চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১১ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১১

নান্টু চলে যাবার কিছুক্ষণের মধ্যেই ফরহাদ ভিজে ন্যাতা ন্যাতা হয়ে উপস্থিত হল। তার সঙ্গে অনেক জিনিসপত্র। বিছানার চাদর, মশারি, বালিশ সবই ভিজেছে। জোবেদ আলি চিন্তিত মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে। হঠাৎ এই প্রবল বর্ষণ তাঁকে চিন্তায় ফেলেছে। জাপানী গাছটা আজ পুতেছেন আর আজই এমন বৃষ্টি। পানি জমে গেলে শিকর পঁচে যাবে তো।ঘরে ঢুকতে ঢুকতে ফরহাদ জিজ্ঞেস করল, বাবা আমার কাছে কেউ এসেছিল?

জোবেদ আলি অন্যমনস্ক ভঙ্গিতে বললেন, না। অথচ নান্টু তার সামনেই বাসায় এসেছে। বের হবার সময়ও তাঁর সঙ্গে কথা বলে বের হয়েছে। জোবেদ আলি ছেলের দিকে না তাকিয়েই বললেন, কি করা যায় বল দেখি?

কোন প্রসঙ্গে কি করা যায়?

বৃষ্টির কথা বলছি। তুই ঘরে যা ভিজে গেছিস।

বৃষ্টির কথা কি?

তুই যা ঘরে যা।

রাহেলা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলেকে লক্ষ্য করছেন। ছেলেকে চিন্তিত মনে হচ্ছে না। সে বেশ সহজ স্বাভাবিক। তাকে দেখে মনে হচ্ছে না তার কোন সমস্যা আছে। এইতো লুঙ্গি পরে কলতলায় চলে গেছে। বালতি ভর্তি করে পানি তুলছে।মা গায়ে মাখার সাবানটা দিয়ে যাও তো।

রাহেলা সাবান নিয়ে গেলেন। গায়ে মাথায় সাবান মাখতে মাখতে ফরহাদ বলল, দাদাজান দুদিন ধরে আমলকি আমলকি করছেন। আজ আমলকি নিয়ে এসেছি। পলিথিনের একটা ব্যাগে আছে। কয়েকটা আমলকি লবণ দিয়ে দাদাজানকে দাও।রাহেলা বললেন, আজ কি তোর কাছে কারোর আসার কথা ছিল?

ফরহাদ বলল, হ্যাঁ ছিল। আসমানীর মামা আসবেন বলেছিলেন। তিনি সিঁড়ি থেকে পরে পা মচকে ফেলেছেন। আসবেন না।রাহেলা বললেন, তোর বিয়ের ব্যাপারে কথা বলার জন্যে? ফরহাদ বলল, হ্যাঁ। মা তুমি ভিজছতো ঘরে চলে যাও। গোসল শেষ করেই আমি এক কাপ আদা চা খাব। মনে হচ্ছে আমার জ্বর আসছে।জ্বরের মধ্যে গোসল করছিস কেন?

সারাদিন ঘুরেছি। গা ঘেমেছে। বিশ্রী লাগছে।

নান্টু এসেছিল। পরে আবার আসবে বলেছে।

ও আচ্ছা।

নান্টু বলেছিল তোর চাকরি নিয়ে কি সমস্যা না-কি হয়েছে।

ফরহাদ জবাব দিল না। মগের পর মগ পানি মাথায় ঢালতে লাগল। রাহেলা রান্নাঘরে চা বানাতে গেলেন। রান্নাঘরের খোলা দরজা দিয়ে কলঘর দেখা যায়। তিনি দেখতে পাচ্ছেন—ফরহাদ এক বালতি পানি শেষ করে আরেক বালতি পানি নিয়েছে। মগে করে পানি ঢালছে। অতি দ্রুত ঢালছে। সে আবারো পানি ভরছে। বৃষ্টির জোর আরো বেড়েছে।

চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে ফরহাদ বলল, চা-টা খুব ভাল হয়েছে মা।

রাহেলা বললেন, তোর কি জ্বর এসেছে?

আসব আসব করছিল এমন গোসল দিয়েছি যে পানি দিয়ে জ্বর ধুয়ে ফেলেছি।

ক্ষিধে লেগেছে, আজ রান্না কি?

শিং মাছের ঝোল।

ইলিশ মাছের ভাজা খেতে ইচ্ছা করছে। বৃষ্টিটা যদি কমে তাহলে একটা ইলিশ মাছ নিয়ে আসব।

এত রাতে মাছ পাবি?

