এপিটাফ পর্ব:০৬ হুমায়ূন আহমেদ

এপিটাফ পর্ব:০৬

হাদিউজ্জামান সাহেব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, তোদের সবচে বড় সমস্যা হলো বিশ্বাসের সমস্যা। তোকে দোষ দিচ্ছি না। আমরা বাস করছি অবিশ্বাসের যুগে। আইয়েমে জাহেলিয়াতের সময় যে অবিশ্বাস ছিল এখন আবার আমরা সেই অবিশ্বাসের দিকেই যাচ্ছি। বড়ই আফসোসের কথা।দিলশাদ নরম গলায় বলল, বাবা, আমি দোয়াটা পড়ব। অবশ্যই পড়ব। কিন্তু আমি দোয়া শেষ করা পর্যন্ত অপেক্ষা করব না।হাদিউজ্জামান বিরক্ত চোখে মেয়ের দিকে তাকিয়ে রইলেন। দিলশাদ নরম গলায় বলল, তুমি আমাকে এখন কিছু সাহায্য কর বাবা। আমি জানি তোমার কাছে টাকা আছে। বেশি না হলেও আছে। যা আছে তুমি আমাকে দাও। আমি তোমার প্রতিটি টাকা গুনে গুনে ফেরত দেব।কোত্থেকে দিবি?

দরকার হলে পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করব।নাটক নভেলের মতো কথা বলছিস কেন? বাস্তব কথা বল। ফট করে বলে ফেললি পথে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করবি? ভিক্ষা করা এতই সহজ?খুব কঠিনও না। এখন তো ভিক্ষাই করছি। বাবা, তুমি বলো তোমার কাছে কত টাকা আছে। যা আছে সব তুমি আমাকে দিয়ে দাও। কত আছে তোমার সেভিংস অ্যাকাউন্টে? হাদিউজ্জামান সাহেব মেয়ের দিকে কঠিন চোখে তাকিয়ে রইলেন। মেয়ের উপর তার কোনো মমতা হচ্ছে না। রাগ লাগছে। বিপদ-আপদ মানুষের আসে। সেই বিপদ সামলাবার চেষ্টা করতে হয়। সাহসের সঙ্গে করতে হয়। মাথা নিচু করে বিপদ মোকাবেলা করা যায় না, মাথা উঁচু করে করতে হয়। তার উপর মেয়ের অবিশ্বাসও তাকে কষ্ট দিচ্ছে। বারবার জানতে চাচ্ছে ব্যাংকে কত আছে। আশ্চর্য!

সেভিংস অ্যাকাউন্টে তার আছে দুই লক্ষ তিন হাজার সাত শ’ তের টাকা। এটা গত মাসের হিসাব। ইন্টারেস্টে এক মাসে কিছু বেড়েছে। তিনি দিলশাদের নামে দুই লক্ষ টাকার একটা চেক কেটে রেখেছেন। স্ত্রীর সঙ্গে কথা ছিল দুজনে মিলে চেকটা মেয়ের হাতে দিয়ে আসবেন। এতে মেয়ে অনেকটা সাহস পাবে। দুঃখজনক হলেও সত্যি, বিপদে অর্থ যে সাহস দেয় অন্য কিছু সেই সাহস দিতে পারে না।

হাদিউজ্জামান উঠলেন। আসরের নামাজের সময় হয়ে আসছে। অজু করা দরকার। তিনি দিলশাদকে বললেন, একটু বোস, আমি নামাজটা পড়ে আসি। বেশিক্ষণ লাগবে না।দিলশাদ শুকনো মুখে বারান্দায় বসে রইল। ভালো বৃষ্টি হচ্ছে। বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। বাজ পড়ছে। নাতাশার জন্যে তার খারাপ লাগছে। সে ভয় পাবে কিন্তু ফুলির মাকে ডাকবে না। একা একা কষ্ট পাবে। দিলশাদ ঘড়ি দেখল। দুটা বাজে। ঘড়ি বন্ধ হয়ে আছে। বুকের মধ্যে ধক করে উঠল। কোনো অলক্ষণ কি? ঘড়ি কেন বন্ধ হবে? সেদিন মাত্র নতুন ব্যাটারি কেনা হলো।

