• Wednesday , 3 March 2021

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল-পর্ব-০৩- হুমায়ূন আহমেদ

স্কুলের ঘণ্টা এরকম করে বাজছে কেন? শব্দটা ঠিক মত আসছে না। ঝনঝন শব্দ না চাপা শব্দ। ব্যাপার কি? ফজলুল করিম সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। হরিপদকে ডাকা দরকার। এই মুহুর্তে ডাকলে সে ঘণ্টা পেটা বন্ধ করে ছুটে আসবে। কাজেই পাঁচটা ঘণ্টা পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। বয়সের কারণে হরিপদের সমস্যা হচ্ছে। গত সপ্তাহেই ফোর্থ পিরিয়ড শুরু হচ্ছে সে পাঁচটা ঘণ্টা বাজিয়ে বসে আছে। এইসব অপরাধ ক্ষমার যোগ্য না। তিনি দুটাকা ফাইন করেছেন। বেতন থেকে কাটা যাবে। যার প্রধান কাজই ঘণ্টা পেটানো। সে যদি তাতেই ভুল করে বসে তাহলে হবে কিভাবে?

দুটাকা ফাইন করে তার নিজেরও মন খারাপ হয়েছে। দুটাকার মূল্য হরিপদের কাছে অনেক। তারপরেও স্কুলের শৃঙ্খলার ব্যাপার আছে। ক্লাসে ক্লাসে ছেলেরা কান খাড়া করে আছে ঘণ্টা শোনার জন্য। চারটার জায়গায় পাঁচটা ঘণ্টা শুনলে ওদের কেমন লাগবে?

ফজলুল করিম সাহেব টিচারদের রোস্টারের দিকে তাকিয়ে আছেন। মমতাজ সাহেব আজও এবসেন্ট। মাহবুব সাহেব এসেছেন ফার্স্ট পিরিয়ডের পর। শিক্ষকদেরও ফাইন করার ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন ছিল। নিয়ম সবার জন্যেই এক হওয়া উচিত। কারো জন্যে কঠিন নিয়ম। কারো জন্যে সহজ, অ হয় না।হরিপদ।আজ্ঞে।

ঘণ্টা নিয়ে ভেতরে আস।হরিপদ স্কুল-ঘণ্টা বগলদাবা করে ভয়ে ভয়ে ঢুকল। বিনয়ে নিচু হয়ে পড়ল। এখন অবশ্যি বিনয় ছাড়াই তার শরীর নুয়ে পড়েছে। কোমর বেঁকে গেছে। বয়স মানুষকে বাকা করে ফেলে।স্কুলের ঘণ্টার আওয়াজ ঠিকমত শোনা যাচ্ছে না ব্যাপার কি?

হরিপদ আরো নিচু হয়ে গেল। মাথা প্রায় মাটির সঙ্গে যাচ্ছে।দেখি ঘণ্টা দেখি। ঘণ্টা ঠিক আছে।হরিপদ ঘণ্টাটা টেবিলের ওপর রাখল। ঘণ্টা ঠিক আছে। ফেটে যায়নি। এই স্কুলের সবচে মূল্যবান সম্পত্তি হল–ঘণ্টাটা। জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল শুরু হয় এই ঘণ্টা দিয়ে। ফজলুল করিম সাহেব তখন ছিলেন না–কত আগের কথা। তবে তিনি শুনছেন–স্কুল শুরু হবার প্রথম ঘণ্টা জীবনকৃষ্ণ বাবু নিজে বাজিয়েছিলেন। ঘণ্টা বাজিয়ে তিনি কিছুক্ষণ কেঁদেছিলেন। কি জন্যে কেঁদেছিলেন? মনের আনন্দে?

হরিপদ?আজ্ঞে?ঘণ্টাতো ঠিকই আছে। শব্দ এরকম হয় কেন?হাতুড়ি চুরি গেছে স্যার। এই জন্যে শব্দ কম হয়।ফজলুল করিম সাহেব বিস্মিত চোখে তাকালেন। কি ভয়ংকর কথা। হাতুড়ি চুরি গেছে। আজ হাতুড়ি গেলে, কাল যাবে ঘণ্টা।কখন চুরি গেছে?কাইল থাইক্যা পাই না।তুমি তো অসম্ভব কথা বলছ হরিপদ। স্কুলের প্রাণ হল তার ঘণ্টা। ঘণ্টা হাতুড়ি থাকে তোমার দায়িত্বে। সেই হাতুড়ি চলে গেল তুমি খবর পর্যন্ত দিলে না। তুমি ঘোরর অন্যায় করেছ। তোমাকে আরো দুটাকা ফাইন করা হল। ঘণ্টার হাতুড়ি চুরি হবার মত কোন বস্তু না। নিশ্চয়ই কোথাও আছে। খুঁজে বের কর।

জ্বে আজ্ঞে।মাহবুব সাহেব গম্ভীর ভঙ্গিতে ঢুকলেন। মনে হচ্ছে তাকে ডেকে আনায় তিনি বিরক্ত। তিনি হেডমাস্টার সাহেবের সামনের চেয়ারে বসতে বসতে বললেন, ডেকেছেন?মাহবুব সাহেব আজকের ফাস্ট পিরিয়ড মিস করেছেন।কাজ ছিল।কাজ থাকলে আগে ভাগে ছুটি নেবেন যাতে আমরা বিকল্প ব্যবস্থা রাখতে পারি।হঠাৎ কাজ পড়ে গেল, আগে জানানো সম্ভব ছিল না। ময়মনসিংহ-এর ডিসি সাহেব হঠাৎ চলে এসেছেন। উঠেছেন ডাকবাংলায়…… সকালে তাঁর সঙ্গে চা খেতে বললেন। তাকে তো আর বলতে পারি না–চা খাব না।

