প তাদের বলতে বলল। বোকা বলেই বোধহয় বলল। স্বামীকে খুশি করার জন্যে বোকা স্ত্রীরা হাস্যকর সব জিনিস করে।

ওয়াদুদুর রহমান কি দিলশাদকে লাখ দুই টাকা দেবেন না? সম্ভবত দেবেন। তাঁর হাতে টাকা আছে। তবে দ্রলোক যেহেতু ব্যবসায়ী সেহেতু টাকা ফেরত আসবে কি-না এই চিন্তাটা তাঁর মাথায় থাকবে। দিলশাদের প্রথম কাজ হচ্ছে ভদ্রলোকের মাথা থেকে এই দুঃশ্চিন্তা দূর করা। কীভাবে দিলশাদ তা করবে তা ঠিক করা আছে। সে অনেক ভেবে-টেবে ঠিক করেছে।

দিলশাদের বাবার হাতেও কিছু টাকা আছে। তার বাবা রিটায়ার্ড ভাইস প্রিন্সিপ্যাল হাদিউজ্জামান সাহেব তার গ্র্যাচুইটি, সারেন্ডার করে দেওয়া পেনশনের টাকা ব্যাংকে জমা করে রেখেছেন। টাকার পরিমাণ ঠিক কত তা দিলশাদ জানে না। তবে তার অনুমান তিন-চার লাখ টাকা হবে। তাঁর কলাবাগানের দুতলা বাড়ির একতলায় তিনি থাকেন। দুতলাটা ভাড়া দেন। ভাড়ার টাকায় খুব হিসেব করে সংসার চালান।হাদিউজ্জামান সাহেব প্রায়ই বলেন, আমার তো আর ছেলে নেই যে, বুড়ো বয়সে ছেলের সংসারে থাকব।

মেয়েদের সংসার হলো পরের সংসার, সেখানে আমাদের জায়গা হবে না। আমাদের ব্যবস্থা আমাদেরই দেখতে হবে। আমি কাউকে কিছু দেব না। অন্যদেরও আমাকে কিছু দিতে হবে না।গত রোজার ঈদে দিলশাদ তার বাবার জন্যে মটকার একটা পাঞ্জাবি এবং মা’র জন্যে টাঙ্গাইলের সুতির শাড়ি নিয়ে গেল। হাদিউজ্জামান সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, মা, পাঞ্জাবি এনেছ অত্যন্ত খুশি হয়েছি। কিন্তু আমি তো মা তোমার এই পাঞ্জাবি রাখতে পারব না। ইসলাম ধর্মে পুরুষদের রেশমি পোশাক পরা নিষেধ।দিলশাদ বলল, এটা বদলে সুতির পাঞ্জাবি নিয়ে আসি?

না। আমার জন্যে এবং তোমার মার জন্যে কিছুই আনবে না। উপহার পেলেই উপহার দিতে হয়। আমার কিছু দেবার সামর্থ্য যখন নেই তখন নেবার উপায়ও নেই। তোমরা কষ্ট পাও বা রাগ কর আমার কিছুই করার নেই।দিলশাদের ধারণা তার বাবার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। মাথা খারাপের বীজ আগেই ছিল। যেদিন রিটায়ার করলেন সেদিনই বীজ থেকে চারা বের হলো। যত দিন যাচ্ছে ততই চারা ডালপালা প্রসারিত করে বাড়ছে। সারাজীবন ঘোর নাস্তিক হাদিউজ্জামান সাহেব এখন এক পীর সাহেবের কাছে যাতায়াত শুরু করেছেন। যুবক বয়েসী পীর। চুল-দাড়ি সবই কালো। তাকেই তিনি পরম শ্রদ্ধাভরে বাবা ডাকছেন। দেখা হলেই কদমবুসি করছেন। কঠিন কদমবুসি। পা থেকে ধুলা নিয়ে সত্যি সত্যি কপালে ঘষেন।

