জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩২ হুমায়ূন আহমেদ

জোছনা ও জননীর গল্প পর্ব – ৩২

নীলগঞ্জ হাই স্কুলে হেডমাস্টার মনসুর সাহেব মাথা নিচু করে তাঁর শোবার ঘরের খাটে বসে আছেন। তার সামনেই ঘোমটা দিয়ে বসে আছেন তার স্ত্রী আসিয়া। বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে আসিয়া এখন সম্পূর্ণ সুস্থ। তাঁর মাথায় কোনো সমস্যা নেই।মধ্যদুপুর। প্রবল বৃষ্টি হচ্ছে। বৃষ্টি শুরু হয়েছে কাল রাত থেকে। এত প্রবল বর্ষণ নীলগঞ্জে এর আগে কখনো হয়েছে বলে মনসুর সাহেব মনে করতে পারছেন না। তিনি ছোট্ট নিঃশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বললেন, আসিয়া, তুমি যদি অনুমতি দাও। তাহলে আমি একটা কাজ করতে চাই।আসিয়া ক্ষীণ গলায় বললেন, কী কাজ?

মনসুর সাহেব বললেন, ঘোমটা সরাও। কথাগুলি আমি তোমার মুখের দিকে তাকিয়ে বলতে চাই।আসিয়া ঘোমটা সরালেন। মনসুর সাহেব বললেন, আমার অতি প্ৰিয়জন ইরতাজউদ্দিন কাসেমপুরী সবসময় বলতেন, যে স্বামী স্ত্রীর মনে কষ্ট দিয়ে কোনো কাজ করবে। আল্লাহপাক তাকে কখনো ক্ষমা করবেন না। যে কাজটা আমি করতে যাচ্ছি, তার জন্যে তোমার অনুমতি চাই।আসিয়া আবারো বললেন, কী কাজ?

মনসুর সাহেব বললেন, ইরতাজউদ্দিন কাসেমপুরীকে মিলিটারিরা গতকাল সন্ধ্যায় নদীর পাড়ে গুলি করে মেরেছে। তারা এ অঞ্চলে কারফিউ দিয়ে রেখেছে। মৃতদেহ পড়ে আছে নদীর পাড়ে। ভয়ে কেউ সেখানে যাচ্ছে না। আমি উনার ডেডবডি নিয়ে আসতে চাই। নিয়মমতো কবর দিতে চাই।আসিয়া বললেন, আপনি একা এই কাজ পারবেন?

কেন পারব না? পারতে হবে।আপনি যদি বলেন, তাহলে আমি যাব আপনার সঙ্গে।মনসুর সাহেব বিস্মিত হয়ে বললেন, তুমি যেতে চাও? জি যেতে চাই। মিলিটারি। যদি আপনাকে গুলি করে মারে, তাহলে আপনার সঙ্গে আমিও মরতে চাই। আমি একা বেঁচে থেকে কী করব?

নীলগঞ্জের মানুষ বিস্ময়ের সঙ্গে দেখল, হেডমাস্টার সাহেবের সঙ্গে ঘোমটা পর একজন মহিলা প্ৰবল বর্ষণের মধ্যে মাওলানা ইরতাজউদিনের বিশাল শরীর টেনে নিয়ে যাবার চেষ্টা করছে। তাদের খুবই কষ্ট হচ্ছে। অনেকেই দৃশ্যটা দেখছে, কেউ এগিয়ে আসছে না।হঠাৎ একজনকে ভিজতে ভিজতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল। সে আসিয়া বেগমের কাছে এসে উর্দুতে বলল, মাতাজি আপনি সরুন, আমি ধরছি।মনসুর সাহেব বললেন, আপনার নাম?

