জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩৯ হুমায়ূন আহমেদ

জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩৯

তার হাত চেয়ারের হাতলের সঙ্গে বাধা, চেয়ারের পায়ের সঙ্গে দুটা পা বাধা। পায়ের বাঁধন এত শক্ত যে দড়ি চামড়া কেটে মাংসে ঢুকে পড়েছে। আশ্চর্য ব্যাপার হচ্ছে, পায়ে কোনো ব্যথা বোধ নেই। আবু তাহেরের মুখ দিয়ে লালা পড়ছে। লালা পড়া শুরু হয়েছে কিছুক্ষণ আগে। তার সামনে মিলিটারি গোয়েন্দা বিভাগের দুজন বসে আছে। দুজনের চেহারাটা তার কাছে একরকম মনে হচ্ছে।

গোলাকার ফর্স মুখ। নাকের নিচে হালকা গোফ। আবু তাহেরের পেছনে একজন দাঁড়িয়ে আছে। সেই একজন মাঝে-মধ্যে তার সামনে আসছে। সেই একজনের চেহারাও অন্য দুজনের মতো। তবে সে রোগা। তার মুখে বসন্তের দাগ। এরা কি যমজ ভাই? এক সঙ্গে তিনজনের জন্ম কি হতে পারে?

তোমার নাম কী?

আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।

নাম বলো।

আবু তাহের।

কেয়া নাম?

মোহাম্মদ আবু তাহের।

Telt me your name.

Sir, my name is Abu Taher.

তোমার নাম কী?

আমার নাম মোহাম্মদ আবু তাহের।

তারা একই প্রশ্ন করে যাচ্ছে। কতদিন ধরে করছে? একদিন দুদিন নাকি কয়েক বছর হয়ে গেল? তারা কি এই প্রশ্ন করেই যাবে? একই প্রশ্ন বারবার করার পেছনের অর্থ কী? আবু তাহের কিছুক্ষণ আগে চেয়ারে প্রস্রাব করেছে। সেই প্রস্রাব গড়িয়ে গেছে সামনে বসে থাকা দুজনের দিকে। তারা তাকিয়ে দেখেছে। কিন্তু এই বিষয়ে কিছুই বলে নি। তারা কিছুক্ষণ পর পর সিগারেট ধরাচ্ছে। সেই সিগারেটের ধোঁয়ার গন্ধ ভয়াবহ। নাড়ি পাক দিয়ে বমি আসছে।

মোহাম্মদ আবু তাহের?

জি স্যার।

ঢাকা শহরে যেসব মুক্তিবাহিনীর গেরিলারা কাজ করছে।–তাদের কাউকে তুমি চেন? জি-না স্যার।কিন্তু তুমি তো মতিঝিলে হাটখোলা শাখার হাবীব ব্যাংক লুটের সময় জড়িত ছিলে। তোমার সঙ্গে আর কে কে ছিল?

স্যার, আমি হাবীব ব্যাংক লুটের সঙ্গে জড়িত ছিলাম না।তুমি কী করো? আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি। ফিজিক্সে M.Sc. থিসিস গ্রুপ।টিকাটুলি ওয়েল ট্যাংকার হাইজ্যাকে তুমি ছিলে না? জি-না স্যার।এখন আমরা তোমার ডান হাতের পাঁচটা আঙুলে পিন ঢুকিয়ে দিব। তুমি যদি অপরাধ স্বীকার করো, তবেই তা বন্ধ করা হবে।

স্যার, মুক্তিবাহিনীর কোনোকিছুর সঙ্গেই আমি জড়িত না।

তোমরা তিনভাই। বাকি দুজন কোথায়?

স্যার, বাকি দুজন কোথায় আমি জানি না।

আমরা যতদূর জানি বাকি দুজন মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিয়েছে।

ওদের খবর আমি জানি না। স্যার।

তুমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দাও নাই কেন?

