জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩০ হুমায়ূন আহমেদ

জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩০

মেলা শেষ করে আমি কংকনের সঙ্গে তার অ্যাপার্টমেন্টে গেলাম। নিউ ইয়র্কের অ্যাপার্টমেন্টগুলি যেমন হয় সেরকম। ছোট কিন্তু খুব গোছানো। এক কথায় বললে বলতে হবে, ছবির মতো সাজানো সংসার। কংকন বিয়ে করেছে এক আমেরিকানকে। সে কনস্ট্রাকশান ফার্মে চাকরি করে। তাদের একটা ছেলেও আছে। ছেলের নাম রবিন। তবে তাকে ডাকা হয় রবি নামে। ছেলে তার বাবার সঙ্গে লায়ন কিং ছবি দেখতে গিয়েছে। কংকন বলল, আপনি থাকতে থাকতেই ওরা এসে পড়বে। আমরা একসঙ্গে ডিনার করব।আমাকে ডিনার পর্যন্ত থাকতে হবে?

অবশ্যই। তবে আপনার ভয় নেই–বাংলাদেশের মতো রাত দশটায় ডিনার না। এখানে সন্ধ্যা নামার সঙ্গে সঙ্গেই ডিনার করা হয়। আপনি যেভাবে পা তুলে বসেন, সেইভাবে আরাম করে বসুন, আমি গল্প করি।আমি পা তুলে বসি তুমি জানো কীভাবে? বইমেলায় দেখলাম। আপনাদের লেখকদেরই শুধু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা থাকবে, আমাদের পাঠকদের থাকবে না?

আমি নরম সোফায় পা তুলে বসেছি। কংকন গল্প শুরু করেছে।খুব ছোট ছিলাম তো, পরিষ্কার কিছু মনে নেই। আবছা আবছা সব স্মৃতি। সেই আবছা স্মৃতির মধ্যেও কিছু কিছু আবার খুবই স্পষ্ট। যেমন ধরুন, আমার খুব স্পষ্ট মনে আছে–শাহেদ চাচা বাজারের মতো একটা জায়গায় আমাকে গোসল করাচ্ছেন। মাথায় পানি ঢালছেন কেতলি দিয়ে। সেই পানিটা গরম। কিছুক্ষণ মাথায় পানি ঢালেন, তারপর গায়ে সাবান ডলেন। সাবান থেকে লেবুর মতো গন্ধ আসছিল— এটা পরিষ্কার মনে আছে। সেই স্মৃতি এমনভাবে মাথায় ঢুকে আছে যে আমি এখনো লেমন ফ্লেভারের সাবান ছাড়া অন্য সাবান ব্যবহার করি না।

শাহেদ চাচা আমাকে নতুন জামা কিনে দিলেন। জুতা কিনে দিলেন। সস্তা ধরনের প্লাস্টিকের পুতুল কিনে দিলেন। পুতুলটা এখনো আমার সঙ্গে আছে। আপনাকে দেখােব। আমরা এক রাত থাকলাম হোটেলে। চাচাকে জড়িয়ে ধরে কী আরাম করে যে সেই হোটেলে ঘুমালাম! আমি ঠিক করেছি। যদি কোনোদিন বাংলাদেশে যাওয়া হয়, তাহলে হোটেলটা খুঁজে বের করব। এক রাত থাকব সেই হোটেলে।হোটেল খুঁজে বের করতে পারবে?

অবশ্যই পারব। হোটেলটি দাউদকান্দি নামের এক জায়গায়। টিনের ঘর। হোটেল থেকে নদী দেখা যায়। হোটেলের সব খুঁটিনাটি আমার মনে আছে।তারপর বলো।আমার স্পষ্ট মনে আছে, মাইলের পর মাইল শাহেদ চাচা আমাকে ঘাড়ে নিয়ে হেঁটেছেন। আমরা তখন বর্ডার ক্রস করছি। বাংলাদেশ থেকে যাচ্ছি আগরতলায়। চাচা ক্লান্ত হয়ে যান। আমাকে ঘাড় থেকে নামিয়ে বলেন, মা, কিছুক্ষণ হাঁটতে পারবে?

আমি বলি, হ্যাঁ। আমি হাঁটতে পারি না। চাচা আবার আমাকে ঘাড়ে তুলে নেন। আমার কোনো কষ্ট হচ্ছিল না। আমার খুবই মজা লাগছিল। আমাদের সঙ্গে আরো অনেক লোক যাচ্ছিল। একজন বৃদ্ধা মহিলা যাচ্ছিলেন। তাঁর ছেলে তাকে কোলে করে নিচ্ছিল।বৃদ্ধ মহিলার কথা তোমার মনে আছে? জি আমার মনে আছে। কারণ শাহেদ চাচা আমাকে বলছিল–ছেলে তার মাকে কোলে করে নিয়ে যাচ্ছে। আর আমি আমার মাকে ঘাড়ে করে নিয়ে যাচ্ছি। মজা না?