পীর সাহেব তাঁকে দশলক্ষ একবার সূরা কাফ পড়তে বলেছেন। পড়া শেষ হলেই তিনি তাকে নিয়ে চিল্লায় যাবেন। সেখানে তার জন্যে খাস দিলে দোয়া করা হবে। যার পরপরই বাতেনি জগৎ হাদিউজ্জামান সাহেবের কাছে ধরা দেবে।বাতেনি জগৎ ধরার জন্যে হাদিউজ্জামান সাহেব এখন সূরা কাফ পড়ে যাচ্ছেন। চার লক্ষ বারের মতো পড়া শেষ হয়েছে। সূরা পাঠের জন্য একটা ঘর আলাদা করা হয়েছে। সেই ঘরে কোনো আসবাব নেই। তিনি নিজের হাতে মেঝে ধোয়ামোছা করেন।

অন্য কারো সেই ঘরে প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষেধ। মাগরেবের নামাজের পর তিনি তাঁর এই ঘরে মোমবাতি জ্বেলে দেন। মোমবাতির আলোয় সূরাপাঠ চলতে থাকে। এশার নামাজের ওয়াক্ত না হওয়া পর্যন্ত সূরাপাঠ থামে না। রাতে যখন ঘর থেকে বের হন তখন ঘামে তার সারা শরীর ভেজা থাকে। চোখ হয় টকটকে লাল। তিনি নাকি সূরাপাঠের সময় বিচিত্র সব শব্দ শুনতে পান। কারা নাকি তার কানে পেছন দিক থেকে ফুঁ দেয়।এ দেশের স্ত্রীরা যতই স্বাধীনচেতা হোক, তারা স্বামীর অনুকরণ ও অনুসরণ করা থেকে নিজেদের বিরত রাখতে পারেন না। দিলশাদের মা মনোয়ারা বেগমও তার ব্যতিক্রম নন। তিনিও এখন নিয়মিত স্বামীর সঙ্গে পীর সাহেবের কাছে যান।

পীর সাহেবকে ভক্তিভরে কদমবুসি করেন। তিনিও মাগরেবের পর তসবি হাতে বসেন এশার নামাজের আগে সেই তসবি তার হাত থেকে নামে না। ইদানীং তিনিও বলছেন তসবি পাঠের সময় কারা যেন তার চারপাশে ফিসফাস করে। তিনি অপূর্ব সুগন্ধ পান। কাঁঠালিচাপা ফুলের গন্ধের মতো গন্ধ। সেই গন্ধে তাঁর মাথা ঝিমঝিম করে। দিলশাদের ধারণা তার মা’র এই কথাগুলো বানানো। তিনি স্বামীকে খুশি করার জন্যেই মিথ্যা গল্প বানিয়েছেন।মনোয়ারা বেগম তার মেয়েকে বলে দিয়েছেন এক লাখ টাকার ব্যবস্থা তিনি যেভাবেই হোক করে দেবেন।

এই ব্যাপারে দিলশাদ যেন নিশ্চিন্ত থাকে। দিলশাদ নিশ্চিন্ত নেই। কারণ টাকাপয়সা মনোয়ারার নিয়ন্ত্রণে নেই। হাদিউজ্জামান সাহেব বর্তমানে বাতেনি জগতের সন্ধানে ব্যস্ত থাকলেও ইহলৌকিক ব্যাপারগুলিও কঠিন নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন। একপোয়া মুড়ি আনার জন্যে দশটা টাকাও মনোয়ারা বেগমকে স্বামীর কাছ থেকে নিতে হয়।দিলশাদ ঠিক করেছে সে তার বাবার সঙ্গে সরাসরি কথা বলবে। এই কথোপকথনে সে মাকেও সঙ্গে রাখবে না। স্ত্রীর সমর্থনসূচক যে-কোনো কথায় হাদিউজ্জামান সাহেব বিরক্ত হন। এই মুহূর্তে বাবার বিরক্তি তার কাম্য নয়।টাকার জন্যে সাজ্জাদের দিক থেকে যে-সব আত্মীয়স্বজন আছে তাদের কাছে কি সে যাবে?