আমি পাকিস্তানে বিশ্বাস করি। ইন্ডিয়া আমাদের শক্র। পাকিস্তান জিন্দাবাদ। কায়দে আজম জিন্দাবাদ। লিয়াকত আলি খান জিন্দাবাদ। মহাকবি ইকবাল জিন্দাবাদ।গোয়েন্দা বিভাগের দুজন শব্দ করে হেসে উঠল। তাদের একজন হাসতে হাসতে বলল, দাও ওর আঙুলে পিন ফুটিয়ে দাও।

আবু তাহের বিড়বিড় করে বলল, আল্লাহ আমাকে অজ্ঞান করে দাও। আল্লাহপাক আমাকে অজ্ঞান করে দাও। আমাকে অজ্ঞান করে দাও।কী তীব্র ব্যথা! কী ভয়াবহ যন্ত্রণা! চোখের সামনে হঠাৎ করে আগুনের মতো কী যেন ঝলসে ওঠে। পিন ফুটানোর ব্যথাটা হাতের আঙুলে হয় না। অন্য কোথাও যেন হয়।

স্যার পানি খাব। স্যার পানি খাব।

তোমার নাম কী?

আমার নাম আবু তাহের, স্যার পানি খাব।

ঢাকা মেডিকেল কলেজের চৌরাস্তার ট্রাফিক স্টপে মন্ত্রী মাওলানা মোহাম্মদ ইসহাকের গাড়িতে গ্রেনেড ছোড়া হয়। যারা এই কাজটা করে, তুমি কি তাদের সঙ্গে ছিলে?

সার, পানি খাব।

প্রশ্নের জবাব দাও, তুমি তাদের সঙ্গে ছিলে?

ছিলাম স্যার।

হাবীব ব্যাংক লুটের সময় ছিলে?

ছিলাম স্যার। পানি খাব।

টিকাটুলি অপারেশনে ছিলে?

জি স্যার। এক গ্রাস পানি দেন। পানি খাব।

গেরিলারা কে কোথায় লুকিয়ে থাকে, তুমি জানো?

জানি স্যার।

ওদের দুইজনকে, শুধুমাত্র দুইজনকে ধরিয়ে দিতে পারলে আমরা তোমাকে ছেড়ে দিব। ধরিয়ে দেবে? জি স্যার। একটু পানি খাব।আবু তাহেরকে পানি খেতে দেয়া হলো। চোখের উপরের বাতি নিভিয়ে দেয়া হলো। ঘরে এখনো বাতি জ্বলছে। কিন্তু আবু তাহের কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। তার কাছে মনে হচ্ছে ঘর অন্ধকার। কবর কি এরকম অন্ধকার হয়?

মোহাম্মদ আবু তাহের।

জি স্যার।

নাও সিগারেট নাও।

আমি সিগারেট খাই না।

না খেলেও সিগারেটে টান দাও। এই অবস্থায় শরীর নিকোটিন পছন্দ করে।আবু তাহের সিগারেট টানছে। সিগারেট তার বা হাতে ধরা। সে ডান হাত তুলতে পারছে না। তার ডান হাতের প্রতিটি আঙুলে পিন ফুটানো হয়েছে। মধ্যমা আঙুলের পিন ঠিকমতো ফুটে নি। অর্ধেক বের হয়ে আছে। একবার তার কাছে মনে হলো, এরকম কিছুই ঘটে নি। সে ভয়ঙ্কর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখছে। তার বোঝায় ধরা রোগ হয়েছে। বোঝায় ধরার আগে আগে সে এরকম দুঃস্বপ্ন দেখে। ঘুম ভাঙলেই দেখা যাবে সব ঠিক আছে।মোহাম্মদ আবু তাহের?

জি।অনেকে শাস্তির হাত থেকে বাচার জন্যে সব অপরাধ স্বীকার করে। তাদেরকে যখন বলা হয়–মুক্তি যেখানে থাকে সেখানে নিয়ে চল— তখন তারা কোথাও নিয়ে যেতে পারে না। কাউকে ধরিয়েও দিতে পারে না। তারা আমাদের সময় নষ্ট করে। তুমি বলে আমাদের সময় নষ্ট করা কি উচিত?

জি-না।

তুমি আমাদের সময় নষ্ট করছ না তো?

