ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য (শেষ পর্ব) – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

ঠাকুরদার সিন্দুক রহস্য – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

কর্নেল বললেন,–ইঞ্জিনিয়ার মিঃ সেনের জিপগাড়ি। চণ্ডী গাড়িটা নিয়ে যাচ্ছিল। যাই হোক, বোঝা যাচ্ছে, আমাকে তো বটেই, আপনাকেও শত্রুপক্ষ চেনে। এটা একটা ভাববার কথা। তো ওসব পরে ভাবা যাবে। আপনি বাথরুমে ঢুকে অন্তত মুখহাত ধুয়ে ফেলুন। গরমজলের ব্যবস্থা আছে। আপনার মুখে এখনও ছাইয়ের ময়লা লেগে আছে। রুমালে চিতার ছাই মোছা যায় না। আর কপালের লাল রংগুলোও ধুয়ে ফেলবেন।

বললুম,–ছ্যা-ছ্যা! মড়াপোড়া ছাই মুখে ঘষেছিলেন হালদারমশাই? গোয়েন্দাপ্রবর কোট এবং সোয়েটার খোলার পর খিখি করে হেসে বললেন,–সে-ছাই না। . কাঠ কুড়াইয়া ধুনি জ্বালছিলাম, সেই ছাই।সুবিমল এসে বলল,থানা থেকে ও.সি. বাসুদেববাবু কর্নেলসায়েবকে ফোন করেছেন! কর্নেল বললেন,–ফোন কি তোমার অফিসঘরে? –হ্যাঁ স্যার! কিছুক্ষণ পরে হালদারমশাই মুখ-হাত ধুয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলেন।

বললেন, –শার্ট-গেঞ্জি-প্যান্ট খুললে অনেক ময়লা বাইরাইব। রাত্রে আর স্নান করুম না। কাইল সকালে স্নান কইর‍্যা সব সাফ করুম।তিনি চেয়ারে বসে হঠাৎ লাফিয়ে উঠলেন,–ওই যাঃ।–কী হল হালদারমশাই? –বাঘছালখান জঙ্গলে ফ্যালাইয়া আইছি।–কাল দিনে গিয়ে খুঁজে পাবেন।এইসময় কর্নেল ফিরে এলেন। জিজ্ঞেস করলুম,–ও.সি. ভদ্রলোককে কেমন বুঝলেন? কর্নেল একটু হেসে বললেন,–মজার কথা শোনো।

হালদারমশাইও শুনুন। ও.সি. বাসুদেব ঘোষ কথাপ্রসঙ্গে বললেন, একটু আগে অবনী মুখার্জি নামে এক ভদ্রলোক তার একজন কাজের লোককে সঙ্গে নিয়ে থানায় গিয়েছিলেন। হৈমন্তীদেবী নাকি কলকাতা থেকে প্রাইভেট ডিটেকটিভ এনেছেন। সেই ডিটেকটিভ সাধুবাবার ছদ্মবেশে মুখার্জিবাবুদের ঠাকুরবাড়িতে ঢোকার জন্য উঁকি দিচ্ছিলেন। অবনীবাবুর দুজন লোক তা দেখতে পেয়ে তাকে তাড়া করে।

ঠাকুরবাড়িতে ডিটেকটিভ ঢুকবে কোন সাহসে? তো ডিটেকটিভ তাঁর এই লোকটাকে লক্ষ করে গুলি ছোড়েন। ভাগ্যিস গুলি এর টর্চের মাথায় লেগে কাঁচ গুঁড়িয়ে গেছে। কাজেই সেই সাধুবেশী ডিটেকটিভ আর হৈমন্তীদেবীর নামে এফ, আই. আর. করতে চান অবনীবাবু। ও.সি. তাকে সান্ত্বনা দিয়ে ব্যাপারটা তদন্ত করবেন বলে বিদায় করেছেন।