আগন্তুক বলল, আমি বেলুচ রেজিমেন্টের একজন সেপাই। আমার নাম আসলাম খাঁ।*

*ইরতাজউদ্দিন কাশেমপুরীর নামাযে জানাজা হয় দেশ স্বাধীন হবার পর। ঐদিন তার কবর হলেও জানাজা হয় নি। জানাজার জন্যে মাওলানা খুঁজে পাওয়া যায় নি।

আসমানী হতাশ চোখে রুনির দিকে তাকিয়ে আছে। মেয়েটা এত অবুঝ কী করে হয়ে গেল! সকাল থেকে ঘ্যানঘান করছে, এখন দুপুর। সে সন্দেশ খাবে। সন্দেশের ব্যাপারটা মেয়ের মাথায় কী করে এসেছে আসমানী জানে না। শরণার্থী শিবিরে সে কি কাউকে দেখেছে সন্দেশ খেতে? দেখতেও পারে। এই মেয়ে এখন নিজের মনে ঘুরঘুর করতে শিখেছে। কাউকে কিছু না বলে এখানেওখানে যাচ্ছে। এই পাশে আছে, এই নেই।

একদিন তো সারা দুপুর তার খোঁজ নেই। চিন্তায় অস্থির হয়ে আসমানী যখন ঠিক করল, ক্যাম্প ওয়ার্ডেনকে জানাবে–তখন মেয়েকে দেখা গেল হেলতে দুলতে আসছে। হাতে একটা বনরুটি। কে দিয়েছে বনরুটি? মেয়ে বলবে না। আসমানীর ধারণা, সে কারো কাছ থেকে চেয়ে নিয়ে এসেছে। মেয়েটার ভিখিরি স্বভাব হয়ে গেছে। যেখানেসেখানে হাত পাতিছে।

রুনিকে অবশ্যি দোষ দেয়া যায় না। তারা তো এখন ভিখিরি। নিজ দেশ ছেড়ে অন্য এক দেশে ভিখিরি সেজে বাস করছে। থালা হাতে খাবারের জন্যে দুবেলা লাইন ধরতে হচ্ছে। কী লজ্জা কী লজ্জা! এই লজ্জা এই অপমানের শেষ কি হবে? না-কি বাকি জীবন কেটে যাবে শরণার্থী শিবিরে? এইসব নিয়ে চিন্তা করতে এখন আর আসমানীর ভালো লাগে না। তাঁর এখন একটাই চিন্তারুনিকে আগলে রাখা। যেন হারিয়ে না যায়। হারিয়ে গেলে এই মেয়েকে তার পক্ষে খুঁজে পাওয়া সম্ভব হবে না।

নানা হাতবদল হয়ে একসময় রুনির জায়গা হবে খারাপ পাড়ায়। রুনি ভুলেই যাবে এক সময় তার অতি সুখের সংসার ছিল।কী দ্রুতই না মেয়েটা বদলাচ্ছে! একদিন আসমানী শুনল রুনি কাকে যেন কুৎসিত সব গালি দিচ্ছে–তোর হোগায় লাখি। আসমানী ছুটে বের হয়ে মেয়ের হাত ধরে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এইসব কী বলছি মা? রুনি ঘাড় শক্ত করে বলল, ও তো আমাকে আগে বলেছে।

ও বললেই তুমি বলবে?

হ্যাঁ, বলব।

তুমি জানো না। এইসব খুব খারাপ গালি?

আমি এরচেয়েও খারাপ গালি জানি।

আসমানী কী করবে, মেয়েকে কীভাবে সামলে রাখবে ভেবে পায় না। কী ভয়ঙ্কর পরিবেশ চারপাশে! শরণার্থী শিবিরে চুরি হচ্ছে, এক শরণার্থী অন্যজনের কাপড় চুরি করছে। ধরা পড়ছে। মারামারি হচ্ছে। ওয়ার্ডেনরা ছুটে আসছে। তাদের মুখেও গালি–তোমরা জান বাঁচাইতে আসছি না চুরি করতে আসছ? কাজ তো জানো মোটে তিনটা–হাগা, মুতা আর চুরি।

মাঝে-মাঝে বাংলাদেশ সরকারের লোকজন আসেন। তারা মুখের ভাব এমন করে রাখেন যে শরণার্থীদের দুঃখ-দুর্দশায় তাদের হৃদয় ভেঙে যাচ্ছে। কী সুন্দর সুন্দর বক্তৃতা–আমরা বাঙালি। আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। কিন্তু মাথা নোয়াবো না। আপনারা ধৈর্য ধরুন। আমাদের বীর মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করে যাচ্ছে। বিজয় এলো বলে।