জি-না।

কাউকে যদি ধরিয়ে দিতে না পোর, তাহলে আমরা তোমাকে মজার একটা শাস্তি দেব। শাস্তির ইংরেজি নাম Castration. তোমার দুটা অণ্ডকোষ কেটে ফেলে দেব। খোঁজা বানিয়ে দেব। খোঁজা কী চেন? চিনি।পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিটা পুরুষকে খোজা বানিয়ে দিতে পারলে হতো; একটা নতুন জাতি তৈরি হতো। নপুংসক জাতি। ভালো হতো না?

জি স্যার। ভালো হতো।এক ঘণ্টার মধ্যে আমরা তোমাকে নিয়ে বের হব। তুমি বাড়িগুলি চিনিয়ে দেবে। তোমার হাত থেকে আমরা পিন সরাব না। যে রকম আছে, সে রকমই থাকবে। ঠিক আছে? জি স্যার।তোমার একটা আঙুলের পিন দেখছি ঠিকমতো ঢোকানো হয় নি। ঢুকিয়ে দেই?

দিন স্যার।

আচ্ছা এখন থাক। আমরা ভ্ৰমণ শেষ করে কাজটা করব।

জি আচ্ছা স্যার।

ভ্ৰমণে যাবার আগে কিছু কি খাবে? এক পিস কেক। এক কাপ চা।

খাব স্যার।

কাজটা সেরে এসে খাই? প্ৰথমে কাজ তারপর খাদ্য। সেটা ভালো না?

জি স্যার ভালো। খুব ভালো।

গাঢ় নীল রঙের একটা টয়োটা গাড়ি নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ঘুরছে। গাড়ির কাচ এমন যে, ভেতবের আরোহীদের বাইরে থেকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু গাড়ির ভেতরের মানুষরা বাইরে কী হচ্ছে দেখতে পাচ্ছে। পেছনের সিটে আবু তাহের বসে আছে। তার শায়ে কম্বল জড়ানো। আবু তাহেরের মুখ দিয়ে এখনো লালা পড়ছে। প্রচণ্ড জ্বর এসেছে। কিছুক্ষণ পরপর শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে। আবু তাহেবের দুপাশে দুজন। আবু তাহের বাড়ি দেখিয়ে দিচ্ছে, এই দুজন নোট নিচ্ছে। বাড়ি দেখানোর কাজটা আবু তাহের করছে কিছুই না জেনে। মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে তার কোনোই যোগ নেই। তারা কে কোথায় থাকে সে কিছুই জানে না।

স্যার, এই বাড়ি।

এটা তো দোতলা বাড়ি। দোতলা বাড়ির কোন তলা?

সেটা বলতে পারছি না। স্যার।

ভালো করে দেখে বলো, এই বাড়ি?

জি স্যার।

এখন কোন দিকে যাব?

পুরানা পল্টন।

পুরানা পল্টন?

জি স্যার।

পুরানা পল্টনে যে থাকে তার নাম কী?

নাম জানি না স্যার। রাতে এই বাড়িতে এসে ঘুমায়।

একা ঘুমায় নাকি আরো লোকজন থাকে?

সেটা বলতে পারছি না স্যার। আবু তাহের ঢাকা নগরের বিভিন্ন এলাকায় পাঁচটি বাড়ি দেখিয়ে দিল। সেই রাতেই পাঁচটি বাড়ি থেকে নয়জনকে মিলিটারি ধরে নিয়ে গেল। তাদের কেউই জীবিত ফিরে এলো না। এই নয়জনের কেউই মুক্তিবাহিনীর বিষয়ে কিছুই জানত না।

এই নয়জন আরো কিছু মানুষের নাম বলল। অদ্ভুত এক চেইন রিঅ্যাকশন। তরুণ যুবকরা ধরা পড়ছে। কেন ধরা পড়ছে তারা জানে না। কোনো একজনের নাম বলে দিলে অত্যাচারের হাত থেকে বাচার সম্ভাবনা। তারা নাম বলছে। বাড়িঘর দেখিয়ে দিচ্ছে।সেই সময় দুস্কৃতিকারী ধরার জন্যে পুরস্কারও ঘোষণা করা হয়েছিল। পুরস্কারের লোভে যদি কেউ এগিয়ে আসে। জেলা প্রশাসকরা যে-কোনো মুক্তিযোদ্ধাকে ধরিয়ে দিতে পারলে এক হাজার টাকা পুরস্কার দিতে পারতেন।*

