কোথাও কেউ নেই পর্ব – ০৯ হুমায়ূন আহমেদ

কোথাও কেউ নেই পর্ব – ০৯

শওকত সাহেব কিছু বললেন না। শমসের আলি নিচু গলায় কথা চালিয়ে যেতে লাগলেন। একজনকে উইথড্র করা মানে কেইস দুর্বল করা। চোখ বন্ধ করে ঘুমান, খালাস পেয়ে যাবেন। শুধু খালাস না। চাকরি ও ফেরত পাবেন। নাইন্টি নাইন পারসেন্ট গেরান্টি।

শওকত সাহেব প্রায় তিন ঘণ্টার মত সময় বিন! কারণে অফিসে বসে কাটালেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন সবাই খুব অস্বস্তি বোধ করছে, তবু তার চলে যেতে ইচে্ছ করছিল না;

তাঁর চেয়ারে নতুন একটি ছেলে এসেছে। প্রথম চাকরিতে ঢুকেছে বোধ হয়। কিছুই জানে না। বার বার চেয়ার ছেড়ে উঠে অন্যদের জিজ্ঞেস করছে। এইসব অল্প বয়সী ছোকড়া দিয়ে কাজ হয়? ফাইলিং শিখতেই এক বছর লাগবে।

উকিল সাহেবের কাছে তাদের ডাক পড়ল একটার দিকে। উকিল সাহেব টিফিন-ক্যারিয়ার খুলে আলু ভাজা এবং পরোটা খাচ্ছেন। এত নামী ডাকি একজন মানুষ আলুভাজা এবং পরোটা দিয়ে লাঞ্চ খায় শওকত সাহেবের ধারণা ছিল না। উকিল সাহেব দরজা গলায় বললেন বসেন, দাঁড়িয়ে আছেন কেন? বাকের হাত কচলে বলল, স্যার ভাল আছেন?

ভালই আছি।………..আমাদের কেউসটা দেখেছেন?………….হ্যাঁ দেখলাম। কনভিকসন হবে না। নিশ্চিন্ত থাকেন। এই কেইসে যদি আমার ক্লায়েন্টের কনভিকসন হয় তাহলে তো আমাকে ওকালতি ছেড়ে কাঠমিস্ত্রি হতে হবে। হা হা হা।

উকিল সাহেবের সঙ্গে গলা মিলিয়ে বাকেরও হাসল। সে মুগ্ধ। শওকত সাহেব ক্ষীণ স্বরে বলল, চাকরি ফিরে পাব?………কনভিকসন না হলে নিশ্চয়ই ফিরে পাবেন। কনভিকসন না হওয়ার মানে হল আপনি অপরাধী নন। যে অপরাধী না তার চাকরি থাকবে না কেন? তবে ওরা যদি কোর্টে না এসে ডিপার্টমেন্টাল অ্যাকশন নিত, তাহলে চাকরি থাকত না।

ওরা সেটা নেয়নি। কোর্টে এসেছে। আপনার জন্যে শাপে বর হয়েছে। কোনো রকম দুঃশ্চিন্তা করবেন না। ভরসা রাখেন আমার ওপর।…………বাকের দাঁত বের করে বলল, আপনার ওপরই স্যার ভরসা। নব্বই পারসেন্ট ভরসা আপনার ওপর। আর দশ পারসেন্ট আল্লার ওপর।

উকিল সাহেব বাকেরের কথা পছন্দ করলেন বলেই মনে হয়। তিনি তার পান খাওয়া কালো কালো দাঁত বের করে হো হো করে হাসতে লাগলেন। যেন খুব-একটা মজার কথা।

বকুল অনেকদিন পর টিনা ভাবীর বাসায় এসেছে। আড়াইটা বাজে। বেড়াতে আসার মত সময় নয়। কিন্তু টিনা ভাবীর বাসায় তার অসময়ে আসতেই ভাল লাগে। বকুল কড়া নেড়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। দরজা খুলল এক অপরিচিত মেয়ে। টিনা ভাবীর বোন হবে। তার মত দেখতে।