তারা নানান ধরনের পরিকল্পনা নিয়েও আসেন। শরণার্থী শিশুদের জন্যে স্কুল হবে। পড়াশোনা যেন বন্ধ না হয়। শরণার্থীদের দিয়ে নাটক করানো হবে। নাটকের বিষয়বস্তু দেশপ্রেম। বাইরের পৃথিবী যেন দেখে এর মধ্যেও আমরা জীবনের আলোয় উদ্ভাসিত।প্রায়ই বিদেশীরা আসে ছবি তুলতে। কেউ আসে মুভি ক্যামেরা নিয়ে। তাদের সঙ্গে বিরাট লটবহর। সেই সময় যদি শরণার্থীদের কেউ মারা যায়, তবেই তাদের আনন্দ। কত কায়দা করেই না ডেডবডির ছবি তোলা হয়! যারা শোকে অস্থির হয়ে কাঁদছে, তাদের ছবি তোলা হয়।

বিদেশীরা প্রায়ই এটা-সেটা উপহার হিসেবে নিয়ে আসে। গায়ে মাখা সাবান, বাচ্চাদের জন্য লজেন্স, চকলেট। তখন ভয়ঙ্কর অবস্থা হয়! সবাই একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এই ঝাপিয়ে পড়ার দলে রুনিও আছে। ব্যাপাঝাপি করে একবার সে গায়ে মাখা একটা সাবান এনে মাকে দিল। সেদিন তাকে দেখে মনে হয়েছিল, সে বিরাট এক যুদ্ধ জয় করে ফিরেছে।

পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বড় বড় কর্মকর্তারাও আসেন। একদিন এসেছিলেন পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল। তিনি খুবই সুন্দর বক্তৃতা দিয়েছিলেন। বক্তৃতার শেষ পর্যায়ে হাতজোড় করে বলেছিলেন–আমরা আপনাদের শুধু আশ্রয় দিতে পেরেছি। আর কিছু দিতে পারছি না। সাধ আছে, সাধ্য নেই। আমি ক্ষমা প্রার্থনা করছি।

কিছুদিন পর পরই খবর আসে–ইন্দিরা গান্ধীর আসার সম্ভাবনা আছে। তখন সাজ সাজ পড়ে যায়। ব্যাটন হাতে ওয়ার্ডেনরা তাঁবুতে ঢুকে অকারণেই চিৎকার চেচামেচি করে–বিছানা পরিষ্কার, বিছানা পরিষ্কার। খবরদার কেউ ঘরে হাগা-মুতা করবেন না।

রেডক্রস সাইন লাগানো একটা ডিসপেনসারি প্রতিদিনই খোলা থাকে। সেখানে দুজন ডাক্তার বসেন। তারা যত্ন নিয়েই রোগী দেখেন। ব্যবস্থাপত্ৰ লিখে দেন। কিন্তু ওষুধ দিতে পারেন না। ডিসপেনসারিতে ওষুধ নেই। মাঝেমাঝে দান হিসেবে ওষুধ পাওয়া যায়! সেই ওষুধ নিমিষেই শেষ হয়ে যায়।

গৰ্ভবতী মাদের একটা তালিকা রেডক্রস করেছে। সেখানে আসমানীর নাম আছে। তালিকায় নাম উঠার কারণে আসমানী সপ্তাহে এক টিন প্রোটিন বিসকিট পায়। সেই বিস্বাদ বিসকিট রুনি একা কুটকুট করে খায়। মাকে টিন ধরতে দেয় না। মেয়েটার জন্যে আসমানীর এত মায়া লাগে! তার বাড়ন্ত শরীর। এই শরীর খাদ্য চায়। সেই বাড়তি খাবার জোগাড়ের সামর্থ্য আসমানীর নেই।

সকাল থেকে মেয়েটা সন্দেশ সন্দেশ করছে। কোথেকে আসমানী সন্দেশ দেবে! গতকালই তার হাত পুরোপুরি খালি হয়ে গেছে। এখন হাতে একটা টাকাও নেই। মেয়েটার জন্যে আসমানীর এতই খারাপ লাগছে যে হাতে একটা টাকা পাকলেও সে সন্দেশ কিনে দিত।

মা, সন্দেশ কিনে দেবে না?