ক. সাধারণ দুস্কৃতিকারী বিষয়ে খবর দেয়ার জন্যে ৫০০ টাকা।

খ. ভারতের ট্রেনিংপ্রাপ্ত দুস্কৃতিকারীর বিষয়ে খবর দেয়ার জন্যে ৭৫০ টাকা।

গ. আগ্নেয়াস্ত্রসহ গ্রেফতারের জন্যে ১,০০০ টাকা।

ঘ. দুস্কৃতিকারী দলের নেতা গ্রেফতারের জন্যে ২,০০০ টাকা।

ঙ. অন্ত্রশস্ত্রসহ দুস্কৃতি দলের নেতা গ্রেফতারের জন্যে ১০,০০০ টাকা।

————–

সূত্র : দৈনিক পাকিস্তান

জওহরলাল নেহেরুর একমাত্র কন্যা ইন্দিরা গান্ধীকে তাঁর দেশের মানুষ শ্ৰদ্ধা ও ভালোবাসার সঙ্গে ডাকে ইন্দিরাজি।

ইন্দিরাজী কোলকাতা বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ডে বক্তৃতা দেবেন। তারিখ ডিসেম্বর তিন। তাঁর আসার কথা ছিল চার তারিখে, তিনি একদিন আগেই চলে এসেছেন। এর কোনো বিশেষ তাৎপর্য কি আছে? আজই কি সেই দিন? সেই মাহেন্দ্ৰক্ষণ? আজই কি বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়া হবে? হিন্দুস্থান সেনাবাহিনী মুক্তিযোদ্ধাদের সাহায্যে সরাসরি নেমে পড়বে। স্বাধীন হবে বাংলাদেশ।

এক কোটি শরণার্থ যারা অন্য এক দেশে, অচেনা পরিবেশে অবর্ণনীয় দুঃখে। জীবনযাপন করছে তারা ফিরে যাবে নিজ বাসভূমে।বিগ্রেড প্যারেড গ্রাউন্ড লোকে লোকারণ্য। উদগ্ৰীব মানুষের সমুদ্র। বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়ার বিশেষ ভাষণ সবাই শুনতে চায়।ইন্দিরাজী ভাষণ শুরু করলেন। শান্ত গলায় প্রায় উত্তেজনাহীন বক্তৃতা। তিনি নতুন কিছু বললেন না।

শরণার্থীদের দুঃখ-দুৰ্দশার কথা বললেন। বিদেশী শক্তিদের আবারো আহ্বান করলেন সমস্যা সমাধানে ভূমিকা রাখার জন্যে। বক্তৃতা শেষ হয়ে গেল। তবে বক্তৃতা চলাকালিন সময়ে তিনি একটা ছোট্ট চিরকুট পেলেন। চিরকুট দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্যে তাঁর ভুরু কুঁচকে গেল। চোখের দৃষ্টি হলো তীব্র। তাৎক্ষণিকভাবে নিজেকে সামলে নিয়ে যেন কিছুই হয় নি এমন ভঙ্গিতে বক্তৃতা শেষ করলেন।

চিরকুটে লেখা ছিল— পাকিস্তান বিমানবাহিনী হঠাৎ করে অমৃতসর, পাঠানকোট, শ্ৰীনগর, অবন্তিপুর, যোধুপুর, আম্বালা এবং আগ্ৰায় বোমা বর্ষণ করেছে। পাঞ্জাব সীমান্তে পাকিস্তান স্থলবাহিনী যুদ্ধ শুরু করেছে। তারা ভারতের ভেতরেও কিছুদূর ঢুকে পড়েছে।ইন্দিরা গান্ধী দিল্লি ফিরে গেলেন। ডিসেম্বরের চার তারিখ মধ্যরাতে আকাশবাণী দিল্লি কেন্দ্র থেকে তিনি বাংলাদেশের মানুষদের বহু প্ৰতীক্ষিত বিশেষ ঘোষণাটা দিলেন। এই ঘোষণায় বাংলাদেশের স্বীকৃতি ছিল না, কিন্তু বোঝা যাচ্ছিল সেই স্বীকৃতি আসার পথ তৈরি হচ্ছে

Today the war in Bangladesh has become a war on india…

Aggression must be met and the people of india will meet it with fortitude and determination and with discipline and atmost unity.