টিনা ভাবী আছে?………………আছে। ঘুমাচ্ছে।…………..বকুল সরাসরি শোবার ঘরে ঢুকে গেল। টিনা ঘুমাচ্ছিল না। শেষ পর্যায়ে এসে সে খুব কাহিল হয়ে পড়েছে। চিৎ হয়ে ছাড়া ঘুমুতে পারে না। কাত হয়ে শুলেই মনে হয় পেট শরীর থেকে খসে আসবো।

সে বিরক্ত স্বরে বলল, বকুল তুই কী মনে করে?………..কেমন আছ ভাবী?…………জিজ্ঞেস করতে লজ্জা লাগে না? এত দিন পর তুই কী মনে করে এলি?……….আসতে ইচ্ছা করছিল না ভাবী। কোথাও যাই না। আমি স্কুলেও যাই না।

তোর বাবা দোষ করেছে, তুই তো করিসনি?………….বাবা কিছু করেনি।………তোদের আচার-আচরণে তো এরকম মনে হয় না। ঐ দিন বাবু যাচ্ছিল বাসার সামনে দিয়ে। আমি এত ডাকলাম, সে ফিরে ও তাকাল না। এ রকম ভাব করল যেন শুনতে পায়নি।

বকুল প্রসঙ্গ পাল্টাবার জন্যে বলল, তোমার পেট তো ভাবী হিমালয় পর্বতের মত হয়ে গেছে।………….তা হয়েছে। আগে ভেবেছিলাম যমজ এখন মনে হচ্ছে। যমজ না, তিনজন বাস করছে। তিন বাচ্চাকে কী বলে ত্রিমজ?………বকুল খিলখিল কবে হেসে ফেলল। বহুদিন এমন প্ৰাণ খুলে সে হাসেনি। সে সন্ধ্যা পর্যন্ত টিনা ভাবীর সঙ্গে থাকল।

বাচ্চাদের জন্যে কাঁথা বানানো হল খানিকক্ষণ। খানিকক্ষণ ছাদে বসে গল্প হল। তেঁতুল এবং কাঁচা কলার ভর্তা বানিয়ে মহানন্দে খাওয়া হল। এ বড় সুখের সময়।..টিনা একসময় বলল, তুই একবার আমার সঙ্গে সারারাত থাকবি। রাত জেগে গল্প করব।

কী গল্প?……………..কিছু কিছু গল্প রাতেই করতে হয়; সেই সব গল্প।…….টিনা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। বাড়ি ফেরার আগে বকুল হঠাৎ নিচু স্বারে বলল, আচ্ছা ভাবী, যদি কোনো মেয়ের কোনো ছেলেকে ভাল লাগে তাহলে তার কী করা উচিত? ধর ছেলেটার মেয়েটাকে ভাল লাগছে না। শুধু মেয়েটারই লাগছে।

টিনা বেশ কিছু সময়। চুপ চাপ থেকে বলল মেয়েটা যদি তোর মত সুন্দরী হয় তাহলে তার উচিত এক’দিন ভাল লাগার ব্যাপারটি ছেলেটিকে বলা;……………আর যদি আসুন্দরী হয়?……..টিনা জবাব দিল না। সহজ ভাবেই অন্য প্রসঙ্গ নিয়ে এল।

তোর বিয়ের কী হল?…………..কিছু হয়নি। এর জন্যে কী তোর মন খারাপ?……….নাহ।…….বকুল বাড়ি ফিরল মন খারাপ করে । যদিও মন খারাপ করার মত কিছুই ঘটেনি সেখানে।…..বাবু আজ স্কুলে যায়নি।

অথচ সকাল বেলা বই-খাতা নিয়ে বের হয়েছে। স্কুলের গোট পর্যন্ত গিয়ে নান্টুকে বলল আমার মাথা ধরেছে, আজ যাব না। অথচ তার মাথা ধরেনি।….সে অন্যমনস্কভাবে এদিক-ওদিক খানিকক্ষণ ঘুরল। স্কুলের লাগোয়া মিউনিসিপ্যালিটির একটি শিশু পার্ক আছে। সেখানে বসে রইল একা একা। এখান থেকে স্কুলের ঘণ্টার শব্দ শোনা যায়। সেকেন্ড পিরিয়ড শেষ হবার ঘণ্টা শুনে সে পার্ক থেকে বেরুল।