হাদিউজ্জামান সাহেব নামাজ শেষ করতে অনেক সময় নিলেন। তিনি বারান্দায় এলেন চেক হাতে নিয়ে। স্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে মেয়েটাকে এই টাকাগুলো দেয়ার তার ইচ্ছা ছিল। দেয়া হলো না। মনোয়ারা তার মেয়ের আনন্দিত মুখ দেখতে পেল না। এটা একদিকে ভালোই হয়েছে। মনোয়ারার জন্যে উচিত শাস্তি। কেন সে দুপুরে ফেরার কথা বলে এখনো ফিরছে না? তিনি না খেয়ে বসে আছেন। একা একা তিনি খেতে পারেন না। তার খাওয়ার সময় মনোয়ারাকে সামনে থাকতে হয়।

দিলু! জি বাবা।নে মা। এই চেকটা রাখ। দুই লাখ টাকার চেক। এখন ভাঙাবি না। ভাঙালে খরচ হয়ে যাবে। সেভিংস অ্যাকাউন্টের চেক, জমা দেবার আগে আমাকে বলবি। আমি ব্যাংক ম্যানেজারকে চিঠি দেব। আমার চিঠি ছাড়া এতগুলি টাকা তারা রিলিজ করবে না।দিলশাদ চেক হাতে দাঁড়িয়ে রইল। তার চোখ ভিজে আসছে। বাবা না হয়ে মা যদি চেকটা তাকে দিত তাহলে সে হয়তো চিৎকার করে কেঁদে একটা কাণ্ড করে বসত।

হাদিউজ্জামান সাহেব বললেন, সেভিংস অ্যাকাউন্টে কত টাকা আছে জানতে চাচ্ছিলি– দুই লক্ষ তিন হাজার সাতশ’ তের টাকা আছে। তিন লক্ষ টাকা ছিল, গ্রামের স্কুলে এক লক্ষ টাকা সাহায্য করেছি। ওরা একটা লাইব্রেরি বানিয়েছে। তখন তো আর জানতাম না তোর এতবড় বিপদ হবে।দিলশাদের চোখ বেয়ে পানির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে। হাদিউজ্জামান। সাহেব বললেন, বিপদে অস্থির হবি না। অস্থির হলে বিপদ কমে না। বিপদ বাড়ে। আরেকটা কথা তোকে বলি– টাকা-পয়সা যদি জোগাড় না হয় অস্থির হবি না।

ভাববি এটাও আল্লাহর ইশারা। আল্লাহর ইশারা ছাড়া জগতে কিছু হয় না। তোর মেয়েকে আমার রোজ দেখতে যেতে ইচ্ছা করে। তোরা বাসা নিয়েছিস তিনতলায়। ডাক্তার আমাকে তিন ধাপ সিঁড়ি ভাঙতেও নিষেধ করেছে। ইচ্ছা করলেও যেতে পারি না। তোর মাকেও আমি তোর বাসায় যেতে নিষেধ করেছি। তার বিশ্রী কাঁদুনি স্বভাব আছে। সে নাতাশাকে দেখলেই এমন কান্নাকাটি শুরু করবে যে তোর মেয়ে ভয় পেয়ে যাবে। তার মনোবল যাবে ভেঙে। এই অবস্থায় মনোবল ভাঙা খুব খারাপ।বাবা আমি যাই? আচ্ছা মা, যাও।

যাই বলেও দিলশাদ দাঁড়িয়ে থাকে। তার ইচ্ছা করছে বাবাকে একটু ছুঁয়ে দেখতে। মনে হচ্ছে বাবাকে ছোঁয়ামাত্র বাবার ভেতর থেকে অনেকখানি সাহস তার ভেতর চলে আসবে। কিন্তু বাবার সঙ্গে তার দূরত্ব অনেক বেশি। হাজার ইচ্ছা করলেও বাবাকে সে ছুঁতে পারবে না, কিংবা তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে পারবে না। হাদিউজ্জামান সাহেব দিলশাদের দিকে তাকিয়ে বললেন, যাই বলেও মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছিস কেন? তোরা সবসময় ইনডিসিশনে ভুগিস– এটা আমার অসহ্য লাগে।

দুপুরে ঘুমুচ্ছিলাম। ঘুমের মধ্যেই মনে হলো দারুণ একটা কিছু ঘটতে যাচ্ছে। খুব : আনন্দময় কিছু। আমার এরকম প্রায়ই হয়। আমরা একবার নানিজনদের বাড়িতে বেড়াতে গেছি। মা নানিজান দুজনে মিলে এমন গল্প শুরু করলেন, সাড়ে এগারটা বেজে গেল। নানিজান বললেন, এতরাতে বাসায় ফিরে কী করবি? থেকে যা। আমরা থেকে গেলাম। নানিজানদের বাড়িতে বিছানার খুব অভাব। আমি, নানিজান আর মা আমরা তিনজন এক বিছানায় শুয়েছি। বালিশে মাথা ছোঁয়াবার সঙ্গে সঙ্গে আমার ঘুম চলে এলো।

ঘুমের মধ্যে মনে হলো, আমাদের খুব খারাপ কিছু ঘটতে যাচ্ছে। ভয়ঙ্কর কোনো সংবাদ নিয়ে কেউ একজন আসছে। আমার ঘুম ভেঙে গেল। জেগে দেখি, মা আর নানিজান তখনো মজা করে গল্প করছেন। খুব হাসাহাসি হচ্ছে। নানিজান বাচ্চামেয়েদের মতো মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে হাসছেন। আমাকে জেগে উঠতে দেখে নানিজান হাসিমুখে বললেন, কী রে নাতু, ছোট ঘর যাবি? নানিজান আমাকে ‘নাতু’ ডাকেন। নাতাশা নামটা নাকি তার কাছে অনেক লম্বা লাগে। ডাকতে গিয়ে দম ফুরিয়ে যায়।আমি বললাম, ছোট ঘরে যাব না, পানি খাব নানিজান।

নানিজান পানি আনার জন্যে উঠতে যাচ্ছেন, মা বললেন, তুমি বসো তো মা, আমি পানি এনে দিচ্ছি। আর ঠিক তখন কলিংবেল বেজে উঠল। আমি নিশ্চিত বুঝলাম খারাপ খবরটা এসে গেছে। আমার হাত-পা কাঁপতে লাগল। এত রাতে মা দরজা খুলতে গেলেন না। নানাভাই জেগে ছিলেন, তিনি উঠে দরজা খুললেন। মা গেলেন নানাভাইয়ের পিছু পিছু। মা’র সঙ্গে আমিও গেলাম।বুড়ো মতো ভিখিরী ধরনের এক জ্বলোক দরজা ধরে দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি বিড়বিড় করে কী যেন বললেন। এত নিচু গলায় বললেন যে, কেউ কিছু বুঝতে পারল না।

নানাভাই বিরক্ত গলায় বললেন, কী বলছেন জোরে বলুন। কিছু বুঝতে পারছি না। আপনার গলায় জোর নাই।বুড়ো দ্রলোক তখন আমার ছোট মামার মৃত্যুসংবাদ দিলেন।কতদিন আগের কথা, এখনো আমার স্পষ্ট মনে আছে। কথা বলার সময় বুড়ো ভদ্রলোকের মুখ থেকে থুথু ছিটকে আসছিল। সেই থুথুর খানিকটা এসে তাঁর দাড়িতে লাগল। দাড়ির মাথায় শিশিরের মতো থুথুর বিন্দু চিকচিক করতে লাগল। সেই থুথু আমি এখনো চোখ বন্ধ করলেই দেখতে পাই। যতদিন বেঁচে থাকব ততদিন দেখতে পাব।

বেশিদিন অবশ্যি আমি বেঁচে থাকব না। আর খুব অল্পদিনই বাঁচব। এটা মা জানে না। আমি জানি। এবং খুব সম্ভব আমার ডাক্তার সাহেব জানেন। মা পুরোপুরি নিশ্চিত চিকিৎসা-টিকিৎসা করে আমাকে সুস্থ করে ফেলবে। তখন আমি আবার আগের মতো হয়ে ছোটাছুটি শুরু করব। আমার অপারেশনের ব্যবস্থা সব হয়ে গেছে। এখন শুধু টিকিট কেটে প্লেনে ওঠা। ও না, ভিসা এখনো হয় নি। ভিসা নিয়ে মা খুব চিন্তা করছে। আমেরিকান অ্যাম্বেসি নাকি কাউকে ভিসা দিচ্ছে না। ভিসার চিন্তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে টাকার চিন্তা।

টাকা জোগাড় করার জন্যে মা প্রায় পাগলের মতো হয়ে গেছে। তার মাথা এলোমেলো। সেদিন সন্ধ্যাবেলা শুনি গুন গুন করে আপন মনে গান গাইছেন– ‘খোল খোল দ্বার রাখিও না আর বাহিরে আমায় দাঁড়ায়ে।আমি অবাক হয়ে মাকে দেখছি। কারণ তাঁকে আমি এভাবে কখনো গান গাইতে শুনি নি। মা আমার দিকে তাকিয়ে হঠাৎ খুব লজ্জা পেয়ে গেলেন। আমি বললাম, মা, তুমি সুন্দর গান গাও তো। মা আরো লজ্জা পেলেন। বিড়বিড় করে কী যেন বললেন।

