জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ১
“হে মানব সন্তান, সহ শৃঙ্খলে আবদ্ধ হইয়া তুমি মুক্তির স্বাদ পাইবে। ইহাই তোমার নিয়তি।“
(প্রাচীন শিলালিপি। মায়া সভ্যতা)
শ্রাবণ মাসের শেষ।ভ্যাপসা গরম পড়েছে। গত পনেরো দিনে এক ফোঁটা বৃষ্টি হয়নি। সারাদিন ঝাঁঝালো রোদ যায়। সূর্য ডোবার পর গরম আরো বাড়ে। গরমে অতিষ্ঠ হয়ে যখন-তখন সাপ বের হয়ে পড়ে। এ পর্যন্ত দুজনকে সাপে কেটেছে।জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের টিচার্স কমনরুমে সাপ নিয়ে গল্প হচ্ছিল। ইংরেজির মাহবুব স্যার কাল রাতে কিভাবে অল্পের জন্য বেঁচেছেন সেই গল্প করছেন। খুব আগ্রহ নিয়ে করছেন, তবে কেউ মন দিয়ে শুনছে৷ বলে মনে হচ্ছে না।
মাহবুব সাহেব গল্প ভাল বলতে পারেন না। কিছু দূর বলার পরই খেই হারিয়ে ফেলেন, তখন গলা খাকাড়ি দিয়ে বলেন, বুঝলেন কি-না, বুঝলেন কি-না। গল্প আবার নতুন করে শুরু হয়। এইভাবে গল্প শুনে আরাম নেই। তারপরেও সবাই শুনছে, কারণ কিছু করার নেই। হেডস্যার সবাইকে ক্লাসের পরে থাকতে বলেছেন। খুব জরুরী।
জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলের হেডমাষ্টার ফজলুল করিম এম, এ, (ডবল) বিটি (প্রথম শ্রেণী) কে সবাই সমীহ করে চলেন। ভদ্রলোকের বয়স পাঁচপঞ্চাশের মত। রোগা পাতলা মানুষ। হাঁটেন খানিকটা কুজো ভঙ্গিতে। হাঁটার সময় চোখ থাকে তার নিজের পায়ের পাতার উপর। সামনে কে আসছে বা কে পাশ দিয়ে যাচ্ছে তার চেয়েও তার পায়ের পাতা কোথায় পড়ছে তা তাঁর কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হয়। কথা বলেন নরম গলায়। তবে প্রতিটি শব্দ খুব স্পষ্ট করে বলেন। ১৯৬৮ সালে হেডমাস্টার হিসেবে এই স্কুলে এসেছিলেন। এখনো আছেন। তার সবচে বড় গুণ এবং সবচে বড় ত্রুটি হচ্ছে স্কুলের বাইরে তিনি কিছু চিন্তা করতে পারেন না।
মাহবুব সাহেব গলা খাকাড়ি দিয়ে বলছেন, বুঝলেন কি-না গরমষ্টা কেমন পড়েছে কাল রাতে। বুঝলেন কি-না যাকে বলে তালপাকা গরম। রাতে ভাত হতে দেরি হচ্ছে, আমি আমার মেয়েটাকে বললাম, উঠোনে পাটি পেতে দে, বিশ্রাম করি। সে দিল। তারপর বললাম, দে মা, একটা বালিশও দে, শুয়ে থাকি। রান্না হলে ডেকে দিস। সে বেশ একটা বিছানার মত করে দিল। বুঝলেন কি-না আমি একটা তালপাখা নিয়ে শুতে গেছি, হঠাৎ দেখি বালিশের কাছে এক গোছা পাটের কোষ্ঠা। বুঝলেন কি-না আসলে সাপ। চাঁদের আলোয় পাটের কোষ্ঠার মত লাগছে। আমি তো আর সাপ যে সেটা জানি না। আমি শুয়ে পড়েছি, তখন একটা গন্ধ পেলাম। মিষ্টি গন্ধ।
আরবী ও ইসলামিয়াত শিক্ষক মওলানা ইরতাজ উদ্দিন হাই তুলতে তুলতে বললেন, মিষ্টি গন্ধ পেলেন কেন? সাপ কি সেন্ট মেখে এসেছিল।এই কথায় সবার হেসে উঠা উচিত, কিন্তু কেউ হাসল না। দুএকজন অবশ্যি মুখ ফিরিয়ে হাসি চাপার চেষ্টা করল। এই স্কুলে মাহবুব সাহেবকে নিয়ে কেউ হাসাহাসি করে না। মওলানা ছাড়া আর কারো এত সাহস নেই। মাহবুব সাহেব ক্ষমতাবান ব্যক্তি। এবার চেয়ারম্যান ইলেকশনে দাঁড়াবেন এরকম শোনা যাচ্ছে। স্কুলে শুধু না, এই অঞ্চলে থাকতে হলেও তাকে তোয়াজ করে চলতে হয়। মওলানা নতুন এসেছেন তিনি এই ব্যাপারটা হয়। এখনো জানেন না কিংবা জানলেও না জানার ভান করছেন।
মাহবুব সাহেব কল্পনা করেননি তার এমন ভয়াবহ গল্প নিয়ে কেউ রসিকতা করবে। তিনি কিছুক্ষণ অবাক হয়ে মওলানার দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিজেকে সামলালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, মওলানা সাহেব, আপনি বোধহয় জানেন না ভাদ্র-আশ্বিন মাসে সাপের শরীরে গন্ধ। হয়, তখন সাপ খোলস ছাড়ে। অনেকটা বাসি বকুল ফুলের গন্ধের মত গন্ধ।আমি জানতাম না, আমার ধারণা ছিল শীতকালে খোলস ছাড়ে। এই নিয়ে পরে আপনার সঙ্গে বাহাস করা যাবে, আপাতত গল্পটা শেষ করুন। সাপটা কি করল, খোলস ছাড়ার জন্যে আপনার কাছে গেল?
মাহবুব সাহেব মওলানার সাহস দেখে অবাক হলেন। তিনি কিছু বললেন না। ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে রইলেন। তার মুখে থুথু জমে যাচ্ছে। তিনি মনে মনে বললেন, হারামজাদা মওলানা।অংক-স্যার বিনয় বাবু পরিস্থিতি সামলাবার জন্যে বললেন, চা খাওয়া যাক, কি বলেন? হরিপদকে বলি চা-পাতা আর ভেলি গুড় নিয়ে আসুক। ভেলি গুড়ের চা ভাল হয়। কি বলেন আপনারা ডাকি হরিপদকে? কেউ হ্যাঁ বা না কিছু বলল না। হা বললেই খরচ দেয়ার একটা প্রশ্ন চলে আসে। কে খরচ দেবে? মাহবুব সাহেব পাঞ্জাবির পকেট থেকে একটা কুড়ি টাকার নোট বের করে টেবিলে রাখতে রাখতে বললেন, আনতে বলুন, চা আর একটা করে সিঙ্গাড়া। আমরা মানুষ কজন? বিনয় বাবু উৎসাহের সঙ্গে বললেন, হেডস্যারকে নিয়ে বার বারটা সিঙ্গাড়া আনিতে বলি, কি বলেন?
মাহবুব সাহেব বললেন, আমাকে বাদ দিয়ে হিসাব করুন। আমি সিঙ্গাড়া-ফিঙ্গাড়া খাই না।তিনি ভেবেছিলেন, সবাই একসঙ্গে বলে উঠবে, আপনি খাবেন না মানে? আপনাকে বাদ দিয়ে আমরা খাব না-কি? তিনি বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলেন, কেউ কিছুই বলল না। গল্প অনেকটুকু বলা হয়েছে, বাকিটুকু শোনার প্রতিও কারো আগ্রহ নেই। মাহবুব সাহেবের ভুরু কুঞ্চিত। আশ্চর্য! একটা গল্পের শেষটুকু বলা যাবে না। আসল মজাইতো গল্পের শেষে মওলানা সাহেব বললেন, চা আসুক, এরমধ্যে আসরের নামাজটা পড়ে ফেলি। সময়মত নামাজ পড়ার বদঅভ্যাস কি আর কারো আছে? থাকলে আসুন। জামাত ছাড়া নামাজ পড়ে আরাম পাওয়া যায় না।
মাহবুব সাহেব নিয়মিত নামাজ পড়েন। আসরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যাচ্ছে এটা তিনি লক্ষ্য করছেন কিন্তু এই ব্যাটার পেছনে নামাজ পড়ার অর্থ হয় না। যার উপর রাগ থাকে তার পেছনে নামাজ পড়া যায় না। নামাজ কবুল হয় না।চারজন শিক্ষক উঠে দাড়ালেন। মাহবুব সাহেবের ক্ষীণ সন্দেহ হলতারা বোধহয় গল্পের হাত থেকে বাচার জন্যেই উঠে গেছে। নামাজটা উপলক্ষ্য। আসর ভেঙে গেল। ভাঙা আসরে গল্প বলার কোন মানে হয় না। কিন্তু মান রক্ষার জন্যে হলেও শেষ করা দরকার। মাহবুব সাহেব বিনয় বাবুর দিকে তাকিয়ে বললেন, চরম বিপদ গিয়েছিল, বুঝলেন, আরেকটু হলে মরেই যেতাম। সাপ ফণা তুলে ফেলেছিল।
বিনয় বাবু অনাগ্রহের সঙ্গে বললেন, ও আচ্ছা।আমি নিজে কিছুই দেখিনি। আমার মেয়ে প্রথম দেখল, বুঝলেন কি-না সে এক বাটি মুড়ি নিয়ে আসছে। হঠাৎ এক চিৎকার–এইটা কি? এইটা কি? আমি তাকিয়ে দেখি সাপ ফণা তুলে আছে। হাতের খাবার সাইজের এক ফণা।গল্পে আবার বাধা পড়ল। হরিপদ চা-সিঙ্গাড়া নিয়ে এসেছে। বিনয় বাবু ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন ভাগাভাগিতে। গরম গরম সিঙ্গাড়া, ধোঁয়া উড়ছে। এর স্বাদই অন্য রকম। মাহবুব সাহেবের মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। একবার খাবেন না বলার পর আর খাওয়া যায় না। বিনয় বাবুকে দেখা যাচ্ছে পিরিচে তিনটা সিঙ্গাড়া আলাদা করছেন। মাহবুব সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, করছেন কি?
বিনয় বাবু বললেন, হেডস্যারকে দিয়ে আসি।দিয়ে আসতে হবে না, এখানে এসে খাবেন। আর তিনটা সিঙ্গাড়া দিলেন কোন আন্দাজে? সবাইকে দুটা দিচ্ছেন। তাকেও দুটা দিন। যান খবর দিন। এতগুলি মানুষকে খামাখা কেন বসিয়ে রেখেছেন কে জানে। জরুরী মিটিং, আমি তো জরুরী কিছু দেখি না।আপনাকে দেই। গরম সিঙ্গাড়া খেতে ভাল লাগবে। এরা জিনিসটা ভাল বানায়।বললাম তো বাজারের খাবার খাই না।হেডমাস্টার সাহেবকে আসতে দেখা যাচ্ছে। মাটির দিকে তাকিয়ে হন হন করে হাঁটা। মাহবুব সাহেব চারদিনের পুরনো খবরের কাগজ নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। হেডমাস্টার সাহেবের সাথে তাঁর ঠাণ্ডা লড়াই চলছে। এই মানুষটার মুখের দিকে তাকাতে ইচ্ছে করছে না।মাহবুব সাহেব, খবর কি?
ভাল।নাস্তা-পানির ব্যবস্থা হয়েছে দেখছি, সিঙ্গাড়া কি পরিমলের দোকানের? বিনয় বাবু হাসিমুখে বললেন, জ্বি স্যার। তিনি হেডমাস্টার সাহেবের দিকে পিরিচ এগিয়ে দিলেন।এই সিঙ্গাড়া একটা দুটো খেলে হয় না। গোটা দশেক করে খেতে হয়। বিনয় বাবু, হরিপদকে পাঠান তো, আরো কিছু আনুক।তিনি পকেট থেকে কুড়ি টাকার নোট বের করলেন।নামাজীরা নামাজ শেষ করে ফিরেছে। বিনয় বাবু খুশি-খুশি গলায় বললেন, হেডস্যার আরো কুড়ি টাকার সিঙ্গাড়া আনতে দিলেন। পারহেড খ্রী পিস।ফজলুল করিম সাহেব চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বললেন, আপনাদের সবার জন্যে একটা সুসংবাদ আছে। এই জন্যেই আপনাদের এতক্ষণ আটকে রাখলাম। সুসংবাদটা কি আন্দাজ করুন দেখি?