রাস্তার পাশে একজন বুড়ো মানুষ ম্যাজিক দেখিয়ে নিম টুথ পাউডার বিক্রি করছিল। সে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে দেখল। পুরনো ধরনের ম্যাজিক। চারটা হরতনের বিবি চারটা টেক্কা হয়ে যায়। দড়ি মাঝখানে কেটে রুমাল দিয়ে ঢেকে রাখার পর সেই দড়ি জোড়া লেগে যায়। এই সব হাবিজাবি। বুড়োটা যখন বলল বাচ্চা লোগ তালি লাগাও। তখন সে চলে এল। ছেলে-বুড়ো সবাই মহানন্দে তালি দিচ্ছে, তার তালি দিতে ইচ্ছা করছে না।

হঠাৎ করে তার মন খারাপ লাগছে। বাবুর ইচ্ছা করল হেঁটে হেঁটে অনেক দূরে কোথাও চলে যায়। দূরের সেই অচেনা দেশে থাকবে শুধু অপরিচিত মানুষ। কেউ তাকে চিনবে না। সেও চিনবে না কাউকে। কেউ ইঞ্জিনিয়ার সাহেবের স্ত্রীর মত জিজ্ঞেস করবে না তোমাদের সংসার এখন কে চালাচ্ছে বাবু? কিংবা আলমের বাবার মত কেউ বলবে না তোমরা নাকি এই বাসা বদলি করছ? সত্যি নাকি?…………….বাবুর ইচ্ছে হচ্ছিল বলে, আমরা এ বাড়ি ছাড়লে আপনার কী? কিন্তু সে কিছু বলেনি।

সে মুনা আপার মত না। কারো মুখের ওপর সে কথা বলতে পারে না। শুধু চাপা একটা রাগ হয়। রাগের জন্যে মাথা ধরে যায়। প্রথম দিকে অল্প অল্প ধরে, তারপর যন্ত্রণাটা বাড়তে থাকে। ধক ধক শব্দ হয়ে মাথায়। পুলের উপর ট্রেন গেলে যে রকম শব্দ হয় সে রকম শব্দ।

ভাল লাগে না, কিছু ভাল লাগে না। সেদিন ক্লাসের ইরাজুদিন স্যার হঠাৎ বললেন এই তোর বাবা নাকি জেল হাজতে, সত্যি নাকি? বাবুর কান্না এসে যাচ্ছিল, সে বহু কষ্টে কান্না সামলাল। স্যার আবার বললেন সত্যি নাকি রে? বাবু চাপা স্বরে বলল, সত্যি না স্যার। বাবুদের ক্লাস ক্যাপ্টেন বলল, মামলা চলছে স্যার। রায় হয় নাই।

পড়া বাদ দিয়ে ইরাজুদ্দিন স্যার মামলার ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠলেন এবং সবশেষে অন্য সবার মত বললেন, সংসার চলছে কী ভাবে?………বাবু মনে মনে বলেছিল, আমাদের সংসার যে ভাবেই চলুক তাতে আপনার কী স্যার? আপনি কেন সবার সামনে এইসব কথা বলবেন? কেন আপনি অন্য রকম ভাবে তাকাবেন? কেন আমার বাবার নামে আজেবাজে কথা বলবেন?……কেউ অবশ্য তার মনের কথা শুনতে পেল না। ভাগ্যিস কেউ মনের কথা টের পায় না।

এক সময় ইরাজুদিন স্যার সমাজ পাঠ পড়াতে শুরু করলেন। সে পড়া বাবুর কানে ঢুকল না। তার মাথাব্যথা শুরু হয়েছে এবং এত দ্রুত বাড়তে শুরু করেছে যে বাবুর মনে হচ্ছে এই ক্লাস শেষ হবার আগেই মারা যাবে।…………….সেটা খুব-একটা খারাপ হবে না বোধ হয়। মরার কথা মনে হলেই আগে তাঁর ভয় লগত। এখন সে রকম লাগে না।