ইলিশ মাছ রাত একটার সময় গেলেও পাওয়া যাবে। চা-টা সত্যি ভাল হয়েছে মা। দাদাজানকে এক কাপ বানিয়ে দাও।

রাহেলা অবাক হয়ে ছেলেকে দেখছেন। ফুল হাতা শার্ট গায়ে দিয়ে ভেতরের বারান্দায় চা খেতে বসেছে। চুল আঁচড়েছে। আরাম করে চা খাচ্ছে। তাকে দেখে কে বলবে তার কোন রকম সমস্যা আছে। সুখী সুখী চেহারা। রাহেলা বললেন, তোর বাবার কাছে শুনলাম এই শুক্রবারে না-কি তোর বিয়ে।একটু পিছিয়েছে মা, রোববারে হবে। রোববার রাতে। বিয়ে মানে দুই তিনজনকে নিয়ে ওদের বাসায় যাব। কাজী সাহেব থাকবেন। কাগজে সই করে বাসায় চলে আসা।

আমি আজ সকালেই জানলাম।

তোমাকে বলা হয় নি। নানান ঝামেলার মধ্যে মাথা আউলা হয়ে আছে।

তোর চাকরি চলে গেছে?

হ্যাঁ। তবে এরচেয়েও বড় সমস্যা আছে।

এরচে বড় সমস্যা আবার কি?

ফরহাদ ছছাট্ট একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, রহমত উল্লাহ সাহেব সুইজারল্যান্ড থেকে একটা চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিটা পড়ে দেখ। চিঠি পড়লেই বুঝবে সমস্যা কত প্রকার ও কি কি? চিঠিটা আমার টেবিলের উপর আছে। উনি এই বাড়ি জমি বিক্রি করে দিয়েছেন। যাদের কাছে বিক্রি করেছেন তারা দখল নিতে আসবে। যে কোনদিন সব খালি করে দিতে হবে। বাবার জন্যেই আমার কষ্টটা বেশি হচ্ছে। শখ করে এত গাছ লাগিয়েছেন।রাহেলা অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন, আমরা থাকব কোথায়?

ফরহাদ জবাব দিল না। সিগারেটের প্যাকেট থেকে সিগারেট বের করল। রাহেলা ছেলেকে সিগারেট ধরাবার সুযোগ দিলেন। চলে গেলেন বাইরের বারান্দায়। এই বৃষ্টির মধ্যে জোবেদ আলি কোদাল হাতে বাগানে কি যেন করছেন।রাহেলা শান্ত গলায় বললেন, তুমি কি করছ?

জোবেদ আলি বললেন, জমিতে পানি জমে গেছে। নালা কেটে দিচ্ছি। পানি হচ্ছে গাছের জীবন। এই পানি যদি একটু বেশী হয় তাহলে পানিই গাছের বিষ। আল্লাহপাকের কি অদ্ভুত ব্যবস্থা, এই বিষ এই অমৃত।শর্মিলার বসার ঘরে ঢুকে নান্টু খুবই অবাক হল। শর্মিলা সেজেগুজে বসে আছে। তার কপালে লাল টিপ। পরনের সিল্কের শাড়িটা নতুন। শর্মিলার সামনে এক ভদ্রলোক বসে আছেন। মধ্যবয়স্ক মানুষ।

মনে হয় ভদ্রলোক বেশ কিছু সময় ধরেই আছেন। তাঁর সামনের এসট্রেতে পাঁচটা সিগারেটের শেষ অংশ। পাঁচটা সিগারেট, একটার পর একটা খেতেও তো পাঁচ গুণন তিন-পনেরো মিনিট লাগার কথা। তিনি নিশ্চয়ই কোন হাসির কথা বলেছেন—শর্মিলা হাসছে। নান্টুর মনে হল হুট করে ঘরে ঢুকে পরাটা তার ঠিক হয় নি। দরজা বন্ধ থাকলে সে কলিং বেল টিপে ঘরে ঢুকতো। দরজা ছিল ভেজানো হাত দিতেই খুলে গেল।

শর্মিলা হাসি বন্ধ করে নান্টুর দিকে তাকাল। তার ভুরু কুঁচকে আছে। চোখের দৃষ্টি তীক্ষ। শর্মিলার সামনে বসা ভদ্রলোকও যেন কেমন করে তাকাচ্ছেন। নান্টু বলল, অর্ণব কেমন আছে। ওকে দেখতে এসেছি।শর্মিলা উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এল নান্টুর দিকে। নান্টু বলল, অর্ণবের জ্বর কত?