সেটা কেন বলবেন? চা খেতে ডেকেছে চা খাবেন। আবার আপনার জন্যে ছাত্ররা যাতে অসুবিধায় না পড়ে সেই দিকেও লক্ষ্য রাখবেন। ডিসি সাহেবের সঙ্গে চায়ের চেয়ে ছাত্রদের ক্লাশ অনেক জরুরী। আপনি শিক্ষক মানুষ। এই ব্যাপারটা আপনি ছাড়া কে বুঝবে?মাহবুব সাহেব চোখ মুখ কঠিন করে বসে রইলেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আচ্ছা যান, এইটা বলার জন্যই ডেকেছিলাম। শুধু যে আজই আপনি ক্লাস মিস করেছেন তাই না। গতকালও স্কুলে এসেছেন টিফিন টাইমের পরে।

গতকাল স্কুলের কাজেই বাইরে ছিলাম। বাজার কমিটির সাথে একটা সভা ছিল। বাজার কমিটির চাদা ছাড়া তো স্কুল চলবে না। না-কি চলবে?বাজার কমিটির টাকা আমাদের অবশ্যই দরকার। কিন্তু এদের মিটিং এমনভাবে ফেলতে হবে যেন স্কুল এফেকটেড না হয়। ছুটির দিনে মিটিং করবেন কিংবা সন্ধ্যাবেলা করবেন।মাহবুব সাহেবের মুখে খুব কঠিন কিছু কথা এসে গিয়েছিল সেই সব কথা তিনি সামলে নিলেন। কঠিন কথা বলার সময় পাওয়া যাবে। প্রচন্ড রাগ নিয়ে কঠিন কথা ঠিক না। কঠিন কথা বলতে হয় ঠাণ্ডা মাথায়। খুব ঠাণ্ডা মাথায়।

মাহবুব সাহেব।জ্বি স্যার।আমাদের স্কুলের সায়েন্স টিচার আসবেন পরশু সন্ধ্যায়। বিদেশী মানুষ, তাঁর থাকা খাওয়ার একটা ব্যবস্থা তো করতে হয়…।দেখি, একটা ব্যবস্থা করব।কি ব্যবস্থা করবেন আমাকে জানাবেন। ষ্টেশনে কাউকে পাঠাতেও হবে উনাকে আনার জন্যে। আমি নিজেই যেতাম। আমার শরীরটা খারাপ রাতে ভাল ঘুম হচ্ছে না। শরীর ভাল লাগলে নিজেই যাব।

মাহবুব সাহেব চেয়ার ছেড়ে উঠে দাড়াতে দাঁড়াতে বললেন সার আমি তাহলে উঠি?আচ্ছা। মাহবুব সাহেব!জ্বি স্যার।অনেক কঠিন কথা বলে ফেললাম। কিছু মনে করবেন না। মেজাজও খুব খারাপ, হাতুড়ি খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কি রকম অব্যবস্থা–স্কুলের হাতুড়ি চুরি গেছে। ডাষ্টার দিয়ে ঘণ্টা পিটাচ্ছে…। আচ্ছা যান। আপনার ক্লাসের সময় হয়ে গেল।

ফিফথ পিরিয়ড শুরু হচ্ছে। ফজলুল করিম সাহেব ঘণ্টার শব্দ শুনছেন। হাতুড়ি পাওয়া যায় নি। ঘণ্টার শব্দ থেকেই বোঝা যাচ্ছে হাতুড়ি পাওয়া যায়নি। ফজলুল করিম সাহেব স্কুলের প্যান্ডে হরিপদের জরিমানা সংক্রান্ত নোটিশ লিখতে শুরু করলেন। সব কিছুর রেকর্ড থাকা দরকার। ফজলুল করিম সাহেব লিখলেন বিষয়ঃ কর্তব্য কার্যে গুরুতর অবহেলা।

সন্ধ্যাবেলা হরিপদ এসে জানালো হাতুড়ি খুঁজে পাওয়া যায় নি। হেডমাস্টার সাহেব তাকে জরিমানার চিঠি ধরিয়ে দিলেন। হরিপদ বিনয়ে নিচু হয়ে রইল। কিছু বলল না।ফজলুল করিম সাহেব বললেন, শেক্সপিয়ারের একটা কথা আছে আই হ্যাভ টু বি ক্রুয়েল ওনলি টু বি কাইন্ড। অর্থাৎ তোমার প্রতি নিষ্ঠুর হচ্ছি, তৈমাকে করুণী প্রদর্শনের জন্যেই। বুঝছি

জ্বে আজ্ঞে।আচ্ছা যাও। আমি আরো কিছুক্ষণ থাকব। রাতে এক জায়গায় দাওয়াত আছে। কাজেই রাত আটটা পর্যন্ত স্কুলে থাকব। তোমার থাকার কোন দরকার নেই। তুমি চলে যাও।জ্বে আজ্ঞে।যাবার আগে হারিকেনে তেল ভরে দিয়ে ঠিকঠাক করে দিয়ে যেও।তেল কিনতে হবে স্যার। তেল নাই।ফজলুল করিম সাহেব দশটাকার একটা নোট বের করে দিলেন।বোতল নিয়ে যাও ছটাকার কেরোসিন আনবে।জ্বে আজ্ঞে।

হেডমাস্টার সাহেব ঠিক করে রেখেছেন যে চারটাকা ফেরত আসবে সেই টাকাটা তিনি রাখবেন না এতে দুটাকা দুটাকা করে যে চার টাকা ফাইন হয়েছিল সেটা হরিপদ সামলে ফেলতে পারবে। বোকা মানুষ বলে সে ব্যাপারটা বুঝতে পারবে না।ফজলুল করিম সাহেবের ঘরে হারিকেন জ্বলছে। হরিপদ বারান্দায় জবুথবু হয়ে বসে আছে। হেড স্যারকে ফেলে সে যেতে পারে না। এটা সম্ভব না।