কড়া রোদ উঠেছে। কিন্তু বাতাস ঠাণ্ডা। বাবু উদ্দেশ্যহীন ভাবে এগোতে লাগল। আজ প্রথম যে সে এ রকম করেছে তা না। আগেও কয়েকবার সে স্কুল ফাকি দিয়ে হেটে হেটে অনেক দূর পর্যন্ত গিয়েছে। একবার তো লালবাগ কেল্লার কাছে এসে পথ; হারিয়ে ফেলল। যা ভয় লেগেছিল। ছেলে ধরার মত দেখতে একটা লোক তার পিছু পিছু আসছিল। আজ অবশ্য পিছু পিছু কেউ আসছে না। সকালবেলা সবাই নিজের কার্জ নিয়ে ব্যস্ত থাকে। বিকাল বেলার দিকে একা একা হাঁটলে কম হলেও দুতিনজন লোক জিজ্ঞেস করবে, কী খোকা কোথায় যাচ্ছি? আজ এখনো কেউ সে রকম কিছু জিজ্ঞেস করেনি।

শাহবাগের কাছে এসে বাবু দেখল। বড় মামা হকারের কাছ থেকে পত্রিকা কিনছেন। সে প্রত উল্টোদিকে হাঁটতে শুরু করল। তাকে দেখলেই বড় মামা এক লক্ষ প্রশ্ন করবেন। শুধু প্রশ্ন না, এমন কথা বলবেন যা শোনা মাত্রই মাথা ধরে যাবে।

বড় মামাকে সে কোনোদিনই পছন্দ করেনি। মুনা আপার সঙ্গে গণ্ডগোলটার পর সে ঠিক করে রেখেছে, কোনোদিন বড় মামার সঙ্গে সে কথা বলবে না। মারে গেলেও না।

বড় মামার সঙ্গে মুনা আপার গণ্ডগোলটার প্রথম অংশ বাবু দেখতে পায়নি। সে গিয়েছিল বিসকিট, চানাচুর কিনতে মামা এসেছেন, তাকে শুধু চা তো দেয়া যায় না। মামা অবশ্য এসব কিছুই মুখে দেবেন না। চায়ের কাঁপে তিন চারটা চুমুক দিয়ে উঠে পড়বেন, তবু তাকে শুধু চা দেয়া যাবে না।

বাবু বিসকিটের ঠোঙা নিয়ে ঘরে ঢুকেই শোনে বড় মামা চিবিয়ে চিবিয়ে বলছেন, উকিল টুকিল সব তুমিই ঠিক করেছ? মুনা আপা বলল হ্যাঁ।

স্ত্রী-বুদ্ধিতে সংসার চলছে এখন?……..কী করবো মামা, পুরুষ-বুদ্ধির কাউকে তো পাওয়া গেল না। কেউ তো সাড়া শব্দ করল না।…………….সাড়া শব্দ করবে কী ভাবে? কেউ কী কখনো এসেছে আমার কাছে?…………………….আপনার কাছে যেত হবে কেন মামা? আপনার তো নিজেরই আসা উচিত—…………উচিত-অনুচিত আমার শিখতে হবে তোমার কাছ থেকে?………….শিখতেই যে হবে এমন কোনো কথা নেই, আপনার শিখতে ইচ্ছে না হলে শিখবেন না।

মুখ সামলে কথা বল।………….আমার সঙ্গে এমন চিৎকার করে কথা বলবেন না। আশপাশে লোকজন আছে, ওরা কী মনে করবে?…………মামা রেগে অস্থির হয়ে এমন সব কথা বলতে লাগলেন যে, বাবুর সঙ্গে সঙ্গে মাথা ধরে গেল। বকুল কাঁদতে কাঁদতে বলতে লাগল বড় মামা, ছিঃ ছিঃ আপনি মুনা আপাকে এসব কী বলছেন? বড় মামা কাঁপতে কাঁপতে বললেন ঠিকই বলেছি। একটা কথাও ভুল বলিনি। তোমাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখি না। এই সব কারণে।

সেই রাতটা যে কী খারাপ কেটেছে বাবুর। মুনা আপার জন্যে এমন কষ্ট হয়েছে। মনে হয়েছে মুনা আপনাকে জড়িয়ে ধরে সে খানিকক্ষণ কাঁদি। মুনা আপ অবশ্য খুব শক্ত মেয়ে। মা যখন বললেন কিছু মনে করিস না মুনা, রাগের সময় মানুষের মাথা ঠিক থাকে না তখন মুনা। আপা বেশ সহজ ভাবেই বলেছে এসব আমি পাত্তা দেই না। যার যা ইচ্ছা বলুক।