ইন্দিরা গান্ধীর ঘোষণার জবাবে ইয়াহিয়া খান আনুষ্ঠানিক যুদ্ধ ঘোষণা করলেন। ডিসেম্বরের চার তারিখ সকালে। তিনি রেডিও ভাষণে বললেন,

Our enemy has once again challenged us…. March forward. Give the hardest blow of Allah ho Akbar to the enemy.

ইয়াহিয়া খানের যুদ্ধ ঘোষণার জবাবে ইন্দিরা গান্ধী লোকসভায় বললেন, আমি ভোরবেলায় খবর পেয়েছি পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। আমরা তৈরি আছি।কিসিং কনটেম্পরারি আর্কাইভসের সেই সময়ের বিবরণ। এইভাবে দেয়া–

The tindian Army, linking up with the Mukti Bahini entered East Pakistan On Dec. 4 from five main direction, (1) in the Comilla Sector, east of Dacca; (2) In the Sylhet Sector, in the north-east of the province (3) in the Mymensingh Sector, in the North (4) in the Rangpur Dinajpur Sector, in the north west; (5) in the Jessore Sector, south west of Dacca….

শুরু হয়ে গেল অদ্ভুত এক আন্তর্জাতিক দাবা খেলা।শক্তিমান দেশগুলি মেতে গেল নিজেদের অবস্থান এবং শক্তি পরীক্ষায়।ডিসেম্বরের পাঁচ তারিখে মার্কিন সরকারের উদ্যোগে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের অধিবেশন বসল। যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব আনলেন মার্কিন প্রতিনিধি জর্জ বুশ।* মার্কিন প্রস্তাবের পক্ষে এগারোটা ভোট পড়ে।

গ্রেট ব্রিটেন ও ফ্রান্স ভোটদানে অংশগ্রহণ করে নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন মার্কিন প্ৰস্তাবের বিপক্ষে সরাসরি ভেটো প্রয়োগ করে প্রস্তাব বাতিল করে দেয়। সোভিয়েত প্ৰতিনিধি কমরেড জ্যাকভ মালিক বলেন, আপনারা কেউ কি পরিস্থিতি বুঝতে পারছেন না? জাতিসংঘের ৮৮টি দেশের কোনোটির জনসংখ্যা এক কোটির বেশ না অথচ পূর্ব পাকিস্তান থেকে এক কোটির বেশি শরণার্থী ভারতে আশ্রয় নিয়েছে।

রেডিও পিকিং থেকে বলা হলো, চীন পাকিস্তানকে সবরকম সাহায্য দেবে। ভারতীয় বাহিনীকে পরাজয়ের তিক্ত স্বাদ গ্রহণ করতে হবে।চীন যাতে লাদাক সীমান্ত দিয়ে সরাসরি ভারতে ঢুকে না পড়তে পারে, সেই ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে এলো রাশিয়া। রাশিয়া, চীন-রাশিয়া সীমান্তে দশ লক্ষ সৈন্য মোতায়েন করল।মার্কিন প্রেসিডেন্ট-রিচার্ড নিক্সন সাংবাদিকদের কাছে বললেন, ভারত যা করছে তার নাম সরাসরি যুদ্ধের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের অংশ দখল করার অশুভ পায়তারা।

মার্কিন সরকারের সপ্তম নৌবহর তখনো ছিল উত্তর ভিয়েতনামের কাছে। সপ্তম নৌবহরকে বাংলাদেশের দিকে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিল। সপ্তম নৌবহর রওনা হলো বঙ্গোপসাগরের দিকে। সপ্তম নৌবহরে ছিল পরমাণু শক্তি চালিত বোমারু বিমান বহনকারী বিশাল জাহাজ এন্টারপ্রাইজ, একটি এমফিবিয়াস এসল্ট শিপ, একটি গাইডেড মিজাইল ফ্রিগেট, চারটি গাইডেড মিজাইল ডেসট্রিয়ার এবং একটি ল্যান্ডিং ক্রাফট।

এর জবাবে রাশিয়া বিশটি সোভিয়েত রণতরীকে ভারত সাগবে নিয়ে এলো। একটি ক্ষেপণাস্ত্রবাহী রাশিয়ান ফ্রিগ্রেট এবং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপে সক্ষম পরমাণু চালিত একটি সোভিয়েট ড়ুবোজাহাজও বঙ্গোপসাগরে উপস্থিত হবার জন্যে রওনা হলো।হতভম্ব নিয়াজীকে গুল হাসান খান টেলিফোন করে পশতু ভাষায় জানালেন, নার্ভাস হবার কিছু নেই। মনে সাহস রাখ, হলুদ এবং সাদা জাতি উত্তর ও দক্ষিণ উভয় দিক দিয়ে আসছে।

ইয়াহিয়া খানও টেলিফোনে যোগাযোগ করলেন, যে-কোনো মুহুর্তে বিদেশী সাহায্য আসবে। যে-কোনো মূহুর্তে।সাহায্য কীভাবে আসবে? কীভাবে সাহায্য আসবে সে ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না, তবে বিদেশী সাহায্য আসবে। এই খবরে কোনো ভুল নেই। অতি গোপন খবর এবং আসল খবর। যে-কোনো ভাবেই হোক ঢাকার পতন যেন না হয়। ঢাকা ধরে রাখা। শুধু ঢাকা। সাহায্য আসবে, কঠিন সাহায্য।

গভর্নর হাউসে মিটিং বসেছে। পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ড. মালিকের মাথায় (ড, আব্দুল মোত্তালেব মালিক) সাদা টুপি। তিনি এইমাত্র নামাজ শেষ করেছেন। তাঁর চোখে-মুখে দিশাহারা ভাব। জেনারেল নিয়াজীকে বেশ হাসিখুশি দেখাচ্ছে। মিটিং-এ আরো উপস্থিত আছেন, রাও ফরমান আলি (গভর্নরের সামরিক উপদেষ্টা), জেনারেল জামশেদ। জেনারেল জামশেদকে অসম্ভব চিন্তিত দেখাচ্ছে। তবে রাও ফরমান আলির মুখমণ্ডল ভাবলেশশূন্য।

তাঁকে দেখে মনে হচ্ছে, আশেপাশে কী হচ্ছে না হচ্ছে তার সঙ্গে তিনি নিজেকে সম্পৃক্ত করছেন না।ড. মালিক খাকাড়ি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে মিনমিনে স্বরে বললেন, আমাদের অবস্থাটা কী? নিয়াজী বললেন, অবস্থা ভালো। কাপুরুষ হিন্দুবাহিনী ঢাকায় আসার চেষ্টা করছে। তাদের আগমন শিক্ষাসফরের মতো। পদে পদে শিক্ষা পেয়ে তারা এগুচ্ছে।ড. মালিক বললেন, মূল অবস্থাটা কী জানতে পারি?

জেনারেল জামশেদ বললেন, মূল অবস্থা আপনার জানার প্রয়োজন নেই। যুদ্ধ কী হচ্ছে কেমন হচ্ছে তা দেখার দায়িত্ব গভর্নরের না। তিনি বেসামরিক বিষয় দেখবেন। জাতীয় পরিষদের সাধারণ অধিবেশনে যুদ্ধবিরতির প্রস্তাব এসেছে, আপনি সেই বিষয় নিয়ে ভাবুন।ড. মালিক আগের চেয়েও ক্ষীণ গলায় বললেন, আমার মাথায় অন্য পরিকল্পনা ছিল।রাও ফরমান আলি তীব্ৰ গলায় বললেন, কী পরিকল্পনা?

ড. মালিক থতমত খেয়ে গেলেন। কিছু বলতে পারলেন না। ফরমান আলি বললেন, দাবা খেলা এখন শেষপর্যায়ে চলে এসেছে। এখন আমরা মিডল গেম পার হয়ে এন্ড গেমে এসেছি। এন্ড গেম চট করে শেষ হয় না। চলতেই থাকে। চলতেই থাকে। এই খেলাও চলতে থাকবে। ইন্ডিয়া-পাকিস্তান কেউ জয়ী হবে না। স্টিলমেট অবস্থা হবে। তখন বিদেশী রাষ্ট্রগুলির মধ্যস্থতায় একধরনের সমঝোতা হবে। ড. মালিক বললেন, এই বিষয়ে কি আপনি নিশ্চিত?

