চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ৫ হুমায়ূন আহমেদ

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ৫

আমাকে কোলে করে গাড়ি পর্যন্ত নিতে পারবেতো? আমার ওজন বেশী না। এইটি নাইন পাউন্ডস। খুবই পানির পিপাসা পেয়েছে। তুমি গাড়িতে উঠেই ঠাণ্ডা এক বোতল পানি কিনে আনবে। বড় বোতল আনবে না। ছোট বোতল আনবে। যাতে আমি একাই পুরো বোতল শেষ করতে পারি।এত কথা বলছ কেন?

যাতে অজ্ঞান হয়ে না যাই এইজন্যই এত কথা বলছি। অজ্ঞান না হবার অনেক কৌশল আছে। একটা কৌশল হল প্রচুর কথা বলা এবং কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে বড় বড় করে নিঃশ্বাস নেয়া যাতে ব্রেইনে অক্সিজেন সাপ্লাই বেশী থাকে।ফরহাদ আসমানীর একটা হাত নিজের কাঁধে তুলে দিয়েছে। কোমর ধরেছে শক্ত করে। তোক তাকিয়ে দেখছে। দেখুক।এই শুনছ? তোমাকে একটু হিন্টস দেব?

দরকার নেই।খুব সহজ ধাঁধা। পানির মত সহজ। এই শোন আমার প্রচণ্ড পানির পিপাসা হচ্ছে।পানির ব্যবস্থা করছি।আচ্ছা এই প্রশ্নটা পারবে? চেয়ারের বাংলা হল কেদারা। টেবিলের বাংলা কি? জানি না।কেউ বলতে পারে না। শুধু কণা পেরেছিল। কণাকে চিনেছ—আমার বান্ধবী। তুমি তাকে দেখনি। অতি ভাল মেয়ে। তুমি টেবিলের বাংলা সত্যি জান না?

না।টেবিলের বাংলা হল—মেজ। ম একের, জ। মেজ। মনে থাকবে? থাকবে।এই একটা মজার কথা শুনবে? হ্যাঁ শুনব।তুমি যখন সোনার দোকানে আংটি কিনতে ঢুকলে তখন আমি ভেবেছিলাম আমার জন্যে কিনবে। তারপর যখন ছোট্ট একটা আংটি কিনলে তখন কি ভাবলাম জান? না।

বলতে খুবই লজ্জা লাগছে, কিন্তু বলেই ফেলি—তখন ভাবলাম আমাদের তো একটা বাবু হবে কোন একদিন। জম্নের পর পর তার মুখ দেখার জন্যে তুমি আংটি কিনেছ।আমার ভাগ্নির আকীকা। তার জন্যে কিনেছি। তুমি যদি চাও তোমার মেয়ের আংটি আমি আগে ভাগে কিনে রাখব।আমি চাই। অবশ্যই চাই।আসমানী খুব ঘামছে। তার জ্বর কি কমে যাচ্ছে? না-কি শরীর ঘামা অন্য কোন কিছুর লক্ষণ। ফরহাদ ভয়ে অস্থির হয়ে গেল।

জোবেদ আলি রাতে ভাত খাননি। রাগ করে ভাত খাননি। রাগের কারণ অতি তুচ্ছ। তাঁর একটা গাছ কে যেন পা দিয়ে মাড়িয়ে ভর্তা বানিয়ে ফেলেছে। গাছটা তিনি তাঁর পরিচিত নার্সারী থেকে অনেক দেন দরবার করে এনেছেন। চারশ টাকা দামের চারা তাকে দিয়েছে দুশতে সেই দুশ টাকাও তিনি দিতে পারেন নি। একশ টাকা দিয়েছেন। একশ বাকি রেখে এসেছেন। জাপানি ফুলের গাছ নাম এরিকা জাপানিকা। বিশেষত্ব হচ্ছে এই গাছে সবুজ রঙের ফুল ফুটে।

সবুজ পাতার রঙ, ফুলের রঙ না। সেই কারণেই সবুজ ফুল—অসম্ভব সুন্দর হবার কথা। তিনি কল্পনায় ফুল দেখতেন। বাস্তবে আর দেখা হল না।তাঁর এই শখের চারাটার উপর কে যেন অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিল। শুধু যে দাঁড়িয়ে ছিল তা-না দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট খেয়েছে। সিগারেটের টুকরা তিনি কাছেই পেয়েছেন। কাজটা কে করেছে এখনো বুঝতে পারছেন না।তার সন্দেহ ছোট ছেলে মঞ্জুর উপর।

তিনি প্রায়ই লক্ষ্য করেছেন মঞ্জু বাগানে হাঁটাহাঁটি করে সিগারেট খায়। এর আগেও সে একটা পাথরকুচি গাছের চারা মাড়িয়ে চ্যাপ্টা করেছিল। পাথরকুচির জীবনী শক্তি অনেক বেশী বলে গাছটা বেঁচে গেছে। জাপানী গাছের এত জীবনী শক্তি থাকার কথা না। বেচারা বিদেশী মাটিতে বড় হচ্ছে। তার মন পড়ে থাকে জাপানে, তার আসে পাশে সব অপরিচিত গাছ।

জীবনী শক্তি বেশী থাকার কথাতো না।জোবেদ আলি ঠিক করে রেখেছেন—ছোট ছেলেকে আজ তিনি কিছু কঠিন কথা শুনাবেন। এমন কিছু কঠিন কথা যা এই ছেলে অনেকদিন শুনেনি। সিগারেট গাঁজা যা ইচ্ছা খাও—বিছানায় শুয়ে শুয়ে খাও। গাছের উপর দাঁড়িয়ে খাবে কেন?

মঞ্জু রাত নটার মধ্যে বাসায় ফিরে। রেী করে বড় ছেলে ফরহাদ। আজ দুজনই দেরী করছে। করুক দেরী, তিনি অপেক্ষা করবেন। প্রয়োজন হলে সারারাত বারান্দায় বসে থাকবেন।রাত এগারোটা দশ। তিনি বারান্দার মোড়ায় বসে আছেন। তাঁর খুব ভাল সিধে পেয়েছে। খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম এই বয়সে করা ঠিক না। কিন্তু রাগ কমাতে পারছেন না।রাহেলা বারান্দায় এসে বিরক্ত গলায় বললেন—তুমি সত্যি ভাত খাবে না?

জোবেদ আলি বললেন, না। আমি ভাতের কাঁথা পুড়ি।যত বয়স হচ্ছে তুমি তত পুলাপান হয়ে যচ্ছ। ভাত খাবে না কেন? ক্ষিধা নাই।একটা গাছ মরে গেছে। তাতে কি হয়েছে। মানুষ মরে যায় আর গাছ। আস ভাত খাও।বললামতো খাব না।আমি কিন্তু ভাতে পানি দিয়ে ফেলব।যা ইচ্ছা দাও।লোকে বলে না—বুড়ো হলে মানুষের ভীতি হয়—তোমার ভীমরতি হচ্ছে।ভাল।আমি কিন্তু আর সাধাসাধি করতে আসব না।বললামতো আসার দরকার নাই।এই শেষ আসা।আচ্ছা।

এই বৃক্ষপ্রীতি জোবেদ আলির আগে ছিল না। রিটায়ার করার পর হয়েছে। যত দিন যাচ্ছে ব্যাপারটা তত বাড়ছে। প্রতিদিন কিছু সময় তিনি সাত মসজিদ রোডের এক নার্সারিতে বসে থাকেন। নার্সারির লোকদের সাহায্য করেন। গোবর মাটি এবং ডাস্টবিনের আবর্জনা মাখিয়ে বৈ সার বানান। গায়ে পড়া কোন সাহায্যই মানুষ সহজ ভাবে নিতে পারে না। তার এই সাহায্যও কেউ সহজ ভাবে নেয় না। লোকটার আসল মতলব খুঁজে বের করার চেষ্টা করে।

টেবিলে খাবার ঢাকা দিয়ে রাখলাম। যদি খেতে ইচ্ছা করে খেয়ে আমাকে মুক্তি দিও।আচ্ছা।টিফিন কেরিয়ারে দুজনের মত কাচ্চি বিরিয়ানী আছে। জাহানারা দিয়ে দিয়েছে।আচ্ছা।ফরহাদকে বলবে কষ্ট করে যেন গরম করে নেয়। আমি রাত জাগতে পারব ঘুমের অষুধ খেয়ে ফেলেছি।ভাল করেছ। আরো দুটা ঘুমের অষুধ খাও।এটা কি কথা বললে? জোবেদ আলি রাগী গলায় বললেন, বলে ফেলেছি বলে ফেলেছি। এখন আমাকে কি করবে? মারবে?

রাহেলা হতভম্ব হয়ে গেলেন। কথাবার্তার একি নমুনা। সামান্য একটা গাছ মরে গেছে আর লোকটা মাথা খারাপের মত কথাবার্তা বলছে। রাহেলা খুব কঠিন কিছু বলার প্রস্তুতি নিয়েও নিজেকে সামলে ফেললেন। ঘুমের অষুধ খাবার পরে রাগারাগি চেঁচামেচি করলে অষুধের ধার কমে যায়। বিছানায় শুবেন ঘুম আসবে না। এরচে ঝগড়াটা কিছু সময়ের জন্যে মূলতুবী থাকুক।

স্বামীকে তিনি এত সহজে ছেড়ে দেবার মত মানুষ না। তাছাড়া মেয়ের বাড়িতে যাবার কারণে আজ তার মেজাজ ভাল। আকিকা উপলক্ষে তিনি শেষ পর্যন্ত নাতনীকে একটা চেইন দিতে পেরেছেন। তাঁর গোপন সঞ্চয়ে হাত দিতে হয়েছে। তার জন্যে মেজাজ সামান্য খারাপ ছিল। কিন্তু চেইন দেখে জাহানারা এতই খুশি হল যে মেজাজ খারাপ ভাব সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল। জাহানারা অবশ্যি বলেছে—ইশ মা তোমাকে গলার চেইন দিতে কে বলেছে? নাতনীকে দোয়া করবে—তা না।

দোয়াতো সব সময়ই করি।

এত টাকা খরচ করা তোমার ঠিক হয়নি মা।

একটা লকেটও দেয়ার ইচ্ছা ছিল। হাত একেবারে খালি।

এই রকম বাজে খরচ তুমি করো নাতো মা।

রাহেলা মেয়ের খুশি দেখে খুবই তৃপ্তি পেলেন। ভাগ্যিস আংটি না কিনে শেষ মুহূর্তে সোনার চেইন কিনেছেন। না কিনলে খুব বোকামী হত।জাহানারা বলল, তোমার জামাই মেয়ের আকিকা উপলক্ষ্যে আমাকে কি দিয়েছ দেখ মা। দুটা বালা বানিয়ে দিয়েছে। একেকটা এক ভরি করে। ডিজাইন আমার পছন্দ হয় নি। কিন্তু আমি কিছু বলিনি বেচারা শখ করে কিনেছে।

কই ডিজাইনতো আমার কাছে সুন্দর লাগছে।সবাই সুন্দর বলছে কিন্তু আমার কাছে ওল্ড ফ্যাশনড় মনে হচ্ছে। তাছাড়া বালা পরলে বয়স বেশি বেশি লাগে। আমি এগুলি ভাঙ্গিয়ে পাতলা করে চারটা চুড়ি বানাব। সব সময় পরা যায় এমন চুরি।ভুলেও এই কাজ করবি না। জামাই জানতে পারলে মনে কষ্ট পাবে।ও জানতেই পারবে না। একমাস পরে নিজেই ভুলে যাবে যে আমাকে বাবা দিয়েছিল।

জামাইয়ের ব্যবসা কি ভাল যাচ্ছে না-কি।ওদেরতো মা অনেক রকম ব্যবসা। একটা খারাপ গেলে অন্যটা ভাল যায়। তুমি এসেছ খুব ভাল হয়েছে। তোমার সঙ্গে আমার খুবই জরুরী কিছু কথা আছে।কি কথা? এখন না। খাওয়া দাওয়া শেষ হোক তারপর বলব। মুখ এমন শুকনা করে ফেলেছ কেন? খারাপ কিছু না। খুবই ভাল একটা ব্যাপার আছে। তোমার জামাই আমাকে বলেছে তোমার সঙ্গে কথা বলতে। কাজেই আমি যা বলব সেটা হল অফিসিয়াল।

এখনই বল। আমার হাত পা কাঁপছে।হাত পা কাপাতে হবে না। বললাম না, ভাল খবর।জাহানারা রহস্যময় ভঙ্গিতে হাসতে লাগল। রাহেলা মেয়ের হাসি দেখেও তেমন স্বস্তি পেলেন না। তাঁর জীবনে ভাল কিছু ঘটতে পারে এই বোধই নষ্ট হয়ে গেছে। তাঁর জীবনটা এমন এক পর্যায়ে গেছে যে এখন ঘটনা মানেই দুর্ঘটনা। স্বপ্ন মনেই দুঃস্বপ্ন। রাহেলা দুঃশ্চিন্তা নিয়ে সময় কাটাতে লাগলেন।

নাতনীর আকীকা উপলক্ষ্যে তিন চারশ লোককে দাওয়াত দেয়া হয়েছে। প্যান্ডেল খাটানো হয়েছে বিয়ে বাড়ি বিয়ে বাড়ি ভাব। রাতে না-কি আবার কাওয়ালী হবে। বাচ্চু কাওয়ালকে খবর দেয়া হয়েছে। রাহেলার খুব ইচ্ছা কাওয়ালী দেখে যাওয়া। রাত বেশি হলেও সমস্যা হবে না। জামাইদের গাড়ি আছে। শাশুড়ীকে জামাই নিশ্চয়ই নামিয়ে দিয়ে যাবে।

কাওয়ালীর আসর থেকে জাহানারা মাকে উঠিয়ে নিয়ে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। রাহেলার বুক ধরাস ধরাস করতে লাগল। জাহানারা গলা নামিয়ে বলল, মা আমার ননদকে তুমি দেখেছ রাণী নাম। দেখেছ না?

রাহেলা বললেন, হুঁ।

খুব সুন্দর মেয়ে না?

রাহেলা আবারো ক্ষীণ স্বরে বললেন, হুঁ।এমন মিহি করে হু বলছ কেন? সুন্দর মেয়েকে সুন্দর বলতে সমস্যা কোথায়? একটু মোটার ধাত আছে।তা আছে। সেটা এমন কিছু না। মেয়েটা ভাল। নিজের ননদ বলে বলছি না—আসলেই ভাল মেয়ে।রাহেলা মেয়ের কথার আগামাথা কিছুই ধরতে পারছেন না। মেয়ে ভাল হলে তার কি যায় আসে?

জাহানারা বলল, আমার শ্বশুর বাড়ির সবার খুব ইচ্ছা রাণীর সঙ্গে ভাইয়ার বিয়ে হোক। ভাইয়াকে তাদের সবার খুবই পছন্দ।রাহেলা বললেন, ও এই ব্যাপার।জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, মা তুমি দেখি পুরো ব্যাপারটা ঝেড়ে ফেলে দিলে। এরা সাত ভাইয়ের মধ্যে একটা বোন। সবার চোখের মণি। মেয়ের নামে একটা বাড়ি ঢাকা শহরে আছে। তার বয়স যখন বার তখনি তার বিয়ের জন্যে তিন সেট গয়না বানিয়ে রাখা হয়েছে। বুঝতে পারছ কিছু?

হুঁ।ভাইয়ার জন্যে এরচে ভাল বিয়ে হবার না। ওরা ভাইয়াকে যত পছন্দই করুক। আমিতো জানি ভাইয়া মোটামুটি অপদার্থ একজন মানুষ। এম,এসসি পাশ করে তিন বছর টিউশনি করেছ। একে অপদার্থ ছাড়া কি বলবে? এই ফ্যামিলির একটা মেয়েকে বিয়ে করলে ভাইয়ার ভাগ্য ফিরে যাবে।

রাহেলা বললেন, ফরহাদের পছন্দের একটা মেয়ে মনে হয় আছে। কয়েকবার বাসায় এসেছে।জাহানারা বিরক্ত গলায় বলল, এইসব ফালতু প্রেম ভাইয়াকে হজম করে ফেলতে বল। প্রেম আবার কি? পেটে ভাত থাকলে তবেই না প্রেম। উপাস পেটে আবার প্রেম কি? মা শোন ভাইয়াকে তুমি অবশ্যই রাজি করাবে।দেখি।দেখাদেখি না মা। ভাইয়াকে রাজি না করাতে পারলে আমার মান-সম্মান থাকবে না।তোর মান-সম্মানের কথা আসছে কেন?

কারণ আমার শাশুড়ি নিজে আমাকে ডেকে নিয়ে বলেছেন। আমি উনাকে বলেছি-আম্মা আপনি নিশ্চিত থাকেন। আমি ব্যবস্থা করছি।তুই আগবাড়িয়ে কথা বলতে গেলি কেন? আমি কেন বলব না? আত্মীয়ের সঙ্গে আত্মীয়তা ভাল না।জাহানারা বলল, মা শোন এই বিয়েটা শুধু ভাইয়া না তোমাদের সবার জন্যে দরকার। যেই আমি ভাল একটা বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছি ওমি তুমি ভাব ধরে ফেলছ।

ঠাণ্ডা মাথায় বিবেচনা কর—ঢাকা শহরে যে বাস করছ তোমাদের পায়ের নিচে কি মাটি আছে? না মাটি নেই। আর রাণীর নামে ঢাকায় যে বাড়ি আছে সে বাড়ি থেকে মাসে ভাড়াই আসে আঠারো হাজার টাকা।বলিস কি? সাত কাঠা জমির উপর বাড়ি। দোতলা বাড়ি—তিন তলার ফাউন্ডেশন আছে। ও। আমার শাশুড়ির নিজস্ব সম্পত্তি আছে অনেক। মায়ের সম্পত্তিতে মেয়ের অংশ বেশি এটা নিশ্চয়ই তুমি জান। কি জান না?

জানি।জাহানারা নিঃশ্বাস ফেলে বলল, আমি মেয়ে মানুষ। বাপ ভাইয়ের সংসারের জন্যে মেয়েরা কিছু করতে পারে না। তারপরেও আমি আমার সাধ্যমত চেষ্টা করলাম। বাকিটা তোমাদের বিবেচনা।রাহেলা তারপরেও অনেকক্ষণ মেয়ের বাড়িতে রইলেন। কাওয়ালী শুনলেন। মেয়ের শাশুড়ির সঙ্গে বসে চা খেলেন। জামাই টাটকা দুধ খাবার জন্যে একটা গাই কিনেছে। দুইবেলা দুধ দেয় ছ কেজি দুধ।

সেই গাই দেখে তার গায়ে হাত বুলালেন এবং তার সমস্ত কর্মকান্ডের ফাঁকে ফাঁকে রাণী মেয়েটাকে লক্ষ্য করলেন। শুরুতে তাকে যতটা মোটা লাগছিল শেষের দিকে তা আর লাগল না। বরং তাঁর কাছে মনে হল মেয়েটা শুধু যে সুন্দর তাই না—অতিরিক্ত ভদ্র বিনয়ী। বৌ হিসেবে একশতে নব্বুই পঁচানব্বুই পাওয়ার কথা। বড়লোকের মেয়ে একটু দেমাগী হবেই। কি আর করা। দেমাগ করার সামর্থ যার আছে সে দেমাগ করলেও তেমন দোষের কিছু হয় না।

রাহেলা বাসায় ফিরলেন আনন্দ নিয়ে। মেয়ে মাকে গাড়িতে তুলে দিতে এসে এক ফাঁকে একটা খাম হাতে দিয়ে বলল, ব্লাউজের ভেতর নিয়ে নাও তো মা। এটা মেয়ের পুরানো টেকনিক। খামে কিছু টাকা আছে। রাহেলা যতবারই মেয়ের কাছে এসেছেন এরকম একটা খাম পেয়েছেন। স্বামীর সংসার থেকে মাকে টাকা দেয়া খুব দূষনীয় ব্যাপার বলেই গোপনীয়তা। প্রথম দিকে রাহেলা ক্ষীণ আপত্তি করতেন। এখন করেন না।

ছেলের হাতের টাকা যদি নেয়া যায় মেয়ের হাতের টাকাও নেয়া যায়।জাহানারা বলল, টিফিনকেরিয়ারে সামান্য খাবার দিয়ে দিলাম মা। খাওয়া সর্ট পরে গেছে বলে বেশি দিতে পারি নি। দুজনের হবে। টিফিনকেরিয়ারটা ফেরত পাঠিও। আর ভাইয়াকে যেভাবেই হোক রাজি করাবে। আমার কোন স্বার্থ নেই। মা। এটা মনে রেখে এগুবে।রাহেলা বললেন, আচ্ছা।

আজ রাতে ভাইয়াকে কিছু বলার দরকার নেই। আজ রাতটা ঠাণ্ডা মাথায় চিন্তা কর। আর বাবাকে এই মুহূর্তে কিছু বলবে না।আচ্ছা।পুরোপুরি সবকিছু ফাইন্যাল না হওয়া পর্যন্ত বাবা যেন কিছুই না জানে। বাবা সবকিছু আউলা করে ফেলে। এখানেও আউলা করবে।রাহেলা হাসলেন। এই হাসিতে কিছু তৃপ্তিও আছে। মেয়ের সংসারী বুদ্ধি দেখে তৃপ্তির হাসি।

বিয়ের আগে বোঝাই যায় নি—এই মেয়ে এত সংসারী হবে। এর সঙ্গে প্রেম, তার সঙ্গে প্রেম। ঘুমের অষুধ খাওয়া, স্টমাক ওয়াশ। কি বিশ্রী দিন কেটেছে। আজ মেয়ের স্বামী সংসার দেখে ঈর্ষা হয়। কি সুখেই না আছে। কে বলবে এই মেয়ে লোফার টাইপ একটা ছেলের জন্যে ঘুমের অষুধ টষুধ খেয়ে কত কাণ্ড করেছে। বিয়ে হল সব শেষ। এত বড় সংসার হাতের মুঠোয় নিয়ে মেয়ে সুখে আছে তার জন্যে এটাই বড় আনন্দ।

খাম খুলে দুটা পাঁচশ টাকার নোট পেয়েছেন। চেইন কিনতে সতেরোশ টাকা লেগেছিল তার অনেকটাই উঠে এসেছে। তার গোপন সঞ্চয়ে টাকাটা চলে যাবে। আবার কোন দুর্যোগে কাজে লাগবে। ছেলেরা যে সারা জীবন তাঁকে দেখবে তাতো। তাদের সংসার হলেই তারা আস্তে আস্তে সরে পড়তে থাকবে। এটাও দোষের। এটাও সংসারের কঠিন নিয়মের এক নিয়ম। ফরহাদের বাবা সংসারী মানুষ হলে তিনি এত ভাবতেন না। লোকটা মোটেই সংসারী না।

গাছ মরে গেলে যে ভাত খাওয়া বন্ধ করে দেয় তার উপর বিশ্বাস রাখা যায় না। তাকে খরচের খাতায় ধরতে হয়। তাছাড়া পুরুষ মানুষের হায়াত কম হয়। মেয়েরা হয় কচ্ছপের মত দীর্ঘদিন বেঁচে থাকে। ফরহাদের বাবা বেঁচে থাকবে না, তিনি অর্থ হয়ে বিছানায় শুয়ে থাকবেন তখন তার হবে কি? কার উপর ভরসা করবেন? কে দেখবে তাকে? তবে ফরহাদের বাবারা দীর্ঘজীবি গুষ্ঠি।

ফরহাদের দাদার বয়স আশি দাঁড়িয়ে গেছে। দিব্যি বেঁচে আছেন। অসুখ বিসুখ হচ্ছে কিন্তু তেমন জটিল হবার আগে সেরেও যাচ্ছে। আরো কতদিন তিনি ঝুলে থাকবেন কে জানে? অচল একজন মানুষ সংসারে থাকলে সংসারটাও অচল হয়ে যায়। তার সংসার অচল হয়ে গেছে। এই দুঃখের কথা কাউকে বলা যায় না। বললে লোকে ছিঃ ছিঃ করবে।

ঘুমের অষুধ খেয়ে সঙ্গে সঙ্গে বিছানায় যাবার নিয়ম নেই। আধ ঘন্টা ঠাণ্ডা মাথায় সময় কাটিয়ে ঘর অন্ধকার করে ঘুমুতে যেতে হয়। মাথা ঠাণ্ডা হবে কি ভাবে? ঘুমের অষুধ খাবার পর পর এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকে যে মাথা গরম হতে শুরু করে। একজন ভাত খাবে না, গাছের শোকে পাথর। স্বামীকে অভুক্ত রেখে ঘুমুতে যাওয়া সংসারের জন্যে অমঙ্গলের।

এই কাজটাই তাকে বাধ্য হয়ে করতে হচ্ছে। চুলা ধরিয়ে খাবার গরম করার কথা বলেছেন। এটা নিয়েও দুঃশ্চিন্তা হচ্ছে—চুলা ধরিয়ে ঠিকমত নিভাবেতো? গ্যাসের চুলার চাবিতে কিছু সমস্যা আছে। চাবি বন্ধ করলেও ঠিকমত বন্ধ হয় না। গ্যাস বের হতে থাকে। একবার খবরের কাগজে পড়েছিলেন—-গ্যাসের চুলা বন্ধ ঠিকমত করা হয়নি বাড়ি ভর্তি হয়ে গেল গ্যাসে। তখন বাড়ির কর্তা সিগারেট ধরাবার জন্যে ম্যাচ জ্বালিয়েছেন ওমি সারা বাড়িতে আগুন লেগে গেল।