তারপর কী হলো বলো।আমরা আগরতলা পৌঁছলাম সন্ধ্যায়। সেখান থেকে শরণার্থী শিবিরে ট্রাকে করে যেতে হয়। ট্রাকে ওঠার সময় শাহেদ চাচা বললেন, মা শোন, অনেকগুলো শিবির আছে। আমরা তোমার মাকে প্রত্যেকটা শিবিরে খুঁজব। তাকে পাওয়া যাবে–সে সম্ভাবনা খুবই কম। পাওয়া না গেলে তুমি মন খারাপ করবে না। আমি তো তোমার সঙ্গে আছি! আমি যেভাবেই হোক তোমাকে তোমার মার কাছে পৌঁছে দেব। ঠিক আছে মা? আমি বললাম, ঠিক আছে।

ট্রাকে আমার জ্বর এসে গেল। চাচা চাদর দিয়ে আমাকে ঢেকে জড়িয়ে ধরে বসে রইলেন। আমার কাছে মনে হচ্ছিল, আমি যেন আমার মাকে জড়িয়ে ধরে আছি। মজার ব্যাপার কী জানেন? প্ৰথম শরণার্থী শিবিরেই আমার মা এবং দাদকে পাওয়া গেল বলো কী? জি। তবে আমাদের দেখা হওয়ার কোনো স্মৃতি আমার মাথায় নেই। শুধু মনে আছে আমার মা, দাদু আর শাহেদ চাচা তিনজনেই খুব কাদছিলেন।

শাহেদ চাচার কান্না দেখে আমার খুবই মজা লাগছিল। আমি তাকিয়েছিলাম শাহেদ চাচার দিকে।কংকন কাঁদছে! প্ৰথমে নিঃশব্দে কাদছিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দুহাতে মুখ ঢেকে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল। অ্যাপার্টমেন্টের বেল বাজছে। হয়তো কংকনের স্বামী তার সন্তানকে ছবি দেখিয়ে ঘরে ফিরেছে। কংকন দরজা খোলার জন্যে এগিয়ে যাচ্ছে না। সে প্ৰাণপণ চেষ্টা করছে নিজের কান্না থামাতে।

রোরুদ্যমান তরুণীর দিকে তাকিয়ে হঠাৎ আমার মনে হলো, কংকন কাঁদছে না। কাঁদছে আমাদের বাংলাদেশ। আমাদের জননী।আগরতলার যে হোটেলে শাহেদ উঠেছে তার নাম নিরালা। স্কুলঘরের মতো লম্বা একতলা দালান। টিনের ছাদ। জানোলা দিয়ে টিলা এবং দূরের শালবন দেখা যায়। হোটেলের রুম খুপড়ির মতো হলেও প্রচুর আলো-বাতাস খেলে।

হোটেলের রান্না ভালো। সবজি এবং অড়হড়ের ডালের মিশ্রণে যে খাদ্যটি তৈরি হয় তা অতি স্বাদু। হোটেলের মালিকের নাম মিশ্র। তিনি প্রথম পরিচয়েই শাহেদকে বলেছেন, বাংলাদেশের সব মানুষ আমারে ডাকে মিছরি বাবু। আপনিও তাই ডাকবেন। আমি আসলে বাংলাদেশেরই মানুষ। কুমিল্লার নবীনগরে আমার মায়ের বাড়ি।শাহেদ বলল, কেমন আছেন ভাই?

মিছরি বাবু আনন্দিত গলায় বললেন, ভালো আছি, তবে আপনাদের দুঃখকষ্ট দেখে মনটা অস্থির।শাহেদ বলল, আপনার হোটেলটা ভালো। পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন।মিছরি বাবু বললেন, জলের কিছু সমস্যা আছে। মানুষ বেশি হয়ে গেছে। সাপ্লাই-এর জল পাওয়া যায় না। নিজগুণে ক্ষমা করবেন। প্ৰতিদিন স্নান করা সম্ভব না। ফতু বলে একটা ছেলে আছে, তারে একটা টাকা দিলে দুই বালতি জল এনে দিবে।