আজো বৃষ্টি পড়ছে। কাল যেমন বৃষ্টি পড়ছিল আজ তারচেয়েও বেগে বৃষ্টি নেমেছে। এইবার বন্যা না হয়েই যায় না। লাইব্রেরী ঘরের দিকে খটখট শব্দ হচ্ছে। শব্দ শুনে মনে হয় কারা যেন চেয়ার টেবিল টানাটানি করছে। হরিপদের গা সামান্য ছমছম করতে লাগল। স্কুলে একটা গুজব প্রচলিত আছে লাইব্রেরী ঘরে স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জীবন বাবুকে মাঝে মধ্যে দেখা যায়। ব্যাপারটা পুরোপুরি গুজবও নয়। হরিপদ নিজেও একবার দেখেছে। তিন বছর আগের কথা। শীতকাল, সে স্কুল লাইব্রেরী বারান্দা দিয়ে যাচ্ছিল–হঠাৎ শুনে খটমট শব্দ।

লাইব্রেরী দরজা তালা দেয়া, সে ঘুলঘুলি ফাঁক করে তাকিয়েই চমকে উঠল। চেয়ারে জীবন বাবু বসে আছেন। খালি গা-ধবধবে ফর্সা শরীর, মোটা একটা বইয়ের পাতা ওল্টাচ্ছেন। হরিপদকে তাকাতে দেখে তিনি চোখ তুললেন। কি কঠিন সেই চোখের দৃষ্টি। হরিপদের বুক হিম হয়ে গেল। জীবন বাবু ধমকে উঠলেন–কি চাও? হরিপদ ছুটে চলে এল। এই ঘটনার কথা সে কাউকে বলেনি। এইসব ব্যাপার বলতে নেই।

লাইব্রেরী ঘরে শব্দ হচ্ছে, হরিপদের বুক কাপছে। ভরসার কথা এই যে শুধু যে হেডমাস্টার সাহেব আছেন তাই না, মওলানা সাহেবও আছেন। মওলানা সাহেব টিচার্স কমনরুমে নামাজ পড়ছেন।শুধু যে হরিপদ হেডমাস্টার সাহেবের জন্যে অপেক্ষা করে তাই না। মওলানা সাহেবও অপেক্ষা করেন। এই এক দিকে দুজনের মিল আছে।নামাজ শেষ করে মওলানা সাহেব ফজলুল করিম সাহেবের ঘরে উঁকি দিলেন।স্যার যাবেন কখন?একটু দেরী হবে। সিরাজ সাহেবের ওখানে রাতের খাওয়ার দাওয়াত। নটার সময় যেতে বলেছেন।

নটা বাজতে তো অনেক দেরী, এতক্ষণ বসে থাকবেন?বসে নেই তো কাজ করছি। এইবার যে কজন ছেলে মেয়ে এসএসসি দিবে ওদের খুব স্পেশাল কোচিং-এর কি ব্যবস্থা করা যায় সেটা নিয়ে ভাবছি। পরিকল্পনা করছি।আপনি বসুন পরিকল্পনাটা নিয়ে আপনার সঙ্গে ডিসকাস করি।মওলানা সাহেব বসতে বসতে বললেন–যে বৃষ্টি নেমেছে–চা খেলে কেমন হয় স্যার?চা খাবেন কিভাবে?হরিপদ আছে। ওকে ফ্লাক্স দিয়ে পাঠিয়ে দেই।

চা খেতে পারলে মন্দ হয় না অবশ্যি। ফ্লাক্স কোথায় পাবেন?আমার একটা আছে।তাহলে তো ভালই হয়। আপনি এখনো যাননি, স্কুলে পড়ে আছেন ব্যাপারটা কি?একা মানুষ গিয়েই বা কি করব? আপনি আছেন দেখে আমিও থেকে গেলাম।ভাল করেছেন। আপনার সঙ্গে আমার পরিকল্পনাটা নিয়ে আলাপ করি। বিরাট পরিকল্পনা নিয়েছি।

বলুন শুনি আপনার পরিকল্পনা।যারা এবার এসএসসি দেবে তারা থাকবে দিন রাত চব্বিশ ঘণ্টা কোচিং-এর আওতায়। লাইব্রেরী ঘরের জিনিসপত্র খালি করে ঐখানে টানা বিছানা করে দেব। সার্বক্ষণিক শিক্ষক থাকবেন। শিক্ষকদের ডিউটি ভাগ করে দেয়া হবে। ব্যবস্থাটা কেমন মনে হচ্ছে?

খুব ভাল মনে হচ্ছে না। সম্ভব না। সম্ভব না কেন?এইবার চল্লিশজন ছেলে পরীক্ষা দিচ্ছে। ঊনত্রিশটা ছেলে, এগারোটা মেয়ে এদের আপনি কোথায় রাখবেন? এদের খাওয়ার খরচ কে দিবে? শিক্ষকরাই বা বাড়তি ঝামেলা কেন করবেন?

স্কুলের দিকে তাকিয়ে শিক্ষকরা বাড়তি ঝামেলাটা করবেন। এইটা ছাড়া এখন আমাদের উপায় নেই। শহরের স্কুলগুলির সঙ্গে গ্রামের স্কুলগুলি পারছে না। এসএসসির রেজাল্ট হলে আপনি কখনো শুনবেন না গ্রামের কোন স্কুল থেকে একটা ছেলে ফার্স্ট হয়েছে… এমন তো না যে আমাদের ছাত্র খারাপ……

না ছাত্র খারাপ না।দুটো ছেলে এবার আমাদের ভাল আছে। খুবই ভাল। এদের ঠিক মত তৈরি করতে পারলে……তাহলে স্যার এই দুজনকে নিয়েই কাজ করুন।এটাও মন্দ না। আমার নিজের বাড়িতেই রেখে দিতে পারি…. পরের বন্ধুর স্কুলের হোষ্টেল যখন হয়ে যাবে তখন বাধ্যতামুলকভাবে এসএসসির সব ছাত্রকে হোস্টেলে থাকতে হবে….. কি বলেন?