মাহবুব সাহেব বিরস মুখে বললেন, আন্দাজ-ফান্দাজ আবার কি, কি বলতে চান বলুন। আমাদের সবারইতো কাজকর্ম আছে।সরকার থেকে একটা স্যাংশান পাওয়া গেছে। সাত লাখ টাকা। কনস্ট্রাকশনের জন্য স্যাংশন। আজকেই চিঠি পেলাম। এইবার ইনশাল্লাহ পাকা বিল্ডিং হবে। হোস্টেল হবে। ঘটনাটা কিভাবে ঘটল তার শানে-নজুলটা আপনাদের বলি। শুনলে ভাল লাগবে সে এক ইতিহাস……।
মাহবুব সাহেব অত্যন্ত বিরক্তির সঙ্গে লক্ষ্য করলেন–সাপের গল্প কেউ আগ্রহ নিয়ে শুনছিল না, কিন্তু সাত লাখ টাকার গল্প চোখ বড় বড় করে কনছে।ঢাকা গিয়েছিলাম এক বৎসর আগের কথা বলছি। শ্রাবণ মাসের শেষ। বায়তুল মোকাররমের সামনে দিয়ে হাঁটছি হঠাৎ শুরু হল বৃষ্টি–দৌড় দিয়ে একটা দোকানে ঢুকলাম। দোকানে এক লোেক কি যেন কিনছে। লোকটাকে চেনা চেনা লাগছে–আবার চেনাও যাচ্ছে না। আমি তাকাতেই সে বলল, আরে স্যার, আপনি। বলেই পা ছুঁয়ে সালাম। তার সঙ্গে ফুটফুটে দুটো মেয়ে। সে মেয়ে দুটোকে বলল, সালাম কর, সালাম কর। আমার শিক্ষক।
মেয়ে দুটো ইতস্তুত করছে। একালের শহুরে মেয়ে, এরা হুট করে পা ছুঁয়ে সালাম করে না। সে দিল ধমক, মারা দাঁড়িয়ে আছ কেন? সালাম কর, সালাম কর। আমার শিক্ষক।মাহবুব সাহেব বিরক্ত মুখে বললেন, গল্প সংক্ষেপ করুন। আপনি দেখি সাত খন্ড রামায়ন শুরু করেছেন।হেডমাস্টার সাহেব অপ্রতিভ হলেন না। তিনি হাসিমুখে বললেন, খুবই ইন্টারেস্টিং ব্যাপার। পুরোটা শুনতে হবে।
–আমাকে ছাড়ল না। জোর করে গাড়িতে নিয়ে তুলল। বাসায় নিয়ে গেল। সে শিক্ষা দপ্তরের বিরাট অফিসার। জয়েন্ট সেক্রেটারী। যেদিন আমার সঙ্গে দেখা হয়েছে সেদিনই প্রমোশন পেয়েছে। প্রমোশন উপলক্ষে ঘরোয়া খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন–আমি তার মধ্যে বাইরের লোক। অনেক কথা হলো তার সাথে, স্কুলের কথা বললাম, স্কুলের ভগ্নদশার কথা বললাম। মনজুর বলল, স্যার দেখি কি করতে পারি। আমি তার কথায় তেমন গুরুত্ব দেইনি। সরকারী অফিসাররা দেখি শব্দটা প্রচুর বলে কিন্তু কিছু দেখে না। না দেখাটাই তাদের দস্তুর। মনজুর দেখেছে। আশ্চর্য ব্যতিক্রম।বিনয় বাবু বললেন, সেক্রেটারী সাহেবের নাম মনজুর?
সেক্রেটারী না, জয়েন্ট সেক্রেটারী। মনজুর আহমেদ।মওলানা বললেন, পাকা বিল্ডিং হচ্ছে এ তো অতি আনন্দের সংবাদ।ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আনন্দ মানে? মহানন্দ। দুপুরের ডাকে চিঠি পেয়েছি। পর পর তিনবার পড়লাম। তারপর দেখি, আমার চোখ দিয়ে আপনা আপনি পানি পড়ছে।মাহবুব সাহেব বললেন, সরকারী টাকা হাতে না আসা পর্যন্ত বিশ্বাস নাই। আগে হাতে আসুক। পঞ্চাশ বস্তা গম সংস্থান হয়েছিল তিন বছর আগে, সেই গম কোথায়?
মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়ালেন।ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আরে বসুন না। খানিকক্ষণ গল্পগুজব করি–এরকম একটা সুসংবাদ পাওয়া গেল। রোজদিন তো এরকম ঘটে না।কাজ আছে।আরেকটা কথা তো আপনাদের বলা হয় নাই-আমাদের নতুন সায়েন্স স্যার চলে আসছেন। চিঠি পেয়েছি। এখানেও ভাগ্যের ব্যাপার আছে চেয়েছিলাম বিএসসি। পেয়ে গেছি এমএসসি। তাও যতি এমএসসি না। ফার্স্টক্লাশ পাওয়া এমএসসি। ভাল ভাল ছেলেপুলে না এলে স্কুলের উন্নতি হবে না।মাহবুব সাহেব বললেন, এরা স্কুলে থাকবে না। চাকরি-বাকরি না পেয়ে স্কুলে ঢুকছে। নাই কাজ তো খই ভাজ-এর মত অবস্থা। যেই একটা কিছু পাবে স্কুলে পেচ্ছাব করে চলে যাবে।
ফজলুল করিম সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন, অশালীন শব্দ ব্যবহার করে কথা বলবেন না। আমরা শিক্ষক মানুষ। কথাবার্তায় আমাদের খুব সাবধান হওয়া দরকার। খুবই সাবধান। শিক্ষকদের প্রতিটি শব্দ চিন্তা-ভাবনা করে বলতে হবে।বিনয় বাবু বললেন, বৃষ্টি নামবে বলে মনে হয়। উঠে পড়া যাক, স্যার যদি অনুমতি দেন।অবশ্যই, অবশ্যই। যান, বাড়ি যান।স্কুল ফাঁকা হয়ে গেল। শুধু মওলানা থেকে গেলেন। মাগরেবের ওয়াক্ত হয়ে গেছে। তিনি মাগরেবের নামাজ শেষ করে তারপর যাবেন। তার অজু আছে।
নতুন করে অজু করার প্রয়োজন নেই তবু বারান্দায় অজু করতে গেলেন। হেডমাস্টার সাহেব পাশে এসে দাঁড়িয়েছেন। মুখ হাসি হাসি। একজন আনন্দিত মানুষের মুখের দিকে তাকালেও আনন্দ হয়। মানুষটা আনন্দে ঝলমল করছে। আনন্দ শিশুদের ধর্ম। এই মানুষটার ভেতর শিশুভাব আছে। পর্যাপ্ত পরিমাণেই আছে। মওলানার একমাত্র আফসোস–মানুষটা নামাজের ধার ধারেন না। তিনি অজু করতে করতে একবার ভাবলেন হেডমাস্টার সাহেবকে সুযোগমত একবার নামাজের কথা বলে দেখবেন।মওলানা সাহেব।জ্বি স্যার।শিক্ষক হবার সবচে বড় লাভ কি জানেন?
কি লাভ? হঠাৎ হঠাৎ ছাত্র পাওয়া যায়। কৃতী ছাত্র। এদের দেখলেও আনন্দ হয়। কৃতী ছাত্র দেখলে এত ভাল লাগে। একটা কথা আছে–জীবনের প্রতি ক্ষেত্রে জয় আশা করিবে শুধু ছাত্রের এবং পুত্রের নিকট পরাজয়কেই আনন্দের সঙ্গে গ্রহণ করিবে। মনজুরের কথাই ধরুন। জয়েন্ট সেক্রেটারী। সহজ ব্যাপার না।তা তো স্যার ঠিকই।আমি চিনতেই পারিনি। বয়স হয়ে গেছে। স্মৃতিশক্তি হয়েছে দুর্বল। মনজুর তার স্ত্রীকে নানান গল্প করছে, আমি শুধু শুনে যাচ্ছি। তার মেট্রিকের রেজাল্ট যখন হল, নাইনথ স্ট্যান্ড করেছে, তখন খবর পেয়ে আমি নাকি তাকে কোলে নিয়ে স্কুলের মাঠে একটা চক্কর দিয়েছি। আমার তো কিছুই মনে নেই…..
আপনার মনে থাকবে কেন? আপনি তো কত ছেলেকেই কোলে নিয়ে চক্কর দিয়েছেন। যাদের মনে রাখার তারা ঠিকই মনে রেখেছে।শিক্ষকতা করে এই জীবনে বড়ই তৃপ্তি পেয়েছি। শেষ জীবনে স্কুলটাকে ঠিকঠাক করে যেতে পারলে মনে শান্তি পেতাম। এতদিনের পুরানো একটা স্কুল।মওলানা সাহেবের নামাজের সময় যাচ্ছে। কিন্তু হেডস্যার এত আগ্রহ করে কথা বলছেন, তাকে ফেলে চলে যেতেও মায়া লাগছে।নামাজের ওয়াক্ত হয়ে গেছে স্যার।ও আচ্ছা, আচ্ছা। যান, নামাজ পড়ন। নামাজ পড়ন। স্কুলের জন্যেও দোয়া করবেন।অবশ্যই করব, স্যার।
বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। হেডমাস্টার সাহেব প্রাইমারী সেকশানের দিকে যাচ্ছেন। বছরের প্রথম কালবোশেখির ঝড়ে প্রাইমারী সেকশানের খুব ক্ষতি হল। দুটা টিনের চালা উড়ে গেছে। খুঁজে এনে কোনমতে লাগানো হয়েছে। ফাঁক-ফোকর আছে। বৃষ্টি নামলেই ক্লাশের ভেতর পানি পড়ে। পাকা দালান হলে আর দেখতে হবে না। পাকা দালানে ছাত্ররা ক্লাশ করবে। স্কুলের বিশাল কম্পাউণ্ডের ভেতরে থাকবে ফুলের বাগান। এসেমব্লীতে ছাত্রছাত্রীরা লাইন ধরে দাড়াবে, জাতীয় সংগীত গাইবে–আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালবাসি। আহ, কি সুন্দর জাতীয় সংগীত! এত সুন্দর জাতীয় সংগীত কি আর কোন জাতির আছে?
স্কুল লাইব্রেরীটা ঠিকমত করতে হবে। কাচের আলমীরার ভেতর থরে থরে বই সাজানো থাকবে, দেয়ালে থাকবে মহাপুরুষদের ছবি। মহাপুরুষদের ছবির দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলেও মন পবিত্র হয়। মহাপুরুষদের ছবি জোগাড়ের চেষ্টা চালাতে হবে। রবীন্দ্রনাথ, টলস্টয়, আইনস্টাইন, মহাত্মা গান্ধী, শেখ মুজিব……
হেডমাস্টার সাহেব অফিস ঘরে ফিরে গেলেন। তিনি সন্ধ্যার পরেও খানিকক্ষণ অফিসে থাকেন। হরিপদ হারিকেন জ্বালিয়ে দিয়ে গেছে। হারিকেনের কাচের একটা কণা ভাঙ্গা। ধুঁয়া বেরুচ্ছে। সব কিছুরই ভগ্নদশী, তবে এই ভগ্নদশা থাকবে না। হেডমাস্টার সাহেব ঠিক করলেন, মনজুরকে চিঠি লিখে ধন্যবাদ জানাবেন। চিঠিটা আজই লিখে ফেলা দরকার। এইসব ব্যাপারে দেরি করতে নেই। তিনি গোটা গোটা হরফে ইংরেজিতে একটা চিঠি লিখলেন। তিনি ইংরেজির শিক্ষক। ইংরেজিতেই ভাল লিখতে পারেন। বাংলা তেমন আসে না। তাঁর চিঠির বাংলা তর্জমা অনেকটা এরকম–
আমার পুত্রপ্রতিম ছাত্র মনজুর আহমেদ
জয়েন্ট সেক্রেটারী। শিক্ষা দপ্তর।
Read more