শাহেদ এই হোটেলে আছে চারদিন ধরে। প্রতিদিনই সে এক টাকা খরচ করে দুই বালতি পানি আনাচ্ছে। ঘুমুতে যাবার আগে দুই বালতি পানি খরচ করে দীর্ঘ গোসল করে। রাতে খুব ভালো ঘুম হয়। ভোরবেলায় ঘুম ভাঙার পর তার মনে হয়, এত শান্তির ঘুম সে দীর্ঘদিন ঘুমায় নি। রাতে ঘুম ভাঙিয়ে মিলিটারি ধরে নিয়ে যাবে–এ ধরনের কোনো দুশ্চিন্তা নেই। বিহারিরা ঘুমন্ত অবস্থাতেই জবাই করে যাবে সেই আশঙ্কা নেই। প্রায়ই তার মনে হয়, সে পৃথিবীতে বাস করছে না। সে বেহেশতি আরামে আছে।

কংকনকে সে তার মায়ের হাতে তুলে দিতে পেরেছে–এই ঘটনোটা তার কাছে বিস্ময়কর মনে হয়। এই অসম্ভব কীভাবে সম্ভব হয়েছে? তাহলে কি সত্যি এমন কেউ আছেন যিনি আমাদের দিকে লক্ষ রাখছেন? তিনি তার বিচিত্র কৌশলে হারানো শিশুদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন বাবা-মার কোলে? পঁচিশে মার্চের পর এই বিশ্বাস প্রায় ভেঙে পড়তে বসেছিল। এখন আবার ফিরে আসছে।

কংকনের ঘটনার পর শাহেদের ভেতর কেমন এক আলস্য এসে গেছে। তার কাছে মনে হচ্ছে, তার দায়িত্ব শেষ হয়েছে। এখন সে বিশ্রাম করতে পারে। আগরতলা নামের এই দেশ যার নাম শুনেছে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার সময়, সেই আগরতলা এখন টুরিস্টের মতো দেখা যেতে পারে। নিশ্চয়ই অনেক কিছু দেখার আছে। শাহেদের এইটাই প্রথম বিদেশ ভ্ৰমণ। বিদেশ ভ্ৰমণ সে কীভাবে করবে? তার পাসপোর্টও নেই। এখন পাসপোর্ট ছাড়াই চলে এসেছে বিদেশে।

আসমানীদের খোঁজ সে প্রথম দুই দিনেই নিয়েছে। সবকটা শরণার্থী শিবির দেখেছে। লষ্ট পারসন বুরোতে খোঁজ নিয়েছে। এখানকার প্রতিটি হোটেলের অতিথি তালিকা দেখেছে। আসমানীরা আগরতলায় নেই। তারপরেও কিছুই বলা যায় না, হয়তো দেখা যাবে কোনো একদিন সে রাস্তায় ভাড়ে করে চা খাচ্ছে–হঠাৎ বাচ্চা একটা মেয়ে ছুটে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। ধরার সময় এমন ধাক্কা লেগেছে যে তার হাত থেকে চায়ের খুড়ি পড়ে ভেঙে গেল।

সে বিরক্ত হয়ে ধমক দিতে যাবে তখন মেয়েটা বলবে–বাবা বাবা আমি। কংকনের ক্ষেত্রে যদি এ রকম ঘটতে পারে, তার মেয়ের ক্ষেত্রে কেন ঘটবে না? শাহেদ এক সন্ধ্যায় সিনেমাহলে গিয়ে সিনেমা দেখে এলো। উত্তম-সুচিত্রার ছবি সাগরিকা। খুবই ভালো লাগল। ছবি দেখে। ছবিঘর থেকে বের হয়ে মনে হলো, সব ঠিক আছে। আমি ভালো আছি। আসমানীরাও ভালো আছে। এই ছবিটাই আমি কোনো একদিন আসমানীকে নিয়ে দেখব। অবশ্যই দেখব।

কংকনরা যে শরণার্থী শিবিরে ছিল শাহেদ সেখানে আর যায় নি। যদিও তার উচিত প্ৰতিদিন একবার গিয়ে খোঁজ নেয়া। কেন জানি শাহেদের এটা করতে ইচ্ছা করে না। একদিন শিবিরের কাছাকাছি গিয়ে ফিরে এলো। কেন এ রকম হচ্ছে কে জানে? কংকনকে দেখলেই নিজের মেয়ের কথা মনে পড়বে।–এই ভেবেই কি এ রকম হচ্ছে? হতে পারে।

মিছরি বাবুর কাছে ঠিকানা নিয়ে একদিন সে নীরমহল দেখে এলো। ত্রিপুরার মহারাজাদের প্রাসাদ। পানিতে প্রাসাদের ছায়া পড়েছে। দূরে নাগকেশর ফুলের বন। কী অপূর্ব দৃশ্য! শাহেদ তৎক্ষণাৎ ঠিক করল, দেশ স্বাধীন হলে অতি অবশ্যই সে আসমানীকে নিয়ে এদিকে আসবে। উঠবে। হোটেল নিরালায়। সেখান থেকে কোনো এক সন্ধ্যায় যাবে নীরমহল দেখতে। সেখান থেকে শালবন, শালবন দেখে নাগকেশরের বন। ঐ গানটা যেন কী?

