সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -১৭

এদিকে বটুকবাবুর ছেলে রথীন থাকত কলকাতায়। অমরেন্দ্রর ছেলে হেমেন্দ্রর বাড়ির পাশেই সে থাকত। হেমেন্দ্রর সঙ্গে তার বাবা অমরেন্দ্রর নাকি ভাল সম্পর্ক নেই (কর্নেলের বক্তব্য)। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, বটুকবাবুর নাম করে উড়ােচিঠি লিখে অমরেন্দ্রর এক কর্মচারী যােগেন অমরেন্দ্রকে ভয় দেখাত। গত বছর কর্নেল তাকে ধরিয়ে দেন অর্থাৎ উড়ােচিঠির রহস্য ফাঁস হয়। কেন যােগেন এ কাজ করত? কর্নেল জানাননি আমাকে।

কর্নেল সমগ্র ১ম খণ্ড

এই সময় ফোন বেজে উঠল। বিরক্ত হয়ে ফোন তুলে অভ্যাসমতাে বললাম, রং নাম্বার। 

‘রাইট নাম্বার ডার্লিং! 

কর্নেল! কী ব্যাপার? রাত বারােটা বাজে। ‘তুমি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর থেকে চারবার কেউ ফোন করে আমাকে বলেছে, চাই চিচিং ফাঁক। দারুণ ইন্টারেস্টিং নয়? 

‘আমিই কিন্তু বলেছিলাম কথাটা চাই চিচিং ফাঁক। ‘তােমার বুদ্ধির প্রশংসা করছি।” ‘কিন্তু শুধু এই কথাটা জানাবার জন্য এত রাতে নিশ্চয় ফোন করছেন না? 

‘তুমি বুদ্ধিমান জয়ন্ত! ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জি সকালে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। বিকেলে আমার অ্যাপার্টমেন্টে এসেছিলেন। তখন তুমি ছিলে। কিন্তু উনি এখনও বাড়ি ফেরেননি। 

বলেন কী ? কে জানাল আপনাকে? ‘ওর স্ত্রী অরিজিৎকে ফোন করেছিলেন। অরিজিৎ ওঁর খোঁজে পুলিশ লড়িয়ে দিয়েছে। একটু আগে আমাকে অরিজিৎ ফোনে জানাল, এত রাতে ডিসটার্ব করার জন্য দুঃখিত। যা-ই হােক, ইন্দ্রজিত্ত্বাবুর নিখোঁজ হওয়ার চেয়ে অদ্ভুত ঘটনা, অরিজিই বলল যে, ইন্দ্রজিৎবাবুর স্ত্রী মৃদুলা রাঙাটুলির মেয়ে। কথায় কথায় অরিজিৎকে সেটা জানিয়েছেন মৃদুলা। অরিজিৎ যেহেতু আমার কাছে তখন রাঙাটুলির ইকোলজিস্ট অনাথবন্ধু রায়ের কথা শুনেছিল, তাই রাঙাটুলি কথাটা ওর মনে ছিল। তবে কথাটা অরিজিৎ নেহাত ক্যাজুয়ালি আমাকে জানাল। অরিজিৎকে আমি অমরেন্দ্র সিংহরায়ের কথা জানালাম না।। 

‘ব্যস্! এ যে তাহলে রাঙাটুলি রহস্য হয়ে উঠল। 

নাহ। পরগাছা রহস্য। তার মানে? ‘মানে জানতে হলে সকাল আটটার মধ্যে আমার কাছে চলে এসাে। ছাড়ছি। গুড নাইট। হ্যাভ আ নাইস স্লিপ, ডার্লিং! 

কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -১

ফোন রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ সিগারেট টানছিলাম। উদ্বিগ্ন হয়ে ভাবছিলাম, ইন্দ্রজিৎবাবুকে ডিস্কো খতম করে ফেলেনি তাে? কিন্তু তার চেয়ে ভয়ের কথা, এবার কর্নেলকেই ভুতুড়ে ফোনে চাই চিচিং ফাঁক’ বলে কেউ উত্ত্যক্ত করছে। ডিস্কো নয় বলেই মনে হচ্ছে। সে হলে সােজাসুজি চার্জ করে বসত কর্নেলকে, আমার এই জিনিসটা চাই। চিচিং ফাঁক’ এই সাংকেতিক কথা বলার পাত্র নয় সে। তাছাড়া সে কর্নেলকে উত্ত্যক্ত করবেই বা কেন? কী লাভ হবে তাতে? এ নিশ্চয় অরিজিৎ লাহিড়ি যে তৃতীয় লােকের কথা বলছিলেন, তারই কাজ। 

সকালে কর্নেলের অ্যাপার্টমেন্টে গিয়ে দেখি, একটা প্রকাণ্ড বই খুলে বসে আছেন। বইয়ের পাতায় চোখ রেখেই বললেন, ‘আজ সব কাগজে কলগার্ল খুন হেডিংয়ে চন্দ্রিকার খবর বেরিয়েছে। .. 

