কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

পুলিশের চাকরির কারণে বাবা রেশন পেতেনভাতডালের ব্যবস্থা হতােবাকি খরচ কোথেকে আসবে! পুলিশের রেশনে কাপড় দেয় নামা’কে তাকিয়ে থাকতে হতাে তার বাবার দিকে উনি প্রায়ই কন্যার শাড়ি কিনে পাঠাতেন। 

কিছু শৈশবস্বামীস্ত্রীর নিখাদ ভালােবাসায় সংসার অতি সুখের হয় এই ধারণা ভুল। সংসার সুখের হতে হলে কিছু অর্থের অবশ্যই প্রয়ােজন হয়। 

আমার মায়ের নিশ্চয়ই ইচ্ছা করত ভালাে কোনাে খাবার তার স্বামীপুত্র কন্যাদের পাতে তুলে দিতেতিনি কখনােই তা পারেন নিমা’কাছ থেকে শােনা আমাদের বাসার মেনু ছিল— 

নাশতা : রুটি, পেঁপে ভাজি (আটা পুলিশের রেশনের)লাঞ্চ : ভাত, ডাল, ডালের বড়া (ডালের বড়া বানানাের তেল 

পুলিশের রেশনের)। ডিনার : ভাত, ডাল, নিমপাতা ভাজি (বাসার পেছনে বড় নিম গাছ 

ছিলআমরা সেই নিম গাছের সব পাতা ভেজে খেয়ে ফেলেছি)

সমস্যার এখানেই শেষ না, বাবার নিয়ম ছিল কোনাে ভিখিরি এসে যদি ভাত চায় তাকে ভাত খেতে দিতে হবে ভিখিরিরাও এই খবর পেয়ে গিয়েছিলপ্রতি দুপুরেই তারা নিয়ম করে এসে কুয়াতলায় বসে পরম তৃপ্তিতে ভাত খেতভিখিরিদের খাওয়া দেখাটা আমার জন্যে খুব আনন্দের ছিলকী তৃপ্তি করেই না তারা প্লেট চেটেপুটে খেত! দেখে মনে হতে অমৃতসম কোনাে খাদ্য খাচ্ছে। 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

একদিন আমি মাকে বললাম, আমিও ভিখিরিদের মতাে কুয়ার পাড়ে বসে টিনের থালায় ভাত খাব। 

মা চড় দিয়ে বললেন, কী জন্যে ? কুয়ার পাড়ে বসে ভাত খেতে খুবই মজা। 

মা তার ছেলের অধঃপতন দেখে রাগেদুঃখে কেঁদেকেটে অস্থির হলেন। সব ঘটনা শােনার পর বাবা নির্দেশ দিলেনছেলেকে দুপুরে কুয়ার পাড়েই ভাত দেয়া হবে। 

আমি তিনচারবেলা খেয়েছিআমি এবং আমার ছােটবােন শেফুদাদাভাই যা করে শেফুর তাই করা চাইকুয়ার পাড়ে স্বাদের কোনাে উনিশ বিশ না দেখে পূর্বাবস্থায় ফিরে যাওয়া হয়। 

মা’প্রসঙ্গে ফিরে আসিসংসারের যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ একজন তরুণীছেলেমেয়েগুলি প্রচণ্ড দুষ্টকেউ ঘরে থাকে নাঘরে অভাব। তরুণীর দিশাহারা হবারই কথাসেই বয়সের একটি মেয়ের কোনাে শখই পূর্ণ হবার নাহঠাৎ হঠাৎ ছবিঘরে ছবি দেখতে যাওয়াপাড়া পাড়ায় বেড়ানাে

কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

তিনি কখনাে তাঁর মেয়েকে নিয়ে কখনােবা আমাকে নিয়ে নিজের আনন্দে ঘুরে বেড়াতেনমাঝে মাঝে নিতান্তই অপরিচিত বাড়িতেও ঢুকে যেতেন। 

একবার বাবা খুব রাগ করলেন, কারণ মা ডিসট্রিক্ট জজ সাহেবের বাড়িতে বেড়াতে গেছেনগল্পগুজব করে এসেছেনবাবা বললেন, আয়েশা শােন, মি নিতান্তই সাধারণ এক পুলিশের দারােগাজজ সাহেব কত উপরের একজন মানুষতুমি কী মনে করে তাঁর বাড়িতে গেলে