হেলিয়া দুলিয়া পড়ে নাগকেশরের ফুল।

বালা নাচ তো দেখি।

বালা নাচ তো দেখি।

একদিন সে গেল মুক্তিযোদ্ধারের ক্যাম্প দেখতে। জায়গাটার নাম মেলাঘর। বাংলাদেশের কসবা এবং ভারতের বিলুনিয়ার মাঝামাঝি একটা জায়গা। ক্যাম্পের দায়িত্বে আছেন দুই নম্বর সেক্টর অধিনায়ক মেজর খালেদ মোশাররফ। ঘন জঙ্গলের ভেতর সেই ক্যাম্প। পানির বড়ই অভাব। সব অভাব সহ্য করা যায়, পানির অভাব না। শত শত যুবক ছেলে প্রশিক্ষণ নিচ্ছে। তাদের একজনের সঙ্গে শাহেদের পরিচয় হলো। নাম ইফতেখার।* ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যার ছাত্র। সেকেন্ড ইয়ার অনার্স।

শাহেদ বলল, কেমন আছেন ভাই?

ইফতেখার বলল, ভালো আছি।

আপনার কি ট্রেনিং শুরু হয়েছে?

এখনো হয় নাই। নাম লেখালেখি চলছে।

আপনাদের খাওয়া-দাওয়া কী?

দুইবেলা খাই। রাতের খাওয়াটা ভালো হয়।

রাতের খাওয়াটা ভালো হয় কেন?

ইফতেখার হাসিমুখে বলল, অন্ধকারে খাই তো এই জন্যে ভালো হয়।

শাহেদ বলল, বুঝলাম না।

ভাতে অসংখ্য সাদা সাদা কীরার মতো থাকে। অন্ধকারে কীরা দেখা যায় না বলে খেতে সমস্যা হয় না। হা হা হা।

শাহেদ নিতান্তই অল্পবয়েসী এই ছেলের আনন্দময় হাসি দেখে মুগ্ধ হলো। সে বলল, ভাই, আপনি যদি কিছু মনে না করেন। আপনাকে কি আমি হোটেলে একবেলা খাওয়াতে পারি? একদিনের ছুটি নিয়ে আমার সঙ্গে শহরে আসবেন? ইফতেখার বলল, না। তবে আপনি আমাকে একটা সিগারেট খাওয়াতে পারেন। আগে সিগারেট খেতাম না। এখন ধরেছি।শাহেদ খুবই লজ্জার মধ্যে পড়ে গেল। তার সঙ্গে সিগারেট নেই।

সে বলল, আমি কাল আপনার জন্যে সিগারেট নিয়ে আসব। কয়েক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে আসব।কোনো দরকার নেই।শাহেদ বলল, দরকার আছে। অবশ্যই দরকার আছে। আমি কাল আসব। এমনিতেই আমার আসতে হবে। আমি আপনাদের সঙ্গে যোগ দেব। এখানকার রিত্রুটিং অফিসার কে? মুক্তিযোদ্ধা হতে যোগ্যতা কী লাগে? নিশ্চয়ই সাহস লাগে। আমার একেবারেই সাহস নেই।ইফতেখার বলল, আমারো নাই।

শহরে ফিরতে শাহেদের অনেক রাত হলো। ট্রাকের পেছনে চড়ে উঁচু-নিচু রাস্তায় অনেক দূর আসা; পথে কয়েক দফা বৃষ্টির মধ্যে পড়তে হলো। পাহাড়ি বৃষ্টি। এই আছে এই নাই। তার জ্বর উঠে গেল ট্রাকেই।রাতে শাহেদ কিছু খেতে পারল না। জ্বর হু-হু করে বাড়তে লাগল। একটা কম্বলে শীত মানে না। হোটেলের বয়কে দিয়ে আরেকটা কম্বল আনানো হলো। মিছরি বাবু একবার এসে দেখে গেলেন। কিছু ট্যাবলেট দিলেন।

প্রবল জ্বরের ঘোরে শাহেদ স্বপ্ন দেখল আসমানীকে। যেন আসমানী ঢাকায়, তার বাসার শোবার ঘরে বসে আছে। রুনির জ্বর এসেছে। সে রুনির মাথায় জলপট্টি দিচ্ছে। রুনির সঙ্গে রাগী রাগী গলায় কথা বলছে–তোর বাবার কাণ্ডটা দেখেছিস? আমরা ঢাকায় এসেছি আর সে বসে আছে আগরতলায়। তার কি বুদ্ধিশুদ্ধি পুরোটাই গেছে?