ফরমান আলি বললেন, অবশ্যই। একজন পূর্ব পাকিস্তানি নুরুল আমিনকে প্রধানমন্ত্রী এবং জুলফিকার আলী ভুট্টোকে উপপ্ৰধানমন্ত্রী করে কোয়ালিশন সরকার গঠন করা হয়েছে। আপনি কি এর মধ্যে কোনো ইঙ্গিতে দেখতে পারছেন না? এই কোয়ালিশন সরকার আলাদা আলোচনার মাধ্যমেই গঠন করা হয়েছে। এমনও হতে পারে যে, ইন্দিরা গান্ধীর পরামর্শেই এই সরকার গঠন করা হয়েছে। ড. মালিক বললেন, ইন্ডিয়ান সৈন্যরা যেভাবে এগিয়ে আসছে তাতে মনে হয়, অতি দ্রুত তারা ঢাকায় ঢুকে পড়বে।

জেনারেল নিয়াজী বললেন, ঢাকায় ঢুকতে তাদের খুব কম করে ধরলেও পাঁচ বছর লাগবে। ইন্ডিয়ানরা কাপুরুষ। আমাদের গোলাগুলির ভেতর দিয়ে এরা ঢাকায় কিছুতেই ঢুকবে না। ইন্ডিয়ানরা কেন কাপুরুষ সেই গল্প শুনতে চান?কেউ জবাব দিল না। তাদের ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছে তারা এই মুহুর্তে গল্প শোনায় আগ্রহী না। নিয়াজীর উৎসাহে তাতে ভাটা পড়ল না।

তিনি গল্প শুরু করলেন–পুরুষদের কাপুরুষতার অংশটা থাকে তাদের নুনুর আগায়। আমরা তা কেটে ফেলে দেই বলে আমরা সাহসী। ওরা তা ফেলে না বলে ওরা কাপুরুষ। হা…হা…হা…।জেনারেল গলা ফাটিয়ে হাসছেন। সেই হাসি অন্য কারো মুখে সংক্রামিত হচ্ছে না। সাইরেনের শব্দ হচ্ছে। আবারো বিমান আক্রমণ হবে। অতি দ্রুত সবাই স্থান ত্যাগ করলেন। ইন্ডিয়ান বিমানবাহিনী বড় যন্ত্রণা করছে।

গভীর রাত। টাঙ্গাইলে পাকবাহিনীর অধিনায়ক বিগ্রেডিয়ার কাদির খান অবস্থান করছেন এলেঙ্গায়। কয়েকটি দুঃসহ রাত তিনি নির্মুম পার করেছেন। এখন আর শরীর টানছে না। মন অবসন্ন। একের পর এক ভয়াবহ দুঃসংবাদ আসছে। নিয়তির কী অপূর্ব রসিকতা! টাঙ্গাইল এলাকার মুক্তিবাহিনীর সর্বাধিনায়কের নামও কাদের। কাদের সিদ্দিকী। কাদির খান এখন প্রায়ই দুঃস্বপ্ন দেখেনতিনি বন্দি হয়েছেন কাদের সিদ্দিকীর হাতে।

কাদের সিদ্দিকী কি তার সঙ্গে সম্মানসূচক আচরণ করবে? তার মনে হয় না। মুক্তিবাহিনীর কাছে তারা অতি ঘূণ্য প্রাণী। একজন মর্যাদাসম্পন্ন সামরিক বাহিনীর অফিসারের সম্মান এবং মর্যাদার ব্যাপারটা বুঝবেন আরেকজন মর্যাদাসম্পন্ন সামরিক অফিসার। আত্মসমর্পণ যদি করতেই হয়, তাহলে করতে হবে ইন্ডিয়ানদের কাছেই। তিনি কী করবেন? তার কী করা উচিত?