মুনা আপা যে এসব জিনিস একেবারেই পাত্তা দেয় না, তাও ঠিক না। গভীর রাতে বাবু বাথরুমে যাবার জন্যে জেগে উঠে দেখে–মুনা আপা বারান্দায় পা ছড়িয়ে বসে আছে। অন্ধকারে কিছুই স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে না। তবু বাবু পরিষ্কার বুঝল তার গাল ভেজা।

মুনা আপা তাকে দেখে বলল কী, বাথরুম?…………হু।……….এক রাতে তিনবার চারবার বাথরুমে যাস, তোর ডায়াবেটিস নাকি?……..বলতে বলতেই মুনা আপা শব্দ করে হাসল। কী সহজ স্বাভাবিক আচরণ। যেন তার কিছুই হয়নি। এমনি এমনি বারান্দায় বসে আছে।

বাবু ভয়ে বলল, তোমার মন খারাপ আপা?…….না। মন খারাপ হলে বারান্দায় বসে থাকব কেন? মন ভাল করার জন্যে বারান্দায় কিছু আছে নাকি? ঘুম আসছে না। তাই বসে আছি।

ঘুম আসছে না কেন?……….কী মুশকিল, ঘুম আসছে না কেন সেটা আমি কী করে বলব? আমি কী ডাক্তার?……..দুপুর বারোটার দিকে বাবু মগবাজার চৌরাস্তায় উপস্থিত হল। আর হাঁটতে ভাল লাগছে না। এখন আস্তে আস্তে বাড়ির দিকে রওনা হওয়া যেতে পারে।

যে পথে এসেছে সেই পথেই যাবে না। অন্য কোনো পথ ধরবে এটা ঠিক করতে বাবুর কিছু সময় কাটল। চেনা পথ ধরে ফেরাই ভাল। কিন্তু নান্টু সব সময় বলে যে পথে আসা হয়েছে সে পথে ফিরে যেতে নেই। সে পথে ফিরলে বিপদ হয়।

বাবু কী করবে বুঝতে পারছে না। ঠিক তখন সে একটি অবিশ্বাসা দৃশ্য দেখল। তার বাবা আইসক্রিমওয়ালার কাছ থেকে আইসক্রিম কিনছেন।নিজের জন্যেই কিনছেন নাকি? বাবুর উচিত পালিয়ে যাওয়া, কিন্তু সে মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল। বাবা একবার তাকালেন তার দিকে। তার চোখে-মুখে চিনতে পারার কোনো লক্ষণ ফুটে উঠল না।

তিনি বাচ্চা ছেলেমেয়েদের মত লাল রঙের আইসক্রিমটি কামড়ে কামড়ে খেতে লাগলেন। তার বগলে একটি ছাতা। প্রচণ্ড রোদেও ছাতা না খুলে নিশ্চয়ই প্রচুর হাঁটাহাঁটি করেছেন। ঘামে ভেজা মুখ হয়েছে আয়নার মত চকচকে। তিনি আইসক্রিম হাতে রাস্তা পার হলেন। রাস্তা পার হওয়াও শিশুদের মত। কোনো দিকে না তাকিয়ে হঠাৎ ছুটলেন। একজন বয়স্ক মানুষ শিশুদের মত এতগুলো কাণ্ড একসঙ্গে কিভাবে করে?

বাবু নিজের অজান্তেই ডাকল, বাবা।………..শওকত সাহেব থমকে দাঁড়ালেন। সামনেই দাঁড়িয়ে, তবু তিনি যেন তাকে চিনতে পারছেন না।………….তুই এখানে!….বাবু জবাব দিল না। শওকত সাহেব জবাবের জন্য অপেক্ষাও করলেন না। সহজ ভাবে বললেন, আইসক্রিম খাবি?…………না।

হঠাৎ তৃষ্ণা লেগে গেল।…………যেন তিনি ছেলের কাছে কৈফিয়ত দিচ্ছেন।………….খা একটা আইসক্রিম। এ্যাই, এ্যাই আইসক্রিমওয়ালা।…………..বাবুকে আইসক্রিম নিতে হল।