তা করা যাবে।জোরে সোরে নামতে হবে বুঝলেন মওলানা সাহেব। শহরের স্কুল আমাদের টেক্কা দিয়ে চলে যাবে তা হয় না।হেডমাস্টার সাহেবের চোখ চকচক করতে লাগল।তাঁরা স্কুল থেকে বেরুলেন সাড়ে আটটায়। বৃষ্টি থেমে গেছে। রাস্তায় পঁাচ প্যাচ কাদা। সাবধানে পা ফেলতে হচ্ছে। পোস্টাপিস পর্যন্ত দুজন এক সঙ্গে এলেন। এখান থেকে দুজন দুদিকে যাবেন! ফজলুল করিম সাহেব বললেন, মওলানা সাহেব যাই।

জ্বি আচ্ছা স্যার।আপনার কথাটাই রাখব ঠিক করেছি, দুটা ছেলেকেই চব্বিশ ঘণ্টা তত্ত্বাবধানে রাখব। সব টিচারদের ডিউটি ভাগ করে দেব……ইনশাআল্লাহ্।মওলানা রওনা হতে গিয়েও হলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আপনি কি কিছু বলবেন?জি না।

আপনার ভাব ভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে কিছু বলতে চান।যদি কিছু মনে না করেন, স্যার।কিছুই মনে করব না। বলুন কি ব্যাপার।আপনার বাসায় কাজের যে মেয়েটা আছে কি যেন নাম?রেশমী।হ্যাঁ। রেশমী প্রসঙ্গে একটা কথা।ওর প্রসঙ্গে কি কথা।মেয়েটার একটা বিয়ের ব্যবস্থা করলে কেমন হয়?হঠাৎ বিয়ের কথা উঠছে কেন?মওলানা ইতস্তত করে বললেন–যুবতী মেয়ে বিয়ে হয়ে যাওয়া উচিত। তাছাড়া……

তাছাড়া কি?আপনি বিপত্নীক মানুষ–তরুণী এক মেয়েকে নিয়ে বাস করছেন। আমাদের মন তো ছোট, হঠাৎ কেউ কিছু বলা শুরু করলে…… সবাই বিশ্বাস করা শুরু করবে…… সত্য আমরা বিশ্বাস করতে চাই না। অসত্য বিশ্বাস করি, কারণ অসত্য বিশ্বাস করানোর জন্য শয়তান আমাদের সব সময় প্ররোচিত করছে।

ফজলুল করিম সাহেব তীব্র গলায় বললেন, কেউ কি আপনাকে কিছু বলেছে? মওলানা জবাব দিলেন না। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, মেয়েটা ছোট থেকে আমার সঙ্গে আছে। আমার স্ত্রীর দেশের মেয়ে। সে দেশ থেকে নিয়ে এসেছিল। আমাকে খালু ডাকে।

জানি। সবই জানি–কথা হলো কি, বিয়ে হলে মেয়েটার জন্যেও ভাল। দরিদ্র মেয়ে বিয়ে হলে জীবনের গতি হয়। আমার হাতে একটা ছেলে আছে। মোটর মেকানিক। ভাল রোজগার করে। সংসারে শুধু মা আছে, আর কেউ নেই। যদি বলেন তো কথা বলে দেখি। বলব?

ফজলুল করিম সাহেব ক্লান্ত গলায় বললেন, বলুন। বলে দেখুন। বিয়ের যাবতীয় খরচ দেব। আমার পক্ষে যতটুকু সম্ভব করব। মেয়েটা আমার অতি প্রিয়। তার ভাল বিয়ে হলে আমার চেয়ে খুশি আর কেউ হবে না।

মওলানা চুপ করে রইলেন। ফজলুল করিম সাহেব প্রসঙ্গ পাল্টে বললেন, পরও আমাদের নতুন টিচার আসছে শুনেছেন বোধ হয়। সায়েন্স টিচার।জ্বি, শুনেছি।তার থাকার ব্যবস্থা করতে হয়। মাহবুব সাহেবকে অবশ্যি বলেছি।আমার সঙ্গে রাখতে পারি। আমার ঘরে দুটা খাট আছে। উনি একটাতে থাকতে পারেন। থাকতে রাজি হবেন কি-না কে জানে।রাজি হবেন না কেন?

মওলানা টাইপ কারো সঙ্গে লোকজন রাত্রিযাপন করতে চায় না।এই জাতীয় অদ্ভুত কথা কেন বলছেন?অভিজ্ঞতা থেকে বলছি। মওলানার প্রয়োজন পড়ে মিলাদ পড়াবার সময়, কিংবা কেউ মারা গেলে। অন্য সময় তাদের দরকার নেই। আপনি লক্ষ্য করেছেন কিনা জানি না কেউ কোন মওলানাকে কখনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ দেয় না।কি যে অদ্ভুত কথা আপনি বলেন।

আপনি নিজেই দেন না। স্কুলের অনেক ঝামেলার কাজ আপনি নিজে করেছেন কিংবা অন্যকে দিয়ে করিয়েছেন আমাকে কখনো দেন নি।ফজলুল করিম সাহেব চুপ করে রইলেন। মওলানা সত্যি কথাই বলছেন। তিনি ব্যাপারটাকে এ ভাবে কখনো দেখেন নি।

সিরাজ সাহেব প্রচুর লোক দাওয়াত করেছেন। আজ তাঁর মায়ের মৃত্যু বার্ষিকী। মিলাদ পড়ানো হয়েছে। মিলাদের পর খাবার ব্যবস্থা। আয়োজনও প্রচুর। বড় মাছ, মাংস পোলাও, দৈ মিষ্টি। দৈ এসেছে টাঙ্গাইল থেকে। সিরাজ সাহেব নিজেই অতিথিদের পাতে দৈ উঠিয়ে দিচ্ছেন। ময়মনসিংহ থেকে ভিসি এবং এসপি এসেছেন। তারাও খেতে বসেছেন। মন্ত্রী স্বয়ং তাঁদের পাতে দৈ তুলে দিচ্ছেন। এই দৃশ্যে তারা বড়ই বিব্রত। এসপি সাহেবের গলায় খাবার আটকে যাবার মত অবস্থা।

স্যার আপনি কেন?সিরাজ সাহেব বললেন, কেন আমি কি দৈ দিতে পারি না? না-কি আপনার সন্দেহ আমি পরিমাণে আপনাকে কম দেব?সবাই হেসে উঠল। হাসি থামতেই চায় না। সিরাজ সাহেব ক্রমাগত রসিকতা করে যাচ্ছেন–সবাই হেসে যাচ্ছে।ঢাকা থেকে পত্রিকার এক সাংবাদিকও এসেছেন। সিরাজ সাহেব তাঁর কাছে গিয়ে বললেন, যতদূর জানি আপনি সাহিত্যের ছাত্র। আপনি আমাকে বলুন মাথায় ঘোল ঢেলে দেয়ার বাগধারা শোনা যায়। দৈ ঢেলে দেয়া শোনা যায় না কেন?

সাংবাদিক কিছু বলার আগেই সবাই হাসতে শুরু করল। ফজলুল করিম সাহেবের পুরো ব্যাপারটা ভাল লাগছে না। মায়ের মৃত্যু বার্ষিকীতে এত হাসাহাসি কেন? এ তো কোন আনন্দময় উৎসব নয়।খাওয়া শেষ হতে হতে দশটা বেজে গেল। সিরাজ সাহেব বললেন, আপনারা কেউ যাবেন না, একটা জরুরী ঘোষণা আছে। আজ একটা বিশেষ দিন। আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিলাম বিশেষ দিনে একটা জরুরী ঘোষণা দেব। তাছাড়া ইচ্ছা করলেও আপনারা কেউ যেতে পারবেন বলে মনে হয় না, যে বৃষ্টি নেমেছে। রাস্তায় এক হাঁটু পানি

সবাই আবারো হাসতে শুরু করলো। রাস্তায় এক হাঁটু পানি এই খবরে হাসার কি আছে ফজলুল করিম সাহেব বুঝতে পারছেন না। না-কি মন্ত্রীদের প্রতিটি কথায় হাসতে হয়, এটাই নিয়ম।সিরাজ সাহেব বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতেই ঘোষণা দিলেন। তিনি উঠে দাঁড়ালেন। মাথায় টুপি পরে বিসমিল্লাহ হির রহমানির রাহিম বলে শুরু করলেন

আজ আমি যদিও আপনাদের সবার সঙ্গে খুব হাসাহাসি করছি তবু আপনারা নিশ্চয়ই শুনেছেন আজ আমার মার মৃত্যু দিবস। মা নয় বছর আগে এই বাড়িতে মারা গেছেন। আমি আমার মার কু পুত্র। র জন্যে। কিছুই করতে পারিনি। কাজেই ঠিক করেছি, মার স্মৃতির রক্ষার জন্যে এই অঞ্চলে একটা স্কুল দেব। তবে লোকজন যেমন নাম দিয়ে স্কুল দেয় সে রকম কিছু না, স্কুলের নাম হবে নীলগঞ্জ হাই স্কুল। আমার মায়ের নাম স্কুলের সঙ্গে যুক্ত রাখব না। এটা আমার কাছে অরুচিকর মনে হয়। তাছাড়া আপনারা অনেকেই জানেন আমার মা ছিলেন অত্যন্ত পর্দানশীন মহিলা। তাঁর নাম। সবাই মুখে নেবে এটা তার ভাল লাগার কথা না।

প্রচণ্ড হাততালিতে সিরাজ সাহেবের কথা চাপা পড়ে গেল। তিনটা হ্যাজাক বাতির একটা দপ দপ করছে, এতেও তাঁর বক্তৃতা বাধা পাচ্ছিল। হ্যাজাক ঠিক করার পর রমিজ সাহেব আবার শুরু করলেন,আমি আমাদের পৈত্রিক বসত বাটি সেই সঙ্গে দশ একর জমি এবং নগদ পাঁচ লাখ টাকা স্কুলের নামে লিখে পড়ে দিয়েছি। কাগজপত্র রেজিষ্ট্রি হয়েছে। কাগজপত্র ফাইলে রাখা হয়েছে–আপনারা ইচ্ছে করলে দেখতে পারেন।

মন্ত্রীরা ক্ষমতা অপব্যবহার করে অনেক আজেবাজে কাজ করেন-আমিও একটু করেছি। সরকারি স্যাংশন করিয়ে ফেলেছি। এতে আমার যদি অধর্ম হয়ে থাকে ক্ষমা করবেন।

আমাদের এই নীলগঞ্জ স্কুলের ছাত্ররা ইনশাল্লাহ্ এই সেশানের পরের সেশান থেকেই এসএসসি পরীক্ষা দেবে। এখন আমি যা চাই সেটা হলআপনাদের সাহায্য। এটা আমার মার স্কুল না, এটা আপনাদেরই স্কুল। আমি কিছু করছি না, যা করছেন আপনারাই করছেন।

ফজলুল করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন–স্যার এখানে তো একটা স্কুল আছে। অনেক দিনের পুরানো স্কুল।সিরাজ সাহেব বললেন, মার কাছে মামার বাড়ির গল্প কেন করছেন হেডমাষ্টার সাহেবঃ জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল যে এখানে আছে সেটা আমি জানব না? আমি সেই স্কুলের ছাত্র না?

সবাই আবারো হো হো করে হাসছে। ফজলুল করিম সাহেব সেই হাসি অগ্রাহ্য করে বললেন, দুটো স্কুল চলার মত অবস্থা স্যার নীলগঞ্জের নাই।এখন নেই–পরে হবে। শিক্ষার হার জিওমেট্রি প্রগ্রেসানে বাড়বে। দুটা স্কুলে আমাদের চলবে না। তিনটা চারটা স্কুল লাগবে।ফজলুল করিম সাহেব ক্ষীণ স্বরে বললেন, এতো পুরানো দিনের স্কুল উঠে যাবে এটা কি ঠিক হবে? স্যার আপনিই বলুন–আপনি সাহায্য করতে চান। সাহায্য করুন, আমাদের স্কুলকে করুন

আপনার স্কুলের সাহায্য লাগবে কেন? আপনার মত হেডমাস্টার থাকতে স্কুলের কি চিন্তা? তাছাড়া দুটো স্কুল থাকলে কম্পিটিশন হবে। কম্পিটিশনের ফল সব সময় শুভ হয়। সাহায্যের কথা বলছেন না হয় আপনাদেরও সাহায্য করব, শর্ত একটাই আপনারা আমার স্কুল দাড়া করিয়ে দেবেন।ফজলুল করিম সাহেব আরো কিছু বলতে যাচ্ছিলেন, মাহবুব সাহেব তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, স্যার আমরা যা করার ইনশাআল্লাহ্ করব। এই বিষয়ে আপনি কোন দুশ্চিন্তা করবেন না। আল্লাহ হাফেজ।

সিরাজ সাহেব বললেন, চায়ের ব্যবস্থা আছে। চা না খেয়ে কেউ যাবেন। বৃষ্টি কিন্তু এখনো পড়ছে। আপনাদের জন্যে নৌকার ব্যবস্থা করেছিনৌকা দিয়ে আপনাদের পৌঁছে দেয়া হবে। হা-হা-হা।আবারো হাসি শুরু হল।ফজলুল করিম সাহেব বাসায় ফিরলেন মাঝরাতে। বাইরের বারান্দার উঠোনে হারিকেন জ্বালিয়ে রেশমী বসে আছে। কি সুন্দর লাগছে মেয়েটাকে। রেশমী উদ্বিগ্ন গলায় বলল, কই ছিলেন?দাওয়াত ছিল রেশমী।

আমারে কিছু বলে যাবেন না। না-কি আমি কোন মানুষ না?রেশমী কেঁদে ফেলল। সহজ কান্না না-হাউ মাউ করে কান্না। ফজলুল করিম সাহেব হতভম্ব হয়ে গেলেন। কি করবেন, কি বলবেন বুঝতে পারছেন না। রেশমী ফোপাতে ফেঁপাতে বলল, আমি আপনার কে? আমি আপনার কেউ না।এই প্রথম ফজলুল করিম সাহেবের নিজেকেই নিজের পায়ে পানি টলিতে হল। ঘরে ঢুকে দেখেন রেশমী তার নিজের ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে দরজা বন্ধ করে দিল।

ফজলুল করিম সাহেব বিছানায় শুয়ে অপেক্ষা করতে লাগলেন। তার মন বলছে এক সময় রেশমীর রাগ ভাঙ্গবে। সে দরজা খুলে বের হয়ে এলে তাকে বলবেন, দুকাপ চা কর রেশমী, আমার মনটা খুব খারাপ। কি জন্যে খারাপ তোমাকে বলি।রেশমী দরজা খুলল না। অপেক্ষা করতে করতে ফজলুল করিম সাহেব ঘুমিয়ে পড়লেন। এক সময় তার ঘুম ভাঙ্গলো–তিনি দেখলেন তার মশারী ফেলা। গায়ের উপর চাদর দেয়া। বাইরে মুষল বৃষ্টি। বৃষ্টির শব্দ শুনেই তার মন ভার হচ্ছে? নিজেকে একা লাগছে? কারো সঙ্গে কথা বলতে ইচ্ছে করছে। রেশমীকে কি তিনি ডেকে তুলবেন? সেটা কি ঠিক হবে। নিশিরাতে তিনি রেশমীকে ডেকে তুলছেন কথা বলার জন্যে। ডেকে তোলার জন্যে কোন অজুহাত থাকলে ভাল হত। চায়ের পিপাসা হচ্ছে। এই অজুহাতে কি ডাকা যায় না?

ফজলুল করিম  সাহেব মশারীর ভেতর থেকে বের হলেন। খাটের পাশে  রাখা চেয়ারের সঙ্গে ধাক্কা লেগে শব্দ হয়। ভালই হল শব্দ উব্দ শুনে যদি রেশমীর ঘুম ভাঙ্গে। তিনি হাত দিয়ে চেয়ার টানলেন আরো শব্দ হল। দরজার সিটকিনি খুললেন। বারান্দায় বেশ খানিকক্ষণ বসে থাকবেন, বৃষ্টির শব্দ শুনবেন।

বৃষ্টির ছাটে বারান্দায় রাখা ইজিচেয়ারের কাপড় ভিজে গেছে। ভেজা কাপড়ের উপরই বসে থাকতে হবে। ব্যাঙ ডাকছে। আচ্ছা ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী কি? শব্দটা মনে পড়ছে না কেন? ফজলুল করিম সাহেব ভুরু কুঁচকে বসে আছেন। ইংরেজীটা যদি মনে পড়ে। বয়সের সমস্যা শুরু হয়েছে। স্মৃতি নষ্ট হচ্ছে।

ফজলুল করিম সাহেব অপেক্ষা করছেন। ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী মনে পড়ার অপেক্ষা এবং সেই সঙ্গে রেশমীর জন্যে অপেক্ষা। তাঁর মন বলছে রেশমী ঘুমায় নি। ঘুমুলেও সাড়া শব্দে ঘুম ভেঙ্গেছে। রেশমী উঠে আসবে।

বৃষ্টির ছাটে বসে থাকার জন্যে রাগারাগি করবে। তখন তিনি রেশমীকে চা করতে বলবেন। চা খেতে খেতে গল্প করবেন। বয়সের অনেক লক্ষণের। একটি হল-~-ঘুম কমে যায়। মাঝ রাতে কারো সঙ্গে গল্প করতে ইচ্ছে করে।

তিনি বসেই রইলেন। রেশমী এল না। বৃষ্টির বেগ কখনো কমছে, কখনো বাড়ছে। ব্যাঙের ডাকের কোন উঠা নামা নেই। ফজলুল করিম সাহেব–জবুথবু হয়ে বসে আছেন। ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী কি ভাবতে ভাবতে বৃষ্টি দেখছেন।

মমিন ট্রেন থেকে নামল ঘোর বৃষ্টিতে। তার হাতে একটা সুটকেস, ট্রেনে দুটা প্রকান্ড বোচকা পড়ে আছে–নামাতে হবে। তার একার পক্ষে নামানো সম্ভব না। সে নেমেছে কুলীর সন্ধানে। নেমেই সে তার বোকামী টের পেল। এইসব গ্রামের মায়ে খেদানো, বাপে তাড়ানো টাইপ ষ্টেশনে কুলী থাকার কোন কারণ নেই। কুলী কুলী বলে চেঁচামেচি করতে করতে ট্রেন ছেড়ে দেবে। গার্ড সাহেব জানালা দিয়ে মাথা বের করে ফেলেছেন।

মমিন সুটকেস প্লাটফরমে নামিয়ে আবার ট্রেনে উঠল। মন পড়ে রইল প্লটফরমে। স্যুটকেস কেউ নিয়ে পালিয়ে যাবে নাতো। কাপড় চোপড় যা আছে সবই স্যুটকেসে।আমি জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাই স্কুলের হেড মাষ্টার। ফজলুল করিম। আপনার জিনিসপত্র কি আছে দিন।মমিন এক ঝলক তাকিয়ে দেখল। সৌজন্য আলাপ পড়ে হবে আগে মালপত্র নামানো যাক। মমিন বলল, স্যার এই পুটলিটা একটু ধরুন।বেঞ্চের নীচ থেকে পুটলি টেনে বের করা যাচ্ছে না। এমন ওজন।

ফজলুল করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, কি আছে এর মধ্যে?স্যার বই।ফজলুল করিম সাহেব সঙ্গে সঙ্গে তৃপ্তির হাসি হাসলেন। যে শিক্ষকের এত বই সে ভাল শিক্ষক না হয়েই যায় না। তিনি মনে মনেই বললেন–গুড, ভেরী গুড।মমিন বলল, ট্রেন কি ছেড়ে দিচ্ছে স্যার?ছাড়লেও নামতে পারবেন। গ্রামের ষ্টেশন চলন্ত ট্রেনেই লোকজন ওঠানামা করে।একটা পুটলি বের হয়েছে। মমিন দ্বিতীয় পুটলি ধরে টানাটানি করছে। ফজলুল করিম বললেন, এর মধ্যেও কি বই?জ্বি স্যার।

ফজলুল করিম সাহেব আবারো মনে মনে বললেন, গুড ভেরী গুড। ছেলেটি লম্বা, অতিরিক্ত রকমের রোগা, ভাবভঙ্গি দেখে মনে হয় রাগী হবে। হোক। রাগী শিক্ষকই ভাল। ছাত্ররা ভয় পাবে। ভয়ের সঙ্গে শিক্ষার সম্পর্ক আছে। অদির করে কোলে বসিয়ে শিক্ষা হয় না। প্রাচীন কালে গুরুগৃহে কঠিন শাসন ছিল।

স্কুল স্টেশন থেকে কতদূর?আছে সামান্য দূর। পাঁচ মাইলের কম।যাব কি ভাবে?আগে রিকশায় যাওয়া যেত। বর্ষা শুরু হওয়ায় রিক্সা বন্ধ। হেঁটেই যাতায়াত করতে হয়।বলেন কি?রোজ রোজতো আর স্টেশনে আসা হয় না।

ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে। বাইরে ঝুম বৃষ্টি। ফজলুল করিম নতুন সায়েন্স টিচারকে নিয়ে স্টেশনের পাশের টি স্টলে চা খেতে ঢুকেছেন। বৃষ্টি না ধরা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। একটা মাত্র ছাতা। দুজন এই ছাতায় কুলুবে না। ফজলুল করিম সাহেব লক্ষ্য করলেন নতুন টিচার বেশ আগ্রহ নিয়ে বৃষ্টি দেখছে। নিশ্চয়ই শহুরে ছেলে। গ্রামের বর্ষা দেখেনি। শহুরে ছেলে হলেই ভাল। এরা গ্রাম পছন্দ করে। হয়ত স্কুলে টিকে যাবে। গ্রামের শিক্ষিত ছেলেপুলেদের গ্রাম বেশী অপছন্দ। তারা শুধু খুঁজে শহর।

ফজলুল করিম ঝুঁকে এসে বসলেন, আপনি কি গ্রামে ছিলেন কখনো?জ্বি-না।তাহলে ভাল লাগবে। পল্লীগ্রামের বর্ষা সুন্দর।স্কুলটা কেমন?স্কুলটাও সুন্দর। প্রাচীন স্কুল।সেই সুন্দর জানতে চাচ্ছি না। বেতন টেন রেগুলার পাওয়া যাবে? শুনেছি গ্রামের স্কুলের বেতন খুবই অনিশ্চিত ব্যাপার?ফজলুল করিম সাহেব জবাব দিলেন না। চা খাবার ব্যাপারে অতিরিক্ত মনোযোগী হয়ে পড়লেন। স্কুলের অবস্থা শুধু যে ভাল না, তাই না–স্কুলের অবস্থা শোচনীয়। এই খবর দিয়ে শুরুতেই ভড়কে দেবার দরকার কি?

স্যার কিছু বলছেন না যে স্কুলের অবস্থা কেমন?আছে মোটামুটি। তবে ইনশাআল্লাহ্ অবস্থা ভাল হবে।কি ভাবে ভাল হবে?স্কুলের নাম ডাক ছড়ালেই ছাত্র আসতে থাকবে।মমিন বিস্মিত হয়ে বলল, ছাত্র সব চলে গেছে নাকি?না না তা না। আসুন বৃষ্টি কমেছে, রওনা দেয়া যাক। জিনিস পত্র থাকুক, পরে নোর ব্যবস্থা করব।আমার থাকার ব্যবস্থা কোথায় হয়েছে?

আপাতত ইরতাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে থাকবেন। অতি সজ্জন। আরবী এবং ইসলামিয়াতের শিক্ষক। খাওয়া দাওয়া উনার এখানে থাকা খাওয়ার কোন খরচ নাই।কেন?পল্লীগ্রামতো–এখানে শিক্ষকদের খুব মর্যাদা। সভ্রান্ত ব্যক্তিরা নিজেদের বাড়িতে শিক্ষকদের রাখেন। আদর যত্ন করেন।জায়গীর? বিনিময়ে প্রাইভেট টিউশনি?অনেকটা সে রকমই। তবে আপনাকে ছাত্র পড়াতে হবে না।মামুন হতাশ গলায় বলল, কিছু মনে করবেন না স্যার অবস্থাতো আমার কাছে মোটেই সুবিধার মনে হচ্ছে না। মনে তো হচ্ছে পেটে ভাতে চাকরি।

সরকারী ডি এ আছে। ছাত্রদের কাছ থেকে কিছু কালেকশন হয়। বাজার কমিটির চাঁদা…. তাছাড়া পল্লীগ্রাম খরচও তো তেমন নেই।আবার ঝেঁপে বৃষ্টি এসেছে। একটা ছাতায় বৃষ্টি মানছে না। মামুন বলল, ছাতা বন্ধ করে ফেলুন স্যার। আধাভেজা হয়ে যাবার চেয়ে পুরোপুরি ভিজে যাওয়াই ভাল। আমারতো বৃষ্টিতে ভিজতে ভালই লাগছে।

ফজলুল করিম সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। নতুন সায়েন্স টিচার টিকে যাবে বলে মনে হচ্ছে। এমন ঘন বর্ষণে ভিজতে যার খারাপ লাগছে না তার হয়ত কোন কিছুতেই খারাপ লাগবে না। কোন সায়েন্স টিচারই এই স্কুলে টিকে না। গত একবছরে তিনজন চলে গেল।

মামুন সাহেব।জ্বি স্যার।আপনার রেজাল্টতো খুব ভাল। এমএসসিতে ফার্স্ট ক্লাশ। গ্রামের স্কুলে আসতে রাজি হলেন ব্যাপারটা কি?ইচ্ছা করেই রাজি হয়েছি। গ্রামের দিকে থাকব নিরিবিলিতে পড়াশোনা করব। আমি বি সি এস দিচ্ছি। বই পত্র নিয়ে এসেছি।ও আচ্ছা। বি সি এস পাশ করলে চলে যাবেন।অবশ্যই। তবে যে কদিন আমি থাকব–ঠিকমতই থাকব। আমি ভাল শিক্ষক।

করিম সাহেবের মন খারাপ হয়ে গেল। এও থাকবে না। ভাল স্কুলের পূর্ব শর্ত হল ভাল শিক্ষক। দালান কোঠায় স্কুল হয় না। স্কুল হয় শিক্ষকে। মামুন বলল, ঠাণ্ডায় কাহিল হয়ে পড়েছি। স্যার যদি অনুমতি দেন একটা সিগারেট ধরাই।অবশ্যই অবশ্যই সিগারেট ধরাবেন এতে কি। আপনি আমার সহকর্মী।সহকর্মী হলেও আপনি বয়োজৈষ্ঠ। স্যার কি ধুমপান করেন?জ্বি–না আগে করতাম। হঠাৎ এক সময় মনে হল ছাত্ররাই শিক্ষকদের দেখে শিখবে। আমাকে দেখে যদি সিগারেট খাওয়া শিখে সেটা ঠিক হবে না। ছেড়ে দিলাম।

বলেন কি?মাঝে মধ্যে খাই না যে তা না–হঠাৎ হঠাৎ খাই।স্যার, এখন কি একটা খাবেন। আশে পাশে ছাত্র নেই–কেউ দেখবে না।না না। ইচ্ছা করছে না।ইচ্ছা করলেও পারবেন না। এই বৃষ্টির মধ্যে সিগারেট না ভিজিয়ে খাওয়া সহজ কর্ম না। শুধু প্রফেশনালরা পারবে। হা হা হা হা।করিম সাহেব বিস্মিত হয়ে নতুন সায়েন্স টিচারের হাসি শুনছেন। এমন প্রবল হাসি হাসার মত কি ঘটনা ঘটেছে তাও তিনি বুঝতে পারছেন না।মামুন সাহেব।

জ্বি স্যার।ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী জানেন না-কি?মামুন বিস্মিত হয়ে বলল জ্বি–না জানি না। ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী দরকার কি?মামুন এই প্রথম হেডমাষ্টার সাহেবকে ভালমত লক্ষ্য করল। পাঁচ মাইল হেঁটে ইনি তাকে নিতে এসেছেন। এতক্ষণ ব্যাপারটা তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নি, এখন মনে হচ্ছে। স্কুলের দপ্তরীকেও তো উনি পাঠাতে পারতেন। বৃদ্ধ বয়স্ক একজন মানুষ ঝড় বৃষ্টির দিনে এতটা কষ্ট করবেন কেন? স্বার্থ ছাড়া মানুষ সচরাচর কষ্ট করতে রাজি হয় না। এই মানুষটার স্বার্থ কি?

মামুন বলল, আর আপনি নিজে আমাকে নিতে এসেছেন কেন? কোন দরকার ছিল না।করিম সাহেব কিছু বললেন না। তাঁর মাথায় ব্যাঙের ডাকের ইংরেজী কি সেটাই ঘুরছে। বয়সের লক্ষণ। বেশী বয়সে মাথায় কিছু ঢুকে গেলে সেটা বেরুতে চায় না। প্যাচ কেটে যাওয়া রেকর্ডের মত এক জায়গায় বাজতে থাকে।স্যার আপনার স্কুলের ছাত্র কতজন?একশ তেইশ। আগামী কাল একজন ভর্তি হবে–একশ চব্বিশ হবে।স্যার কিছু মনে করবেন না–ব্যক্তিগত কৌতুহল থেকে প্রশ্নটা করছি আপনি কি এই একশ চব্বিশ জন ছাত্রের নাম জানেন?ফজলুল করিম সাহেব তৎক্ষণাৎ বললেন, জানি।মামুন সিগারেট ফেলে দিতে দিতে বলল, আমিও এ রকমই অনুমান করেছিলাম।

 

Read more

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল-পর্ব-০৪- হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment