• Wednesday , 3 March 2021

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল-পর্ব-০৪- হুমায়ূন আহমেদ

মওলানা ইরতাজউদ্দিন হেডমাস্টার সাহেবের ঘরে ঢুকলেন। তার পেছনে বোকা বোকা চেহারার এক যুবক। যুবকের গা থেকে বিড়ির কড়া গন্ধ আসছে। তার দাঁত হলুদ হয়ে আছে। দাঁত মাজার ব্যাপারটি সে সম্ভবত জানে না, আর জানলেও তার প্রয়োজন বোধ করে না। মাথা ভর্তি চুল। সেই চুল ঘাড় পর্যন্ত নেমে এসেছে। এই চুল সে নিশ্চয়ই উকুনের চাষের জন্যে বড় করছে।

মওলানা বললেন, রহমত! স্যারকে সালাম কর।রহমত টেবিলের নিচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার ঝাপ দেয়া দেখেও ফজলুল করিম সাহেব আঁৎকে উঠলেন। এর চলাফেরা, কাজ কর্ম সব কিছুর মধ্যেই পশু ভাব আছে। পশুদের গায়ে যেমন কড়া গন্ধ থাকে এর গায়েও আছে। টক টক গন্ধ।মওলানা বললেন, স্যার এর কথাই আপনাকে বলেছিলাম।কি বলেছিলেন?

ঐ যে রেশমীর সঙ্গে…ও আচ্ছা আচ্ছামোটরের ভাল মেকানিক। ওস্তাদ কারিগর। অন্যের গ্যারেজে কাজ করে, টাকা পয়সা জোগাড় করতে পারলে সে নিজেই নেত্রকোনা শহরে স্বাধীন ব্যবসা করবে।ভাল খুব ভাল।আপনাকে দেখানোর জন্যে খবর দিয়ে এনেছি।ভাল করেছেন খুব ভাল করেছেন।মওলানা রহমতের দিকে তাকিয়ে বললেন, রহমত তুমি বারান্দায় একটু দাঁড়াও আমি স্যারের সঙ্গে একান্তে দুটা কথা বলি।

রহমত তার সব কটি হলুদ দাঁত বের করে হেসে ফেলল। ফজলুল করিম সাহেব হাসি দেখেও চমকালেন। এটা তো হাসি না, যেন কামড়াতে আসছে। রহমত বারান্দায় চলে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে বিড়ি ধরাল। বিড়ির কড়া গন্ধে ঘরে থাকাই মুশকিল।মওলানা বললেন, স্যার ওকে এনেছি রেশমীকে দেখানোর জন্যে। দেখে যদি পছন্দ হয় আজ রাতেই আমি বিয়ে পড়িয়ে দেব। রহমত বৌ নিয়ে চলে যাবে।

কি বলছেন আপনি?ওর সঙ্গে এরকমই কথা হয়েছে।হুট করে বিয়ে?গরীব মানুষদের বিয়ে এরকম হুট হাট করেই হয়।এর সঙ্গে রেশমীর বিয়ে হতে পারে না।কেন?ছেলেটাকে আমার পছন্দ না।আপনার পছন্দের কথা তো এখানে আসছে না। রেশমীর পছন্দ নিয়ে কথা।ওর তো পছন্দের প্রশ্নই উঠে না। পছন্দ করার মত কি আছে এই ছেলের মধ্যে?অনেক কিছুই আছে। ছেলের রোজগার ভাল। ভাল টাকা কামায়। এই জাতীয় ছেলে নেশাভাঙ করে। তার সে বদঅভ্যাস নেই।

ফজলুল করিম সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, খামাখা একটা বিষয় নিয়ে পিড়াপিড়ি করছেন কেন? ছেলেটাকে আমার পছন্দ হয়নি। পও শ্রেণীর মানুষ বলে মনে হয়েছে। জেনেশুনে এমন একজনের সঙ্গে রেশমীর বিয়ে দেয়া যায় না। ওকে চলে যেতে বলুন।

একটু ভেবে বলুন স্যার।ভেবে বলাবলির কিছু নেই।জি আচ্ছা স্যার।স্কুলের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বিড়ি টানছে এটাও তো খুব আপত্তিজনক কথা। আমার নিষেধ আছে শিক্ষকরাও ছাত্রদের সামনে ধূমপান করবেন না। খারাপ ব্যাপারগুলি ছাত্রদের আগে আকৃষ্ট করে। আপনি বের হয়ে রহমত না কি যেন নাম, তাকে একটা কড়া ধমক দিন, তার পর চলে যেতে বলুন।

জি আচ্ছা।ওকে বিদেয় করে আসুন আপনার সঙ্গে কথা আছে।জ্বি আচ্ছা।ইরতাজউদ্দিন ফিরে এলেন। তাকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আমাদের নতুন টিচারকে কেমন লাগছে।ভাল।এক শব্দে জবাব দেবেন না। কেন ভাল সেটা বলুন।যুবক মানুষ। উৎসাহ আছে।পড়াচ্ছে কেমন?

ভাল।আপনার যে এক শব্দে জবাব দেবার একটা বিশ্রী অভ্যাস হয়েছে তার কি করা যায় বলুনতো। খোঁজ নিয়েছেন ভাল, না-কি খোঁজ না নিয়েই বলেছেন ভাল।খোঁজ নেই নাই, অনুমানে বলেছি।অনুমানে কিছু বলবেন না। যা বলবার অনুসন্ধানের পর বলবেন। প্রথমে অনুমান তারপর অনুসন্ধান এই কাজটা করবেন না। প্রথমে অনুসন্ধান। তারপর অনুমান। বুঝতে পারলেন?জ্বি স্যার। এখন যদি অনুমতি দেন উঠি।আচ্ছা যান। ভাল কথা ব্যাঙের ডাকের আরবী কি বলুনতো।

বুঝতে পারছি না কিসের আরবী?ব্যাঙের ডাকের।ইরতাজউদ্দিন সাহেব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে আছেন ব্যাপারটা ধরতে পারছেন না। হেডমাস্টার সাহেব আগ্রহ নিয়ে তাকাচ্ছেন। মনে হচ্ছে সত্যি সত্যি তিনি ব্যাঙের ডাকের আরবী জানতে আগ্রহী। মানুষটার মাথায় কি গোলমাল হচ্ছে? মাথার অসুখ হঠাৎ করে শুরু হয় না। আস্তে আস্তে শুরু হয়।

সেকেন্ড পিরিয়ড শুরু হবার ঘণ্টা পড়ল। ঘণ্টা ঠিকমত পড়ল। সুন্দর আওয়াজ হল। হরিপদ স্কুলের ঘণ্টা খুঁজে পেয়েছে। ফজলুল করিম সাহেব ফাইন মাফ করে তাকে চিঠি দিয়েছেন। সেকেন্ড পিরিয়ডে ক্লাস নাইনের সঙ্গে তাঁর ক্লাস-ইংরেজী ফাস্ট পেপার। আজ পড়াবেন কবিতা।

তেত্রিশজন ছাত্র ছিল ক্লাসে, আজ সেখানে বারজন ছাত্র বসে আছে। সব কটা বেঞ্চ ফাঁকা। নীলগঞ্জ হাইস্কুল চালু হয়েছে। ছাত্ররা দল বেঁধে চলে যাচ্ছে। মাত্র দুমাসে এই অবস্থা। সারভাইভেল ফর দি ফিটেস্ট। যে ফিট সে টিকে থাকবে। যে আনফিট তাকে চলে যেতে হবে। এটা জগতের কঠিন নিয়মের এক নিয়ম।

ফজলুল করিম সাহেব ডায়াসের চেয়ারে চুপচাপ বসে রইলেন। পড়ানো শুরু করতে ইচ্ছে করছে না। ক্লাস ভর্তি থাকবে ছেলেমেয়ে তবেই না পড়িয়ে আরাম। অল্প কটা ছেলেকে তিনি কি পড়াবেন? তিনি হাসতে চেষ্টা করলেন। পড়ানো শুরু করার আগে শিক্ষকরা হাসি হাসি মুখে থাকলে ছাত্ররা ভরসা পায়। ছাত্ররা তেমন ভরসা পেল বলে মনে হল না। তিনি বললেন, সবাই দেখি নতুন স্কুলে যাচ্ছে। তোমরা যাচ্ছি না কেন?

একজন বলল, আমরা স্যার যাব না।ফজলুল করিম সাহেবের ভুরু কুঁচকে গেল। ছেলেটা কথা বলেছে বেয়াদবের মত। উঠে দাড়ায়নি। স্যারের সঙ্গে কথা বললে–উঠে দাড়াবে। যা বলবে স্পষ্ট করে বলবে।তোমার নাম ফরহাদ উদ্দিন না?জ্বি স্যার।শোন ফরহাদ উদ্দিন। তুমি যে বললে, তোমরা যাবে না। শুনে আমি সঙ্গত কারণেই খুশি হয়েছি। কিন্তু কথাগুলি তুমি বলেছে বসে বসে। অত্যন্ত বেয়াদবের মত কাজ করেছ। ভবিষ্যতে আর কখনো করবে না।

জি আচ্ছা স্যার।এখন বল তোমরা যাবে না কেন?এই স্কুলই ভাল।নীলগঞ্জ স্কুল যে খারাপ এটা তো তুমি বলতে পার না। কারণ তুমি ঐ স্কুলে পড়নি। পড়েছ?জি না।তাহলে বললে কেন এই স্কুলই ভাল? যা মনে আসে তাই বলে বসবে। কথা বলার আগে অবশ্যই আমাদের অনেক সাবধান হতে হবে। কথা বলাটাও শিক্ষারই একটা অঙ্গ। মনে থাকবে?জ্বি স্যার!আজকে আমরা কি পড়ব?

ইংরেজী কবিতা।কবিতার নাম কি?

The Sands of Dee.

যে কবি কবিতাটা লিখেছেন তার নাম কি? কেউ জান না। জানা উচিত ছিল না-কি? কবির নাম চার্লস কিংসলে। সবাই এক সঙ্গে বল চার্লস কিংসলে।সবাই এক সঙ্গে বলল, চার্লস কিংসলে।আবার বল।ছাত্ররা আবার বলল।

ফজলুল করিম সাহেব বোর্ডের কাছে গেলেন। চক দিয়ে বড় বড় করে লিখলেন Charles Kingsley.কবির নামের নিচে লিখলেন কবিতার নাম The sands of Dee. প্রথমে স্রষ্টা তারপর তার সৃষ্টি। কাজটা কি ঠিক করলেন? সৃষ্টি কি বেশির ভাগ সময়ই স্রষ্টাকে ছাড়িয়ে যায় না? জীবনকৃষ্ণ বাবুর চেয়েও কি জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুল অনেক গুরুত্বপূর্ণ নয়?তিনি মিষ্টি গলায় কবিতার প্রথম চার লাইন আবৃত্তি করলেন।

O Mary, go and call the cattle home.

And call the cattle home,

And call the cattle home,

Across the sands of Dee.

বাবারা বল Dee মানে কি?নদীর নাম স্যার।হ্যাঁ। ইংল্যাণ্ডের একটা নদীর নাম। লিভারপুলের কাছে এই নদী সমুদ্রে পড়েছে। এই কবিতায় অনুপ্রাণিত হয়ে আমাদের দেশের এক কবিও অসাধারণ একটা কবিতা লিখেছিলেন। তোমরা কেউ সেটা জান?ছাত্ররা চুপ করে আছে। কেউ জবাব দিচ্ছে না। ফজলুল করিম সাহেব বিষণ্ণ গলায় বললেন, কবিতাটা তোমরা ক্লাস সেভেনে পড়েছ। তোমাদের পাঠ্য ছিল

শোন মা আমিনা, রেখে দে রে কাজ, ত্বরা করে মাঠে চল

এল মেঘনায় জোয়ারে বেলা এখনি নামিবে ঢল।

নদীর কিনারা ঘন ঘাসে ভরা,

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় ত্বরা,

করিস না দেরি আসিয়া পড়িবে সহসা অথই জল।

মাঠ থেকে গরু নিয়ে আয় তৃরা মেম্বনায় নামে ঢল।

ফজলুল করিম সাহেব অন্যমনস্ক হয়ে পড়লেন। ভাল লাগছে না। কিছু ভাল লাগছে না। ঘণ্টা পড়ার জন্য অপেক্ষা করছেন। তিনি বোর্ডের দিকে তাকালেন। ভুল করেছেন। কবির নামের আগে কবিতার নাম থাকা উচিত ছিল।

আজ বৃহস্পতিবার হাফ স্কুল ফজলুল করিম সাহেব ঠিক করে ফেললেন বাসায় যাবেন না। স্কুলেই সন্ধ্যা পর্যন্ত থাকবেন। রেশমী মন খারাপ করবে। করুক। দুটার দিকে ডাক আসে। ডাকের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। সরকারি অনুদানের চিঠি পেয়েছেন। চেক আসছে না। মনজুরকে কয়েকটা চিঠি দিয়েছেন। মনজুর চিঠির জবাব দিচ্ছে না। একবার ঢাকা যাওয়া উচিত।

গত মাসে শিক্ষকদের বেতন দিতে পারেন নি। সরকারী ডি, এর টাকাটা দিতে পারলেও হত। সেই টাকাও আসেনি। স্কুলের এমন কোন ফান্ড নেই যে সেখান থেকে টাকা ধার করেন। এত দিনের পুরানো একটা স্কুল অনার বোর্ডের দিকে তাকালে মন ভরে যায়। কত বিখ্যাত মানুষ এই স্কুল তৈরি করেছে।

ফজলুল করিম সাহেব ছাত্রদের দিকে তাকালেন। তারা এক দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। তিনি বললেন, আজ পড়াতে ভাল লাগছে না। খুব মাথা ধরেছে …

বলেই তিনি অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। তাঁর মাথা ধরেনি। ছাত্রদের মিথ্যা কথা বলা হল। মাথা না ধরলেও শারীরিকভাবে স্বস্তিবোধ করছেন না। গরম লাগছে। কোটের কারণে গরম লাগছে বোধ হয় …।

ফজলুল করিম সাহেব ক্লাস শেষ হবার ঘণ্টার জন্যে অপেক্ষা করতে লাগলেন। সময় কাটছেই না।স্কুল ছুটি হয়ে গেছে। শিক্ষকরা সবাই চলে গেছেন। শুধু মাহবুব সাহেব এবং বিনয় বাবু বসে আছেন। বিনয় বাবু গোপনে কিছু কথা বলতে চান। তিনি টিচার্স কমনরুমে অপেক্ষা করছেন। মাহবুব সাহেব ফজলুল করিম। সাহেবের সঙ্গে কথা বলছেন। তাঁর কথা শেষ হলেই বিনয় বাবু ঢুকবেন।

মাহবুব সাহেব বললেন, স্যার বেতনের কি ব্যবস্থা?ফজলুল করিম হাসিমুখে বললেন, হবে হবে।কি ভাবে হবে?সরকারি ডি এর জন্য আমি নিজেই ঢাকা যাব।কবে যাবেন?দুই একদিনের মধ্যে।সরকারি ভি, এ টা না হয় হল। বাকি বেতনের কি করবেন?বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে সাহায্যের জন্যে যাব। স্কুলের প্রাক্তন ছাত্র …বাজার সমিতি গত বছরের টাকাটা দেয় নি …ওদের…ওদের কথা ভুলে যান। ওরা কিছু দিবে না।দিবে না কেন?

আর কত দিবে। দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেছে। ওদের একটা প্রস্তাব আছে। স্কুলের কিছু জমি তারা কিনে নিতে রাজি আছে, এ থেকে কিছু টাকা পাওয়া যায়।সেটা সম্ভব না। জীবন বাবুর দানপত্র করা জমি বিক্রি করা যাবে না।তাহলে সমস্যার সমাধান কি?আছে সমস্যার সমাধান অবশ্যই আছে।সেটা কি বলুন।স্কুলের ছাত্র বাড়বে, তাদের বেতন থেকে যে আয় হবে…ছাত্র বাড়বে কিভাবে?

লোকে যখন জানবে এটা ভাল স্কুল তখন দূর দূর থেকে ছাত্ররা আসবে। হোস্টেলে থাকবে…মাহবুব সাহেব হঠাৎ উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, স্যার উঠি। হেডমাস্টার সাহেব তৎক্ষণাৎ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, জ্বি আচ্ছা জ্বি আচ্ছা।দুপুরে কিছু খাওয়া হয়নি, ক্ষিধে জানান দিচ্ছে। বয়স হয়ে গেলে ক্ষিধের কষ্টই প্রবল হয়ে দাড়ায়। হরিপদকে পাঠিয়ে কোন খাবার টাবার আনলে হত। একটা কলা দুটা বিসর্কিট….

বিনয় বাবু বললেন, স্যার আসব?আসুন বিনয় বাবু। আপনি এখনো যাননি?আজ্ঞে না। আপনার সঙ্গে সামান্য কথা ছিল।বলুন।বিনয় বাবু বসতে বসতে বললেন, আমার সংসারের অবস্থার কথা তো স্যার আপনি জানেন, অভাবে অনটনে পর্যন্ত হয়েছি। ঘরে বিবাহযোগ্যা কন্যা। বিবাহ দিতে পারছি না। পণ ছাড়া হিন্দু মেয়ের বিয়ে হয় না। এক লাখ দুলাখ টাকা পণ চায়। কোথায় পাব এত টাকা?

জ্বি তা তো ঠিকই। বড়ই দুঃসময়। সবার জন্যই দুঃসময়। তবে পৃথিবীর সব দুঃসময়ই সাময়িক। শীতের পরে বসন্ত আসে এটা জাগতিক নিয়ম।জাগতিক নিয়ম সবার জন্য না স্যার। আমার বেলায় শীতের পর শীত আসে, তার পর আসে আরো শীত। স্যার আমি জানি আপনি মনে কষ্ট পাবেন কিন্তু না বলে পারছি না …

বলুন কি ব্যাপার?বিনয় বাবু কিছু বললেন না। পাঞ্জাবীর কোণায় চোখ মুছতে লাগলেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আপনি কি নীলগঞ্জ স্কুলে যোগ দিয়েছেন?বিনয় বাবু হা সূচক মাথা নাড়লেন। ফজলুল করিম সাহেব বললেন, আপনাকে ছাড়া আমি স্কুল চালাব কিভাবে? আপনার মত অংকের শিক্ষক আমি কোথায় পাব?নতুন শিক্ষক যিনি এসেছেন, মামুন সাহেব তিনি ভাল অংক জানেন। শুধু ভাল না। খুব ভাল। আমি ক্লাশ টেনের ছাত্রদের কাছ থেকে খোঁজ নিয়েছি।ও আচ্ছা।

কারো জনোই কিছু আটকে থাকে না স্যার। আমি যা করেছি না পেরে করেছি। এই অপরাধের জন্যে নরকে আমার স্থান হবে। তা হোক, শুধু আপনি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি ঈশ্বরের ক্ষমা চাই না। আপনার ক্ষমা চাই।আপনি চলে গেলে আরো অনেকেই যাবে।তা যাবে।স্কুলটা কি উঠে যাবে?না উঠবে না। আপনার মত মানুষ থাকলে স্কুল উঠবে না। স্যার উঠি।

বিনয় বাবু হঠাৎ নিচু হয়ে ফজলুল করিম সাহেবকে প্রণাম করতে গেলেন। ফজলুল করিম সাহেব আঁৎকে উঠে বললেন, করেন কি, করেন কি, বয়সে আপনি আমার বড়ই হবেন।বিনয় বাবু ধরা গলায় বললেন, আমি তো স্যার আপনাকে প্রণাম করছি। আপনার ভেতর যিনি বাস করছেন আঁকে প্রণাম করছি। তিনি নমস্য।সরকারি চিঠি আজকের ডাকেও আসেনি। ফজলুল করিম সাহেব তাঁর বড় মেয়ের একটি চিঠি পেলেন। মেয়ের চিঠিটা একটু যেন রহস্যময়। মেয়ে লিখেছে–

বাবা,

আমি প্রচণ্ড ব্যস্ত থাকি বলে তোমাকে নিয়মিত চিঠি লিখতে পারি না। তবে তোমার খোঁজ খবর সব সময় রাখি। সম্প্রতি তোমার বিষয়ে কিছু অস্বস্তিকর খবর পেয়ে অত্যন্ত বিব্রত আছি। আশা করি আমি কি বলছি তুমি বুঝতে পারছ। তোমার সামাজিক মান মর্যাদার দিকে তুমি লক্ষ্য রাখবে এটা আশা করা অন্যায় না। নিঃসঙ্গ মানুষ নিজের নিঃসঙ্গতা কাটানোর জন্যে মাঝে মাঝে উদ্ভট সব কান্ড করে। তোমার এই বয়সে, তুমি এমন কিছু করবে না–এটুক আশা তোমার মেয়ে হিসেবে আমি অবশ্যই করতে পারি।

ফজলুল করিম সাহেব মেয়ের চিঠি কয়েকবার পড়লেন কিন্তু চিঠির মূল বিষয় ধরতে পারলেন না।সন্ধ্যা হয়ে গেছে। মওলানা ইরতাজউদ্দিন বারান্দায় আজান দিয়ে নামাজ পড়ছেন। হেড মাস্টার সাহেব তার ঘরে একা একা বসে আছেন। মওলানার নামাজ শেষ হলে এক সঙ্গে বেরুবেন।দপ্তরী এসে ঢুকল। করিম সাহেব বললেন, কিছু বলবি? হরিপদ মাথা চুলকে বলল, নতুন মাস্টার সাব লাইব্রেরি ঘরের বেবাক বই নামাইয়া একটা বিষয় করতাছে।

কি করছেন?এই ঘাটাঘাটি।করুক। বই সাজিয়ে রাখার জন্যে না। পড়ার জন্য। ঘাটাঘাটি করার জন্য। বুঝলি?জ্বি স্যার।এর মধ্যেই খবর হয়ে গেছে। মামুন সাহেব অতি ভাল শিক্ষক। একজন ভাল শিক্ষক ১০০ হাতীর সমান।ফজলুল করিম সাহেবের বিষণ্ণ ভাবটা কেটে যাচ্ছে। নতুন শিক্ষক স্কুলের লাইব্রেরীর বই ঘাটাঘাটি করছেন। খুবই ভাল লক্ষণ। স্কুল লাইব্রেরীর দায়িত্ব তাকে দিয়ে দেয়া যায়।

বিনয় বাবুর জন্য মনটা খারাপ লাগছে। অতি সজ্জন। অংকের জাহাজ। যে কোন অংক মুখে মুখে করে ফেলতে পারেন। এ রকম শিক্ষক যে কোন স্কুলের জন্যে স্তম্ভের মত।মাহবুব সাহেবের বাড়িতে আজ মামুনের রাতের খাবার দাওয়াত। মাহবুব সাহেব বলে দিয়েছেন, সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় চলে আসবেন গল্পগুজব করব। বাড়িতে টিভি আছে ব্যাটারীতে চলে। আজ আবার নাটক আছে। মজা করে নাটক দেখবেন।

মামুন বলল, আমি যথাসময়ে উপস্থিত হব। তবে নাটক দেখব না।টিভির নাটকগুলিতো অতি উত্তম। দেখবেন না কেন?ভাল লাগে না।ভাল না লাগলে দেখবেন না। আমরা বারান্দায় বসে গল্প করব। একবার সাপের হাতে জীবন যেতে বসেছিল গল্পটা আপনাকে বলা হয় নাই। বিষধর সর্প।জ্বি আচ্ছা আপনার বিষধর সর্পের গল্পও শুনব। দাওয়াত কি আমি একা যায়? ইরতাজউদ্দিন সাহেব যাবেন না? দুজন এক সঙ্গে থাকি এর মধ্যে আমি একা দাওয়াত খেতে যাওয়া ব্যাপারটা খারাপ দেখায় না?

আসুন উনাকেও নিয়ে আসুন। অসুবিধা কিছু নাই। খাওয়া দাওয়াতো কোন ব্যাপার না–গল্প গুজব করা।ইরতাজউদ্দিন সাহেব আসতে রাজি হলেন না। মামুন একাই উপস্থিত হল। মাহবুব সাহেবের বাড়িটা সুন্দর। অনেকখানি জায়গা নিয়ে হাফ বিল্ডিং। উপরে টিনের ছুদি। বাড়ির সামনে দেশী গাছ গাছড়ার বাগান। মামুন মুগ্ধ হয়ে বলল, এটা দেখি ইন্দ্রপুরীর বাগান।

মাহবুব সাহেব নির্বিকার ভঙ্গিতে বললেন, কোন মতে বেঁচে থাকা। বাড়ির পেছনে পুকুর আছে। পুকুরটা সুন্দর। গত বছর ঘাট বাধিয়ে দিয়েছি। দেখাব আপনাকে। বর্শি বাওয়ার অভ্যাস আছে?জ্বি-না?অভ্যাস থাকলে বর্শি বাইতে বলতাম। দুবছর আগে রুই মাছের পোনা ছেড়ে ছিলাম বড় হয়েছে।আপনিতো রাজার হালে আছেন মনে হয়।আর রাজার হাল। পল্লীগ্রামে পড়ে আছি। নানা সমস্যা।

কি সমস্যা?পল্লীগ্রামের সমস্যা একটা থাকে না। পল্লীগ্রামের সমস্যা থাকে এক হাজার একটা। স্কুল উঠে যাচ্ছে–এতদিনের পুরনো স্কুল। দীর্ঘদিন থেকে যুক্ত স্কুলের সঙ্গে এটাওতো বড় সমস্যা।স্কুল উঠে যাচ্ছে না-কি?জি। আপনি নতুন জয়েন করেছেন। আপনাকে বলা ঠিক না। তবে এইসবতো গোপন রাখার জিনিস না। আজ হোক, কাল হোক আপনি জানবেন।স্কুল উঠে যাচ্ছে কেন?

নানান কারণ আছে। হেড মাস্টার সাহেবও একটা কারণ। স্কুলের হেড মাস্টার হল নৌকার কান্ডারীর মত। নৌকার কান্ডারি যদি ঠিক না থাকে তাহলে নৌকাতো ভুববেই।হেড মাস্টার সাহেবের সমস্যাটা কি?

হুজুগে লোক আর কি? হুজুগে কি আর স্কুল টিকে? তাছাড়া বয়স হয়েছে। বয়স হলে ভীমরতি হয় বলে প্রবাদ আছে, উনারও তাই হয়েছে।ভীমরতি হয়েছে বলতে চাচ্ছেন?অনেকটা সে রকমই। উনার সম্পর্কে অনেক কেলেংকারী ধরণের কথা চালু আছে–সে সব কথা ঠিক হবে না। বাড়ির দাসির সঙ্গে সম্পর্ক।বুঝলাম না কি বলতে চাচ্ছেন শারীরিক সম্পর্ক?লোকে তো তাই বলে। একজন স্কুলের হেড মাস্টারের সম্পর্কে যদি এই জাতীয় গুজব চালু থাকে তাহলে কি আর স্কুল টিকে?

আপনারা উনাকে সরিয়ে নতুন কাউকে নিয়ে আসেন না কেন? আপনি নিজেওতো হেড মাস্টারের দায়িত্ব নিতে পারেন। আপনার সম্পর্কে নিশ্চয়ইএই জাতীয় কোন জব নেই?আরে ছিঃ ছিঃ কি বলেন?স্কুল টিকিয়ে রাখতো অনেক জরুরী।নতুন একটা স্কুল চালু হয়েছে। এইটাই আশার কথা। ভাল স্কুল। ষ্টাফ ভাল। আমাদের স্কুলের কিছু একসেলেন্ট ষ্টাফ ঐ স্কুলে চলে গেছেন। ভাল বেতন। ষ্টাফ কোয়ার্টার! কেন যাবে না বলুন।

আপনি যাচ্ছেন না?আমাকে হেড মাষ্টারের দায়িত্ব নিতে বলছে।নিচ্ছেন না কেন?এতদিনের পুরনো একটা স্কুল। বললেইতো ছাড়া যায় না।মায়ার কারণে এখনো লেগে আছেন?তা বলতে পারেন। আপনার ক্ষিধে হলে বলবেন, খাওয়া গরম করতে বলব। আমি আবার ঠাণ্ডা কিছু খেতে পারি না।আমি ঠাণ্ডা গরম সবই খেতে পারি। আপনার যখন ক্ষিধে হবে খাবার দিতে বলবেন।

মাছ ভাতের ব্যবস্থা করেছি। শহুরে মানুষ। মাছ ভাতটাই বেশী পছন্দ করে। গো মাংসের সন্ধান করেছিলাম। পাইনি। আমার স্ত্রী আবার গো মাংসের খুব ভাল পাক করেন। একদিন খাওয়াব আপনাকে। ছোট ছেলের এখনো আকীকা হয়নি। ভাবছি তার আকীকায় একটা গরু কোরবানী দেব।বাংলাদেশে আপনিই সম্ভবত সবচে ধনবান এসিসটেন্ট হেডমাস্টার।

এই কথায় মাহবুব সাহেব আনন্দিত হলেন। আনন্দ তার চোখে মুখে ফুটে উঠল। মামুন বলল, আপনার মত এমন ক্ষমতাবান লোক থাকতে স্কুলটা জলে ভেসে যাবে এটা কেমন কথা-…..হেড মাস্টার সাহেবের সন্যেই কিছু করা গেল না।উনাকে বিদেয় করে দিন। স্কুল ইম্পর্টেন্ট। হেড মাস্টারতো ইম্পর্টেন্ট না।বিদায় করে দিতে বললেইতো করা যায় না।যায় না কেন? চরিত্রহীন একজন মানুষ……।

আসুন খেতে আসুন। খেতে খেতে গল্প করি। সাপের গল্পটা আপনাকে বলা হয় নাই…..।খাবার আয়োজন প্রচুর। রুই মাছের ভাজা, বড় বড় পাবদা মাছের ঝোল, টাকি মাছের ভর্তা, সরপুটি। মাছ ভাতের কথা বলা হলেও বড় জামবাটি ভর্তি মুরগীর মাংসও দেখা যাচ্ছে। মামুন বিস্মিত হয়ে বলল, করেছেন কি আপনি?

সামান্য আয়োজন। পোলাও করার ইচ্ছা ছিল, পরে ভাবলাম মাছ দিয়ে পোলাও ভাল লাগবে না। রান্না কেমন হয়েছে কে জানে আমার স্ত্রীর অবশ্যি রান্নার সুনাম আছে।রান্না অসাধারণ হয়েছে। আমি কোনদিন এত পদ নিয়ে খেতে বসেছি বলে মনে পড়ে না।খান আরাম করে খান। কেউ তৃপ্তি করে খাচ্ছে দেখতেও ভাল লাগে। ঘরে পাতা টক দৈ আছে। খাওয়ার শেষে এক বাটি টক দৈ খাবেন দেখবেন সব হজম।

খাওয়ার সময় মাহবুব সাহেব অনবরত কথা বলে গেলেন। সাপের গল্প হল, জীনের গল্প হল। তাহাজ্জুদের নামাজ একা পড়তে গিয়েছেন নামাজ শেষ করে সালাম ফিরাতে গিয়ে দেখেন ডান দিকে লম্বা একজন নামাজ পড়ছে। মাথা দে ঠেকে গেছে পরনে সফেদ ড্রেস……..

খাবার পরও অনেকক্ষণ গল্প হল। সব গল্পই স্কুল নিয়ে! হেডমাস্টার সাহেব স্কুলের কি কি ক্ষতি করেছেন মাহবুব সাহেব তার বিষদ বর্ণনা দিলেন। উঠতে উঠতে রাত দশটা বেজে গেল। মামুন বলল, আজ উঠি? যাবার সময় হেড মাস্টার সাহেব সম্পর্কে একটা ভাল কিছু বলুনতো শুনে যাই। একটা কিছু ভাল গুণতো মানুষটার আছে। আছে না?তা আছে, নীতিবান। তবে নীতিতে স্কুলের ক্ষতিই হয়েছে। লাভ কিছু হয়নি।

সেটা কি রকম।ফুড ফর ওয়ার্ক প্রোগ্রাম স্কুল একবার ১০০ বস্তা গম পেল। এটাই শুধু সমস্যা দুশ বস্তা গম পেয়েছি লিখে দিয়ে একশ বস্তা গম নিতে হবে। হেড সাহেব নিলেন না। তাঁর একটা কথা স্কুল নীতি শিক্ষার জায়গা। দুর্নীতি দিয়ে স্কুলের উন্নতির দরকার নেই। নীতি নীতি করে উনার স্কুলের লাভটা কি হল?

তাতো বটেই।যে যুগের সে বাতাস, সেই বাতাসে নৌকা চালাতে হবে না?মামুন বলল ইঞ্জিনের নৌকা হলে অবশ্যি বাতাসের ধার ধারতে হয় না। নীতিবান মানুষ হল ইঞ্জিনের নৌকা।ইঞ্জিন ঠিকই আছে। তেল নেই, ইঞ্জিন চলে না। আপনি যুবক মানুষ। মনে উৎসাহ আছে, চার মাস যখন বেতন পাবেন না তখন আর উৎসাহ থাকবে না।না থাকারই কথা।যাই হোক, আছেন যখন নিজের চোখে সব দেখবেন। সরকারী ডি এ আছে বলে কিছু শিক্ষক এখনো আছেন। ডি এ যখন থাকবে না তখন কি হবে?ডি এ থাকবে না?

থাকবে কি জন্যে ছাত্র নেই স্কুলের আবার ডি এ কি?ছাত্র কিছুতো আছে।এও থাকবে না। দেখবেন ফাঁকা স্কুল ঘরে হেড মাস্টার সাহেব বসে থাকবেন। মাছি টাছি মারবেন।কিছু করার উপায় নেই?ধ্বস নামলে কিছু করার থাকে না। ধ্বস নেমে গেছে। আপনি বাইরে থেকে এসেছেন। কিছু বুঝতে পারছেন না। গত মাসের বেতন পেয়েছেন?জি-না।কোত্থেকে পাবেন? একটা ফুটা পয়সা স্কুলের নাই। হা হা হা।মামুন বিস্মিত হয়ে বলল, আপনি এত আনন্দিত কেন? আপনিওতো স্কুলের একজন।

মাহবুব সাহেব শুকনো গলায় বললেন, হেসে ফেলেছি দেখে ভেবেছেন আনন্দিত। আসলে তা না, মনের দুঃখে হেসেছি। এক সময় এই স্কুলের কি রমরমা ছিল আর আজ কি অবস্থা। আফসোস। বিরাট আফসোস।

অত্যন্ত আশ্চর্যের ব্যাপার জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল স্কুলে আজ শিক্ষকদের বেতন হচ্ছে। তাও ভাঙ্গা বেতন না। পুরো বেতন। পুরো ব্যাপারটা শিক্ষকদের কাছে অপ্রত্যাশিত। বেতন হবে, এই সম্পর্কে হেড স্যার আগে কিছু বলেন নি। কোন আদায় পত্রও হয়নি। টাকাটা পাওয়া গেল কোথায়? কেউ এ সম্পর্কে কিছু প্রশ্ন করছে না। বেতন হচ্ছে এটাই বড় কথা। কোত্থেকে হচ্ছে, কি ভাবে হচ্ছে সেটা বড় কথা না। জানতে না চাওয়াই ভাল। শিক্ষকরা হেড সারের ঘরে ঢুকছেন, রেভিনিত্যু ষ্ট্যাম্পে সই করে বেতন নিচ্ছেন।

মাহবুব সাহেব বেতন নিতে এলেন শেষে। এসিসট্যান্ট হেড মাস্টার হিসেবে ভার একটা দায়িত্ব আছে। ফান্ড কোথায় পাওয়া গেল তার জানা দরকার। তিনি শুকনো মুখে বললেন, টাকাটা কোত্থেকে দেয়া হচ্ছে?

ইমার্জেন্সি ফান্ড থেকে দিচ্ছি।স্কুল কমিটির অনুমতি ছাড়াতো স্যার আপনি ইমার্জেন্সি ফান্ড ভাঙতে পারেন না।অনুমতি পরে নিয়ে নিব। শিক্ষকরা অনেকদিন থেকে কষ্ট করছেন। তিন মাস বেতন হচ্ছে না। তাদের ইমার্জেন্সিওতো ইমার্জেন্সি।আমাদের তো স্যার আইন কানুন মানতে হবে।ইমার্জেন্সির সময় কোন আইন কানুন থাকে না। সাধারণ সময়ের সাধারণ আইন। জরুরী সময়ের জরুরী আইন। মাহবুব সাহেব টাকা গুনে Fani

কাজটা স্যার ভুল করলেন।মানুষ হয়ে জন্মেছি ভুল করব না তাতো হয় না। দশবার শুদ্ধ করব, একবার ভুল করব তবেই না আমি মানুষ। আজ আমি একটা মিটিং দিয়েছি মাহবুব সাহেব।কিসের মিটিং?স্কুল বিষয়ে আপনাদের সবার সঙ্গে কিছু কথা বলব। মুক্ত আলোচনা। আপনারও যদি বলার কিছু থাকে আপনিও বলবেন।মিটিং হবে কখন?পাঁচটার সময়।

চারটার দিকে করতে পারেন না? আমার পাঁচটার সময় এক জায়গায় যাবার কথা।স্কুল পিরিয়ডে ছাত্রদের ক্ষতি করে তো আর মিটিং করতে পারি না। আপনার খুব জরুরী কোন কাজ থাকলে কাজে যাবেন। খুব জরুরী কিছু না থাকলে থাকুন, গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলব।দেখি।

মাহবুব সাহেবের কাজটা তেমন জরুরী না। আজ নিমখালি বাজারে হাট বার। হাটে গরু-ছাগল উঠে। ছেলের আকীকার জন্যে একটা গরু কেনার কথা। ফজলুল করিম সাহেবের মিটিংয়ের চেয়ে ছেলের আকীকা অনেক জরুরী। দুদিন পর পর ছেলে অসুখে ভুগছে। শরীর হয়েছে পাট কাঠির মত। আকীকা করা থাকলে নিশ্চিন্ত থাকা যায়। তাছাড়া হেড মাস্টার সাহেবের গুরুত্বপূর্ণ বক্তৃতায় আসলে গুরুত্বপূর্ণ কিছু থাকবে না। স্কুল স্কুল বলে চেঁচিয়ে তো কিছু হবে না। তারপরেও মাহবুব সাহেব মিটিং এ থেকে যাওয়াই ঠিক করলেন। আরেক বুধবার পর্যন্ত তাকে অপেক্ষা করতে হবে। উপায় কি?

দপ্তরী হরিপদ বড় একটা ধামায় পেঁয়াজ কাঁচামরিচ দিয়ে মুড়ি মাখছে। কেতলীতে করে চা এসেছে। মুড়ি খাওয়ার পর চা দেয়া হবে। মুড়ি এবং চা দুটার টাকাই হেড মাস্টার সাহেব দিয়েছেন।খবরের কাগজ বিছিয়ে মুড়ি টেলে দেয়া হয়েছে। মুড়ি চিবানোর কচাকচ শব্দের ভেতর ফজলুল করিম সাহেব ঢুকলেন। শিক্ষকরা উঠে দাঁড়ানোর ভঙ্গি করলেন তবে কেউ পুরোপুরি উঠলেন না।

ফজলুল করিম সাহেব হাসি মুখে বললেন, মুড়ি খাওয়ার কচ কচ শব্দ একটু কমুক তারপর কথা বলি।মাহবুব সাহেব বললেন, যা বলার এর মধ্যেই বলুন। কথা শুনতেতো অসুবিধা হচ্ছে না। সবারই তাড়া আছে।করিম সাহেবের জন্যে পিরিচে করে মুড়ি এবং একটা চামুচ এসেছে। তিনি মুড়ির দিকে তাকালেন মুড়ি মুখে নিলেন না।নীচু গলায় কথা বলা শুরু করলেন। একটা দুঃসময়ের ভেতর দিয়ে আমরা যাচ্ছি। নতুন করে বলার কিছু না সবাই তো জানেন। আমি যা বলতে চাচ্ছি তা হচ্ছে দুঃসময়টা সাময়িক।

মাহবুব সাহেব বললেন, দুঃসময় সাময়িক মনে হবার কারণ কি?তেমন কোন কারণ অবশ্যি দেখছি না, তবু মনের ভেতর থেকে কে যেন বলছে দুঃসময় থাকবে না।নতুন সায়েন্স টিচার হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, উইথফুল থিংকিং নাতো স্যার!হতে পারে, উইথফুল থিংকিং হতে পারে। দেখি এক কাপ চা খাওয়া যাক।হরিপদ চায়ের কাপ এনে সামনে রাখল। করিম সাহেব মামুনের দিকে তাকিয়ে বললেন, সিগারেট খেতে ইচ্ছা হচ্ছে আপনার কাছে কি আছে?

মামুন সিগারেট বের করে দিল। করিম সাহেব সিগারেট টান দিয়ে কাশতে লাগলেন। কাশি থামিয়ে সহজ গলায় বললেন, মামুন সাহেব আমি যা বলছি তা ঠিক উইথফুল থিংকিংও না। কিছু যুক্তি আছে। এত দিনের পুরনো একটা স্কুলতো জলে ভেসে যেতে পারে না।এটাতো স্যার কোন যুক্তি হল না।তা অবশ্যি হল না।মাহবুব সাহেব বিরক্ত গলায় বললেন, এটা বলার জন্যেই কি মিটিং ডেকেছেন?

না, আসল কথা বলা হয়নি আসল কথা হচ্ছে–এস, এস, সি পরীক্ষার আর আছে মাত্র তিন মাস। এই তিনমাস আমাদের প্রাণপন খাটতে হবে। এবারে তিনজন খুব ভাল ছেলে আছে। এর মধ্যে একজন তো অসম্ভব। ভাল–বদরুল আলম। এদের ঠিক ঠাক মত কোচিং করতে হবে। অসাধারণ একটা রেজাল্ট ওদের দিয়ে করাতে হবে। স্কুলের পূর্ব গৌরব ফিরিয়ে আনার একটা সুযোগ এসেছে। সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এদের কোচিং এর বিষয়ে আপনাদের কোন মতামত আছে?

কেউ কোন জবাব দিল না। কোচিং এর বিষয়ে নতুন তো কিছু বলার নেই। আগে যেমন হয়েছে এবারও তেমন হবে।করিম সাহেব বললেন, আমি চিন্তা করছি দিনরাত চব্বিশ ঘণ্টা এই ছেলেদের মনিটার করলে কেমন হয়। ইরতাজউদ্দিন সাহেবের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হয়েছে। আপনাদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। আমি যা ভাবছি তা হচ্ছে না…

পরীক্ষার্থী যারা সবাই একসঙ্গে থাকবে। একসঙ্গে পড়বে। এতে একটা টিম স্পিরিট তৈরী হবে। দায়িত্ব শিক্ষকদের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হবে। যেমন ভোর ছটা থেকে দুপুর বারটা পর্যন্ত একজন শিক্ষক। দুপুর বারটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত একজন এ রকম। প্রতিট বিষয়ের জন্যে আলাদা আলাদা ক্লাস হবে। আইডিয়াটা আপনাদের কাছে কেমন লাগছে।

এবারো কোন জবাব পাওয়া গেল না। করিম সাহেব উৎসাহের সঙ্গে বললেন, এটা যে পুরোপুরি আমার মৌলিক আইডিয়া তাও না। তিব্বতে বৌদ্ধ ভিক্ষুদের এইভাবে বড় বড় পরীক্ষার জন্যে তৈরী করা হয়।

মাহবুব সাহেব বললেন, এটাতো স্যার তিব্বত না।আমি জানি এটা তিব্বত না। আমার কথা হল, তিব্বত যদি এই নিয়মে কাজ করে আমাদের দেশেও করবে। একটা বড় কিছুর জন্যে সবাইকে এক সঙ্গে তৈরী করা। একটা টিম স্পিরিট সবার মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া। যদি আমাদের এই গ্রামের দরিদ্র স্কুল অসাধারণ একটা রেজাল্ট করে তার ফল হবে সুদূর প্রসারী। স্কুল তখন টিকে যাবে। দূর দূর থেকে ছাত্ররা আমাদের এই স্কুলে পড়তে আসবে। সরকারী সাহায্য আসবে। দানশীল মানুষেরা এগিয়ে আসবেন।

মাহবুব সাহেব বললেন, আপনার কথা শুনতে ভাল লাগছে। কিন্তু যে আইডিয়া শুনতে যত ভাল সেই আইডিয়ার মূল্য ততকম। তিনমাস পড়িয়ে ছেলেদের ফার্স্ট সেকেন্ড বানাবেন তা হয় না।হবে না এটা আগে থেকে ধরে নেয়াটা কি ঠিক? চেষ্টাতো করা যেতে পারে।এতগুলি ছেলে একসঙ্গে থাকবে কোথায় থাকবে। এরা খাবে কি?

এইগুলি নিয়ে আলোচনা করার জন্যেইতো মিটিং। আপনারা বলুন কি ভাবে করা যায়?চায়ের কাপে চুমুক দেয়ার শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ হচ্ছে না। মাহবুব সাহেব উঠে দাঁড়াতে দাড়াতে বললেন, স্যার আমি তাহলে উঠি?উঠবেন? কিছু বলবেন কি?এখনি বলতে হবে? পরে বলি?করিম সাহেব ক্লান্ত ভঙ্গিতে বললেন, আচ্ছা বলুন পরেই বলুন।

 

Read more

জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল-শেষ পর্ব- হুমায়ূন আহমেদ

Related Posts

Leave A Comment