যাবার কোনো মানে হয় না। সাজ্জাদের বড়ভাই থাকেন জয়দেবপুরে। রাইস রিসার্চ ইন্সটিটিউটের সিনিয়ার সাইন্টিফিক অফিসার। তাকে তার নিজের সংসার দেখতে হয় এবং বিধবা ছোটবোনের সংসার দেখতে হয়। দ্রলোকের স্ত্রী আর্থাইটিসে প্রায় পঙ্গু। ভয়াবহ টানাটানিতে সংসার চলে। তারপরেও ব্যবসার জন্যে তিনি সাজ্জাদকে একসময় দশ হাজার টাকা দিয়েছিলেন। প্রভিডেন্ট ফান্ডে তার কিছু ছিল না। টাকাটা দিয়েছিলেন ধার করে। সেই টাকা ফেরত দেয়া হয় নি।

নাতাশার খবর জানলে তিনি নিশ্চয়ই খুব ব্যস্ত হয়ে পড়বেন, তবে কোনো সাহায্য করতে পারবেন না। খুব লজ্জার মধ্যে পড়বেন। কী দরকার তাকে লজ্জা দিয়ে।সাজ্জাদের এক মামা থাকেন পুরনো ঢাকায়। দ্রলোকের প্রচুর টাকা। কাপড়ের ব্যবসা করেন। দিলশাদের বিয়েতে একশ টাকার প্রাইজবন্ড দিয়েছিলেন। তাঁর কাছে কিছুই পাওয়া যাবে না। তবু দিলশাদ একবার যাবে। ভয়ঙ্কর কৃপণ মানুষও মাঝে মাঝে খুব দয়ালু হয়ে যায়। চেষ্টা করে দেখতে ক্ষতি কিছু নেই।দিলশাদের নিজের সঞ্চয় সামান্যই। বিয়ের সময়ে পাওয়া বেশ কিছু গয়না ছিল। তার বাবা দিয়েছিলেন। মা নিজের গয়না তিন ভাগ করে তিন মেয়েকে দিয়েছিলেন। তার পরিমাণও কম ছিল না। সেইসব গয়নার কিছুই নেই।

একদিন কী কারণে স্টিলের আলমারির লকার খুলে দেখে লকারে রাখা বিসকিটের টিন খালি। বিসকিটের টিনে সব গয়না ছিল। দিলশাদ শুধু উপন্যাসেই পড়েছে স্বামী নেশার পয়সার জন্যে স্ত্রীর গয়না বিক্রি করে দেয়। স্ত্রী গয়নার শোকে কাঁদতে কাঁদতে বিছানা নেয়। উপন্যাসের মতোই তার জীবনে গয়না বিক্রির ব্যাপার ঘটেছে, শুধু সে কাঁদতে কাঁদতে বিছানা নেয় নি। শান্ত গলায় বলেছে- কাজটা করলে কীভাবে? একদিনে নিশ্চয়ই সব গয়না বিক্রি কর নি আস্তে আস্তে করেছ, তাই না? না-কি একদিনেই বিক্রি করেছ?

সাজ্জাদ অস্বস্তির সঙ্গে বলেছে, বিক্রি করি নি। বন্ধক রেখে টাকা নিয়েছি। তোমাকে রশিদ দেখাতে পারব।দেখাও, রশিদ দেখাও।সাজ্জাদ রশিদ খোঁজা শুরু করল। এই স্যুটকেস খুঁজে, ঐ স্যুটকেস খুঁজে। বইয়ের পাতার ফাঁকে দেখে। রশিদ খোজার আশ্চর্য অভিনয়।দিলু, তুমি বিশ্বাস করছ না। রশিদ সত্যি আছে। তোমার চোখে যেন না পড়ে সে-জন্যে গোপনে কোনো জায়গায় রেখে নিজেই ভুলে গেছি। তিন মাসের মধ্যে তোমার সব গয়না আমি এনে দিব। আজ থেকে ঠিক তিন মাস।

অনেক তিন মাস পার হয়েছে, গয়না আসে নি। আর কোনোদিন এই প্রসঙ্গ নিয়ে দিলশাদ কথা বলে নি। তার রুচি হয় নি।নাতাশা তার বাবার এই দিকগুলি জানে না। দিলশাদ জানতে দেয় নি। মেয়েটা তার বাবাকে প্রচণ্ড ভালোবাসে। বাবার এইসব দুর্বলতা জানার পরেও সে নিশ্চয়ই তার বাবাকে ভালোবাসবে কিন্তু মেয়েটার ভালোবাসার অপমান হবে। মা হয়ে দিলশাদ তা করতে দিতে পারে না।

দিলশাদ খুব ভালো করে জানে, নাতাশা তার বাবা-মা’র ভেতরের প্রচণ্ড দূরত্বের জন্যে তাকেই দায়ী করে। কারণ তাকেই সাজ্জাদের সঙ্গে রূঢ় কঠিন আচরণগুলি করতে হয়। নাতাশা শুধু তিক্ততাটাই দেখে তিক্ততার উৎস সম্পর্কে জানে না। যেমন- নাতাশা কোনোদিনই জানবে না তার মেজোখালা এক সন্ধ্যাবেলা এসে ফিসফিস করে দিলশাদকে কী বলে গেল।সে শুধু দেখেছে, তার মা পাথরের মতো হয়ে গেছে। রাতে কিছু খায় নি। এবং সারারাত এক ফোঁটা ঘুমায় নি। তোরবেলা নাতাশা বলেছিল, তোমার কী হয়েছে মা? তোমাকে এমন ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে কেন?

দিলশাদ বলেছে- মারে, আমার শরীরটা খারাপ।নাতাশা বলেছে–তোমার শরীর খারাপ না মা। তোমার মন খারাপ। শরীর খারাপ হলে চেহারা একভাবে খারাপ হয়। মন খারাপ হলে অন্যভাবে খারাপ হয়। বলল তো কী হয়েছে? দিলশাদ চুপ করে থেকেছে। সেদিন সে অফিসেও যায় নি, তার বারান্দায় চুপচাপ বসেছিল। নটার দিকে সাজ্জাদ ব্রাশ দিয়ে দাঁত ঘসতে ঘসতে বারান্দায় এসে বলল, কী ব্যাপার, অফিস যাও নি? দিলশাদ বলেছে–না।শরীর খারাপ করেছে? জ্বর-জারি? দেখি টেম্পারেচারটা দেখি।দিলশাদ কঠিন গলায় বলেছে, গায়ে হাত দেবে না।

এর জবাবে সাজ্জাদ কী একটা রসিকতা যেন করেছিল। কী রসিকতা করেছিল দিলশাদের মনে নেই। তার শুধু মনে আছে সে ভেতরে ভেতরে থরথর করে কাঁপছিল। তার মুখে প্রায় এসে গিয়েছিল– তুমি মেজোআপার বাসায় গত বৃহস্পতিবার গিয়ে কী করেছ? সে নিজেকে সামলেছে। কথাগুলি বলা কষ্টের, না বলা আরো কষ্টের।দিলশাদের মেজোআপা দিলরুবা অবশ্যি খুব সহজভাবেই কথাগুলি বলেছে। সন্ধ্যাবেলা এসেছে। চা খেয়েছে। গল্পটল্প করে উঠে চলে যাবার সময় হঠাৎ মনে পড়ার ভঙ্গিতে বলেছে দিল, তোকে একটা কথা বলি। রাগ করিস না।দিলশাদ বলল, এমন কী কথা বলবে যে রাগ করব?

হাসব্যান্ডের ব্যাপারে মেয়েরা খুব সেনসেটিভ হয়– এইজন্যেই বলছি।দিলশাদ শংকিত চোখে তাকাল। দিলরুবা বলল, সাজ্জাদ তোর মেজো দুলাভাইয়ের কাছে বেশ কয়েকবার এসেছে। তার কিছু টাকা দরকার এইজন্যে। এটা তুই বোধহয় জানিস।না, আমি জানি না।যাই হোক, ও বিশ হাজার টাকা চাচ্ছে। তোর দুলাভাই দিতে পারছে না। তার ব্যবসার অবস্থা ভালো না। সে স্পষ্ট না করে দিয়েছে। তারপরেও বার বার এসে, এমন চাপাচাপি–খুব অস্বস্তিকর অবস্থা।আমাকে বলল নি কেন? আমি ভাবতাম তুই জানিস।না, আমি জানতাম না।যাই হোক, সমস্যায় পড়লে আত্মীয়স্বজনের কাছে টাকা ধার চাওয়া কোনো অন্যায় না।এরচে অন্যায় কিছু কি সে করেছে?

