ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১০)-হুমায়ুন আহমেদ

ভাের সাতটায় আলাউদ্দিন এসে উপস্থিত। 

সে ভাের হতেই বাসায় চলে আসবে রাহেলা তা ভাবেননি। আগের রাতের সব দুঃখ তিনি ভুলে গেলেন।ছায়াসঙ্গী হাসিমুখে বললেন, বউমাকে আনলি 

‘ও ঘুমুচ্ছে। ঘুম ভাঙলে চলে আসবে। নােট লিখে এসেছি।’ ‘আসতে পারবে একা একা ? 

‘আসতে পারবে না মানে ? কী যে তুমি বল মা! ও কি আমাদের দেশের মেয়ে যে স্বামী ছাড়া এক পা ফেলতে পারে না!’ 

তা তাে ঠিকই।’ রাহেলা নাশতার আয়ােজনে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আলাউদ্দিনকে এখন সহজ ও স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। রান্নাঘরে মা’র পাশে বসে অনেক গল্প করতে লাগল। নাসরিন এবং মনসুর সাহেবও গল্পে যােগ দিলেন। 

‘তুই তাে ঐ দেশেই থেকে যাবি ? “হ্যা। এই দেশে আছে কী বলাে ? এই দেশে থাকলে তাে মরতে হবে -খেয়ে। 

‘অনেকেই তাে আছে।’ ‘কীরকম আছে তা তাে দেখতেই পাচ্ছি।’ 

তাও ঠিক। 

নাসরিনও সহজভাবে ভাইয়ের সঙ্গে অনেক গল্প করল। এখন ভাইয়াকে খুব আপন লাগছে। কথা বলতে ভালাে লাগছে। ভাইয়া, কাল ওইজা বাের্ড দিয়ে ভূত এনেছিলাম।’ ‘তা-ই নাকি?’ 

হ্যা। আপনাআপনি বােতাম এক ঘর থেকে অন্য ঘরে যায়। ‘তুই নিশ্চয়ই ঠেলেছিস। ‘অনেস্ট ভাইয়া। মােটেই ঠেলিনি।’ 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১০)-হুমায়ুন আহমেদ

‘তুই না ঠেললেও তাের সাবকনশাস মাইন্ড ঠেলেছে। আমি নিউজ উইক পত্রিকায় দেখেছিলাম। পুরাে ব্যাপারটাই আসলে সাব-কনশাস মাইন্ডের। 

এমন সহজ স্বাভাবিকভাবে যে মানুষটা গল্প করল সেই আবার ঠিক সন্ধ্যাবেলা একটা ঝগড়া বাধিয়ে বসল। সাধারণ ঝগড়া না কুৎসিত ঝগড়া। ব্যাপারটা এরকম 

ক্লারা খাবার পানি চেয়েছে । 

নাসরিন গ্লাসে করে পানি দিয়েছে। এক চুমুকেই সেই পানি খেয়ে ক্লারা বলল- থ্যাংকস। খুব বালাে পানি। ক্লারা এখন কিছু কিছু বাংলা বলার চেষ্টা করে। 

আলাউদ্দিন বলল, ফোটানাে পানি দিয়েছিস তাে ? বয়েলড ওয়াটার ? ‘না ভাইয়া। ট্যাপের পানি। 

‘কেন ? তােদের কি আগে বলিনি সবসময় বয়েলড পানি দিবি ? পানি ফুটিয়ে পরে বােতলে ভরে রাখবি। সামান্য কথাটা মনে থাকে না ? বয়স যত বাড়ছে তাের বুদ্ধি দেখি তত কমছে!’ 

নাসরিনের মুখ কালাে হয়ে গেল । 

মনসুর সাহেব মেয়েকে রক্ষা করার জন্যে বললেন, একবার মাত্র খেয়েছে কিছু হবে না। আমরা তাে সব সময় খাচ্ছি। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১০)-হুমায়ুন আহমেদ

তােমাদের খাওয়া আর ক্লারার খাওয়া এক হলাে ? মাইক্রো অরগেনিজম খেয়ে খেয়ে তােমরা ইমমিউন হয়ে আছ। ও তাে হয়নি।’ 

‘যা হবার হয়ে গেছে। এখন চিৎকার করে আর কী হবে? 

‘চিৎকার করছি নাকি ? তােমাদের সঙ্গে দেখি সামান্য আরগুমেন্টও করা যায় না! 

নাসরিন অনেক চেষ্টা করেও কান্না আটকাতে পারল না। মুখে শাড়ির আঁচল গুঁজে দ্রুত বের হয়ে গেল। রাহেলা মৃদুস্বরে বললেন, দিলি তাে মেয়েটাকে কাঁদিয়ে! যা অভিমানী মেয়ে! রাতে তাে খাবেই না। 

আলাউদ্দিন বিরক্ত গলায় বলল, এত অল্পতেই যদি চোখে পানি এসে যায় তা হলে তাে মুশকিল। একটা ভুল করলে তার ভুল ধরিয়ে দেয়া যাবে ? ও ছেলেমানুষ। 

‘ছেলেমানুষ কী বলছ ? সতেরাে আঠারাে বছরের কেউ ছেলেমানুষ থাকে ? তােমাদের জন্যে বড় হতে পারে না। তােমরা ছেলেমানুষ বানিয়ে রেখে দাও। 

আলাউদ্দিন রাতে খেল না। বউকে নিয়ে নাকি নিরিবিলি কোথাও ডিনার করবে । 

নাসরিন সেই রাতে ঘুমুতে গেল না-খেয়ে। অনেকক্ষণ জেগে রইল, ঘুম এল না। তার খুব কষ্ট হচ্ছে। মরে যেতে ইচ্ছা করছে। অনেক রাতে সে ওইজা বাের্ড নিয়ে বসল। আজ আর দেরি হলাে না। বােতামে হাত রাখামাত্র বােম নড়তে লাগল। আজ সে উত্তরগুলিও শুধু ‘হা’ বা ‘না’ দিয়ে দিচ্ছে না। অক্ষরের উপর ঘুরে ঘুরে ছােট ছােট শব্দ তৈরি করছে ।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(১০)-হুমায়ুন আহমেদ

মজার মজার শব্দ। নাসরিন এই শব্দগুলিকে গুরুত্ব দিচ্ছে না আবার গুরুত্ত্ব দিচ্ছে। একবার ভাবছে- এগুলি অবচেতন মনের ইচ্ছে, আরেকবার ভাবছে— হতেও তাে পারে। হয়তাে সত্যি কেউ এসেছে। পৃথিবীতে রহস্যময় ব্যাপারটা তাে হয়। ক’টা রহস্যের সমাধান আমরা জানি ? কী যেন বলেছেন শেকসপিয়ার— There are many things…….. 

‘আপনি কি এসেছেন ? ‘হ্যা। ‘কাল যিনি এসেছিলেন আজও কি তিনিই এসেছেন ? ‘হ্যা। ‘আপনার নাম ? 

‘X’ 

কী অদ্ভুত নাম! আচ্ছা আপনি কি জানেন আজ আমার মন কালকের চেয়েও খারাপ ? ‘জানি। 

কী করা যায় বলুন তাে ? ‘আমি জানি না। 

‘আপনি কি জানেন আপনার সঙ্গে কথা বলতে আমার খুব ভালাে লাগে। জানি।’ 

ভাইয়া বলছিল এই যে আপনি নানান কথা বলছেন এগুলি আসলে আমার মনের অবচেতন ইচ্ছার প্রতিফলন। 

হতে পারে।’ ভাইয়াকে আমার দারুণ পছন্দ। আমি জানি। ‘ঐ পচা মেয়েটা সব নষ্ট করে দিয়েছে। আমার মনে হয় মেয়েটা ডাইনি । ও আশপাশে থাকলেই ভাইয়া অন্যরকম হয়ে যায়। তখন সবার 

সঙ্গে ঝগড়া করে। ‘জানি।। 

কী করা যায় বলুন তাে।’ ‘মেয়েটাকে মেরে ফ্যালাে। “ছিঃ, কী যে বলেন! মানুষকে মেরে ফেলা যায় নাকি ? 

Leave a comment

Your email address will not be published.