আসমানী বললেন, দেব।

কখন দেবে? এখন দিতে হবে। এই এখন।

কান্দবে না। রুনি।

রুনি কঠিন মুখ করে বলল, আমি কাঁদব। আমি চিৎকার করব। আমি তোমাকে খামচি দেব।এসো বাইরে যাই। চিৎকার চোঁচামেচি খামচা-খামচি ক্যাম্পের বাইরে করে। ভেতরে না।না, আমি এইখানে চিৎকার করব। আমি বাইরে যাব না।আসমানী মেয়েকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে টিনশেডের বাইরে এনে প্রচণ্ড শব্দে মেয়ের গালে চড় বসাল। রুনি হতভম্ব হয়ে মার দিকে তাকিয়ে আছে। সে এর আগে কখনো মায়ের কাছ থেকে এমন ব্যবহার পায় নি।রুনি বলল, মা, তুমি আমাকে মারছ?

আসমানী বলল, আজ মেরে আমি তোমার হাডিড গুড়া করে দেব! বলতে বলতেই আসমানী মেয়ের গালে শরীরের সর্বশক্তি দিয়ে আবার চড় বসাল।ভাবি, স্নামালিকুম।আসমানী ঘুরে তাকাল। মুখভর্তি দাড়িগোঁফের জঙ্গল নিয়ে অচেনা একজন দাঁড়িয়ে আছে। রোদে ঝলসে যাওয়া তামাটে চেহারা। মাথাভর্তি উড়ুকু চুল।ভাবি, আপনি আমাকে চিনতে পারছেন? চেনার অবশ্যি কথা না। আমি নিজেই এখন নিজেকে চিনি না। ভাবি, শাহেদ কি ক্যাম্পে আছে?

না, ও ক্যাম্পে নেই। ক্যাম্পে আমি মেয়েকে নিয়ে আছি।শাহেদ কোথায়? ও কোথায় আমি জানি না। বেঁচে আছে কি-না তাও জানি না। আপনার নাম কি নাইমুল? ভাবি, আপনি দশে এগারো পেয়েছেন। আমি নাইমুল।আপনি কি মুক্তিযোদ্ধা? জি ভাবি। মেয়ের নাম রুনি না? রুনি মার খাচ্ছে কেন? আসমানী শান্ত গলায় বলল, ও সন্দেশ খেতে চায়। আপনি কি রুনিকে একটা সন্দেশ কিনে খাওয়াতে পারবেন?

নাইমুল বলল, পারব, তবে এখন না ভাবি। আমি সন্ধ্যাবেলায় সন্দেশ নিয়ে আসব।আসমানী তাকিয়ে আছে। মানুষটা লম্বা লম্বা পা ফেলে চলে যাচ্ছে। তার চলে যাবার ভঙ্গি বলে দিচ্ছে সে ফিরবে না। এখন দুঃসময়। দুঃসময়ে কেউ কথা রুনি কান্দছে না। সন্দেশের জন্যেও হৈচৈ করছে না।সন্ধ্যাবেলা নাইমুলের আসার কথা, সে এলো না।

আসমানীর মনে হলো কোনো কারণে হয়তো আটকা পড়ে গেছে, রাতে আসবে। রাতেও এলো না। রুনি বলল, মা, আমি কি ঘুমিয়ে পড়ব? উনি মনে হয় আসবেন না।আসমানী বলল, ঘুমাও। আমরা যখন দেশে ফিরে যাব, যখন তোমার বাবার সঙ্গে দেখা হবে, তখন যত ইচ্ছা সন্দেশ খাবে।

দেশে কবে যাব। মা?

জানি না কবে যাবে।

আসমানীর চোখ ভিজে উঠতে শুরু করছে। সে মেয়ের দিকে তাকাতে পারছে না। রুনির গালে হাতের দাগ বসে গেছে। গাল কালো হয়ে ফুলে উঠেছে। রুনি বলল, মা শোন, আমার এখন আর সন্দেশ খেতে ইচ্ছে করছে না।তোমার যা খেতে ইচ্ছা করবে, তোমার বাবা তাই কিনে দেবে।মার কান্না দেখেই হয়তো রুনির কান্না পেয়ে গেছে। মার শাড়ির আঁচলে মুখ ঢেকে সে ফোঁপাতে ফেঁচাপাতে বলল, বাবার কি আমাদের কথা মনে আছে মা?

রাতে রুনির জ্বর এসে গেল। ভালো জ্বর। আসমানী সারারাত মেয়ের মাথা কোলে নিয়ে বসে রইল।নাইমুল এসে উপস্থিত হলো ভোরবেলা। লজ্জিত গলায় বলল, ভাবি, জোগাড়যন্ত্র করতে দেরি হয়ে গেল। আপনার মেয়ের জন্যে সন্দেশ আনার কথা। সেটাও ভুলে গেছি। খালিহাতে এসেছি। এখন চলুন। জিনিসপত্র গুছিয়ে নিন।আসমানী অবাক হয়ে বলল, কোথায় যাব?

বারাসাত। আমার ফুপার বাড়ি। উনি এখানে সেটল করেছেন। আমি কাল উনার সঙ্গে কথা বলে সব ঠিক করে এসেছি। কোনো সমস্যা হবে না। আমি ক্যাম্পে আপনাদের এইভাবে ফেলে রেখে যাব না।আসমানী বলল, ভাই, আপনি কী বলছেন।নাইমুল বলল, কথা বলে সময় নষ্ট করবেন না তো ভাবি; আমি জিপ নিয়ে এসেছি। ক্যাম্পের লোকদের সঙ্গে কথা বলেছি। আমার ফুপা-ফুফু দুজনই অতি ভালো মানুষ। তাঁরা আপনাকে নিজের মেয়ের মতো যত্নে রাখবেন। আপনার শরীরের যে অবস্থা, আপনার যত্ন দরকার।সত্যি যেতে বলছেন?

অবশ্যই। ভাবি শুনুন, আপনি আপনার মনে সামান্যতম দ্বিধা বা সংকোচ রাখবেন না। আপনার মনের সংকোচ দূর করার জন্যে ছোট্ট গল্প বলি– মন দিয়ে শুনুন। আমি ইউনিভার্সিটিতে পড়াশোনা করার সময় খুবই খারাপ অবস্থায় দিন কাটাতাম। বইপত্র কেনা দূরের কথা, ভাত খাওয়ার পয়সাও ছিল না।

আমার এই অবস্থা দেখে শাহেদের বড়ভাই, মাওলানা ভাই, প্রতিমাসে মানি অর্ডারে আমাকে টাকা পাঠাতেন। আমাকে প্ৰতিজ্ঞা করিয়ে ছিলেন এই ঘটনা যেন শাহেদ না জানে। আমি শাহেদকে জানাই নি। আজ। আপনাকে বললাম! আর আমি এতই অমানুষ যে মাওলানা ভাইকে আমার বিয়ের খবরও জানাই নি। ভাবি, উনি কেমন আছেন জানেন?

ভাই, আমি জানি না। আমি কারোরই কোনো খবর জানি না।লক্কর ধরনের জিপ রাস্তায় ধূলা উড়িয়ে ছুটে চলেছে। নাইমুল বসেছে ড্রাইভারের পাশে। রুনি বসেছে নাইমুলের কোলে। গাড়িতে উঠার পরই তার জ্বর সেরে গেছে। সে ক্রমাগত কথা বলে যাচ্ছে। নাইমুল খুবই মজা পাচ্ছে। রুনি একটা গল্প শেষ করে আর নাইমুল হাসতে হাসতে বলে, এই মেয়ে তো কথার রানী। শাহেদ তো কথাই বলতে পারে না, এই মেয়ে এত কথা শিখল কার কাছে?

পথে এক দোকানের পাশে নাইমুল গাড়ি থামাল। রুনিকে বলল, এসো এখন সন্দেশ খাবার বিরতি। দেখি কয়টা সন্দেশ তুমি খেতে পারো। তোমার সঙ্গে আমার কম্পিটিশন। দেখি কে বেশি খেতে পারে! তারা বারাসাতে এসে পৌঁছল। সন্ধ্যায়। ছবির মতো সুন্দর গাছ দিয়ে ঢাকা একতলা পাকা দালান। গেটের কাছে জিপ এসে থামতেই এক বৃদ্ধা ছুটে এসে আসমানীকে জড়িয়ে ধরে বললেন, এসো গো মা, এসো। সেই দুপুর থেকে তোমার জন্যে অপেক্ষা করছি। আহা মার মুখ শুকিয়ে গেছে! খুব কষ্ট হয়েছে তাই না মা?

খড়ম পায়ে খালি গায় এক বৃদ্ধও বের হয়ে এলেন। তিনিও অতি মিষ্টি গলায় বললেন, দেখি আমাদের বাঙ্গাল মেয়ের চেহারা। ও আল্লা, এই মেয়ের গায়ের রঙ তো ময়লা। আমাদের হলো ফর্সা ঘর। ফর্সা ঘরে কালো মেয়ের স্থান নাই। এই মেয়ে আমরা রাখব না। বলেই শব্দ করে হাসতে লাগলেন।অনেক অনেক দিন পর আসমানীর মনে হলো, সে নিজের বাড়িতেই ফিরেছে। এই বৃদ্ধ-বৃদ্ধ তাঁর অতি আপনজন।যুদ্ধ খুব অদ্ভুত জিনিস। যুদ্ধ যেমন মানুষকে দূরে ঠেলে দেয়, আবার খুব কাছাকাছিও নিয়ে আসে।

নাইমুল বসে আছে টিবির মতো উঁচু একটা জায়গায়। উঁচু থেকে সমতল ভূমির অনেকখানি দেখা যায়। চারদিকে বা বা করছে রোদ। সে বসেছে ছায়ায়। তার মাথার উপর ছাতিম গাছের বড় বড় পাতা ছায়া ফেলে আছে। এই অঞ্চলে ছাতিম গাছের ছড়াছডি। কেউ নিশ্চয়ই হিসাব-নিকাশ করে ছাতিম গাছ লাগায় নি। আপনা-আপনি হয়েছে।

গত সপ্তাহে সে যেখানে ছিল, সেখানে আবার শিমুল গাছের মেলা। একটু পরপর শিমুল গাছ। বসার জন্যে শিমুল গাছ ভালো না, গাছ ভর্তি কাটা। গাছে হেলান দিয়ে বসা যায় না। ছাতিম গাছে হেলান দেয়া যায়। তবে ছাতিম গাছ শব্দহীন বৃক্ষ। বড় বড় পাতা বলেই বাতাসে পাতা কাপার শব্দ হয় না।নাইমুলের পরনে সেলাইবিহীন সবুজ রঙের লুঙ্গি। লুঙ্গির নিচে হাফপ্যান্ট আছে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্যে হাফপ্যান্ট ভালো পোশাক। তবে হাফপ্যান্ট পরে চলাচল সম্ভব না।

লোকজন প্ৰথম দেখাতেই চিনে ফেলবে। সেলাইবিহীন লুঙ্গিটার প্রয়োজন এইখানেই। অপারেশনের সময় টান দিয়ে খুলে ফেলা যায়। তার গায়ে কালো রঙের হাফ হাতা গেঞ্জি। গেঞ্জির উপর ময়লা সুতি চাদর। কাধে ঝুলানো স্টেইনগান লুকিয়ে রাখার জন্য এই গরমে সুতি চাদর গায়ে রাখতে হচ্ছে। স্টেইনগান নাইমুলের পছন্দের অস্ত্র না। তার সীমা পঞ্চাশ গজ। শত্রুর পঞ্চাশ গজের ভেতরে যাওয়া গেরিলাদের বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই হয়ে উঠে না।

নাইমুল পা ছড়িয়ে হেলান দিয়ে বসেছে। তার পায়ের কাছে যে বসে আছে তার নাম রফিক। বসেছে ব্যাঙের মতো। দেখলেই মনে হয় লাফ দেবে। বয়স ত্ৰিশ-পয়ত্রিশ। ব্যাঙের মতোই বড় বড় চোখ; সামান্য উত্তেজিত হলেই চোখ কোটির থেকে বের হয়ে আসতে চায় এমন অবস্থা।

রফিক বিরাট গল্পবাজ। পরিচয়ের পর থেকেই সে বিরামহীন কথা বলে যাচ্ছে। নাইমুল কী বলছে না বলছে সে বিষযে তার আগ্রহ নেই। তার কথা বলাতেই আনন্দ।স্যার, আপনে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার? নাইমুল হাই তুলতে তুলতে বলল, হুঁ। গেরিলাদের প্রধান ট্রেনিং তাদের পরিচয় গোপন রাখা। নাইমুল সেদিক দিয়ে গেল না। প্রয়োজন মনে করল না।শম্ভুগঞ্জের ব্রিজ উড়াইতে আসছেন? আপনের খবর আছে।খবর আছে কী জন্যে?

আপনের আগে আরো তিন পার্টি আসছে। সব ঝাঁঝরা। মেশিনগানের গুল্লি ছুটাইয়া ঝাঁঝরা কইরা দিছে।তুমি মেশিনগান চেন? চিনব না কী জন্যে? মায়ের কোলের নয়া আবুও অখন মেশিনগান চিনে। মর্টার চিনে। পিকেওয়ান চিনে।পিকে ওয়ানটা কী? রফিক চোখ পিটপিট করে তাকাচ্ছে। লোকটা বলছে সে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডার অথচ পিকেওয়ান চেনে না! নাকি লোকটা তাকে খেলাচ্ছে? কেউ তাকে নিয়ে খেলালে রফিকের ভালো লাগে না।

স্যার, আপনের হাতিয়ার কই?

আছে, সবই আছে।

রাখছেন কই?

জেনে কী করবে? শান্তি কমিটির কাছে খবর দিবে?

এইটা কী কন?

এই অঞ্চলে শান্তি কমিটি নাই?

শান্তি কমিটি থাকব না–এইটা কেমন কথা! অবশ্যই আছে। আগের চেয়ারম্যান সাব মুক্তির হাতে মারা পড়ছে। নতুন আরেকজন হইছে চেয়ারম্যান। তারে মারবেন? বাড়ি চিনি। আপনেরে নিয়া ম্যাব? নাইমুল বলল, চা খাওয়াতে পারবে? রফিক বিস্মিত হয়ে বলল, এই মাঠের মধ্যে চা কই পামু? সেটাও একটা কথা। চেয়ারম্যান সাবের বাড়িতে চলেন, চা খাইয়া আসবেন। তার বাড়িতে চায়ের আয়োজন আছে। আপনে মুক্তির কমান্ডার শুনলে লুঙ্গির মধ্যে পিসাব কইরা দিবে। এমন ডরাইল্যা।চেয়ারম্যান সাহেবের নাম কী?

হাশেম চেয়ারম্যান। বউ দুইটা। ভাটি অঞ্চল থাইক্যা এক বউ আনছে, খুবই সুন্দর। তয় চরিত্রে দোষ আছে। সবেই জানে।নাইমুল আবার হাই তুলল। টেনশনের সময় তার ঘনঘন হাই ওঠে। এর কারণটা তার কাছে স্পষ্ট না। মানুষের হাই ওঠে অক্সিজেনের অভাব হলে। টেনশনের সময় কি তার শরীরে অক্সিজেনের ঘাটতি হয়? ব্ৰেইন প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন নিয়ে নেয় বলেই কি এই ঘাটতি?

নাইমুলের টেনশনের প্রধান কারণ, তার দলের কারোরই কোনো খোঁজ নেই। গতকাল ভোরে PEK1 (Plastic Explosive) এসে পৌঁছানোর কথা। সঙ্গে থাকবে ফিউজ, কর্ডেক্স, ডিটেনেটর। প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিড খুব কম হলে পঁচিশ পাউন্ড লাগবে। পঁচিশ পাউন্ডের কমে ব্রিজের সম্প্যান ভাঙা যাবে না। এখন দুপুর। তারা আসবে নৌকায়। এই অঞ্চলে নৌকায় চলাচল এখনো নিরাপদ।মিলিটারি গানবোট বা লঞ্চ নিয়ে নদীতে নামে নি।

তারা শুকনা অঞ্চলেই ঘোরাফেরা করছে। তার প্রধান কারণ পানি হয় নি। ছোট ডিঙ্গি টাইপ নৌকা বা খুন্দাই (তালগাছের নৌকা) ভরসা! মিলিটারিরা এত ছোট জলযানে উঠবে না।দলটিা কোনো বিপদে পড়ে নি তো? এখন সময় এমনই যে হুট করে বিপদ নেমে আসে। আগে থেকে কিছুই বোঝা যায় না।রফিক ঝুকে এসে বলল, কমান্ডার সাহেবের নাম কী? আমার নাম নাইমুল।সকাল থাইক্যা এই জায়গায় বসা। এর কি কোনো ঘটনা আছে?

নাইমুল আবারো হাই তুলতে তুলতে বলল, কোনো ঘটনা নাই। ছায়ায় বসছি। ছায়া মূল ঘটনা না। নৌকা এখানেই আসবে। ছাতিম গাছ দেখে তালা নৌকা ভেড়াবে। তাছাড়া এখান থেকে ডিসট্রিক্ট বোর্ডের সড়কের অনেকখানি চোখে পড়ে। এই সড়কে মিলিটারির চলাচল কী রকম সেটা দেখাও উদেশ্য।রফিক বলল, রইদ চড়া উঠছে। কমান্ডার সাব দেন একটা ছিরগেট, টান দিয়া দেখি কী অবস্থা।

আপনের আগে যে কমান্ডার সাব আসছিল, আমারে আস্তা এক প্যাকেট ছিরাগেট দিয়েছিলেন। বিরাট কইলজার মানুষ ছিলেন।নাইমুল সিগারেট দিল। রফিক আগ্রহের সঙ্গে সিগারেট টানছে। কায়দা করে নাকে-মুখে ধোঁয়া ছাড়ছে। নাইমুলের ধারণা ব্যাঙ-টাইপ এই লোক সিগারেটের আশায় বসে ছিল। আশা পূর্ণ হয়েছে, এখন সে হেলতে দুলতে চলে যাবে।

লোকজন জোগাড় করে মুক্তিবাহিনীর কমান্ডারের গল্প করবে। যুদ্ধের কারণে বিচিত্র সব মানুষের সঙ্গে তার পরিচয় হয়েছে। লেখক হলে বাকি জীবন সে এইসব চরিত্র নিয়ে লেখালেখি করে কাটিয়ে দিতে পারত।কমান্ডার সাব, আপনে কোন বাহিনী? মুজিববাহিনী?

নাইমুল বলল, তুমি মুজিববাহিনীও চেন? চিনব না কেন? একেক বাহিনীর একেক কায়দা। মুজিববাহিনীর ট্রেনিং ভালো। অস্ত্ৰ-শস্ত্ৰ ভালো। অন্য বাহিনীর সাথে তারার বনে না।ভালো কারা? সবই ভালো। মিলিটারি মারা দিয়া কথা। কী কন কমান্ডার সাব?

হুঁ।শান্তি মারলেও লাভ আছে, তয় শান্তি দেশের মানুষ–এইটা বিবেচনায় রাখতে হয়। আপনে কী কন? নাইমুল নিজে একটা সিগারেট ধরাল। হিসাবের সিগারেট। দ্রুত শেষ করা ঠিক হবে না। রফিকের সিগারেট খাওয়া দেখে তার খেতে ইচ্ছা করছে।আগের শান্তি চিয়ারম্যান ক্যামনে মারা পড়ছে সেই গল্প শুনবেন? না।

Leave a comment

Your email address will not be published.