মা বললেন, অসুবিধা কী? আমার স্বামী সাধারণ একজন দারােগা, কিন্তু আমার ছেলেমেয়েরা একদিন অবশ্যই জজব্যারিস্টার হবেআমি জর্জ ব্যারিস্টারের মা হিসেবে বাড়িতে গিয়েছি। 

বাবা হেসে দিয়ে বললেন, তােমার যুক্তি মানলামতুমি যেখানে ইচ্ছা যাবেঅভাবঅনটন একেকজনের উপর একেকভাবে ক্রিয়া করে অভাবঅনটন মাকে যুক্তিবাদী করল। মার কাছ থেকে আমি শিখেছি লজিকআমি বাজি রেখে বলতে পারি, লজিকে কেউ তাঁকে হারাতে পারবে নাতবে আমি কয়েকবার হারিয়েছিমা নিশ্চয়ই পুত্রের কাছে লজিকে পরাজিত হয়ে খুশি হয়েছেনকারণ ছাত্র এবং পুত্র এই দুইয়ের কাছে পরাজয়ে আনন্দ আছেএই দুইয়ের বাইরে কারাে কাছে পরাজিত হওয়া দুঃখের এবং কষ্টের ব্যাপার

কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

মাকে লজিকে হারানাের গল্পটা বলিআমি দীর্ঘদিনের সংসার ভেঙে অভিনেত্রী শাওনকে বিয়ে করলামমা চিন্তাই করতে পারেন নি তাঁর কোনাে ছেলে এমন কাণ্ড করবেতিনি তাঁর ছেলেকে ত্যাগ করলেনআমার সব ভাইবােনরাও একই কাজ করলতাদের যুক্তিআমি পরিবারকে ছােট করেছি, তাদেরকেও ছােট করেছিআমার কর্মকাণ্ডে আমার ভাইবােনরা কেন ছােট হবে আমি বুঝতে পারি নাসবাই তার নিজের কর্মের জন্যে দায়ীএকজনের কর্মের দায়িত্ব অন্যজনের না। 

ভাইবােনদের সঙ্গে আমি কোনাে যুক্তিতে গেলাম নাঅতি যুক্তিবাদী মহিলা মার কাছে গেলামতিনি কঠিন গলায় বললেন, আমি কখনাে কোনােদিনও তাের বাসায় যাব না। 

আমি বললাম, যুক্তিতে আসুনকোন যুক্তিতে আমার বাসায় আসবেন না সেটা বলুন আমি শুনিমা যুক্তি দিলেনআমি পাল্টা যুক্তি দিলাম মাকে বলতে হলাে তাের যুক্তি মানলামকিন্তু আমি যাব না

মা অবশ্যি তাঁর প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে পারেন নিশাওনের চরম দুঃসময়ে তিনি হাসপাতালে ছুটে এলেনশাওনের তখন খুবই খারাপ অবস্থাতার পেটের সন্তান সাত মাসে মারা গিয়েছেসে কাঁদতে কাঁদতে শুধু বলছে, আমার লীলাবতীলীলাবতী! সন্তানটির নাম রাখা হয়েছিল লীলাবতীলীলাবতীর জন্যে সে কত কিছুই না কিনেছিল! 

কিছু শৈশব-পর্ব-(১১)-হুমায়ূন আহমেদ

আমি অল্পতেই ভেঙে পড়িমা পাশে এসে দাঁড়াতেই অনেক সাহস পেলামহঠাৎ মনে হলাে, আমি তাে একা নাআমার মা আমার পাশে আছেনএবং অবশ্যই আমার মৃত বাবাও হাসপাতালেএই ঘরেই আছেনগভীর বেদনায় বলছেন, বাছুনি বড় বেটা হুমায়ূনের পাশে কেউ নেই কেন ? কেন আমার ছেলে একা একা কাঁদবে ? আমি কি এই শিক্ষাই আমার ছেলেমেয়েদের দিয়েছি

বাবা তাঁর সব ছেলেমেয়েকে নাম ধরে ডাকতেনশেফু, ইকবাল, শাহীন, শুধু তাঁর বড়ছেলের জন্যে আলাদা নাম এবং বিরাট নামবাঙ্গুনি বড় ব্যাটা হুমায়ূন

 

Read more

কিছু শৈশব-পর্ব-(১২)-হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *