ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ

 মৌলানা সাহেব হাত বাড়িয়ে তাকে কবর থেকে তুললেন। 

এই হচ্ছে মন্তাজ মিয়ার গল্প । ছায়াসঙ্গীআমি আমার এই জীবনে অদ্ভুত গল্প অনেক শুনেছি, এরকম কখনাে শুনিনি। 

ছােট চাচাকে বললাম, মন্তাজ তারপর কিছু বলেনি ? অন্ধকার কবরে জ্ঞান ফিরবার পর কী দেখল না-দেখল এইসব ? 

ছােট চাচা বললেন না। কিছু কয় না । হারামজাদা বিরাট বজ্জাত। ‘জিজ্ঞেস করেননি কিছু? 

কতজনে কত জিজ্ঞেস করছে। এক সাংবাদিকও এসেছিল। ছবি তুলল। কত কথা জিজ্ঞেস করল- একটা শব্দ করে না। হারামজাদা বদের হাড্ডি ।’ 

আমি বললাম, কবর থেকে ফিরে এসেছে– লােকজন তাকে ভয়-টয় পেত না? 

প্রথম প্রথম পাইত। তারপর আর না। আল্লাহতায়ালার কুদরত। আল্লাহতায়ালার কেরামতি আমরা সামান্য মানুষ কী বুঝব কও ? | ‘তা তাে বটেই। আপনারা তার বােন রহিমাকে জিজ্ঞেস করেননি, সে 

কী করে বুঝতে পারল মন্তাজ বেঁচে আছে ?’। | ‘জিজ্ঞেস করার কিছু নাই। এইটাও তােমার আল্লাহর কুদরত । উনার কেরামতি। | ধর্মকর্ম করুক বা না-করুক গ্রামের মানুষদের আল্লাহতায়ালার কুদরত এবং কেরামতির ওপর অসীম ভক্তি | গ্রামের মানুষদের চরিত্রে চমৎকার সব দিক আছে। অতি তুচ্ছ ঘটনা নিয়ে এরা প্রচুর মাতামাতি করে, আবার অনেক বড় বড় ঘটনা হজম করে। দার্শনিকের মতাে গলায় বলে, “আল্লাহ্র কুদরত । 

আমি ছােট চাচাকে বললাম, রহিমাকে একটু খবর দিয়ে আনানাে যায় ? ছােট চাচা বিস্মিত হয়ে বললেন, কেন ? 

কথা বলতাম।’ ‘খবর দেওয়ার দরকার নাই। এমনেই আসব।’ ‘এমনিতেই আসবে কেন?’ 

ছােট চাচা বললেন- তুমি পুলাপান নিয়া আসছ। চাইরদিকে খবর গেছে । এই গেরামের যত মেয়ের বিয়া হইছে সব অখন নাইওর আসব । এইটাই নিয়ম। 

আমি অবাকই হলাম। সত্যি সত্যি এটাই নাকি নিয়ম। গ্রামের কোনাে বিশিষ্ট মানুষ আসা উপলক্ষে গ্রামের সব মেয়ে নাইওর আসবে। বাপের দেশে আসার এটা তাদের একটা সুযােগ। এই সুযােগ তারা নষ্ট করবে না । 

আমি আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, কেউ কী এসেছে ? ‘আসব না মানে ? গেরামের একটা নিয়ম-শৃঙ্খলা আছে না ? 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ

আমি ছােট চাচাকে বললাম, আমাদের আসা উপলক্ষে যেসব মেয়ে নাইওর আসবে তাদের প্রত্যেককে যেন একটা করে দামি শাড়ি উপহার হিসেবে দেয়া হয়, একদিন খুব যত্ন করে দাওয়াত খাওয়ানাে হয়। 

ছােট চাচা এটা পছন্দ করলেন না। তবে তাঁর রাজি না হয়েও কোনাে উপায় ছিল না। আমাদের জমিজমা তিনি দীর্ঘদিন ধরে ভােগদখল করছেন। 

গ্রামের নিয়মমতাে একসময় রহিমাও এল। সঙ্গে চারটি ছােট ছেলেমেয়ে ! হতদরিদ্র অবস্থা। স্বামীর বাড়ি থেকে সে আমার জন্যে দুটা ডালিম নিয়ে এসেছে। 

আমার স্ত্রী তাকে খুব যত্ন করে খাওয়াল। খাওয়ার শেষে তাকে শাড়িটি দেয়া হলাে। মেয়েটি অভিভূত হয়ে গেল। এরকম একটা উপহার বােধহয় তার কল্পনাতেও ছিল না। তার চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তে লাগল। আমি তাকে আমার ঘরে ডেকে নিলাম। কোমল গলায় বললাম, কেমন আছ রহিমা ? 

রহিমা ফিসফিস করে বলল, ভালাে আছি ভাইজান । ‘শাড়ি পছন্দ হয়েছে ? 

‘পছন্দ হইব না! কী কন ভাইজান! অত দামি জিনিস কি আমরা কোনােদিন চউক্ষে দেখছি!” 

‘তােমার ভাইয়ের ব্যাপারটা জানতে চাচ্ছিলাম। তুমি কী করে বুঝলে ভাই বেঁচে আছে ?  

রহিমা অনেকটা চুপ করে থেকে বলল, কী কইরা বুঝলাম আমি নিজেও জানি না ভাইজান। মৃত্যুর খবর শুইন্যা দৌড়াইতে দৌড়াইতে আসছি । বাড়ির উঠানে পাও দিতেই মনে হইল মন্তাজ বাঁইচ্যা আছে। 

কীজন্যে মনে হলাে ? ‘জানি না ভাইজান । মনে হইল।’ 

‘এইরকম কি তােমার আগেও হয়েছে ? মানে কোনাে ঘটনা আগে থেকেই কি তুমি বলতে পার ? 

‘জী না। 

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ

‘মন্তাজ তােমাকে কিছু বলেনি ? জ্ঞান ফিরলে সে কী দেখল বা তার কী মনে হল ? 

‘জী না।’ ‘জিজ্ঞেস করােনি ? 

করছি। হারামজাদা কথা কয় না। রহিমা আরাে খানিকক্ষণ বসে পানটান খেয়ে চলে গেল। 

আমার টানা লেখালেখিতে ছেদ পড়ল । কিছুতেই আর লিখতে পারি না। সবসময় মনে হয় বাচ্চা একটি ছেলে কবরের বিকট অন্ধকারে জেগে উঠে কী ভাবল ? কী সে দেখল ? তখন তার মনের অনুভূতি কেমন ছিল? 

| মন্তাজ মিয়াকে জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছা করে, আমার মনে হয় জিজ্ঞেস করাটা ঠিক হবে না। সবসময় মনে হয় বাচ্চা একটি ছেলেকে ভয়ের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়াটা অন্যায় কাজ। এই ছেলে নিশ্চয়ই প্রাণপণে এটা ভুলতে চেষ্টা করছে। ভুলতে চেষ্টা করছে বলেই কাউকে কিছু বলতে চায় না। তবু একদিন কৌতূহলের হাতে পরাজিত হলাম । 

দুপুরবেলা। 

গল্পের বই নিয়ে বসেছি। পাড়াগাঁর ঝিম-ধরা দুপুর। একটু যেন ঘুম ঘুম আসছে। জানালার বাইরে খুট করে শব্দ হলাে। তাকিয়ে দেখি মন্তাজ। আমি বললাম—কী খবর রে মন্তাজ ? 

‘ভালাে। ‘বােন আছে না চলে গেছে ? ‘গেছেগা। ‘আয় ভেতরে আয়।’ 

মন্তাজ ভেতরে চলে এল। আমার সঙ্গে তার ব্যবহার এখন বেশ স্বাভাবিক। প্রায়ই খানিকটা গল্পগুজব হয়। মনে হয় আমাকে সে খানিকটা পছন্দও করে। এইসব ছেলে ভালােবাসার খুব কাঙাল হয় । অল্পকিছু মিষ্টি কথা, সামান্য একটু আদর এতেই তারা অভিভূত হয়ে যায়। এই ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে বলে আমার ধারণা।

ছায়াসঙ্গী-পর্ব-(২)-হুমায়ুন আহমেদ 

মন্তাজ এসে খাটের এক প্রান্তে বসল । আড়ে আড়ে আমাকে দেখতে লাগল । আমি বললাম, তাের সঙ্গে কয়েকটা কথা বলি, কেমন ? 

‘আইচ্ছা।’ 

ঠিকমতাে জবাব দিবি তাে ? 

‘আচ্ছা মন্তাজ, কবরে তুই জেগে উঠেছিলি, মনে আছে ? ‘আছে।’ ‘যখন জেগে উঠলি তখন ভয় পেয়েছিলি ? 

না।’ না কেন ? 

মন্তাজ চুপ করে রইল। আমার দিক থেকে অন্যদিকে চোখ ফিরিয়ে নিল। আমি বললাম, কী দেখলি— চারদিক অন্ধকার ? 

‘কেমন অন্ধকার ? মন্তাজ এবারও জবাব দিল না। মনে হচ্ছে সে বিরক্ত হচ্ছে । আমি বললাম, কবর তাে খুব অন্ধকার তবু ভয় লাগল না ? 

মন্তাজ নিচুস্বরে বলল, আরেকজন আমার সাথে আছিল সেইজন্যে ভয় লাগে নাই। 

আমি চমকে উঠে বললাম, আরেকজন ছিল মানে ? আরেকজন কে 

ছিল ? 

‘চিনি না। আন্ধাইরে কিছু দেখা যায় না।‘ছেলে না মেয়ে? ‘জানি না।’ ‘সে কী করল ? ‘আমারে আদর করল। আর কইল, কোনাে ভয় নাই। 

কীভাবে আদর করল ? ‘মনে নাই। 

কী কী কথা সে বলল ? মজার মজার কথা—খালি হাসি আসে। 

বলতে বলতে মন্তাজ মিয়া ফিক করে হেসে ফেলল । আমি বললাম, কীরকম মজার কথা ? দুএকটা বল তাে শুনি ? ‘মনে নাই।’ ‘কিছুই মনে নাই ? সে কে এটা কি বলেছে ?’ ‘জী না।’ ‘ভালাে করে ভেবেটেবে বল তাে কোনােকিছু কি মনে পড়ে? ‘উনার গায়ে শ্যাওলার মতাে গন্ধ ছিল। ‘আর কিছু ?’ মন্তাজ মিয়া চুপ করে রইল। আমি বললাম, ভালাে করে ভেবেটেবে বল তাে! কিছুই মনে নেই ? 

মন্তাজ মিয়া অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, একটা কথা মনে আসছে। 

‘সেটা কী ? 

বলতাম না। কথা গােপন । বলবি না কেন?’ মন্তাজ জবাব দিল না। আমি আবার বললাম, বল মন্তাজ, আমার খুব শুনতে ইচ্ছা করছে । মন্তাজ উঠে চলে গেল। 

Leave a comment

Your email address will not be published.