হালদারমশাই গুলি-গুলি চোখে তাকিয়ে শুনছিলেন। বললেন,–খাইসে! –নাঃ! খায়নি। বাসুদেববাবু আমাকে জিজ্ঞেস করছিলেন, আমি এ বিষয়ে কিছু জানি কি না? বললুম, জানি। প্রাইভেট ডিটেকটিভ মিঃ কে. কে. হালদার একজন প্রাক্তন পুলিশ ইন্সপেক্টর। তার আত্মরক্ষার জন্য লাইসেন্সড় ফায়ার আর্মস আছে। তবে চরম অবস্থায় পড়লে অর্থাৎ আততায়ী তাকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করলে তিনি শুন্যে গুলি ছুঁড়ে ভয় দেখান। মিঃ হালদার দায়িত্বজ্ঞানহীন নন।

অবনীবাবুর দুজন লোক তার মুণ্ডু কাটতে চেষ্টা করছিল–যেভাবে হৈমন্তীর কালুর মুন্ডু কাটা হয়েছিল।হালদারমশাই উত্তেজিতভাবে বললেন,–ঠিক কইছেন কর্নেলস্যার! একজন আমারে জাপটাইয়া মাটিতে ফেলছিল। অন্যজনের এক হাতে টর্চ ছিল। অন্য হাতে লম্বামতো কী একটা ছিল। দাও হইতে পারে। কুত্তাটার মতন আমার মুণ্ডু কাইট্যা ফেলত।বললুম,–তাহলে অবনী মুখুজ্যেই হৈমন্তীদেবীর পিছনে লেগেছেন! জয়গোপালবাবুকে তিনিই কিডন্যাপ করে লুকিয়ে রেখেছেন।

কর্নেল এতক্ষণে চুরুট ধরিয়ে বললেন,–আগে খোঁজ নিয়ে দেখা যাক অবনীবাবু পদ্য লিখতে পারেন কি না।হালদারমশাই নড়ে বসলেন,–পইদ্য? পইদ্যের কথা ক্যান কর্নেলস্যার? কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর হাত ভরে সেই হলুদ কাগজটা বের করলেন। তারপর বললেন, –আজ বিকেলে জয়গোপালবাবুদের বাড়ির বারান্দায় এটা রাখা ছিল। জয়ন্ত! পড়ে শোনাও। হালদারমশাই কী বলেন শোনা যাক।

আমি পদ্যটা পড়তে থাকলুম : ……. কর্নেল ডাকার কী দরকার…….. প্রাণ যদি চাও গোপালদার……. সিন্দুক খুলবে ঠাকুরদার…… দর্শন পাবে দুই পাদুকার……. জঙ্গলে পোডভিটে সাধুখাঁর……. নিশিরাতে ঠিকঠাই রাখবার……. হুঁশিয়ার পুলিশকে ডাকবার….. চেষ্টাটি করলে গোপালদার…….. মুন্ডুটি ধড় ছেড়ে যাবে তার…….. হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার হুঁশিয়ার

হালদারমশাইয়ের গোঁফের দুই ডগা তিরতির করে যথারীতি কাঁপছিল। ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে তিনি বললেন,–ঠাকুরদার সিন্দুক! দুই পাদুকা! মানে দুইখান জুতা! জয়গোপালবাবুর পাঁচজোড়া জুতা চুরি গেছে। জুতা! ঠাকুরদার জুতা! জুতা চায় ক্যান? জুতায় কী আছে?

কর্নেল চুরুটের ধোঁয়ার মধ্যে বললেন,–১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের আগস্ট বিপ্লব! গোয়েন্দাপ্রবর বললেন,–কী কইলেন? কী কইলেন? –বাবুগঞ্জের জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ হয়েছিল।–অ্যাঁ? –প্রচণ্ড ঝড়বৃষ্টি চলছিল কয়েকদিন ধরে। সেই সময় খাজাঞ্চিখানা লুঠ। হালদারমশাই আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,–কর্নেলস্যার কী কইতাছেন জয়ন্তবাবু?বললুম,–জয়গোপালবাবু কী বলেছিলেন আপনি ভুলে গেছেন হালদারমশাই! উনি বলছিলেন না, ওঁর ঠাকুরদা জমিদারবাড়ির খাজাঞ্চি ছিলেন।

