জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল পর্ব – ২
তোমার অসীম বদান্যতায় আমি মুগ্ধ, ও অভিভূত। আমার জীবনে আজ একটি বিশেষ দিন–সরকারি অনুদানের চিঠি আজ আমার হস্তগত হয়েছে। পর পর তিনবার এই চিঠি পাঠ করার পর আজ আমি অশ্রুবর্ষণ করিয়াছি। এই অশ্রু সুখের ও আনন্দের মিলিত ফসল। আজ আমার মনে হইতেছে আমার দীর্ঘ দিনের শিক্ষাদান বিফল হয় নাই….। আমি তোমার মত দরদী ছাত্র তৈরি করিতে পারিয়াছি…।মওলানা ইরতাজউদ্দিন হেডমাস্টার সাহেবের ঘরে উঁকি দিয়ে বললেন, স্যার এখনো যাননি? একটা চিঠি লিখতে বসেছি। চিঠি শেষ করে উঠব। আপনার নামাজ হয়ে গেল? জি স্যার।বসুন তাহলে, চিঠিটা শেষ করি। চিঠির মুসাবিদাটা শুনে যান।
মওলানা বসলেন। হেডমাস্টার সাহেবের আনন্দময় মুখ দেখতে দেখতে তাঁর মন খুব খারাপ হয়ে গেল, কারণ তিনি জানেন জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুলের শেষ ঘণ্টা বেজে গেছে। এই স্কুলের আয়ু আর অল্প কিছুদিন। স্থানীয় এলাকার মন্ত্রী রমিজ সাহেব এখন স্কুল দিচ্ছেন। পাকা দালান হবে। রাজমিস্ত্রীরা মাপজোখ করে কাজ শুরু করে দিয়েছে। নতুন স্কুলের পাশে জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল টিকতে পারবে না। সাত লক্ষ টাকার অনুদান কাজে আসবে না। এই অনুদানের চেক স্কুলে এসে পৌছুবে না। আর পৌছুলেও ফেরত যাবে।
চিঠি শেষ হয়েছে। কপি করতে হবে। অফিস কপি রাখতে হবে। কার্বন পেপার নেই। কপির কাজ হাতে করা ছাড়া গতি নেই। বানান ভুল কি আছে? ভাল করে আরেকবার দেখতে হবে। চিঠি ছাত্রের কাছে যাচ্ছে–সে চিঠিতে বানান ভুল থাকলে হবে না। ছাত্ররা সব সহ্য করতে পারে, শিক্ষকদের বানান ভুল সহ্য করতে পারে না।মওলানা সাহেব।জ্বি স্যার।আমার আরো খানিকটা দেরী হবে। আপনি না হয় চলে যান।আমার তাড়া কিছু নেই–বসি।আচ্ছা বসুন। একা একা কাজ করতেও ভাল লাগে না। আকাশের অবস্থা কি? বৃষ্টি হবে?
টিপ টিপ করে তো পড়ছে।এই বছর ভাল বৃষ্টি হল, অতি বৃষ্টি। তবে অতি বৃষ্টি হওয়া ভালআপাতত ক্ষতি হলেও পরবর্তি সময়ে ফল হয় শুভ। মঙ্গল সব সময় অমঙ্গলের পেছনে থাকে।ফজলুল করিম সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। গল্প করতে করতে চিঠি কপি করতে যাওয়ার এই সমস্যা। বানান ভুল হয়েছে। হাতের লেখাও ভাল হয়নি, লাইন বাঁকা হয়ে গেছে। তিনি কাগজ ছিঁড়ে ফেলে নতুন করে লিখতে বসলেন।মওলানা পাঞ্জাবীর পকেট থেকে ছবির ছড়া বের করেছেন। চুপচাপ বসে না থেকে সময়টা কাজে লাগানো যাক। বৃষ্টি পড়ছে। বড় বড় ফোঁটা পড়ছে। টিনের চালে বৃষ্টির ফোঁটায় কি সুন্দর ঝম ঝম শব্দ হচ্ছে। মওলানা বললেন, স্যার, আপনি কাজ করুন আমি বারান্দায় বসি।