রুনি বলল, বাবাকে বকা দিও না মা।আসমানী বলল, বিকা দিব না তো কী করব? আমি একা মানুষ। আমি তোকে এখন কার কাছে নিয়ে যাব? কে ডাক্তার ডেকে আনবে? রুনি বলল, বাবা ডাক্তার ডেকে আনবে। বাবা চলে আসবে।স্বপ্ন দেখে শাহেদের ঘুম ভেঙে গেল। পরদিন ভোরেই গায়ে একশ দুই ডিগ্রি জ্বর নিয়ে সে রওনা হলো ঢাকার দিকে।

* দুর্ধর্ষ ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য হিসেবে ইফতেখার ঢাকা শহরে যথাসময়ে প্রবেশ করে। এই ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যরা ব্যতিব্যস্ত করে রাখে ঢাকা শহরের পাকিস্তানি বাহিনীকে। মুক্তি শব্দটাই তাদেরকে তখন আতঙ্কে অস্থির করে তুলত। তারা তখন ঘরে ঘরে অনুসন্ধান চালাত, একটাই তাদের প্রশ্ন–মুক্তি কাহা? কোথায় মুক্তি? শহীদ জননী জাহানারা ইমামের পুত্র দুঃসাহসী রুমি এই গ্রুপেরই একজন সদস্য ছিলেন। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে তিনি ২৯ আগষ্ট ধরা পড়েন। তারা বাংলার এই বীর সন্তানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে।

বিকালে বৌমা আমি হাসিনার* ছেলে দেখতে হাসপাতালে গেলাম। কী ভীষণ দুর্ব্যবহার যে করল ওখানের মিলিটারি পাহারাদারটা! হাসিনার মা মাত্র দশ মিনিটের জন্যে গতকাল ওদের দেখতে পেয়েছিলেন। আজ হতে কড়া নিয়ম চালু করা হলো, কোনো মানুষই আর ওদের দেখতে যেতে পারবে না। এ যে কী অমানুষিক ব্যবহার! জেলখানার কয়েদিও সাক্ষাতের জন্য সময় পায়। আল্লাহ আর কত যে দেখাবো! আজও ছোটনের চিঠি নেই, কারোর কোনো খবর নেই। আল্লাহর হাতে সঁপে দিয়েছি, আল্লাহ মেহেরবান।*

*সূত্র : বেগম সুফিয়া কামালের দিনলিপি–মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তির জয়। হাসিনা–শেখ হাসিনা। পরে প্রধানমন্ত্রী। পুত্রের নাম জয়।

সানডে টাইমস-এ প্রকাশিত সাংবাদিক রালফ শ-র নেয়া পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়ার সাক্ষাৎকার।প্রেসিডেন্ট বলছেন, শেখ মুজিব পাকিস্তানের সর্বোচ্চ কারাগারে জীবিত ও সুস্থ আছেন। তবে আজকের পর তাঁর জীবনে কী হবে সেই ওয়াদা আমি দিতে পারছি না।

দেশের আইন অনুসারে তাঁর বিচার হবে। তার মানে এই নয় যে, আগামীকালই আমি তাকে গুলি করব। তাঁর স্বাভাবিক মৃত্যুও তো হতে পারে। তাকে সর্বোচ্চ শ্রেণীর কারাগারে রাখা হয়েছে। তাকে কোনো পরিশ্রম করতে হয় না। বিছানা, পাখা ও গরম পানির ব্যবস্থা সমেত ছোট ঘর তার রয়েছে। দেখাশোনার জন্যে একজন ডাক্তারও আছেন।পশ্চিম পাকিস্তানি খাবারের কারণে শেখ মুজিবের স্বাস্থ্য সাময়িকভাবে ক্ষুন্ন হয়েছিল, তবে এখন তাকে বাঙালি খাবার দেয়া হচ্ছে।

তার ওজন আবার বেড়েছে।তিনি এখনো দৈনিক বিশ থেকে এক ডজন গালগল্পো করেন। কথার তুবড়ি ছোটান।লায়ালপুরের (বর্তমান নাম ফয়সলাবাদ) জেলের একটি বিশেষ কক্ষ। সেই বিশেষ কক্ষে আটকে রাখা হয়েছে। একজন বিশেষ বন্দিকে। তার উপর কঠিন খবরদারি। সশস্ত্র প্রহরীদের একটি দল সার্বক্ষণিক নজর রাখছে। বন্দি এখন কী করছেন? তার অভ্যাসমতো সেলের ভেতর হাঁটাহাটি করছেন? নাকি সেলের জানালায় বাইরের আকাশ দেখার চেষ্টা করছেন?