আমাদের সময় লালগুলি দুপয়সা দাম ছিল, দুধ মালাই একটা ছিল এক আনা করে। চল বাসায় যাই। হেঁটে যেতে পারবি, না রিকশা নেব?……………হাঁটতে পারব।……..রিকশার চেয়ে হাঁটাটাই আরাম। রিকশায় অ্যাকসিডেন্টের ভয়। পেছন থেকে একটা ট্রাক এসে ধাক্কা দিলে অবস্থা কাহিল।

বাবু সারাক্ষণই ভাবছিল এই বুঝি বাবা জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করেন, এইখানে কী করছিলি? স্কুলে যাসনি কেন? কিন্তু শওকত সাহেব কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। বরং তার ভাবভঙ্গি দেখে মনে হল ছেলেকে হঠাৎ রাস্তায় পেয়ে তিনি বেশ খুশি।

রোদ লাগছে নাকি বাবু?……………না!…………রোদ লাগলে বলিস, সঙ্গে ছাতা আছে। তবে শরীরে রোদ লোগা ভাল। ভিটামিন ডি আছে। এতে শরীরের হাড্ডির খুব পুষ্টি হয়। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। এই যে ভিখারিগুলো দেখছিস? সারাদিন হাঁটাহাঁটি করে। কিন্তু খোঁজ নিয়ে দেখ অসুখ-বিসুখ হয় না।

বাবু অবাক হয়ে বাবার দিকে তাকাল, এমন অদ্ভুত ভাবে কথাবার্তা বলছেন কেন?…….আমি সকালবেলা ঘর থেকে বের হয়েই হাঁটা শুরু করি। দুপুর পর্যন্ত হাঁটি আর শরীরে রোদ লাগাই। খুব উপকারী।

বাবু কোনো কথা বলল না। নিঃশব্দে হাঁটতে লাগল। শওকত সাহেব খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, জেলে কত দিনের জন্যে নিয়ে রাখে কোনো ঠিক আছে? তখন রোদও পাওয়া যাবে না, হাঁটাহাঁটিও করা যাবে না।

শওকত সাহেব একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। বাবুর হঠাৎ মনে হল বাবা শুধু কথাবার্তাতেই না দেখতেও কেমন যেন অচেনা মানুষের মত হয়ে গেছেন। হাঁটছেন কেমন কঁজো হয়ে। অস্বাভাবিক লম্বা লম্বা পা ফেলছেন।

অনেক দিন পর জলিল মিয়ার চায়ের দোকানে বাকের এসে ঢুকল। আগে রোজ সন্ধ্যায় তাদের একটা আড্ডা বসত। তিন-চার বছর ধরে ভাঙন ধরেছে। একজন একজন করে খসে পড়তে শুরু করেছে। আশফাকের মত ছেলেও বিয়ে করে মদন বলে এক জায়গায় পড়ে আছে। শ্বশুরের সঙ্গে নাকি কাঠের বিজনেস করে। এক বছরের ওপর হয়েছে তার কোনো খোঁজ নেই নিৰ্ঘাৎ বাচ্চা বাধিয়ে ফেলেছে বাই দিস টাইম।

শেষ পর্যন্ত টিকে ছিল ইয়াদ। তারও দিন শেষ। সকাল-বিকাল চাকরি করছে। ব্রিফকেস নিয়ে টু্যরে যাচ্ছে শালা। পুরোপুরি ভেডুয়া হয়ে গেছে। দেখা হলেই আই.এ. পাস মেয়ের কথা শুরু হয়। নানান ধরনের গল্প। পরশুদিন একটি শুনল এ রকম, ইয়াদ নিউ মাকেটে গিয়ে দেখে তার সেই আই.এ. পাস একজন বান্ধবীকে নিয়ে শাড়ির দোকানে ঘুরছে।