উপর থেকে অস্পষ্ট সব নির্দেশ আসছে। একবার বলা হলো, নিজের অবস্থানে শক্ত হয়ে বসে থাকে। তারপর বলা হলো, পশ্চাদ অপসারণ করে ঢাকায় চলে এসো। ঢাকা রক্ষা করতে হবে। এখন ঢাকা রক্ষা মানেই পূর্ব পাকিস্তান রক্ষা।তিনি ঢাকায় কীভাবে যাবেন? ঢাকা যাবার কোনো উপায় নেই। প্রতিটি ব্রিজ মুক্তিবাহিনী ভেঙে ফেলেছে। এতে অবশ্যি একটা সুবিধা হয়েছে, ইন্ডিয়ান সেনাবাহিনীও ঢাকায় যেতে পারছে না। তাদেরকেও পায়ে হেঁটে যেতে হবে।

ব্রিগেডিয়ার কাদির খান ডিনার করতে বসলেন রাত দুটায়। কয়েকটা শুকনা রুটি, এক বাটি ঠাণ্ডা গরুর মাংস। সেই মাংস সিদ্ধ হয় নি। পাথরের মতো শক্ত। সময় যখন খারাপ হয়, তখন সবদিক থেকেই খারাপ হয়। রসুইখানায় রান্না হয় নি। রসদের সমস্যা কিংবা অন্যকিছু হবে। তিনি এই নিয়ে ভাবতে চান না। এখন তাঁর একমাত্ৰ চিন্তা–কীভাবে কোন পথে ঢাকায় পৌঁছানো যায়? এবং কত দ্রুত পৌঁছানো যায়।

কাদির খান মাংস ছাড়াই রুটি মুখে দিলেন, আর তখন তার কাছে একটা সুসংবাদ এলো। এত বড় সুসংবাদ তিনি তার দীর্ঘজীবনে পান নি। বিদেশী সাহায্য চলে এসেছে। ঝাঁকে ঝাঁকে চাইনিজ প্যারটুপার নামছে। টাঙ্গাইলে নামছে।ব্রিগেডিয়ার কাদির খান বললেন, আলহামদুলিল্লাহ। শেষপর্যন্ত তাহলে তাদের দেখা পাওয়া গেল?

সংখ্যায় কত?

অসংখ্য। শুধু নামছেই।

আমার তরফ থেকে তাদের অভ্যর্থনার ব্যবস্থা করে। তাদের পরিকল্পনা কী আমার জানা দরকার। আমার ধারণা তারা ইচ্ছা করে টাঙ্গাইল নেমেছে, যাতে শুরুতেই কাদের সিদ্দিকীকে শায়েস্তা করতে পারে।হতে পারে স্যার।হতে পারে না, এটাই সত্য। হেড কোয়ার্টারের সঙ্গে যোগাযোগ করে চাইনিজ প্যারাষ্ট্ৰপার নামার সুসংবাদ দাও। এবং যে-কোনো ভাবেই হোক তাদের সঙ্গে আমার যোগাযোগের ব্যবস্থা কর।

কাদির খান অতি তৃপ্তির সঙ্গে ডিনার শেষ করলেন। মদ্যপানের মতো মানসিক অবস্থা তার এই কদিন ছিল না। আজ এক বোতল রাম নিজে একা শেষ করলেন।চাইনিজ প্যারাষ্ট্ৰপারদের অভ্যর্থনা জানাতে এগিয়ে যাওয়া কাদির খানের বাহিনীর সবাই মারা পড়ল, কারণ এরা চাইনিজ প্যারাষ্ট্ৰপার ছিল না। এরা ছিল ইন্ডিয়ান প্যারাট্র্যপার।

ভাগ্যের পরিহাস টাঙ্গাইল পাকবাহিনীর সেক্টর অধিনায়ক ব্রিগেডিয়ার কাদির খান ধরা পড়েন। কাদের সিদ্দিকীর হাতেই। তখন তার সঙ্গে ছিলেন দুজন কর্নেল, তিনজন মেজর এবং একজন লেফটেনেন্ট। তার সব সৈন্য কালিহাতি এলেঙ্গায় ধ্বংস হয়ে গেছে। এই কজনই শুধু জীবন নিয়ে পালাবার চেষ্টা করছিল।

Leave a comment

Your email address will not be published.