প্রাইভেট ডিটেকটিভ হাসলেন,–হঃ! মনে পড়ছে। কর্নেলস্যার কইছিলেন খাজাঞ্চি মানে ট্রেজারার। তা ট্রেজারার ভদ্রলোকের জুতা অ্যাদ্দিন পরে চায় কারা? ক্যান চায়? বললুম,–আমার ধারণা… কথায় বাধা পড়ল। পর্দা তুলে সুবিমল ঢুকে বলল,আপনারা নটায় ডিনার খেয়ে নিলে ভালো হয় স্যার। ঠাকমশাই বড় শীতকাতুরে মানুষ। বয়সও হয়েছে।কর্নেল ঘড়ি দেখে বললেন, ঠিক আছে। নটায় আমরা খেয়ে নেব।

সুবিমল বেরিয়ে গেলে হালদারমশাই বললেন,–জয়ন্তবাবু কী কইতাছিলেন য্যান? কর্নেল চোখ কটমটিয়ে আমার দিকে তাকালেন,–রাতবিরেতে জুতোর কথা বললেই ভূতপ্রেতের দল জানালার কাছে এসে জুতো চাইবে। সাবধান জয়ন্ত।হালদারমশাই খিখি করে হেসে উঠলেন।… পরদিন সকালে ঘুম ভেঙেছিল ঠাকমশাইয়ের ডাকে। তার হাতে চায়ের কাপ-প্লেট। ঠাকমশাই, কাঁচুমাচু হেসে বললেন,–স্যারের ঘুম ভাঙালুম। কিন্তু বুড়োসায়েব ভোরবেলা আমাকে বলে গেছেন, আপনার বিছানায় বসে বাসিমুখে চা খাওয়ার অভ্যেস।

কর্নেল সর্বত্র এই ব্যবস্থাটা করে প্রাতঃভ্রমণে বের হন। আমার বেড-টি না খেলে বিছানা ছেড়ে উঠতে ইচ্ছে করে না। চা নিয়ে জিজ্ঞেস করলুম,–ঠাকমশাই! কাল রাত্রে যিনি এসেছেন, সেই হালদারসায়েব কি ওঠেননি? –উঠেছেন। বুড়োসায়েব বেরিয়ে যাওয়ার পর উনি উঠে আমার কাছে চা চাইলেন। ওঁকে চা দিয়ে আপনাকে দিতে এলুম।ঠাকমশাই বেরিয়ে যাওয়ার পর চা খেয়ে বাথরুমে গেলুম। প্রাতঃকৃত্যের পর দাড়ি কেটে প্যান্ট-শার্ট-জ্যাকেট পরে বারান্দায় গিয়ে বসলুম। সেই সময় সুবিমলবাবু সাইকেলে থলে ঝুলিয়ে বাজারে যাচ্ছিলেন।

তাকে জিজ্ঞেস করলুম,–হালদারমশাই কী করছেন? সুবিমল বলল,উনি কিছুক্ষণ আগে বেরুলেন। আমি বাজার করে শিগগির ফিরে আসছি।তখনও রোদ আর কুয়াশায় চারদিক রহস্যময় দেখাচ্ছিল। সাড়ে সাতটা বাজে। কিছুটা দূরে পূর্ব-দক্ষিণে সেই সরকারি অরণ্য কুয়াশায় ঢাকা। কিন্তু পুবের ফাঁকা মাঠের ওপর দিয়ে নদী পেরিয়ে ম্লান রোদ এসে বাংলোর ফুলবাগানকে ঈষৎ উজ্জ্বল করেছে। হালদারমশাই তো কর্নেলের সঙ্গে বেরোননি।