বললাম, চোখ বুলিয়েছি। খুঁটিয়ে পড়িনি। ছাঁচে ফেলা খবর। কিন্তু আপনি এই সক্কালবেলা রহস্য ছেড়ে বইয়ে ডুব দিতে গেলেন দেখে অবাক লাগছে। 

কর্নেল বইটা রেখে একটু হেসে বললেন, এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার ব্রিটিশ আর্মিবেসের রেকর্ড। কোথায়-কোথায় সামরিক ঘাঁটি করা হয়েছিল, সেই সব ঘাঁটির সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। 

বুঝলাম, রাঙাটুলি আর্মিবেসের তথ্য খুঁজছেন। কিন্তু কেন? ‘নিছক কৌতূহল। বলে কর্নেল নিভে যাওয়া চুরুট ধরালেম। একটু পর ফের বললেন, ইন্দ্রজিৎবাবুর স্ত্রী মৃদুলা একটু আগে ফোন করেছিলেন। 

‘ইন্দ্রজিৎবাবু বাড়ি ফিরেছেন কি? 

কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -১

‘নাহ্। মৃদুলা কাগজে চন্দ্রিকার খবর পড়ে খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছেন। চন্দ্রিকাকে উনি চিনতেন। কিন্তু চন্দ্রিকা কলগার্ল হয়েছে জানতেন না। বললেন যে, ওঁর স্বামীর সঙ্গে চন্দ্রিকা মাঝেমাঝে ওঁদের বাড়িতে যেত। সেই নিয়ে কোনও সন্দেহ জাগার কথা নয়। কারণ সৌরভ.নাট্যগােষ্ঠীর আরও মেয়ে ওঁর স্বামীর সঙ্গে যেত। রিহার্সাল হতাে ওঁদের বাড়িতেই। | ষষ্ঠী আমার জন্য কফি আনল। কফি খেতে খেতে বললাম, মৃদুলা তাে রাঙাটুলির মেয়ে! চন্দ্রিকা সম্পর্কে নতুন কিছু জানতে পেরেছেন ওঁর কাছে ? 

‘ফোনে বেশি কথা বলা যায় না। কর্নেল আস্তে বললেন, ‘কফি খেয়ে নাও। বেরুদ্ধ। মৃদুলা আমার জন্য অপেক্ষা করছেন। | ইন্দ্রজিৎ ব্যানার্জির বাড়ি লেকের কাছাকাছি। ফ্ল্যাটবাড়ি নয়, দোতলা বনেদী বাড়ি। গেটে লেখা আছে ‘সৌরভ। একজন তাগড়াই গড়নের যুবককে সম্ভবত আমাদের জন্যই দাঁড় করিয়ে রেখেছিলেন মৃদুলা। তার পরনে জিনস। ফিল্মহিরাের কেতা আছে হাবভাবে। নমস্কার করে বলল, ‘আসুন স্যার! ভেতরে গাড়ি রাখার জায়গা আছে। 

সে গেট খুলে দিল। ছােট্ট লনের পর পাের্টিকো। সেখানে গাড়ি রেখে আমরা নামলাম। কর্নেল বললেন, আপনি কি সৌরভ নাট্যগােষ্ঠীর অভিনেতা? 

যুবকটি হাসল। হ্যাঁ, স্যার! ‘ ‘পরগাছা নাটকে আপনি গাবুর রােলে ছিলেন ? 

যুবকটি একটু অবাক হয়ে বলল, আপনি ঠিকই চিনেছেন স্যার। আমার নাম । সুশান্ত সেন। আপনার সব কথা স্যার, মৃদুলাদি বলেছেন আমাকে।’ 

কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -১

কর্নেল ঘরে ঢুকে বললেন, কী সব কথা? ‘এই মানে—আপনি ডিটেকটিভ অফিসার …’ 

কর্নেল জিভ কেটে বললেন, ‘ছি, ছি! আমি ডিটেকটিভ নই। কথাটা একটা গালাগাল। কারণ টিকটিকি কথাটা ডিটেকটিভ থেকে এসেছে। যাই হােক, মিসেস ব্যানার্জিকে খবর দিন।। 

সুশান্ত আরও অবাক হয়ে ভেতরে গেল। ঘরটা আধুনিক ছাঁদে সাজানাে। রুচির ছাপ আছে। একটু পরে সুশান্ত ফিরে এসে বলল, ‘মৃদুলাদি আসছেন। ফোনে কথা বলছেন কার সঙ্গে।’ 

‘সুশান্তবাবু, আপনি কিন্তু অসাধারণ অভিনয় করেন। আপনার অভিনয় দেখে আমি মুগ্ধ। তাে আপনি থাকেন কোথায় ? 

সুশান্ত একটু ইতস্তত করে বলল, আমি এ বাড়িতেই থাকি স্যার। ইন্দ্রদা আমাকে অনেক কাজের দায়িত্ব দিয়েছেন। ধরুন, রিহার্সালের ব্যবস্থা করা হলাে, বুকিং, নানা জায়গায় কন্ট্যাক্ট করা। ম্যানেজার বলতে পারেন। 

চন্দ্রিকা রায় তাে আপনাদের দলেই অভিনয় করত? সুশান্ত চমকে উঠল। হ্যাঁ কাগজে দেখলাম মার্ডার হয়েছে।

 

Read More

সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজের কর্নেল সমগ্র প্রথম খন্ড এর অংশ -১৮

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *