চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ২ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ২

ফরহাদের গোসল শেষ হয়েছে। টিউবওয়েলের পানি বরফের মত ঠাণ্ডা। ঠাণ্ডা পানিতে দীর্ঘ গোসলের পর শরীর ঝরঝরে হয়ে গেছে। ঘুম ঘুম ভাব একেবারেই নেই। ক্ষিধে মরে গিয়েছিল—সেই ক্ষিধে জাগিয়ে উঠেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে সে এক গামলা ভাত খেয়ে ফেলতে পারবে।রাহেলা বেগম বিরাট এক কাতল মাছের মাথা ছেলের পাতে তুলে দিয়ে মিচকি মিচকি হাসতে লাগলেন।

ফরহাদ হতভম্ব গলায় বলল, এত বড় মাছ কোত্থেকে আসল।জোবেদ আলি আনন্দিত গলায় বললেন, আজ দুপুরে কথা নেই বার্তা নেই মঞ্জু বিরাট এক কাতল মাছ নিয়ে উপস্থিত। কাতল মাছ, দুই কেজি খাসির গোশত। এক কেজি টমেটো। আর ভুটানের মরিচের আচার। কইগো আচারের বোতলটা আন।ফরহাদ বলল, ব্যাপার কি?

জোবেদ আলি বললেন, ব্যাপার কি কিছুই জানি না। জিজ্ঞেস করেছিলাম। সে বিরক্ত হয়ে বলল, সামান্য একটা মাছ আনতে ব্যাপার লাগবে না-কি। ওর যা স্বভাব অল্পতেই বিরক্ত। মহা বিরক্ত।চাকরি পেয়েছেন না-কি? পেতে পারে। যদি পায়ও আমরা আগে ভাগে কিছু জানব না। মাসের শেষে বেতন পেলে জানলেও জানতে পারি। আবার নাও জানতে পারি। মাঝে মধ্যে কাচা বাজার করে দিলেই বা ক্ষতি কি? অদ্ভুত এক ছেলে।মঞ্জু ঘুমিয়ে পড়েছে?

ও ঘুমাবে না! কি বলিস তুই? দশটা না বাজতেই বাতি টাতি নিভিয়ে ঘুম।ফরহাদ মার দিকে তাকিয়ে বলল, মাছের মাথা আমি খাব না মা।রাহেলা বেগম বললেন, কথা না বাড়িয়ে খাতো। বড় মাছের মাথা সংসারের রোজগারী মানুষের খেতে হয়। অন্য কেউ খেলে সংসারের অকল্যাণ হয়। যতদিন তোর বাবার রোজগার ছিল মাছের মাথা তাকে দিয়েছি। তোদের দেই নি।ফরহাদ বলল, আমি মাছের মাথা না খেলে সংসারের অকল্যাণ হবে এমন উদ্ভট কথা তোমরা বিশ্বাস কর?

জোবেদ আলি বললেন, দীর্ঘ দিন যে সব কথা চালু হয়ে আছে তার একটা মূল্য আছে। কোন কথাতো আর বিনা কারণে চালু হয় না। যেমন ধর মুরগির কলিজা পুরুষ মানুষের খাওয়া নিষেধ। এখন এর পেছনে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা পাওয়া গেছে।কি বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা?

মুরগির কলিজা হচ্ছে কোলেস্টরলের কারখানা। রোজ মুরগির কলিজা খেলে হার্টে ব্লকেজ হতে বাধ্য। একজন রোজগারী পুরুষের যদি হার্ট ব্লকেজ হয় তাহলে সংসারের অবস্থাটা কি হয় চিন্তা করে দেখ।

মেয়েদের হার্ট ব্লক হলে কোন সমস্যা নেই?

মেয়েদের হার্ট ব্লক হয় না?

ফরহাদ থালায় রাখা মাছের মাথার দিকে তাকাল। কয়েক মুহূর্তের জন্যে তার শরীর ঝিমঝিম করে উঠল। মনে হচ্ছে মাছটা জীবন্ত। অপলক চোখে তাকে দেখছে। সেই চোখ ভর্তি বেদনা ও বিস্ময়।ফরহাদ বাবার পাতে মাথা তুলে দিতে দিতে বলল, সংসারের অমঙ্গল হলেও কিছু করার নেই বাবা। এই মাথা আমি মরে গেলেও খাব না। মাথাটা জীবন্ত।জীবন্ত মানে?

জীবন্ত মানে জীবন্ত। চোখ পিট পিট করছে।জোবেদ আলি বিস্মিত হয়ে বললেন, মাছের চোখের পাতা আছে না-কি চোখ পিট পিট করবে? অতিরিক্ত পরিশ্রমে, টেনশানে তোরতো মনে হয় মাথা টাথা খাপ হয়ে যাচ্ছে। মাছের চোখ খেয়ে দেখ। খুবই মজা পাবি। চুষে চুষে লেবেনচুষের মত খা।মাছের চোখ তুমি খাও বাবা। তবে আমি আগে খাওয়া শেষ করি তারপর পাও।

ফরহাদ ঘুমুতে এল রাত দুটার দিকে। বৃষ্টির কারণে ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা লাগছে। রাতে ভাল ঘুম হবার কথা। তবে যে সব রাতে তার মনে হয় খুব ভাল ঘুম হবে সে সব এতে এক ফোঁটাও ঘুম হয় না। আজও হয়ত হবে না। ফরহাদ ঘরে তার দাদাজান মেম্বর আলিও থাকেন। পাশাপাশি দুটা খাটের একটা মেম্বর আলির। তাঁর বয়স আশির কাছাকাছি। রাতে চোখে কিছুই দেখেন না। বেশীর ভাগ সময় না ঘুম, না জাগরণ অবস্থায় থাকেন।

ফরিদ যতবার তার ঘরে ঢুকে ততবারই মনে হয় সে দেখবে দাদাজান বিছানায় মরে পরে আছেন। তার মুখের উপর ভনভন করে মাছি উড়ছে। মানুষটা কখন মারা গেছে কেউ জানেও না।ফরহাদ দাদাজানের মশারি উঁচু করে নীচু গলায় ডাকল, দাদাজান। দাদাজান। মেম্বর আলি চোখ মেলে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আবার চোখ বন্ধ করলেন। ফরহাদ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। যাক মানুষটা এখনো বেঁচে আছে।

রাহেলা বেগম দৈ-এর বাটি হাতে ছেলের ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। এখন তার মেজাজ সামান্য খরাপ। তার মন বলছে—তাঁকে দেখেই ছেলে যে কথাটি বলবে তা তিনি জানেন। জানেন বলে এই মুহূর্তে তাঁর মন একটু খারাপ। ছেলের কথার জবাবে কঠিন কিছু কথা অনেকদিন থেকেই তিনি বলবেন বলবেন করছেন। বলা হয় নি। আজ হয়ত বলে ফেলবেন। রোজগারী ছেলেকে কঠিন কথা বলা যায় না। এতে সংসারের অকল্যাণ হয়। তবু বলবেন।

সংসার ঠিক রাখার জন্যেও মাঝে মাঝে দুএকটা কঠিন কথা বলা দরকার। কঠিন কথা পেরেকের মত। সংসার নড়বড়ে হলে কঠিন কথার পেরেক লাগে।রাহেলা জানেন তাকে দেখে ফরহাদ প্রথম যে কথাটা বলবে তা হচ্ছে—দাদাজানকে রাত্রে খেতে দিয়েছ? এটা কেমন কথা তিনি বুড়োকে খেতে দেবেন না কেন? দিনের পর দিন বৎসরের পর বৎসর যে সেবাটা করা হচ্ছে সেটা কেন তার ছেলের চোখে পড়ে না। বুড়ো আজকাল প্রায়ই বিছানা নষ্ট করে।

কে সে সব পরিষ্কার করে? কাজের মেয়েরা এইসব কখনো করবে না। এইসব তাকেই করতে হয়। শ্বশুরের যত্ন এক কথা—তার নোংরা পরিষ্কার করা ভিন্ন কথা। বুড়োর নিজের ছেট মেয়ে এই শহরেই বাস করে। বুড়ো তার সঙ্গে গিয়ে থাকলেই পারে। শেষ বয়সে বুড়ো বাপের যত্ন মেয়েরা করবে এটাই স্বাভাবিক। ছেলে যদি মনে করে তার দাদাজানের যত্ন এই বড়িতে হচ্ছে না তাহলে সে বুড়োকে তার ফুপুর বাড়িতে পাঠিয়ে দিলেই পারে।

রাহেলা মনস্থির করলেন আজ যদি ফরহাদ তার দাদাজান বিষয়ে কিছু বলে তাহলে তিনি অবশ্যই বলবেন—ফরহাদ যেন তার দাদাজানকে তার ফুপুর বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়।ফরহাদ মাকে দেখেই বলল, রাতে দাদাজানকে খেতে দিয়েছ? রাহেলা বললেন, না। উপাস রেখে দিয়েছি।ফরহাদ চোখ ছোট ছোট করে মার দিকে তাকাল। রাহেলা বললো, উনার পেট খারাপ করেছে। পেটে কিছুই সহ্য হচ্ছে না। এই জন্যে চিড়ার পানি দিয়েছি।শুধু চিড়া-পানি?

লেবু দিয়া চিড়া-পানি পেটের জন্যে ভাল।রাহেলা ছেলের খাটের এক পাশে বসতে বসতে বললেন–তোর দাদার নোংরা বিছানা চাদর পরিষ্কার কর এক সমস্যা হয়েছে। কাজের মেয়ে করতে চায় না। এই বয়সে আমিও পারি না।ফরহাদ বলল, আমাকে দিও। আমি ধুয়ে দেব।পাগলের মত কথা বলিসনাতো। তুই ধুবি কি? কোন সমস্যা নেই।তুই উনাকে কিছুদিন যাত্রাবাড়িতে রেখে আয়।

কিছুদিন মেয়ের সেবা নিক। বুড়ো বাবা মার সেবা করাওতো মেয়েদের ব্যাপার। তোর ফুপু কিছু সোয়াব পাক।ফরহাদ কিছু বলল না। রাহেলা বললেন–জানুর ছোট মেয়েটার পরশু আকিকা। সবাইকে যেতে বলেছে। খালি হাতে তো যাওয়া যায় না। সোনার আংটি হলেও নেয়া দরকার। আমার অবশ্য একটা সোনার চেইন দেয়ার শখ। মেয়ের ঘরের নাতী। একটা চেইন কেনার টাকা দিতে পারবি?

ফরহাদ বলল, না।রাহেলা ক্লান্ত গলায় বললেন, একটা সামাজিকতার ব্যাপার আছে। সবাই জানতে চাইবে মেয়ের নানী কি দিল? ফরহাদ বলল, যে যার সামর্থ অনুসারে দিবে। পরে ফকিরতো আর কোহিনুর ইরা দিবে না।রাহেলা বললেন, তুই পথের ফকির না। আর আমিও কোহিনুর হীরা দিতে »াই না। সামান্য একটা চেইন। হাজার পনেরোশ টাকা দাম।ফরহাদ বলল, মা শুয়ে পড় আমার ঘুম পাচ্ছে। দৈ-এর বাটি নিয়ে যাও। দৈ খাব না।তুইতো আজ কিছুই খাস নাই—শরীর খারাপ?

শরীর ঠিক আছে। মাছের মাথাটা চোখ বড় বড় করে আমাকে দেখছিল তাতেই ক্ষিধে মরে গেছে।রাহেলা ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ফরহাদ হাই তুলতে তুলতে বলল, আমার কোন চিঠিপত্র এসেছে? এসেছে। তোর ড্রয়ারে রেখেছি।ড্রয়ারে কেন রাখবে। কতবার বলেছি চিঠি পত্র সব টেবিলের উপর পেপার ওয়েট দিয়ে ঢাকা দিয়ে রাখবে। ঢাকায় ফিরেই যেন চিঠিগুলি চোখে পড়ে।পান খাবি? পান দেব?

না।তুই হঠাৎ এমন মেজাজ খারাপ করছিস কেন? মেজাজ খারাপ করছি না মা? যাও ঘুমুতে যাও।মাথায় একটু নারিকেল তেল ডলে দেই। অনেক দিন মাথায় তেল না দিলে–অল্পতে মাথা গরম হয়। চুল পড়ে যায়। তোর মাথার চুল কমে যাচ্ছে।

কমুক।

চা খাবি?

আচ্ছা যাও মা। চা নিয়ে আস। চা পান সব আন।রাহেলা চিন্তিত মুখে ঘর থেকে বের হলেন। ফরহাদ ড্রয়ার খুলে চিঠি বের। করল। সে যা ভেবেছিল তাই—আসমানীর চিঠি। যতবারই সে ঢাকার বাইরে এক সপ্তাহ কাটিয়েছে ফিরে এসে আসমানীর চিঠি পেয়েছে। এবার দিন মাত্র তিন দিন এর মধ্যেই চিঠি পাবার কথা না। কিন্তু ফরহাদের মন বলছিল চিঠি পাবে।

আসমানীর হাতের লেখা সুন্দর। সে চিঠিও খুব গুছিয়ে লেখে। একটা শুধু সমস্যা চিঠি হয় ছোট। হাতে নিতে না নিতেই শেষ। আসমানী লিখেছে—

এই যে

বাবু সাহেব,

আপনি তাহলে ঢাকায় ফিরেছেন? আপনার জন্যে খুবই দুঃসংবাদ। জাপান থেকে আমার মামা এক সপ্তাহ আগেই চলে এসেছেন। এবং আমার মাকে বলেছেন-পাত্র যদি ঠিক থাকে এই শুক্রবার আসমানীর বিয়ে দিয়ে দাও। হুলস্থুল করার কোন দরকার নেই। একজন কাজী ডেকে এনে বিয়ে। পরের দিন কোন ভাল রেস্টুরেন্টে একটা রিসিপশান। রিসিপশনের খরচ আমি দেব। মা মনে হয় রাজি। কাজেই এই শুক্রবারে তোমার বিয়ে। বাবু সাহেব এখন তোমাকে খুবই জরুরী কথা বলছি—তুমি যখনই চিঠিটা পাবে তখনি আমাদের বাসায় চলে আসবে। রাত তিনটার সময় হলে তিনটায় আসবে। কারণ তোমার মুখ দেখতে ইচ্ছা করছে।

আচ্ছা শুনতে আমার সোনার বাংলার পরের লাইনটা যেন কি?

তোমার

পুনশ্চঃ আমার সোনার বাংলার পরের লাইন হচ্ছে—

আমি তোমায় ভালবাসি

চিঠি এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলা যায় তারপরেও মনে হয় চিঠি পড়া হয় নি। যে কথাগুলি লেখা হয়েছে তার বাইরেও অনেক কিছু লেখা। বাইরের লেখাগুলি পড়তে সময় লাগে। রাত তিনটার সময় চলে আসবে। এর মানে কি? এটা কি শুধু কথার কথা? না সে সত্যি চাচ্ছে গভীর রাতে সে গিয়ে উপস্থিত হবে?

বৃষ্টি পড়ছে। ঘর ঠাণ্ডা হয়ে আসছে। জানালা খোলা, বৃষ্টির ছাঁট আসছে। দাদাজান ঘরে না থাকলে সে জানালা খোলা রাখত। ঘুমের মধ্যে হালকা গুড়িগুড়ি বৃষ্টির কণা চোখে মুখে পড়া আনন্দের ব্যাপার। ফরহাদ জানালা বন্ধ করে ঘুমুতে গেল। ঘুম এসে পড়ল প্রায় সঙ্গে সঙ্গে। শুধু ঘুম না, ঘুমের সঙ্গে স্বপ্ন। স্বপ্নেও বৃষ্টি হচ্ছে। সে বৃষ্টির মধ্যে দৈ-এর হাড়ি নিয়ে ভিজছে।

সে দাঁড়িয়ে আছে পেট্রল পাম্পের ভেতর। মাথার উপরে ছাদ। তার গায়ে বৃষ্টি পড়ার কথা না। কিন্তু বৃষ্টি পড়ছে। এইসব অদ্ভুত ব্যাপারগুলি স্বপ্নেই সম্ভব। পেট্রল পাম্পে তার সঙ্গে আরেকটা মেয়ে ভিজছে। এই মেয়েটা দেখতে অবিকল আসমানীর মত, কিন্তু সে আসমানী না। এই মেয়েটা নিশিকন্যা। মেয়েটা ভিজে জবজবা হয়ে গেছে। ফরহাদ বলল, এই শোন এদিকে আস। মেয়েটা হাসতে হাসতে এগিয়ে আসছে।

ফরহাদ বলল, নাও এই দৈয়ের হাড়িটা নাও।

কেন?

বাসায় নিয়ে যাও। বাসায় নিয়ে খাবে।

উঁহু।

উঁহু কি নিয়ে যাও। নাম কি তোমার?

আমার নাম আসমানী।

আমার সঙ্গে ফাজলামী করবে না। তোমার নাম আসমানী না।

সত্যি আমার নাম আসমানী।

এই সময় খুব ভারী এবং গম্ভীর গলায় কেউ একজন বলল, ঐ মেয়ে সত্য কথা বলছে। তার নাম আসমানী।

ফরহাদ ঘুমের মধ্যেই প্রচন্ড চমকে উঠে বলল, কে কে কথা বলল।

মেয়েটা বলল, আপনার দাদাজান।

তাইতো। দাদাজানেরইতো গলা। তিনি এখানে এলেন কেন? এই বয়সে বৃষ্টিতে ভিজলে উপায় আছে। গোঁ গোঁ শব্দ হচ্ছে। দাদাজানেরই গলার আওয়াজ। মনে হচ্ছে কেউ তাকে গলা চেপে মেরে ফেলার চেষ্টা করছে। ফরহাদ ব্যাকুল হয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে। দাদাজানকে দেখা যাচ্ছে না। অথচ তার গোঁ গোঁ চিৎকার শোনা যাচ্ছে।

ফরহাদ জেগে উঠল। পাশের খাটে দাদাজান সত্যি সত্যি গোঁ গোঁ করছেন। তাকে বোবায় ধরেছে। ফরহাদ উঠে গিয়ে দাদাজানের কপালে হাত রাখতেই তিনি বললেন–পানি খাব। পানি।দাদাজানের শরীর কাঁপছে। ঘামে তার মুখ ভিজে জবজব হয়ে গেছে। তিনি দুহাতে ফরহাদ শক্ত করে ধরে আছেন এবং বিড়বিড় করে বলছেন—পানি, পানি।

আসমানীদের ফ্ল্যাট বাড়িতে ফরহাদ এর আগেও এসেছে।ফ্ল্যাট বাড়িগুলি এম্নিতেই ছিমছাম ধরনের থাকে—এইটা আরো বেশি ছিমছাম। নানান কায়দাকানুন। গেটে দারোয়ানের কাছে বইতে নাম লেখতে হয়। দারোয়ান তারপর ইন্টারকম করে। ইন্টারকমে যদি ক্লিয়ারেন্স পাওয়া যায় তবেই লিফটে ওঠা যায়। ক্লিয়ারেন্স পাবার পরও দারোয়ান এমনভাবে তাকিয়ে থাকে যেন একজন ভয়ংকর অপরাধী লিফট করে উঠে যাচ্ছে।

বাড়িতে ঢোকার পরেও সমস্যা। মনে হয় কোন হোটেলে ঢুকে পরা হয়েছে। বসার ঘর এমন করে সাজানো যে সহজ হয়ে বসা যায় না। ফরহাদের প্রধান সমস্যা হয়—জুতা পায়ে দিয়ে সে কার্পেটে উঠবে, না-কি জুতা খুলে উঠবে? জুতা যদি খুলে তাহলে জুতা রাখবে কোথায়? বসার ঘরে ঢোকার আগে দরজার পাশে, না-কি বসার ঘরের কার্পেটে। এখানে থাকা মানেই সারাক্ষণই এক ধরনের টেনশান। বসার ঘরটা কি স্মোক-ফ্রি জোন? না-কি সিগারেট খাওয়া যায়।

সিগারেট খেলে ছাই কোথায় ফেলবে? একবার ছাইদানীতে ছাই ফেলার পর আসমানী ভুরু কুচকে বলল—কোথায় ছাই ফেললে? এটা এসট্রে না। মোমদানী। নিচে নোম লেগে আছে দেখেও বুঝতে পারলে না? আশ্চর্যতো। তারপর সে কাজের মেয়েটাকে ডাকল মোমদানীর ছাই ফেলে ধুয়ে আনার জন্যে। কাজের মেয়েটা এসে এমনভাবে তার দিকে তাকাল যেন সে বাংলাদেশের মহা বেকুবদের একজন প্রতিনিধি। মোমদানী এবং এসট্রের সামান্য প্রভেদটাও জানে না।

ফরহাদের ধারণা আসমানী ছাড়া এ বাড়ির একটা মানুষও তাকে দেখতে পারে। যেমন আসমানীর বাবা নেজাম উদ্দিন। ভদ্রলোক ব্যাংকার ছিলেন—এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। রিটায়ার্ড লোকজন নিজের সংসারে তেমন পাত্তা পায় না বলে—বাইরের লোকজনের সঙ্গে তাদের ব্যবহার খুব আন্তরিক হয়ে থাকে। ব্যতিক্রম সম্ভবত নেজামত সাহেব।

ফরহাদকে দেখলেই তিনি চোখ মুখ কঠিন করে ফেলেন। প্রফেশনাল উকিলদের মত জেরা করতে থাকেন। জেরার ফাঁকে ফাঁকে এমন দুএকটা কথা বলেন যে রাগে রক্ত গরম হয়ে যায়। যেমন একবার নেজামত সাহেবের দেখা হল। ফরহাদ এসে ঢুকেছে তিনি বেরুচ্ছেন এমন অবস্থায় দেখা। ভদ্রলোক সঙ্গে সঙ্গে চোখ মুখ কঠিন করে ফেললেন। ভুরু কুচকে গেল। চোখ সরু হয়ে গেল। তিনি শীতল গলায় বললেন, তুমি কে? কাকে চাও?

ভদ্রলোক ভাল করেই জানেন ফরহাদ কে? এবং সে কার কাছে এসেছে। তারপরেও জিজ্ঞেস করা। ফরহাদ কাচু মাচু ভঙ্গিতে বলল, জি আমার নাম ফরহাদ। আমি আসমানীর কাছে এসেছি। ওকি বাসায় আছে? ও আচ্ছা আচ্ছা। তোমাকেতো আরো কয়েকবার দেখেছি। তোমার দেশ যেন কোথায়?

জ্বি নেত্রকোনা।নেত্রকোনার লোকদের বিশেষত্ব কি বল দেখি।ফরহাদ চুপ করে রইল। ভদ্রলোক বললেন—নেত্রকোনার বিশেষত্ব হচ্ছে এই অঞ্চলের লোকজন সব সময় উল্টা ভাব ধরে থাকে। বুঝতে পেরেছ কি বললাম?

জ্বি না।যে বেকুব সে বুদ্ধিমান ভাব ধরে। যে মূর্খ সে জ্ঞানীর ভাব ধরে। যে বেকার সে এমন ভাব ধরে থাকে যেন কোন কোম্পানীর জি এম।ফরহাদ চুপ করে রইল। তার মেজাজ খুবই খারাপ হচ্ছিল কিন্তু আসমানীর বাবার সঙ্গে মেজাজ খারাপ করার প্রশ্নই উঠে না।নেত্রকোনার মেয়েদের বিশেষগুণ কি বল দেখি।

বলতে পারছি না।সেকি—তুমি নেত্রকোনার ছেলে হয়ে নেত্রকোনার মেয়েদের বিশেষ গুণ কি বলতে পারছ না? তাদের বড়গুণ হচ্ছে ঘরের কাজকর্ম তারা খুব ভাল পারে। বাংলাদেশে যত বুয়া আছে তার শতকরা ৬০ ভাগ আসে নেত্রকোনা থেকে। নেত্রকোনা হচ্ছে বাংলাদেশের বুয়া ভান্ডার। ভালমত খোঁজ নিলে দেখবে তোমার আত্মীয় স্বজনদের মধ্যেও দুএকজন এক্সপার্ট বুয়া বের হয়ে যাবে।

কথাগুলি অপমান করার জন্যে বলা। অপমান ফরহাদ গায়ে মাখে না তবু মনটা খারাপ হয়। সে কিছুতেই ভেবে বের করতে পারে নি নেজামত সাহেব তাকে এতটা অপছন্দ কেন করেন। তার পছন্দের মাপকাঠিটা কি?

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ৩ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.