এক পরিবারে পাঁচজনের মৃত্যু। বেঁচে রইল শুধু বুড়ো নানী। এই অর্থব প্যারালিসিসের রোগী নড়তে পর্যন্ত পারে না। সে একা টিকে গেল। আল্লাহর বিচার বোঝা খুবই মুশকিল।রাহেলা ঘড়ি দেখলেন, আধ ঘন্টা পার হতে এখনো পাঁচ মিনিট বাকি আছে। তিনি শ্বশুরের ঘরে ঢুকলেন। জেগে থাকলে দু একটা ভাল কথা বলবেন। আজ দুপুরে বুড়োর সঙ্গে খুব চেঁচামেটি করেছেন। বুড়োর তেমন দোষ ছিল না। খুব যারা বুড়ো তাদের কিছু বুঝতেই পারে না।

তাদের সঙ্গে ভাল ব্যবহার করলেও তারা বুঝে না। খারাপ ব্যবহার করলেও বুঝে না।রাহেলা ঘরে ঢোকা মাত্র মেম্বর আলি বললেন, কে বউমা। ভাল আছ? রাহেলা বললেন, জ্বি ভাল।খাওয়া দাওয়া করেছ? জ্বি। আলহামদুলিল্লাহ। আমারে খেতে দিবা না? সন্ধ্যার সময় না আপনারে খাওয়ায়ে গেলাম।নাশতা হিসাবে খেয়েছিলাম এখন আবার ভুখ চাপছে।এই বয়সে খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম করা যাবে না। ডাক্তারের নিষেধ আছে। পেট ছেড়ে দিবে। এই বয়সে পেট ছেড়ে দিলে সর্বনাশ।ঘরে কি আজ পোলাও হয়েছে?

পোলাও হবে কেন? এটা কি রাজবাড়ি যে প্রতিদিন পোলাও হবে।পোলাওয়ের গন্ধ পেয়েছি।জাহানারার বাসা থেকে সামান্য কাচ্চি বিরিয়ানী পাঠিয়েছে। আজ তার মেয়ের আকীকা ছিল।তস্তুরীতে করে একটু বিরিয়ানী দাও। খেয়ে দেখি।বিরিয়ানী আপনাকে দেওয়াই যাবে না। এই বয়সে বিরিয়ানী আপনার জন্যে বিষ। লোভ কমাতে হবে।গন্ধটা নাকে গেলতো…তারপর থেকে।এত গন্ধ নিতে হবে না। আপনি ঘুমান। নাম কি? কিসের নাম কি? জাহানারা মেয়ের নাম কি রেখেছে?

হোসনে আরা খানম।আলহামদুলিল্লাহ্ সুন্দর নাম। জাহানারাকে বলবা আমি তার কন্যার জন্যে খাস দিলে দোয়া করেছি।আচ্ছা বলব। এখন আপনি ঘুমান।পেটে ভুখতো ঘুম আসতেছে না।পানি খাবেন? এক গ্লাস পানি খেয়ে শুয়ে থাকেন।খালি পেটে পানি খাওয়াও ঠিক না। পিত্তনাশ হয়। আচ্ছা মা যাও। তুমি ঘুমাতে যাও।রাহেলা ঘুমুতে গেলেন। এবারের ঘুমের অষুধগুলি ভাল—তার সঙ্গে সঙ্গে ঘুম এসে গেল।

ফরহাদ ফিরল রাত সাড়ে দশটায়। আসমানীকে বাসায় নামাতে গিয়ে দেরী হল। আসমানীর মা তাকে খেয়ে যেতে বললেন। সে সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল। আসমানী বলল, আমার শরীর এখন খুবই ভাল লাগছে। আমি রান্না করব।ফরহাদ বলল, তুমি ভয়ংকর অসুস্থ। রান্নার নামও মুখে আনবে না।আসমানী বলল, একবার যখন বলেছি রান্না করব, তখন রান্না করবই।

 

Read more

চৈত্রের দ্বিতীয় দিবস পর্ব – ৬ হুমায়ূন আহমেদ

Leave a comment

Your email address will not be published.