তারা যাতে ইয়াদকে চিনতে না পারে সে জন্যে সে চট করে সানগ্লাস পরে ফেলল। কিন্তু মেয়েটি ঠিকই চিনল। কী সব বলল তার বান্ধবীকে। সেই বান্ধবী তার দিকে চোখ ড্যাবি করে তাকাতে লাগল।অসহ্য। গল্প শুনলেই ইচ্ছা করে একটা চড় বসিয়ে দিতে। ড্যাবি ড্যাবি করে তাকাচ্ছিল। ড্যাব ড্যাবি করে তাকানোর মাল হচ্ছো তুমি শালা। ফকিরামির জায়গা পায় না।

জলিল মিয়ার চায়ের স্টলে ইয়াদ বসে ছিল। তার গায়ে কালো কোট। গলায় লাল রঙের টাই। ক্লিন শেভড। মুখে ক্রিম ঘষেছে বোধ হয়। ভুরতুর করে গন্ধ বেরুছে। বাকেরকে দেখে সে হকচাকিয়ে গেল। বাকের অবহেলার ভঙ্গিতে বলল, তুই এখানে।

আসলাম। দেখা-সাক্ষাৎ হয় না।………..সাজ-পোশাক তো মাশাআল্লাহ ভালই চড়িয়েছিস।..আর বলিস কেন। ওদের বাড়ি থেকে আমাকে দেখতে আসবে। ওর এক দূর সম্পর্কের চাচারও আসার কথা। এক্স মিনিস্টার এল রহমান।

দেখতে আসবে তো তুই এখানে কেন? চায়ের দোকানে দেখতে আসবে নাকি?…..বাসায় তো আর সেজোগুজে বসে থাকা যায় না। মনে করবে ইচ্ছে করে সেজে বসে আছি। ওরা এলে রঞ্জু এসে এখান থেকে ডেকে নিয়ে যাবে। ভাবটা এ রকম যেন বাইরে ছিলাম, বাসায় এসেছি।

বাকের চায়ের অর্ডার দিল। ইয়াদের কোনোদিকে দৃষ্টি নেই। সে ঘন ঘন ঘড়ি দেখছে। পাঁচ মিনিটের মাথায় তিনবার বলল, এত দেরি হওয়ার তো কথা না। এসে গেছে নাকি? বলে এসেছি জলিলের চায়ের দোকানে খোঁজ করতে। কোথায় না কোথায় খুঁজছে কে জানে। রঞ্জু হারামজাদা মহা বেকুব।

উত্তেজনায় ইয়াদ একটা ফাইভ ফাইভ সিগারেট উল্টোদিকে ধরিয়ে ফেলল। বাকের দেখেও কিছু বলল না। ফিল্টারের ধোঁয়া খেয়ে কেশে মরুক। বাকের উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাস্তার দিকে। জলিল মিয়া বলল, বাকের ভাইকে নতুন পাত্তি দিয়া আর এক কাপ চা দেই?

না চা লাগবে না।………….খান বাকের ভাই। চা এক কাপ যা দশ কাপ ও তা।……..বাকের কিছু বলল না। জলিল মিয়া টেনে টেনে বলল, তারপর দেশের খবরাখবর কিছু বলেন।………….বাকের বিরক্তমুখে তাকাল। জলিল মিয়ার স্টলে রাজনৈতিক আলাপ নিষিদ্ধ। দুই-তিন জায়গায় এই কথাগুলো ফ্রেম করে বাধানো, কিন্তু রাজনীতিতে জলিল মিয়ার নিজের খুব উৎসাহ। সে মনেপ্ৰাণে বিশ্বাস করে মাশলি ল ছাড়া এই দেশের কোনো উপায় নেই। কিন্তু এই কথাটা নিজে বলতে পারে না, অন্যের মুখে শুনতে চায়।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন হইছে দেখছেন বাকের ভাই। সিভিল গভৰ্মেন্টের ক্ষমতা নাই ঠিক করার। সে পরিস্থিতি ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করা ছাড়া উপায় নাই।……..বাকের তিক্ত স্বরে বলল, উপায় না থাকলে ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ করে দিলেই হয়!