আচ্ছা, আচ্ছা। বৃষ্টি মনে হয় জোরেসোরে পড়ছে।জ্বি স্যার।পাকা দালানটা হয়ে যাক–তাহলে ঝড় বৃষ্টিতে কিছুই হবে না। অল্প কিছু দিনের ব্যাপার।জ্বি স্যার। আপনি কাজ শেষ করুন।ফজলুল করিম সাহেব চিঠি শেষ করলেন। বৃষ্টি আরো বেড়েছে। বৃষ্টির ছাঁট আর ভেজা বাতাস ঘরে ঢুকছে। হারিকেনের শিখা দপ দপ করছে। নিভে যাবে কিনা কে জানে। ড্রয়ারে মোম আছে। ফজলুল করিম সাহেবের আরো কয়েকটা চিঠি লেখার ইচ্ছে আছে। তাঁর দুই মেয়েকে তিনি অনেক দিন চিঠি লেখেন না। ছোট মেয়ে থাকে সিরাজগঞ্জ, ডাক্তার। তার ভাল প্রাকটিস। সেও চিঠি লিখতে পারে না। এই মেয়ের তিনি বিয়ে দিতে পারেননি। মেয়েই রাজি হল না। বিয়ের কথা বার্তা হলেই শুকনো গলায় বলে,–
আমার বিয়ের ব্যবস্থা আমি নিজে করব বাবা। আমার বিয়ে নিয়ে তুমি কিছু ভাববে না।মেয়েদের উচ্চ শিক্ষা দেবার এই এক সমস্যা। উচ্চ শিক্ষা স্বাধীন মতামত দেয়ার ক্ষমতা তৈরি করে দেয়। তার ফল সব সময় শুভ হয় না। তাঁর মেয়ের বেলায় হয়নি। মেয়ে বিয়ে করেনি। করবে বলেও মনে হচ্ছে না।তাঁর বড় মেয়েকে তিনি যথাসময়ে বিয়ে দিয়েছিলেন। ইন্টারমিডিয়েট পাশ করার পর পরই বিয়ে। এর ফলও শুভ হয়নি। মেয়ের আর পড়াশোনা হয়নি। অথচ তার বড় মেয়েটাই ছিল পড়াশোনায় সবচেয়ে ভাল। মুক্তার মত হাতের লেখা। তিনি তার দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে এত সুন্দর হাতের লেখা কোন ছাত্রের দেখেননি।
বড় মেয়ে এখন নিউ জার্সিতে থাকে। ঘর সংসার দেখে। তার স্বামী কাজ করে সেখানকার এক ব্যাংকে, ফাস্ট ন্যাশনাল ব্যাংক। স্ত্রী হাউস ওয়াইফ।বৃষ্টির রাত হচ্ছে চিঠি লেখার জন্যে সবচে ভাল রাত। মেয়ে দুটিকে দুটা চিঠি লিখে ফেললে হয়। এত সকাল সকাল ঘরে গিয়ে করারও কিছু নেই। ফজলুল করিম সাহেব বাঁ পাশের তালাবন্ধ ড্রয়ার খুললেন। ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের জন্যে কাগজ, কলম, খাম ডাকটিকিট এই ড্রয়ারে থাকে। ব্যক্তিগত কাজে তো আর স্কুলের জিনিস ব্যবহার করা যায় না। শুধু স্কুলের জিনিস না, স্কুলের সময়ও ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা যায় না।…… ফজলুল করিম সাহেব ড্রয়ার খুলে কাগজ কলম খাম বের করলেন। সাত লক্ষ টাকা অনুদানের ব্যাপারটা মেয়েদের জানানো উচিত। ওরা খুশি হবে……।
তিনি চিঠি লিখছেন। তার জন্যে একজন বারান্দায় অপেক্ষা করছে এটা তার আর মনে নেই। দুই মেয়েকেই তিনি দীর্ঘ চিঠি লিখলেন। দুটি চিঠিই ইংরেজিতে।লিখতে সময় লাগল কারণ পছন্দের কোটেশন পাচ্ছিলেন না। তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস মেয়েদের চিঠিতে মহাপুরুষদের বাণীর উদ্ধৃতি দেয়া। ছাত্র জীবনে একটি বই কিনেছিলেন Great Sayings.-বইটি এখনো আছে। চিঠি লেখার সময় খুব কাজে আসে। তেমন পছন্দের কোন কোটেশন খুঁজে পেলেন না। সেক্সপিয়ারের একটা পেলেন সেটা তেমন পছন্দ হল না। তবুও চিঠির শেষে পুনশ্চ দিয়ে লিখে দিলেন–
One Fire burns out anothers burning;
One pain is lessend by anothers anguish.
–Shakespeare (Remed and Juliet)
চিঠি শেষ করতে করতে এশার আজান হয়ে গেল। তিনি বারান্দায় এসে দেখেন–বারান্দায় জায়নামাজ পেতে মওলানা নামাজে দাঁড়িয়েছেন। অন্ধকার বারান্দায়, বাইরে ঝমঝম বৃষ্টি। এর মধ্যে সাদা পাঞ্জাবী পড়া লম্বা একজন নামাজ পড়ছে–দেখতে ভাল লাগে। নামাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত ফজলুল করিম বারান্দায় দাঁড়িয়ে রইলেন।একটাই ছাতা।
মওলানাকে বাজারে পৌঁছে দিয়ে সেই ছাতা দিয়ে হেডমাস্টার সাহেব তার ঘরে ফিরবেন। মওলানা খাকেন মজিদ মিয়ার কাপড়ের দোকান রূপসা ক্লথ হাউসে। এই অঞ্চলের সবচে বড় কাপড়ের দোকান। দোকানের পেছনে বিস্তর জায়গা। কয়েকটা খুপড়ি খুপড়ি ঘর। জায়গীর রাখার মত একটা খুপড়ি মওলানার। মজিদ মিয়া খুব আগ্রহ করে মওলানাকে রেখেছেন। তার বিনিময়ে মজিদ মিয়াকে কোরআন শরীফ পড়া শেখানোর কথা। বছর দুই হয়ে গেল এখনো কোরআন পাঠ শুরু হয়নি। মওলানা মনে করিয়ে দিলেই মজিদ মিয়া বলেন–ভাল দিন দেখে শুরু করতে হয়–দেখি রমজান মাসটা আসুক। রমজানে শুরু করব, রমজানেই কোরআন মজিদ শেষ করব, ইনশাল্লাহ। এই রমজানও পার হয়ে গেল, এখন সামনের রমজানের অপেক্ষা।
হেডমাস্টার সাহেবকে দেখে মজিদ মিয়া আনন্দিত গলায় বললেনস্যার, আসেন আসেন। ভাল দিনে এসেছেন। আজ আপনাকে ছাড়ব না। খানা খেয়ে যাবেন। বিরিয়ানী পাকাতে বলেছি।বিরিয়ানী তো খাই না মজিদ সাহেব। পেটের অবস্থা ভাল না। তৈলাক্ত খাবার সহ্য হয় না।একদিন খেলে কিছু হবে না। বসুন বসুন…… জি–না। আজ না আরেকদিন।আর আরেক দিন। আপনাকে এখন পর্যন্ত চারটা ভালভাত খাওয়াতে পারলাম না–এই এক আফসোস-? খাব, একদিন এসে খেয়ে যাব।তাহলে বেলের শরবত খেয়ে যান, বেলের শরবত করতে বলছি।এই সময় বেল পেলেন কোথায়?
আছে, ব্যবস্থা আছে। আপনাকে খাওয়ায়ে দিচ্ছি। মনে থাকবে–কই রে বেলের শরবত আন। আমার শ্বশুর বাড়ি সান্দিকোনা থেকে আনী। বরমেসে বেল।অসময়ে বেলের শরবত খাওয়ার কোন ইচ্ছা ফজলুল করিম সাহেবের ছিল না। বাধ্য হয়ে বসলেন। এতে কিছুটা লাভ হল, তিনি তাঁর কাজের মেয়েটার জন্য একটা শাড়ি কিনলেন। মেয়েটাকে একটা শাড়ি দেয়া দরকার–মনে থাকে না। আজ চোখের সামনে শাড়ি বেচা-কেনা হচ্ছে দেখে মনে পড়ল।মজিদ মিয়া মাথা ঝাঁকিয়ে বলল, তারপর স্যার, বলেন স্কুলের খবরটা কি? জ্বি খবর ভাল। সরকারি একটা অনুদান পেয়েছি। সাত লক্ষ টাকা… তাই নাকি?
ফজলুল করিম সাহেব বেলের শরবত খেতে খেতে সরকারি অনুদানের ইতিহাসটা পুরোটা বর্ণনা করলেন। গল্প শুরু হলো ছাত্রের সঙ্গে দেখা হওয়া থেকে। মজিদ মিয়া এই গল্পে তেমন আগ্রহ বোধ করছিল না। তবু সে বেশ মন দিয়েই শুনল।গল্পের শেষে হেডমাস্টার সাহেব তৃপ্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, স্কুলটা এবার দাঁড়িয়ে গেল।তাইতো দেখতাছি।পাকা দালান হবে। হোয়াইট ওয়াশ করে দেব। দূর থেকে চোখে পড়বে….মওলানা বললেন, ইনশাআল্লাহ্ বলেন স্যার। প্রতিটি সৃৎ নিয়তের শেষে ইনশাআল্লাহ্ বলতে হয়। নবী-এ-করিম একবার ইনশাআল্লাহ্ না বলায় আল্লাহ পাক নারাজ হয়েছিলেন–কোরআন শরীফে এই বিষয়ে আয়াত নাজেল হয়েছে।
ফজলুল করিম পর পর দুবার বললেন,–ইনশাআল্লাহ্, ইনশাআল্লাহ।বৃষ্টি আরো বেড়েছে। হেডমাস্টার সাহেবকে পৌঁছে দেবার জন্যে মজিদ মিয়ার নিজস্ব রিকশা চলে এসেছে। রাস্তা ঘোর অন্ধকার। মওলানা সাহেব তার টর্চ লাইট দিয়ে দিয়েছেন। ব্যাটারী ডাউন হয়ে আছে। টর্চ জ্বালালে চারদিকের অন্ধকার আরো গাঢ় মনে হয়। তাঁকে কাঠেরপুল পার হয়ে মগরা নদীর ঐ পারে যেতে হবে।রিকশা নিয়ে এই অন্ধকারে কাঠের পুলে ওঠা দুরুহ ব্যাপার, পিছল কাঁচা রাস্তা থেকে খাড়াখাড়ি টেনে অনেকদূর উঠতে হয়। পুলের উপর দিয়ে যখন রিকশা যায় মচমচ শব্দ হয়। মনে হয় এই বুঝি কাঠের কোন একটা টুকরা ভেঙে পড়ে গেল।দেশের কত পরিবর্তন হল–নীলগঞ্জে কিছু হচ্ছে না। নীলগঞ্জ থেমে আছে।
কাঠেরপুলের কাছাকাছি এসে ফজলুল করিম সাহেব বললেন,বাবা আমি রিকশা থেকে নেমে যাই–তুই টেনে তোল।স্যার, আফনে টাইট হইয়া বইয়া থাকেন, আল্লাহ মালিক।রিকশাওয়ালা ঝড়ের গতিতে রিকশা টেনে পুলের উপর তুলে হাঁপাতে লাগল। ফজলুল করিম সাহেব ঠিক করে ফেললেন এইবার শহরে বাসা নেবেন। আর পুল পাড়ি দেয়া না। যদিও তিনি জানেন শেষ পর্যন্ত কোনটাই করা হবে না। শহরের বাইরে মগরা নদীর পশ্চিম পাড়ের এই বাসাবাড়ি ছেড়ে দেয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব না। গাছ গাছালিতে ছাওয়া ছোট্ট ছিমছাম বাড়ি, যার কাছাকাছি এলেই মন ভাল হয়ে যায়। টমাস হার্ডির উপন্যাসটার কথা। মনে পড়ে–Far from the mading crowd.
রিকশাওয়ালা এখনো ধাতস্থ হয়নি–লম্বা লম্বা নিঃশ্বাস নিচ্ছে। ফজলুল করিম সাহেবের খুব মায়া লাগছে। তিনি রিকশা থেকে নেমে কাঠের পুলের রেলিং ধরে দাঁড়ালেন। মাথায় ছাতা ধরা নেই–পা ভিজে যাচ্ছে, ভিজতে ভাল লাগছে। রিকশাওয়ালা বলল, এই বচ্ছর বিষ্টি বাদলা হয় নাই, কিন্তু পানির কি টান দেখছেন স্যার? পুল কাঁপতাছে।পাহাড়ি পানি। পাহাড় থেকে নামে–বৃষ্টির সঙ্গে এর সম্পর্ক নাই।টান যেবায় বাড়ছে পুল ভাঙ্গল বইল্যা।ফজলুল করিম কিছু বললেন না। পানির টান অনুভব করার চেষ্টা করলেন। কাঠের এই পুলটিও জীবনকৃষ্ণ বাবু বানিয়েছেন। পুল ভেঙে গেলে জীবনকৃষ্ণ বাবুর একটি স্মৃতি নষ্ট হবে। সব চলে গেলেও স্কুল থাকবে। স্কুলের সঙ্গে তিনিও থাকবেন। মহাপুরুষেরা কোন না কোনভাবে থেকেই যান। তবে জীবনকৃষ্ণ বাবুকে মহাপুরুষ বলাটা বোধ হয় ঠিক হচ্ছে না।
স্যার, উঠেন।নামার সময় সাবধানে নামবে।ঝড়ের গতিতে রিকশা নামছে। উঁচু নিচু রাস্তা। প্রবল ঝাঁকুনি হচ্ছে। একবার মনে হল তিনি বোধহয় ছিটকে পড়েই যাবেন।ইউনিয়ন বোর্ডের রাস্তা ছেড়ে রিকশা এবার কাঁচা রাস্তায় নেমেছে। চাকা থেকে ছপছপ শব্দ হচ্ছে। রাস্তায় পানি জমে গেছে।স্যার, মনে লইতাছে, এই বছর বান হইব।হতে পারে। প্রতি দুবছর পর পর বন্যা হয়। গত দুবছর বন্যা হয় নি।ফজলুল করিম সাহেবের বাড়ি দেখা যাচ্ছে। বাইরের উঠোনে রেশমী হারিকেন জ্বালিয়ে রেখেছে। হারিকেনে এত আলো হয়? চারিদিকের সুপারি গাছ পর্যন্ত চোখে পড়ছে।
ফজলুল করিম সাহেবের মন ভাল হয়ে গেল। তিনি জানেন–রেশমী ঘর বাড়ি ঝকঝক করে রেখেছে। উঠোনে জ্বলন্ত হারিকেনের পাশে জলচৌকি। জলচৌকির পাশে বালতি ভর্তি পানি আর একটা মগ। তার পাশেই সাবানদানীতে সাবান। হাত পা ধুতে ধুতেই শুকনা একটা গামছা নিয়ে রেশমী দাঁড়াবে। এই মেয়েটা বোধহয় মনের কথা বুঝতে পারে। সে তাকে তখনই খেতে ডাকবে যখন তিনি ক্ষুধার্ত। খেতে বসে দেখবেন–যে সব খাবার তিনি খেতে চেয়েছেন সেগুলিই রান্না করা হয়েছে। মাঝে মাঝে রাতে তাঁর চা খেতে ইচ্ছা করে। রেশমী সেই সব রাতেই চা বানায়। তার চা খেতে ইচ্ছা করছে না অথচ রেশমী চা বানিয়ে এনেছে এরকম কখনো হয়নি।
রেশমী উদ্বিগ্ন মুখে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিল। ফজলুল করিম সাহেবকে দেখে তার উদ্বেগ কিছুটা কমল। সে ছোট্ট করে নিঃশ্বাস ফেলল।রেশমীর বয়স তেইশ চব্বিশ। হালকা পাতলা গড়নের জন্যে তাকে আরো কম দেখায়। গায়ের রঙ শ্যামলা। তার চেহারা খুবই সাধারণ, কিন্তু চোখে অসহায় ভাব আছে বলে ফজলুল করিম সাহেব যতবারই তার দিকে তাকনি ততবারই তার খুব মায়া লাগে।রেশমী বলল, কাঠের পুলটা না-কি ভাইঙ্গা গেছে?
না-তো।আমি খুব চিন্তার মইধ্যে ছিলাম।না, পুল ভাঙ্গে নাই। পুলের উপর দিয়েই তো আসলাম।এই দিকে রটনা পুল ভাঙ্গছে। একটা গরুর গাড়ি পুল ভাইঙ্গা নিচে পরছে।তিনি দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। মানুষ গল্প তৈরী করতে পছন্দ করে। পুল ভাঙ্গেনি অথচ পুল ভাঙ্গার গল্প তৈরী হয়ে গেছে। কেউ এসে চাক্ষুষ দেখে যাওয়ার প্রয়োজন মনে করছে না।ফজলুল করিম সাহেব জলচৌকির উপর উঠে দাঁড়ালেন। হাত পা ধুবেন। জলচৌকির পাশেই কাঠের বৌলাওয়ালা খড়ম সাজানো। রেশমীর কাজে কোন রকম খুঁত নেই। তিনি বালতি থেকে মগ ভর্তি পানি নিলেন। পায়ে পানি ঢালতে যাবেন। রেশমী এসে হাত থেকে মগ নিয়ে নিল।
আপত্তি করা অর্থহীন, রেশমী পায়ে পানি ঢালতে দেবে না। কখনো দেয়। পায়ে পানি ঢালার কাজটা সে খুব আগ্রহের সঙ্গে করে।ফজলুল করিম সাহেব দাঁড়িয়ে আছেন। রেশমী এক হাতে পায়ে পানি ঢালছে। অন্য হাতে কাদা মুছে দিচ্ছে। রেশমীর পিঠ দেখা যাচ্ছে। তার মুখটা শ্যামলা হলেও পিঠতো বেশ ফর্সা দেখাচ্ছে। তার মাথার চুল বাঁধা। এই মেয়েটির চুল খুব লম্বা। ফজলুল করিম সাহেবের শরীর কেমন ঝিম ঝিম করতে লাগল। তিনি চেষ্টা করেও রেশমীর ফর্সা পিঠ থেকে চোখ সরাতে পারছেন না। তিনি বুঝতে পারছেন কাজটা ঠিক হচ্ছে না। ভুল হচ্ছে। অন্যায় হচ্ছে।রেশমী।জি।
সাত লাখ টাকা স্কুলের জন্যে পাওয়া গেছে। সরকারি অনুদান। আমার এক ছাত্রের কথা তোমাকে বলেছিলাম না? জয়েন্ট সেক্রেটারী, ও-ই ব্যবস্থা করে দিয়েছে।ভাল তো।হ্যাঁ, ভাল। অনেক দিনের ইচ্ছা স্কুলটা পাকা করা। স্কুল ঘর পাকা হবে। ছাত্রদের হোস্টেল থাকবে। টিউব ওয়েল বসানো হবে…….পা ধোয়ানো হয়েছে। জলচৌকি থেকে নামার সময় ফজলুল করিম সাহেব রেশমীর কাঁধে হাত রেখে নামলেন। এমন না যে তিনি ঢলে পড়ে যাচ্ছিলেন। কাঁধে হাত রেখে তিনি নিজেই লজ্জায় এবং সংকোচে এতটুকু হয়ে গেলেন। রেশমীর কোন ভাবান্তর হল না–যেন এটাই স্বাভাবিক।
খেতে বসে ফজলুল করিম সাহেব অনর্গল কথা বলে যেতে লাগলেন। এটা নতুন কিছু না–রেশমীর সঙ্গে তিনি প্রায়ই গল্প করেন। রেশমী চুপচাপ শুনছে। তার সব গল্পই রেশমীর আগের শোন–একবার না, অনেকবার শোনা–কিন্তু রেশমী এমনভাবে তাকিয়ে আছে যে মনে হচ্ছে সে এই প্রথমবার শুনছে।বুঝলে রেশমী, ১১ই মে নাইননি সেভেন্টি ওয়ান, পাক আর্মি হঠাৎ নীলগঞ্জ এসে উপস্থিত। চারদিকে ছছাটাছুটি হৈ চৈ পড়ে গেল। এখন যে মন্ত্রী আছেন সিরাজ সাহেব তাঁর বাবা মফিজ তালুকদার তখন শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান। মিলিটারী গিয়ে উঠল তাঁর বাড়িতে। আমরা সবাই আতংকে অস্থির–কি হয়, কি ন?
Read more