বন্দির কর্মকাণ্ড তিনে সীমাবদ্ধ। কোরান শরীফ পাঠ করা। সেলের জানালায় আকাশ দেখার চেষ্টা করা এবং হাঁটাহাটি করা। প্রহরীদের কেউ কেউ বন্দিকে সালাম দেয়। বন্দি তাদের সালামের জবাব দেন। সেই খবর আবার তাৎক্ষণিকভাবে জেলারকে দিতে হয়। বন্দির কর্মকাণ্ডের প্রতিটি খুঁটিনাটি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়াকে জানাতে হয়।

বন্দির অবস্থান, তাঁর দিনযাপন বিষয়ে পৃথিবীর কোনো মানুষ কিছু জানে না। চরম গোপনীয়তা। তবে নানান গুজব দেশী এবং বিদেশী পত্রপত্রিকায় আসছে। পাকিস্তান সরকার এইসব গুজবের সত্য-মিথ্যা নিয়েও কিছু বলছে না। শেখ মুজিবর রহমান বিষয়ে তাদের কিছু বলার নেই।

একটি জোর গুজব যা কোলকাতার স্টেটমেন্ট পত্রিকাতেও এসেছে তা হলো–শেখ মুজিব অনশন করছেন। অনশন শুরু হয়েছে জুন মাস থেকে। তিনি জানিয়েছেন, স্ত্রী এবং সর্বকনিষ্ঠ সন্তান রাসেলের সঙ্গে দেখা হলেই তিনি অনশন ভঙ্গ করবেন। তিনি এখন দিনরাত লিখে চলছেন। পাতার পর পাতা লেখা হচ্ছে। কী লেখা কেউ জানে না।

এমনও রটনা হলো যে, শেখ মুজিব পাগল হয়ে গেছেন। তিনি সারাদিন সারারাত দুর্বোধ্য বক্তৃতা করেন। যখন বক্তৃতা করেন না। তখন বিড়বিড় করেন।শেখ মুজিবর রহমান অস্থির সময় কাটাচ্ছিলেন। যে চিন্তা তাঁকে গ্ৰাস করে রেখেছিল তা হচ্ছে–তাকে মেরে ফেলা হবে, না জীবিত রাখা হবে? পাইপ টানতে টানতে তিনি প্রায়ই এই হিসাব করেন (কারাগারে তাকে তামাক নামক একমাত্র বিলাসদ্রব্যটি সরবরাহ করা হতো)।

পাকিস্তানি মিলিটারি যদি যুদ্ধে জয়লাভ করে, তাহলে অবশ্যই তাকে হত্যা করা হবে। যদি পরাজিত হয় তাহলে কী হবে? পরাজিত হলেও তাকে হত্যার সম্ভাবনা। প্ৰতিশোধ নেবার তীব্ৰ আকাঙ্ক্ষা থেকেই এটা করা হবে। সেই হত্যা প্রক্রিয়াটি কী রকম হবে? তাঁকে কি ফাঁসি দেয়া হবে, নাকি ফায়ারিং স্কোয়াডে নেয়া হবে? পুত্র রাসেলের প্রিয়মুখ কি মৃত্যুর আগে দেখে যেতে পারবেন না? তাঁর বড়মেয়েটির সন্তান হবার কথা। তা কি হয়েছে?