পায়ে ধরে কেউ সাধছে?…………………..জলিল মিয়া খুব অপ্রস্তুত হয়। বাকেরের বিরক্তির কারণ ঠিক বুঝতে পারে না। সে কাউকে বিরক্ত করতে চায় না। বাকেরের মতো কাউকে তো নয়ই।

ইয়াদ বলল, কটা বাজে দেখ তো বাকের। শালা এত দেরি করছে কেন? বাকের কোনো উত্তর না দিয়ে উঠে দাঁড়াল। গম্ভীর মুখে বলল, যাই। ইয়াদ বলল, এত সকাল সকাল যাচ্ছিস কোথায়? বস না শালা এ তো দারুণ টেনশনের মধ্যে পড়লাম।

কাজ আছে।……………তোর আবার কী কাজ?………….খুব-একটা খারাপ কথা বাকেরের মুখে এসে গিয়েছিল। সে সেটা বলল না। ইয়াদ হারামজাদাটার সঙ্গে মুখ খারাপ করে কোনো ফয়াদা নেই।

রাস্তা অন্ধকার। সব কটি লাইটপোস্টের বাতি আবার চুরি হয়েছে। এই এক সপ্তাহের মধ্যে দুইবার বাতি চুরি গেল। চোরের উপদ্রবটা বড় বেশি হচ্ছে। বাকেরের ধারণা কাজটা করে মিউনিসিপ্যালিটির লোকেরা। মই ফিট করে কোন চোর যাবে বাল্ব চুরি করতে? ধরতে হবে একবার শালদের। মামদোবাজি বের করে দিতে হবে।

বাকের দেয়াশলাই বের করে ঘড়ি দেখল, ঘড়ি ঠিকই চলছে। আটটা পঁয়ত্ৰিশ। এত সকাল সকাল বাড়ি গিয়ে হবেটা কী? লাভের মধ্যে লাভ হবে বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা হয়ে যাবে এবং লাটসাহেব বড় ভাই মুখটাকে এমন করবে যেন ভূত দেখছে। বড় অফিসার এদের মেজাজ-মর্জিই অন্য রকম।

রাত এগারটার পর বাড়িতে যাওয়ার অনেক সুবিধা। কারো সঙ্গেই দেখা হয় না। খাবার ঢাকা দেয়া থাকে। খেয়েদেয়ে লম্বা হয়ে পড়লেই সব সমস্যার সমাধান।

সকাল দশটার দিকে ঘর থেকে বেরুলে বড় ভাইয়ের সঙ্গে দেখা না করে দিন পার করে দেয়া যায়। অবশ্য ভাবীর সঙ্গে দেখা হয়। সূর্যের চেয়ে বালির উত্তাপ বেশি, সেই কারণেই ভাবীর মেজাজ থাকে আকাশে। তিনি সহজ ভাবে বাকেরের সঙ্গে কোনো কথাই বলতে পারেন না। যাও বলেন এমন সব ভাষা ব্যবহার করেন যে বাকেরের প্রতিদিনই একবার বাড়ি ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করে।

সেই ইচ্ছা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। কারণ বাকের মেয়েমানুষের কথার কখনোই তেমন কোনো গুরুত্ব দেয় না। মেয়ে মানুষের কাজই হচ্ছে বেশি কথা বলা এবং ফালতু কথা বলা। ফালতু কথাকে এমন গুরুত্ব দিলে চলে?………………বাকের সিগারেট ধরাল। প্যাকেটে আর তিনটা সিগারেট আছে, রাত কাটবে না। ঘুম ভাঙলেই তার সিগারেটের তৃষ্ণা হয়। কিন্তু এখন আবার হেঁটে হেঁটে মোড় পর্যন্ত যেতে ইচ্ছা করছে না।

ফজলু সাহেবের বাসার সামনে একটা ছোটখাটো ভিড়। বাকের এগিয়ে গেল। বাড়ির ভেতর থেকে মেয়েলি গলায় কান্নার শব্দ।……………কী হয়েছে?………………………কী হয়েছে পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। ফজলু সাহেবের পোয়াতী স্ত্রী নাকি খাট থেকে পড়ে গিয়েছে। ফজলু সাহেব গিয়েছেন অ্যাম্বুলেন্স আনতে। বাকেরের বিরক্তির সীমা রইল না। ধামসী এক মহিলা খাট থেকে পড়ে যাবে কেন? কচি খুকু তো না।

Leave a comment

Your email address will not be published.