দিলরুবা হাসিমুখে বলল, তুই চোখ-মুখ যেভাবে শক্ত করে ফেলেছিস, তোকে বলতেই তো ভয় লাগছে। যাই হোক, শোন, সাজ্জাদ গত বৃহস্পতিবার গিয়েছে আমাদের বাসায়। আমরা কেউ বাসায় ছিলাম না। ও রাত নটা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছে। আমার কাজের বুয়া তাকে চা দিয়েছে। ফ্রিজে গাজরের হালুয়া ছিল। হালুয়া দিয়েছে। ও খেয়েদেয়ে চলে এসেছে। তারপর থেকে বসার ঘরে সাইড টেবিলে রাখা কৃস্টালের ঘড়িটা নেই। এবোনাইটের উপর কৃস্টালের যে ঘড়ি। মৎস্যকন্যার মূর্তির মতো।তুমি বলতে চাচ্ছ ঘড়িটা সে চুরি করেছে?আমার কাজের মেয়েটা বলছিল সে হালুয়া নিয়ে ঘরে ঢুকে দেখে সাজ্জাদের। হাতে ঘড়ি। সে খুব মন দিয়ে ঘড়ি দেখছে।দিলশাদ আবার বলল, তুমি বলতে চাচ্ছ সে তোমার ঘড়ি চুরি করেছে?

এই তো তুই রেগে যাচ্ছিস। হয়তো ঠাট্টা করে নিয়েছে। হয়তো মনের ভুলে পকেটে রেখে দিয়েছে। এইরকম ভুল তো মানুষ সবসময় করে। করে না? তবে ঘড়িটা তোর দুলাভাইয়ের খুব শখের। সেবার আমেরিকায় গিয়ে ‘মেসিস’ স্টোর থেকে কিনেছে। ট্যাক্স নিয়ে দাম পড়েছে দুশ চল্লিশ ডলার। দামটা কোনো ব্যাপার না– শখের জিনিস তো। টাকা দিয়ে তো আর শখের জিনিসের দাম হয় না।হড়বড় করে দিলরুবা আরো অনেক কথা বলেছে কিছুই দিলশাদের কানে যায় নি। সে পলকহীন চোখে তাকিয়েছিল, একবার শুধু চিৎকার করে বলতে ইচ্ছা হয়েছিল- আপা, চুপ কর। প্লিজ চুপ কর। তাও বলে নি।

সাজ্জাদ যেদিন বলল, সে বান্দরবন যাবে সেদিন আন্তরিকভাবেই দিলশাদ খুশি হয়েছিল। চলে যাক। চোখের আড়ালে চলে যাক। চলে যাবার দিন সে সাজ্জাদের সঙ্গে খুব খারাপ ব্যবহার করেছে। খারাপ ব্যবহারটা নাতাশার চোখে পড়েছে। খারাপ ব্যবহারের পেছনের কারণটা সে জানে না। কোনোদিন জানবে না। সবকিছু সবাইকে জানতে নেই।ফজরের আজান পড়ছে। ঢাকা শহরে শত শত মসজিদ। আগামী দশ মিনিট ধরে আজান হতে থাকবে। কাছ থেকে, দূর থেকে ঘুম ভাঙানোর জন্যে মোয়াজ্জিন অতি মধুর গলায় আহ্বান জানাবেন–

“আসসালাতু খাইরুম মিনাননাউম।”

‘ঘুমের চেয়ে নামাজ উত্তম।”

দিলশাদের নানিজান তাকে বলেছিলেন, ঘুম ভাঙানোর জন্যে আজান দেওয়া হলেও, যারা দুষ্ট লোক, আজানের শব্দে তাদের ঘুম গাঢ় হয়। ফজরের আজান হচ্ছে তাদের কাছে ঘুমপাড়ানি গানের মতো। দিলশাদের মনে হচ্ছে সে একজন দুই মহিলা। আজানের শব্দে ঘুমে তার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে। সে পাটিতে কুণ্ডলি পাকিয়ে শুয়ে পড়ল। মনে হচ্ছে শরীরের প্রতিটি জীবকোষ ঘুমিয়ে পড়ছে। গভীর অবসাদের ঘুম। যেন এই ঘুম কোনোদিন ভাঙবে না।

Leave a comment

Your email address will not be published.