নিজের পুত্রকন্যাদের কথা যখনই তাঁর মনে হয়, তখনি তিনি খানিকটা লজ্জিত বোধ করেন। এ-কী, দেশের কথা একপাশে সরিয়ে তিনি কিনা নিজের প্রিয়মুখগুলির কথা ভাবছেন! একটি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার রূপকার তিনি। দেশের প্রতিটি মানুষ তাকিয়ে আছে তাঁর দিকে। আর তিনি কি-না তাঁর মৃত্যু কীভাবে হবে তাই নিয়ে ভাবছেন? মাঝে-মাঝে তার ঘোরের মতো হয়। তিনি শুনতে পান। তার জীবনের মধুরতম শব্দ জয় বাংলা। হৃদয়ের গভীর গোপন কোনো জায়গা থেকে কেউ একজন বলে, ভয় পেও না। এই মধুর শব্দ তুমি আবারো শুনবে।

তাঁর নিজের ভাষ্যমতে— একে বলতে পারেন স্বজ্ঞা, টেলিপ্যাথি, ইন্দ্ৰিয় কিংবা অন্য যা খুশি তাই। কিংবা সম্ভবত এটা এক ধরনের ঐশী প্রেরণা, আমি যেটা জানি তা হলো আমার মন বলছিল বিজয় আমাদের হবেই।আগষ্ট মাসের তিন তারিখ টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে ভাষণে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া ঘোষণা করেন–রাষ্ট্রদ্রোহিতার অপরাধে শেখ মুজিবকে বিচার করা হবে।অতি দ্রুত বিচারপর্ব শুরু হলো। তারিখ ৯ আগস্ট। প্রধান বিচারক পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার।

তার সঙ্গে আছেন দুজন কর্নেল, একজন উইং কমান্ডার, একজন নেভাল কমোডর ও একজন (একমাত্র সিভিলিয়ন) জেলা সেশন জজ।শেখ মুজিব আত্মপক্ষ সমর্থনে অস্বীকৃতির কথা জানান এবং কোনো আইনজীবীর সঙ্গে বসতে রাজি হন না। বিচার চলতে থাকে। প্রতিদিন ভোরবেলা শেখ মুজিবকে কঠিন পাহারায় বিচারকক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। বিকেল পাঁচটায় আবারো সেলে ফিরিয়ে আনা হতে থাকে।

বিচারকক্ষটি লায়ালপুর জেলের ভেতরই। লাল ইটের দালান। বন্দিকে লোহার চারটি ভারি দরজা পার হয়ে লম্বা সরু করিডোর দিয়ে আদালতে প্ৰবেশ করতে হতো। পাহারা থাকত সাব-মেশিনগান হাতে যুদ্ধসাজে সজ্জিত একদল কমান্ডো। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে দেখে সবসময়ই নেশাগ্ৰস্ত মনে হয়। মনে হয় তিনি তার প্রিয় সুরা ব্ল্যাকডগে আকণ্ঠ ড়ুবে আছেন। অতি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়েও তার কথাবার্তা থাকে জড়ানো। এতে তিনি কোনো অস্বস্তি বোধ করেন না।

আজ তাকে নেশাগ্ৰস্ত মনে হচ্ছে না। তিনি একগাদা ফাইল নিয়ে বসেছেন। দ্রুত ফাইল ক্লিয়ার করা হচ্ছে। তার হাতে সময় নেই। চীনা রাষ্ট্রদূত প্রেসিডেন্ট ভবনে তার সঙ্গে দেখা করার জন্যে আসছেন। দশ মিলিয়ন ডলার অর্থ সাহায্য চীনের কাছ থেকে পাওয়া গেছে। এখন আলাপ আলোচনা চলছে এক জাহাজ বােঝাই সমরাস্ত্র নিয়ে, এর মধ্যে হালকা চৈনিক ট্যাংকও আছে। চীনা রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আজকের আলোচনা এই কারণেই অতি গুরুত্বপূর্ণ।

প্রেসিডেন্টের অতি ব্যস্ততার মধ্যে ঘরে ঢুকলেন জুলফিকার আলি ভুট্টো। প্রেসিডেন্ট এক ঝলক ভুট্টোর দিকে তাকিয়ে বললেন, আপনার যা বলার বলুন। আমি কাজ করতে করতে আপনার কথা শুনব। আজ আমার সীমাহীন ব্যস্ততা।জুলফিকার আলি বললেন, শেখ মুজিবকে কি মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে? প্রেসিডেন্ট কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বললেন, অবশ্যই।ফর গডস সেক। ডোন্ট ড়ু দ্যাট।না কেন?

আপনার হাতে মৃত্যুর চেয়ে সে বড় মাপের মানুষ।জুলফি, আপনার ধারণা তাকে হত্যা করার মতো বড় আমি না? তাকে হত্যা করলে সারা পৃথিবী আমাদের উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়বে। বিশেষ করে আমেরিকানরা। আমেরিকানরা আপনাকে যত খুশি বাঙালি মারতে দেবে, কিন্তু নট শেখ মুজিব।

জুলফি, আপনি কি মনে করেন আমেরিকানদের মনোভাব আমি জানি না? খুব ভালো যোগাযোগ তাদের সঙ্গে আমার আছে। শেখের কী হলো নিক্সন তার পরোয়া করে না। আমি নিক্সনকে ভালোমতো জানি। আমরা যোগাযোগ রেখে চলি। আপনার সঙ্গে আমি এখন আর কথা বলতে পারছি না, চীনা রাষ্ট্রদূত আসছেন। শুনুন জুলফি, আমি শেখকে অবশ্যই ফাঁসির দড়িতে ঝুলাব। যে ঝামেলায় সে আমাকে ফেলেছে তাকে তার মূল্য দিতে হবে। Good bye.

বেগম মুজিবের বিষাদঘন দিনগুলোর কয়েকটি কথা নববর্ষের দিন সূর্যের আলোয় পথ চিনে এগিয়ে গেলাম, আঠার নং রোডের দুর্গসদৃশ সেই বাড়িটার দিকে। বাইরের ঘরেই বসেছিলেন বেগম শেখ মুজিব। হাসিমুখেই আহবান জানালেন আমাকে। বাড়িটার উল্লেখ করতেই হেসে বললেন–এটা তো তবুও একটা মাথা গুজবার ঠাই, কিন্তু ২৫শে মার্চের পর পুরো দেড় মাস তাও কোথাও পাই নি। আজ এখানে কাল সেখানে, এমনি করে সেই মাসে কম করে হলেও চৌদ্দ পানেরটা বাসা বদল করেছি।

হাসছিলেন বেগম মুজিব, কিন্তু দেখলাম হাসির মাঝে কেমন জানি অস্পষ্ট এক বিষণ্ণতার ছোয়ায় করুণ হয়ে উঠেছে তাঁর চোখের দৃষ্টি।২৫শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাত। অন্ধকার শোবার ঘরটাতে বিছানায় শুয়ে শেখ সাহেব শুনছিলেন বাইরে বোমায় বিধ্বস্ত ঢাকার আর্তনাদ। উত্তেজনায় এক এক সময় উঠে বসছিলেন তিনি।

ঠিক এমনি এক মুহুর্তে গুলির একটি টুকরো জানোলা ভেদ করে ছোট ছেলে রাসেলের পায়ে আস্তে করে লাগে। অন্ধকারে হাতড় গুলিট কুড়িয়ে নিয়েছিলেন শেখ সাহেব। আর সেই দুঃসহ রাতেই নরপিশাচরা তাকে বন্দি করে নিয়ে গিয়েছিল। বাড়িতে তখন ছিলেন বেগম মুজিব, আর তার দুছেলে।

২৬শে মার্চ–সমস্ত দিন ছিল কারফিউ। গোলাগুলির শব্দ তখনও থামে নি। নিস্তব্ধ বাড়িটা জুড়ে যেনো এক ভৌতিক বিভীষিকা মাথা খাড়া করে উঠেছে। সামনে ধানমণ্ডি বালিকা বিদ্যালয়ে তাক করে রাখা বড় বড় কামানের মুখগুলো আমার বাসার দিকে। ভয়ে জানালাগুলো পর্যন্ত বন্ধ করে দিতে পারি নি। দুপুরে কারফিউর মধ্যেই এবাসা ওবাসা করে বড় ছেলে কামাল এসে পৌঁছালো।

রাত এলো। সেই আধার কালো রাত। ইয়াহিয়া খানের হিংস্রভাবে চিবিয়ে চিবিয়ে বলা বিবৃতি শুনেই নিজেদের অবস্থা বুঝতে পারলেন বেগম মুজিব। তাই কালবিলম্ব না করে ছোট ছেলে আর মেজ ছেলেকে নিয়ে পাচিল টপকে প্রতিবেশী ডাক্তার সাহেবের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। অন্যদিকে বড় ছেলে কামাল এবং মহিউদ্দীন সাহেব পালালেন অন্যদিকের পাচিল ডিঙিয়ে।

রাত ১১টা থেকেই তোপ দাগার শব্দে কানে তালা লাগার জোগাড়। কতকটা চেতন কতকটা অচেতন অবস্থায় বেগম মুজিব ২৬শে মার্চের সেই ভয়াবহ রাতে শুনলেন তার আদরের বাড়িতে গোলাগুলির শব্দ। রাত ১১টা থেকে ভোর ৫টা পর্যন্ত। সেরাতে এভাবে না পালালে তার এবং তার সন্তানদের ভাগ্যে কী যে ঘটতো আজও তিনি তা ভাবতে পারেন না।

Leave a comment

Your email address will not be published.