এতটা লজ্জা পাওয়ার মার কিছু ছিল না। ভয়ঙ্কর দুঃসময়ে আমরা সবাই অস্বাভাবিক আচরণ করি। ছোট মামার মৃত্যুসংবাদ নিয়ে বুড়ো ন্দ্রলোক যখন এলেন তখন আমার নানাভাইও খুব অস্বাভাবিক আচরণ করেছিলেন। বুড়ো ভদ্রলোককে বললেন, শুধু-মুখে যাবেন না। পান খেয়ে যান।বাড়িতে তখন ভয়ঙ্কর কান্নাকাটি চলছে। নানাভাই এর মধ্যে ব্যস্ত হয়ে পান খোঁজাখুজি করছেন। আমি অবাক হয়ে নানাভাইয়ের কাণ্ড দেখছি। আমার ধারণা, সেদিন থেকেই নানাভাইয়ের মাথা কিছু কিছু খারাপ হতে শুরু করেছে। কেউ বুঝতে পারে নি। আমি কিন্তু বুঝেছি।

আমি অনেক কিছুই বুঝতে পারি। এই যে ঘুমের মধ্যে মনে হলো আজ খুব ভালো কিছু ঘটতে যাচ্ছে। আমি নিশ্চিত, আসলেই তা ঘটবে। কেউ বাজি ধরতে চাইলে আমি বাজি ধরতাম, এবং নির্ঘাৎ বাজিতে জিততাম।আমি বিছানায় উঠে বসলাম। তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরজার কলিংবেল বাজতে লাগল। সেই ভালো কিছুটা কি এক্ষুনি ঘটবে? বাবা কি এসেছেন? কিংবা বাবার কোনো চিঠি? আমার শরীর যেন কেমন কেমন করছে। মনে হচ্ছে মাথা ঘুরে আমি পড়ে যাব। বুয়া দরজা খুলতে এত দেরি করছে কেন?

আমাদের বুয়া সব কাজ ঝটপট করে, শুধু কলিংবেল বাজলে দরজা খুলতে দেরি করে। মনে হয় কলিংবেলের শব্দ অনেক পরে তার কানে যায়। শব্দের গতিবেগ যেন কত? স্কুলে পড়েছিলাম। এখন আর মনে পড়ছে না। আলোর গতিবেগ মনে আছে সেকেন্ডে এক লক্ষ ছিয়াশি হাজার মাইল। ও হ্যাঁ মনে পড়েছে- শব্দের গতিবেগ হলো প্রতি সেকেন্ডে তিনশ বত্রিশ মিটার। এক ফুট সমান ৩০.৪৮ সেন্টিমিটার।

আবার কলিংবেল বাজছে। বুয়া এখন যাচ্ছে। এত আস্তে আস্তে পা ফেলছে, মনে হচ্ছে পায়ের তলায় কোনো ফোড়া-টোড়া হয়েছে। পা ফেলতে খুব কষ্ট।দরজা খুলল। কার সঙ্গে যেন কথা হচ্ছে। কিছু বোঝা যাচ্ছে না। আবার দরজা বন্ধ হলো। আমি বললাম, কে এসেছিল? বুয়া বলল, কেউ না।এটা কোনো জবাব হলো? কেউ না আবার কী? কেউ একজন তো নিশ্চয়ই এসেছে।তুমি কার সঙ্গে কথা বললে? উকিল সাবের বাড়ির ঠিকানা খুঁজে। আমি বলছি জানি না।জানি না বললে কেন?

উকিল সাহেবের বাড়ির ঠিকানা তো তুমি জানো। আমাদের ফ্ল্যাটের সামনের বকুল গাছওয়ালা বাড়িটা উকিল সাহেবের বাড়ি।যার দরকার হে খুঁইজা বাইর করুক।খোঁজ করে তো সে পাচ্ছে না। তুমিও তাকে বলছ না।আমার অত ঠেকা নাই। কিছু খাইবেন আফা। শীতল পানি।আমাদের বুয়া মাঝে মাঝে কঠিন শব্দ ব্যবহার করে। ঠাণ্ডা পানি বলে না, বলে শীতল পানি। দৈ বলে না, বলে দধি। রুই মাছকে বলে রুহিত মাছ।আফা, শীতল পানি আনমু?