ওর জ্বর কমেছে। ঘুমুচ্ছে।

দেখে যাই।

বললাম না ঘুমুচ্ছে। দেখে যাবে কি? সকালে এসো। সকালে এসে দেখে যেও।

জ্বর শুনে মনটা খুবই খারাপ হয়েছে।

একটা কথা কতবার বলল, জ্বর এখন নেই। মার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে।

এসেছি যখন দেখে যাই।

মার সঙ্গে ঘুমুচ্ছে। মাও ঘুমুচ্ছেন। বললাম না সকালে এসো।

নান্টু অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে। শর্মিলা বলতে গেলে তাকে প্রায় তাড়িয়ে দিচ্ছে। সে এরকম করছে কেন? শর্মিলার সামনে যে ভদ্রলোক বসে আছেন সেই দ্রলোকের কি কোন ভূমিকা আছে? এই ভদ্রলোকের সামনে নান্টু থাকুক শর্মিলা তা চাচ্ছে না। যার ছেলে অসুস্থ সেই বা কেন এত সেজেগুজে বসে থাকবে?

বিয়ে বাড়িতে বা জন্মদিনের নিমন্ত্রণে যাবার সাজও এটা না। তাহলে গায়ে গয়না থাকত। শর্মিলার হাতে কয়েক গাছা চুড়ি ছাড়া আর কিছু নেই।নান্টু বলল, তোমার জন্যে রসমালাই এনেছিলাম।শর্মিলা হাত বাড়িয়ে রসমালাইয়ের হাড়ি নিতে নিতে বলল, কাল পরশু এক সময় এসে অর্ণবকে দেখে যেও।নান্টু দরজার দিকে এগুচ্ছে। পেছনে পেছনে আসছে শর্মিলা।

মনে হচ্ছে নান্টুকে একেবারে ঘর থেকে বের করে, দরজা বন্ধ করে তারপর লোকের সঙ্গে গল্প করতে যাবে। নান্টুর মনে হল অর্ণবের জ্বর আসলে সারে নি। নান্টুকে তাড়াতাড়ি বিদেয় করার জন্যে জ্বর সেরে যাবার কথা বলেছে। নান্টু কি কোন একটা রেস্টুরেন্টে অপেক্ষা করবে? ভদ্রলোক চলে যাবার পর আবার গিয়ে খোঁজ নেবে?

খুব বৃষ্টি হচ্ছে। শর্মিলাদের বাড়ির সামনের রাস্তায় প্রায় হাঁটু পানি। আশে পাশে কোন চায়ের দোকান দেখা যাচ্ছে না যেখানে বসে চা খেতে খেতে এই বাড়ির দিকে লক্ষ্য রাখা যায়। নান্টু পানি ভেঙ্গে এগুচ্ছে। যে ভদ্রলোক শর্মিলার সঙ্গে কথা বলছিলেন তাঁর কি আজ এ বাড়িতে নিমন্ত্রণ? তিনি ফুল নিয়ে এসেছেন। টেবিলে গোলাপ ফুলের তোড়া। অতিথিরা আজকাল নিমন্ত্রণে ফুল নিয়ে আসেন। তার মত বেকুবরা যায় রসমালাইয়ের হাড়ি হাতে।

মেম্বর আলি আজ সকালে একটি ভয়াবহ সত্য আবিষ্কার করলেন। তিনি চোখে একেবারেই দেখতে পারছেন না। একটা চোখ নষ্ট ছিল, সেই চোখে দিনেও দেখতে পেতেন না। অন্য চোখটা ভাল ছিল। ভাল চোখটায় দিনে দেখতে পেতেন। তিনি এদিক ওদিক তাকাচ্ছেন, ঘোলাটে ধরনের ঝাপসা হলুদ আলো ছাড়া কিছু দেখছেন না। পুরোপুরি অন্ধ তিনি নিশ্চয়ই হননি—অন্ধ মানুষ অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখে না। তিনি হলুদ ধরণের আলো দেখছেন।

খুব চিন্তিত হবার মত কিছু নিশ্চয়ই ঘটে নি। চোখের ডাক্তারের কাছে গেলেই হবে। মলম টলম দিয়ে দেবে। চোখে ছানি পড়লে ছানি কাটাবার ব্যবস্থা করবে। মেম্বর আলি ক্ষীণ গলায় ডাকলেন ফরহাদ ফরহাদ।ফরহাদ ঘরে নেই মনে হয় উঠোনে। তাকে আরো শব্দ করে ডাকতে হবে। তিনি যে শব্দ করে ডাকতে পারেন না, তা না। ইচ্ছা করলেই একটা চিৎকারও দিতে পারেন। চিৎকার করতে ইচ্ছা করছে না। আজ ফরহাদের বিয়ে। তিনি চোখে দেখতে পাচ্ছেন না এমন একটা খবর দিয়ে বেচারার মন খারাপ করার দরকার কি?

আজকের দিনটা পার হোক তারপর বললেই হবে। শুভ দিনে অশুভ সব দূরে রাখতে হয়। ফরহাদ নিজে অনেক কিছু নিয়ে খুব দুঃশ্চিন্তায় আছে। বেচারার দুঃশ্চিন্তা বাড়িয়ে লাভ কি? চোখে দেখতে না পেলেও তার তেমন অসুবিধাওতো হচ্ছে না। তার দিন কাটছে বিছানায় শুয়ে শুয়ে। এমনতো না যে তাকে লেখাপড়ার কাজ করতে হবে। কাঁথা সেলাইয়ের কাজ করতে হবে।

তবে বাড়িতে নতুন বউ আসবে। নতুন বউ-এর মুখ দেখতে পারবেন না এটা খুব কষ্টের। দেখতে না পেলেও ভাব করতে হবে যেন দেখতে পাচ্ছেন।নতুন বউ আসা পর্যন্ত তিনি এই বাড়িতে থাকতে পারবেন কি-না তাও বুঝতে পারছেন না। মনে হচ্ছে তাকে আজ মেয়ের বাড়িতে চলে যেতে হবে। জাহেদা এসে তাকে নিয়ে যাবে। সে রকমই না-কি কথা হয়েছে।

নানান রকম কথা গত কয়েকদিন ধরে এ বাড়িতে হচ্ছে। তিনি সব কথা ধরতে পারছেন না। এই বাড়ি ছেড়ে দিতে হবে এমন কথা তিনি অনেকবার শুনেছেন। কেন ছেড়ে দিতে হবে বুঝতে পারছেন না। কেউ তাকে কিছু বলছেও না। বাড়ি কে কিনে নিয়েছে বলে শুনেছেন। বাড়ি বিক্রি করা ঠিক না। দুটা জিনিস বিক্রি করা যায় না। যে বাড়িতে সাতদিন থাকা হয়েছে সেই বাড়ি এবং যে গয়না সাতদিন পরা হয়েছে সেই গয়না। তাঁর কাছে পরামর্শ চাইলে তিনি বলতে পারতেন। তাঁর কাছে কেউ পরামর্শ চাইতেও আসছে না।

কালরাতে ফরহাদের সঙ্গে কিছু কথা হয়েছে। অনেক রাতে তার ঘুম ভেঙ্গে গিয়েছিল। তিনি অভ্যাসমত বললেন, ফরহাদ জেগে আছিস? ফরহাদ বলল, দাদাজান, বাথরুমে যাবেন? না।বিছানা নষ্ট হয়ে গেছে? হুঁ।দাঁড়ান চাদরটা বদলে দেই।ফরহাদ চাদর বদলে দিল। তিনি বললেন, তোর জন্যে আমি খাস দিলে দোয়া করলামরে ব্যাটা। আসল দোয়া।ফরহাদ বলল, ক্ষিধে লেগেছে। কিছু খাবেন? না।

আমি আপনার জন্যে একটা বেদানা এনেছিলাম। ভেঙ্গে দেব? দে।ফরহাদ বেদানা ভেঙ্গে তাঁর হাতে দিচ্ছে। তিনি দুটা তিনটা করে দানা মুখে দিচ্ছেন। খুবই মিষ্টি বেদানা। ফল-ফ্রুট মানেই ভিটামিন। বুড়ো বয়সে ভিটামিন খুব কাজে আসে।ফরহাদ বলল, কাল যে আমার বিয়ে এটা কি আপনি জানেন দাদাজান? জানি। তুই বলেছিস।খুবই গরীবি হালতে বিয়ে, হাত একেবারে খালি।

মেম্বর আলি শংকিত বোধ করলেন। ফরহাদ কি তার অভাব অনটনের কথা বলে তাঁর কাছে চন্দ্রহারটা চাচ্ছে? এত আদর করে বেদানা ভেঙ্গে খাওয়ানোর এটাই কি রহস্য? চন্দ্রহারটা দিয়ে দিলে তার থাকল কি? তার আজ যদি বড় কোন চিকিৎসার দরকার হয় টাকা পাবেন কোথায়?

দাদাজান। হুঁ।আপনি কয়েকটা দিন ফুপুর বাসায় থাকতে পারবেন না? হুঁ।নানান ঝামেলায় পড়েছি। সামলাতে পারছি না। হুঁ।ফুপু আপনাকে নিয়ে যাবে। আমি রোজ একবার আপনাকে দেখে আসব। হুঁ। আচ্ছা।ফুপু আপনার জন্যে একটা ছেলে জোগাড় করেছেন যে সব সময় আপনার সঙ্গে থাকবে। আচ্ছা।বেদানাটা খেতে কেমন? মিষ্টি।

আপনার যদি কখনো কিছু খেতে ইচ্ছা করে যে কাজের ছেলেটাকে ফুপু আপনার জন্যে ঠিক করেছে তাকে বলবেন। সে এনে দেবে। এর জন্যে ফুপুর কাছে টাকা চাওয়ার দরকার নেই। এই টাকাটা আপনার কাছে রাখেন। এখন বালিশের নিচে থাক। এক হাজার টাকা আছে। সব পঞ্চাশ টাকার নোট। দুইশ পঞ্চাশ টাকার নোট। ঠিক আছে দাদাজান?

হুঁ ঠিক আছে।মেম্বর আলি মুখে ঠিক আছে বললেও হঠাৎ করে বুকে ধাক্কার মত বোধ করলেন। ফরহাদ কি তাকে জন্মের মত পাঠিয়ে দিচ্ছে। এ বাড়িতে আর কখনো ফিরিয়ে আনবে না? দু চারদিনের জন্যে পাঠালেতো এতগুলি টাকা দিত না।এটা একটা বিয়ে বাড়ি।বিয়ে বাড়ির কত রহস্য আছে। চারদিকে ব্যস্ততা থাকবে। ছোটাছুটি থাকবে। বাচ্চাদের কান্না থাকবে, হাসি থাকবে। মেয়েদের পরণের নতুন শাড়ির গন্ধ থাকবে, খিল খিল হাসি থাকবে। তার কিছুই নেই। সবাই মনে হয় নিঃশ্বাস বন্ধ করে আছে।

মেম্বর আলি তার দীর্ঘজীবনে অনেক বিয়ে দেখেছেন। আজকের বিয়েটা হয়ত তার দেখা শেষ বিয়ে। আর দেখা হবে না। অবশ্যি এই বিয়েটাতে তিনি শেষ পর্যন্ত থাকতে পারবেন না। তার মেয়ে এসে তাকে নিয়ে যাবে। এছাড়া করার কিছু নেই। তিনি যে ঘরে থাকেন সেই ঘরে ফরহাদের বাসর হবে। ঘরটা ফুল টুল দিয়ে নিশ্চয়ই সাজানো হবে। আজকের দিনটা এ বাড়িতে থেকে যেতে পারলে ভাল হত।

একটা রাত না হয় থাকলেন মঞ্জুর ঘরে। কিংবা বারান্দাতেও থাকতে পারেন। থাকার জন্যে বারান্দা খারাপ না। আলো বাতাস বেশী। এখনতো শীতকাল না, যে শীতে কষ্ট পাবেন।মেম্বর আলির গায়ে রোদ পড়েছে। তিনি হাত বাড়িয়ে রোদ স্পর্শ করলেন। বন্ধ চোখ মেললেন, না রোদ দেখতে পাচ্ছেন না। এই পৃথিবীর অপূর্ব সব দৃশ্য আর তাঁকে দেখতে দেয়া হবে না। এমন ভয়ংকর সিদ্ধান্তগুলি যিনি নেন, তিনি কেমন?

মেম্বর আলির সামান্য শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। এটা নিয়ে চিন্তিত হবার কিছু নেই। ঘরে অক্সিজেনের যন্ত্রপাতি আছে। ফরহাদকে বললেই সে নাকে লাগিয়ে দেবে। এখনই বলতে হবে এমন কোন কথা নেই।এটা কি মাস? বাংলা মাসটা কি? বাংলা কোন মাসে ফরহাদের বিয়ে হচ্ছে তা জানা দরকার। তাঁর নিজের বিয়ে হয়েছিল আষাঢ় মাসে। কি বৃষ্টি কি বৃষ্টি। শত শত নাইয়রীতে বাড়ি ভর্তি হয়ে গিয়েছিল।

বৃষ্টির মধ্যে শুরু হল প্যাক-খেলা। এ তাকে কাদায় ফেলে দিচ্ছে, ও একে ফেলছে। ধুন্দুমার কান্ড। তার বাবা খুবই রাগ। করলেন, চিঙ্কার দিয়ে বাড়ি মাথায় তুললেন-তোমরা করতাছ কি? তোমরার কি আক্কেল জ্ঞান নাই। মেয়েছেলে পুরুষ ছেলে সব প্যাক কাদায় গড়াগড়ি। মৌলভী বাড়ির ইজ্জত রাখবা না? তার কথা শেষ হবার আগেই তাঁর ছোটশালা পেছন থেকে তাঁকে ঝাপ্টে ধরে কাদায় ফেলে দিল। চারদিকে শুরু হল হাসি।

এদিকে শুরু হয়েছে কাদার মধ্যে শালা-দুলাভাই যুদ্ধ। কাদা খেলা সারাগ্রামে। ছড়িয়ে পড়ল। কি অদ্ভুত পাগলামী। কনের বাড়িও গ্রামের মধ্যে। একজন কে বলে বসল, শইল্যে প্যাক-কেদা মাইখ্যা বরযাত্রী গেলে কেমুন হয়? কইন্যা পক্ষের উচিত শাস্তি হয়। আমরা গিয়া বলব—শইল্যে প্যাক-কেদা। প্যাক কাদা পরিষ্কারের জোগাড় কর। ভাল কাপড় দেও।

যেই কথা সেই কাজ। বরযাত্রী যাচ্ছে কাদায় মাখামাখি হয়ে। আহারে কি দিন STRUCS1 মেম্বর আলি ছটফট করছেন। তাঁর খুবই ইচ্ছা করছে তার বিয়ের দিনের গল্পটা কারো সঙ্গে করতে। ঘরে কেউ নেই। ফরহাদের বউ-এর সঙ্গে গল্পটা করতে পারলে ভাল হত। নয়া বউরা অন্য বউদের গল্প শুনতে ভালবাসে। শ্বাসকষ্টটা মনে হয় বাড়ছে।

মেম্বর আলির প্রথম স্ত্রীর নাম ছিল অনুফা। বিয়ের পর তার নাম হল প্যাক-বউ। পাক কাদার বউ তাই প্যাক বউ। বড় সুন্দর ছিল মেয়েটা। গায়ের রঙ সামান্য কম ছিল। তাতে কি? গায়ের রঙই সব না। বিয়ের এক বছরের মাথায় তার মৃত্যু হয়। প্যাক বউ-এর চেহারা মেম্বর আলি ভুলে গেছেন। তার কোন ছবি নেই যে ছবি দেখে চেহারা মনে করবেন।

শুধু মনে আছে তার খুব লম্বা চুল ছিল। চুল হাঁটু ছাড়িয়ে নেমে গিয়েছিল। একদিন সে রাগ করে সেই চুল কেটে ফেলল। তাকে দেখতে লাগল ছেলেদের মত। সে আরেক ইতিহাস। বড়ই মজার ইতিহাস। কেউ কি আছে যে এই ইতিহাসগুলি শুনবে? আচ্ছা এমন কড়া রসুনের গন্ধ আসছে কোত্থেকে? কেউ কি রসুন পুড়তে দিয়েছে। বিয়ে বাড়িতে কেউ রসুন পুড়ে? এদের কি কান্ডজ্ঞান নেই? রসুন পুড়ার গন্ধে তার নাক জ্বালা করছে। চোখ দিয়ে পানি পড়ছে।

আজ আসমানীর বিয়ে।আর বেছে বেছে আজকের দিনেই সে অসুখে পড়ে গেছে। সকালবেলা ঘুম ভেঙ্গেছে। বিছানা থেকে নামতে গিয়ে দেখল—মাথা তুলতে পারছে না। কি আশ্চর্য তার জ্বর না-কি? সে কপালে হাত দিল, তেমন জ্বরতো বোঝা যাচ্ছে না, অথচ শরীর কেমন যেন করছে। হাত পা ভারী। খোলা জানালার দিকে তাকাতে পারছে না। চোখ জ্বালা করছে। আসমানী বালিশে মাথা রেখে আবার শরীর এলিয়ে দিল। নিজের উপর রাগ লাগছে। জ্বর হবার জন্যে তিনশ পঁয়ষট্টি দিন পড়ে আছে। আজ জ্বর হবে কেন?

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ১২ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.