আমি হ্যাঁ-সূচক মাথা নাড়ালাম। আমার আসলেই পানির পিপাসা হচ্ছে। বুয়া উৎসাহের সঙ্গে শীতল পানি আনতে চলে গেল। এখন আর তার পায়ের তলায় ফোড়া নেই। সে প্রায় দৌড়ে যাচ্ছে।মা আমার পানি খাওয়ার জন্যে একটা ফ্রিজ কিনেছেন। সেই ফ্রিজ জন্মদিন উপলক্ষে আমাকে দেয়া হয়েছে। ছোট্ট লাল টুকটুকে একটা ফ্রিজ। মা’র টাকা পয়সার এত টানাটানি, এর মধ্যে ফ্রিজ কিনল কেন? আমাকে অনেকখানি খুশি করে দেওয়ার জন্যে? যাই হোক, আমাকে সেই ফ্রিজের পানি খাওয়ানোর ব্যাপারে বুয়ার খুব উৎসাহ।

বালিশের নিচ থেকে আমি আমার অ্যালার্ম ঘড়ি বের করলাম। সময় দেখলাম। তিনটা পঁচিশ। ঘড়িটাও আমি জন্মদিনে পেয়েছি। বড়খালা দিয়েছেন। ঢাকনা দেওয়া একটা ঘড়ি। ঘড়িটার ঢাকনার রঙও লাল টুকটুকে। আশ্চর্যের ব্যাপার, এবারের জন্মদিনে আমি সব লাল রঙের জিনিস পেয়েছি। নিজান। আমাকে কামিজ কিনে দিয়েছেন। সেটার রঙও লাল। আমার স্কুলের মেয়েরা আমাকে একটি চকলেট আর বড় রঙ পেন্সিলের বাক্স দিয়েছে। পেনসিল বক্সে দুটা লাল রঙের ঘোড়া আঁকা।আমার জন্ম ৩রা বৈশাখ। আমার জন্মের পর পর দাদাজানের কাঁঠাল গাছ থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে টিয়া পাখি উড়ে গিয়েছিল।

এই দৃশ্য আমি দেখি নি, কিন্তু আমার কল্পনা করতে খুব ভালো লাগে। প্রতি জন্মদিনের ভোরবেলায় আমার মনে হয়- আজ কোনো একটা গাছ থেকে একঝাক টিয়া পাখি আকাশে উড়বে।এ বছর আমার জন্মদিন করার কথা ছিল না। মা বললেন, অসুখ-বিসুখের মধ্যে জন্মদিন ভালো লাগবে না। রোগ সারুক, তারপর আমরা দারুণ হৈচৈ করে জন্মদিন করব। বিরাট একটা পার্টি দেব। ঠিক আছে মা? আমি বললাম, আচ্ছা।মানুষ যেরকম ভাবে সেরকম হয় না। জন্মদিনের দিন সকাল থেকে এত মানুষ আসা শুরু করল। উপহারে ঘর ভর্তি হয়ে গেল। মার মুখ থমথমে হয়ে গেল।

মা চাপা গলায় নানিজানকে বললেন, তোমরা কি ভেবেছ এটা আমার মেয়ের শেষ জন্মদিন? তোমাদের কাউকে আমি আসতে বলি নি। কেন তোমরা এত কিছু নিয়ে এসেছ? তোমরা যা ভাবছ তা হবে না। আমি আমার মেয়ের একশ বছরের জন্মদিন করব। নানিজান হাসিমুখে বললেন, একশ বছরের জন্মদিন তুই করতে পারবি না। তুই এতদিন বাঁচবি না। অন্যরা করবে।মা কাঁদতে শুরু করলেন। নানিজান মা’র পিঠে হাত বুলাতে বুলাতে বললেন, নাতুকে নিয়ে তুই অনেকদিনের জন্যে বিদেশে চলে যাবি, কতদিন তাকে দেখব না। কাজেই একটা উপলক্ষ ধরে আমরা এসেছি। তুই এত রাগ করছিস কেন?

নাতুর মাথার টিউমারের চেয়ে বড় টিউমার তো তোর মাথায় হয়েছে রে। আমেরিকা থেকে তুইও একটা অপারেশন করিয়ে আসিস। নানিজান মাথা দুলিয়ে খুব হাসতে লাগলেন। মা হেসে ফেললেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে গেল।আমার নানিজান অসাধারণ একজন মহিলা। যখনি তাকে দেখি তখনি তিনি হাসছেন এবং এত মিষ্টি করে হাসছেন। যার অন্তর যত সুন্দর সে নাকি তত সুন্দর করে হাসে। যদি তাই হয় তাহলে নানিজানের মতো সুন্দর অন্তর আর কারো নেই।তিনি এসেই বললেন, এই নাতু, শুয়ে থাকবি না তো। উঠে বোস। রোগী শুয়ে থাকলে রোগ বসে থাকে। আর রোগী উঠে বসলে রোগ শুয়ে পড়ে।

Leave a comment

Your email address will not be published.