পরে বেরিয়েছেন। কোথায় গেলেন তিনি? একটু পরে মনে পড়ল, সরকারি শালের বনে বাঘছাল ফেলে এসেছিলেন। সম্ভবত তিনি সেই বাঘছাল খুঁজে আনতে গেছেন। গোয়েন্দাপ্রবর আমাকে বলেছিলেন, ছদ্মবেশের জিনিসপত্র তিনি চিৎপুর এলাকায় যাত্রা-থিয়েটারের সাজপোশাকের দোকান থেকে কেনেন। বাঘছালটা চিৎপুরে কেনা নকল জিনিস হলেও ওটা তো তাকে পয়সা দিয়ে কিনতে হয়েছে। কাজেই ওটা জঙ্গলে ফেলে রাখবেন কেন? প্রায় নটায় কর্নেল ফিরলেন।

সেই ট্যুরিস্টের বেশ! মাথায় টুপি, পিঠে কিটব্যাগ আঁটা। কোমর থেকে ফ্লাক্স ঝুলছে। গলা থেকে বাইনোকুলার আর ক্যামেরা। তিনি যথারীতি সম্ভাষণ করলেন, –মর্নিং জয়ন্ত! আশা করি সুনিদ্রা হয়েছে! –মর্নিং কর্নেল! বেঘোরে ঘুমিয়েছি। কতদূর ঘুরলেন? –প্রমথ মুখুজ্যের ফার্মের পাশ দিয়ে হেঁটে দোমোহানি জলাধার পর্যন্ত। কিন্তু কুয়াশা কাটতে দেরি হচ্ছিল। বাইনোকুলার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিল।

তাই ফিরে এলুম। পরে দেখা যাবে। হালদারমশাই কোথায়? –উনি সম্ভবত সরকারি জঙ্গলে ওঁর বাঘছাল খুঁজতে গেছেন। আমার সঙ্গে দেখা হয়নি। ততক্ষণে সুবিমল বাজার করে ফিরে এসেছিল। ঠাকমশাই ট্রেতে কফি আর স্ন্যাক্স আনছিলেন। তার সঙ্গে সুবিমলও এল। সে বলল,–আপনি কি পায়ে হেঁটে ড্যাম অব্দি গিয়েছিলেন স্যার? কর্নেল কফিতে চুমুক দিয়ে বললেন, হ্যাঁ। কিন্তু বড্ড কুয়াশা। ওবেলায় গাড়িতে যাব বরং।

–বড় মুখুজ্যের ফার্ম দেখলেন? –দেখলুম। নিচু পাঁচিলের ওপর কাঁটাতারের বেড়া। বাইনোকুলারে যতটা দেখা যায়, দেখলুম।ঠাকমশাই চলে গিয়েছিলেন। সুবিমল এবার চাপাস্বরে বলল,–দোমোহানির এক মেছুনির নাম রানি। তাকে রানিদি বলে ডাকি। পথে তার সঙ্গে দেখা হল। তার কাছে হাফকিলো পাবদা মাছ ছিল। মাছগুলো দিয়ে রানিদি বলল, প্রায় দেড় কিলো পাবদা ছিল। আসবার পথে বড় মুখুজ্যের ডাকে ফার্মে ঢুকেছিল সে।

মাছ ওজন করার সময় রানিদি একপলকের জন্য নাকি জয়গোপালকে দেখেছে। ঘর থেকে বেরিয়েই ঘরে ঢুকে গেল। রানিদি জানে, জয়গোপালবাবুকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।সুবিমলের কথা শুনে হতবাক হয়ে গিয়েছিলুম। কিন্তু কর্নেল একটু হেসে বললেন, তোমার রানিদি জয়গোপালবাবুকে একপলক দেখেছে। আমি বাইনোকুলারে মিনিটতিনেক দেখেছি। ফার্মের পশ্চিমে গেট।

গেটের ভিতর ঢুকলে বাঁদিকে প্রমথবাবুর বাংলো। একেবারে মডার্ন ফার্ম। প্রমথবাবুও পোশাকে আমার চেয়ে বেশি সায়েব। ড্রেসিং গাউন পরে বারান্দার ইজিচেয়ারে বসে গায়ে রোদ নিচ্ছিলেন। আমি দক্ষিণ-পূর্ব কোণে পাঁচিলের মাথায় বাইনোকুলার রেখে তাকে দেখছিলুম। আর তার পাশে একটা চেয়ারে বসে আদি অকৃত্রিম জয়গোপালবাবু চা-পান করছিলেন। কিন্তু বেশিক্ষণ দেখা হল না।

একটা তাগড়াই অ্যালসেশিয়ান কুকুর টের পেয়ে দৌড়ে আসছিল। আমি রাস্তার অন্যপাশে একটা আখের জমিতে ঢুকে পড়লুম। অ্যালসেশিয়ানের মুখের পাশে একটা ষণ্ডামার্কা লোকের মুখ দেখলুম। পিচরাস্তায় কাকেও না দেখতে পেয়ে সে কুকুরটাকে নিয়ে অদৃশ্য হল।সুবিমল বলল,–অদ্ভুত ব্যাপার স্যার! জয়গোপালদা নিজেকে নিজেই লুকিয়ে রেখেছেন তাহলে! –চেপে যাও। আর ঠাকমশাইকে বলো, আমরা সাড়ে নটায় ব্রেকফাস্ট করে গাড়িতে বেরুব।

সুবিমল চলে গেলে বললুম,–কর্নেল! এমন তো হতেই পারে, রানাঘাট স্টেশনে জয়গোপালবাবুকে গাড়িতে লিফ্ট দেওয়ার ছলে প্রমথবাবু বা তার লোকেরা তাকে কিডন্যাপ করে ফার্মহাউসে রেখেছে। প্রাণের ভয়ে বেচারা চুপচাপ আছেন! –এবং চেয়ারে বসে চা-ও খাচ্ছেন! রানি মেছুনিকে দেখেই লুকিয়ে পড়েছেন।কর্নেল মিটিমিটি হাসছিলেন। আমি বললুম,–আহা! ভিতু গোবেচারা লোক। প্রাণের দায়ে মানুষ অনেক কিছু করে।–এবং পদ্য লিখে ঠাকুরদার সিন্দুকে রাখা জুতো দুটো সাধুখাঁর পোড়ো-ভিটেয় রেখে আসতে বলে!অবাক হয়ে বললুম,–কর্নেল! আপনি কি সিরিয়াসলি বলছেন?

কর্নেল তার প্রসিদ্ধ অট্টহাসি হাসলেন। তারপর বললেন,–নাঃ! তোমার কথায় যুক্তি আছে। জয়গোপালবাবু সম্ভবত পদ্যচর্চা করতেন। তার ওপর তিনি একটু ছিটগ্রস্ত। প্রমথবাবুর কথায় তিনি পদ্যটা লিখতেও পারেন। –কিন্তু হৈমন্তীদেবী তো তার ঠাকুরদার সিন্দুক কোথায় আছে জানেন না! তাহলে? কর্নেল স ম গ্র কর্নেল আমার কথার জবাব দিলেন না। কফি শেষ করে চুরুট ধরিয়ে বারান্দা দিয়ে এগিয়ে গেলেন। সুবিমলকে অফিস থেকে বেরুতে দেখলুম। তারপর কর্নেল তার সঙ্গে অফিসে ঢুকলেন।

সাড়ে নটায় আমরা ব্রেকফাস্ট করলুম। তখনও হালদারমশাইয়ের পাত্তা নেই। কর্নেল বললেন, বলা যায় না। জঙ্গলে বাঘছাল খুঁজতে গিয়ে হালদারমশাই গোয়েন্দাগিরি করতে প্রমথবাবুর ফার্মের আনাচে-কানাচে হয়তো ওত পেতে বসে আছেন। কিন্তু সমস্যা হল, অ্যালসেশিয়ানের পাল্লায় পড়ে ফায়ার আর্মস থেকে গুলি ছুড়লে কী হবে? ব্রেকফাস্টের পর সুবিমলও আমাদের সঙ্গে আসতে চাইল। কর্নেল একটু হেসে বললেন, –আমরা কিন্তু হালদারমশাইয়ের মতো গোয়েন্দাগিরি করতে যাচ্ছি না।

কাজেই তুমি আসতে পারো। তাছাড়া তোমার আসবার অধিকার আছে। কারণ তুমি আপাতদৃষ্টে জটিল রহস্যে ভরা একটা ঘটনার এমন মূল্যবান সূত্র দিয়েছ, যা দিয়ে এই ঘটনার সব জট খুলে যাবে।মনে-মনে অবাক হলেও কিছু বললুম না। রহস্যের জট খোলার কী মূল্যবান সূত্র দিয়েছে সুবিমল, কে জানে! মোরামরাস্তা দিয়ে গাড়ি চালিয়ে বাঁদিকে সেই শাল-সেগুনের সরকারি জঙ্গল পেরিয়ে যেতে-যেতে হঠাৎ কর্নেল বললেন,–জয়ন্ত! গাড়ি থামাও।

গাড়ি দাঁড় করিয়ে বললুম, কী ব্যাপার? কর্নেল গাড়ি থেকে নেমে বললেন,–যা ভেবেছিলুম, তাই ঘটেছে সম্ভবত। জঙ্গলের মধ্যে কুকুরের হাঁকডাক কানে আসছে। সুবিমল গাড়িতে বসে থাকো। জয়ন্ত! আমার সঙ্গে এসো তো! আমারও কানে এল জঙ্গলের মধ্যে কুকুরের প্রচণ্ড চাঁচামেচি। কর্নেলকে অনুসরণ করে জঙ্গলে ঢুকলাম। শুকনো পাতার ওপর নিঃশব্দে চলা কঠিন।

কুকুরের গজরানি লক্ষ করে কিছুটা এগিয়ে গিয়ে চোখে পড়ল এক অদ্ভুত দৃশ্য! একটা ষণ্ডামার্কা গুঁফো লোকের হাতের চেনে আটকানো প্রকাণ্ড একটা অ্যালসেশিয়ান কুকুর। লোকটা ওপরদিকে তাকিয়ে আছে। আর কুকুরটাও ওপরদিকে মুখ তুলে বিকট হাঁকডাক করছে।তারপরই দেখতে পেলুম একটা শালগাছের উঁচু ডালে বসে আছেন প্রাইভেট ডিটেকটিভ হালদারমশাই। তার হাতে কোনো ফায়ার আর্মস নেই।

গুঁড়ি মেরে দুজনে এগিয়ে গেলুম। ষণ্ডামার্কা গুঁফো লোকটা দাঁত বের করে নিঃশব্দে হাসছে। আর হালদারমশাই ধমক দিচ্ছেন,–হালার কুত্তারে গুলি কইর‍্যা মারুম! অরে লইয়া যাও কইতাছি! সত্যই গুলি করুম! কর্নেল এবং তার পিছনে আমি একসঙ্গে উঠে দাঁড়ালুম। তারপর কর্নেল ধমক দিয়ে বললেন, –এ কী হচ্ছে? এক্ষুনি অ্যারেস্ট করব বলে দিচ্ছি। কুকুর নিয়ে ফার্মে চলে যাও। গিয়ে দেখো, এতক্ষণ সেখানে পুলিশ বড় মুখুজ্যেবাবু আর জয়গোপালবাবুকে পাকড়াও করেছে।

লোকটা দাঁতমুখ খিঁচিয়ে বলল,–কে আপনি? ওই বাবুর মতো আপনাকেও টমকে দিয়ে গাছে চড়িয়ে ছাড়ব। ওসব পুলিশ-টুলিশ আমি পরোয়া করি না! এবার কুকুরটা আমাদের দিকে ঘুরে গজরাতে থাকল। কর্নেল এক পা এগিয়ে গিয়ে বললেন,–তাহলে আগে কুকুরটা তারপর তোমার মুণ্ডুটা গুলি করে উড়িয়ে দিই।বলে তিনি সত্যিই জ্যাকেটের ভিতর থেকে রিভলভার বের করলেন। গাছের ওপর থেকে গোয়েন্দাপ্রবর চেঁচিয়ে উঠলেন,–আমার রিভলভারটা সঙ্গে আনি নাই।

হালার কুত্তার মাথা ফুটা কইর‍্যা দ্যান কর্নেলস্যার! লোকটা রিভলভার দেখে আঁতকে উঠে কুকুরের চেন ছেড়ে দিয়ে গুলতির মতো উধাও হয়ে গেল। কুকুরটাও কী বুঝল কে জানে, তখনই তার পিছনে দৌড়ে অদৃশ্য হল। কর্নেল বললেন,–হালদারমশাই! আপনি শালগাছে চড়লেন কী করে?হালদারমশাই সোজা গুঁড়ি বেয়ে তরতর করে নেমে এসে সামনে দাঁড়ালেন। জিজ্ঞেস করলুম, –আপনার পেট অত মোটা কেন?

হালদারমশাই সোয়েটারের ভিতর থেকে তাঁর বাঘছালটা বের করে সহাস্যে বললেন,–কুত্তার তাড়া খাইয়াও বাঘছাল ফেলি নাই। শুধু একখান ভুল, ফায়ার আর্মস আনি নাই।কর্নেল বললেন, আপনি বাঘছাল খুঁজতে কি প্রমথবাবুর ফার্মে গিয়েছিলেন? –না! বাঘছাল ঠিক জায়গায় ছিল। কুড়াইয়া লইয়া ভাবছিলাম, এই জঙ্গলের ওধারে বড় মুখার্জির ফার্ম। তাই সেখানে গিয়া আড়াল থেইক্যা লক্ষ রাখছিলাম। অমনই কুত্তাটা ট্যার পাইছিল।বুঝেছি।–বলে কর্নেল ঘুরে মোরামরাস্তার দিকে পা বাড়ালেন।

হালদারমশাই আমাদের অনুসরণ করলেন। আমি বললুম,–ভাগ্যিস গাছে চড়েছিলেন। নইলে কুকুরটা আপনার অবস্থা শোচনীয় করে ফেলত।হালদারমশাই হাসিমুখে বললেন,–কইছিলাম না? পঁয়তিরিশ বৎসর পুলিশের চাকরি করছি। তো কর্নেলস্যার পুলিশের কথা কইছিলেন ক্যান? সুবিমল বলল,–হিমিদি স্কুলে চলে গেলে ওঁকে ডেকে আনতে হবে।কর্নেল বললেন,–না। উনি ক’দিনের জন্য ছুটি নিয়েছেন।

মোরামরাস্তা যেখানে পিচরাস্তার সঙ্গে মিশেছে, তার আগে শালের জঙ্গলটা শুরু হয়েছে। তাই আমাদের সামনে জঙ্গলের কিছুটা আড়াল ছিল। কিন্তু গাছের ফাঁক দিয়ে দেখলুম, পিচরাস্তায় একটা পুলিশের জিপ আর পিছনে কালো রঙের পুলিশভ্যান দ্রুত বাবুগঞ্জের দিকে চলে গেল। বললুম,–কর্নেল! পুলিশের গাড়ি গেল।কর্নেল একটা চুরুট ধরিয়ে বললেন, এখন পুলিশ নয়, ঠাকুরদার সিন্দুক। আর সিন্দুকের মধ্যে জুতো।পিছন থেকে হালদারমশাই বললেন,–কী কইলেন? কী কইলেন? -–আগস্ট বিপ্লব। সুবিমলকে জিজ্ঞেস করুন! সে জানে।

হালদারমশাই সুবিমলকে নিয়ে পড়লেন। সুবিমল তাকে বাবুগঞ্জের বাড়িতে ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে আগস্ট মাসে ঝড়বৃষ্টির কাহিনি শোনাতে থাকল।বাজারে এখনই ভিড়। হালদারমশাইকে একটা খাবারের দোকানের কাছে নামিয়ে দিলুম। সুবিমল বলল,মিঃ হালদার! হিমিদির বাড়ি চিনতে পারবেন তো? হালদারমশাই বললেন,–হঃ। চিন্তা করবেন না। কুত্তার তাড়া খাইয়া ক্ষুধা পাইছে। কিছু খাইয়া লই।

কর্নেল সুবিমলকে শর্টকাটে পৌঁছনোর পথ দেখাতে বলেছিলেন। গলিপথে ঘুরপাক খেতে-খেতে নদীর ব্রিজের কাছে সেই বাজারে গিয়ে সেখান থেকে ডাইনে ঘুরে আবার একটা গলিতে ঢুকেই জয়গোপালবাবুদের বাড়িটা চিনতে পারলুম। গাড়ির শব্দ শুনে কাচ্চাবাচ্চারা ভিড় করেছিল। সুবিমল ধমক দিয়ে তাদের হটিয়ে দিল।হৈমন্তী বেরিয়ে নমস্কার করে বললেন,–ভিতরে আসুন আপনারা। আমি গেনুদাকে ডেকে বলে আসি, গাড়ি পাহারা দেবে। সুবিমল! ভিতরে গিয়ে বসার ঘরে দরজা খুলে দাও।

কাল রাতে যে ঘরে বসেছিলুম, সেই ঘরে আমি ও কর্নেল বসলুম। একটু পরে হৈমন্তী ফিরে এলেন। কর্নেল বললেন,–গতরাতে কোনো উৎপাত হয়নি তো? হৈমন্তী বললেন,–না। তবে প্রবোধদাতাকে চেনেন কি না জানি না –চিনি। বলুন! –আপনারা চলে যাওয়ার পর প্রবোদা মাতলামি করছিল।–কিছু বলছিলেন কি উনি? –মাতলামি করে গান গাইছিল। গোপাল আছে শিবের কোলে! সরলামাসি ওকে ধমক দিয়ে তাড়িয়ে দিল। তবে গানটা শুনে খটকা লেগেছিল।কর্নেল হাসলেন,–প্রবোধবাবু ঠিকই বলেছিলেন। –তার মানে?

–পরে বলছি। আপনি বাইরের দরজা বন্ধ করে একবার বাড়ির ভিতরে চলুন।ভিতরে ঢুকে দেখলুম, বাড়িটার গড়ন ইংরেজি এল অক্ষরের মতো। যে ঘরে বসেছিলুম, সেটার ভিতরের দরজা পশ্চিমমুখী। এটার সংলগ্ন দুটো ঘর দক্ষিণমুখী। উঠোনের দুটো দিকে পাঁচিল। পাঁচিলের উত্তর অংশে শেষ ঘরটার সংলগ্ন টালির চালের রান্নাঘর।কর্নেল বললেন, আপনার দাদা সম্ভবত এই ঘরটায় থাকতেন। আর আপনি থাকেন রান্নাঘরের পাশে শেষ প্রান্তের ঘরে। তাই না।

হৈমন্তী একটু চমকে উঠে বললেন, হ্যাঁ। আপনাকে কি দাদা এসব কথা বলেছিল? কর্নেল তার কথার জবাব না দিয়ে বললেন, আপনার দাদার ঘরে তালা আঁটা দেখছি। ওটার ডুপ্লিকেট চাবি নেই? হৈমন্তী গম্ভীরমুখে বললেন,–না। দাদা নিজের ঘরের চাবি নিজের কাছেই রাখে।কর্নেল জ্যাকেটের ভিতর থেকে একটা সাদা খাম বের করে বললেন,–এর মধ্যে আপনার ঠাকুরদার উইল আছে। উইলের একটা অংশ পড়ে আমার খটকা লেগেছে। পড়ে শোনাচ্ছি।

বলে তিনি সাদা খামের ভিতর থেকে আরেকটা জীর্ণ খাম বের করলেন। তার ভিতর থেকে সাবধানে এক পাতার একটা পুরু কাগজ বের করলেন। ওপরের দিকটায় স্ট্যাম্প আছে। কত টাকার স্ট্যাম্প দেখতে পেলুম না। হলুদ হয়ে যাওয়া এবং ভাঁজ ছিঁড়ে যাওয়া কাগজটা যে উইল, তা বোঝা গেল। রেজেস্ট্রি করা উইল। কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে আতশ কাঁচ বের করে একটা অংশ পড়লেন।

‘…এতদ্ব্যতীত দালানবাটীর পশ্চিমে শেষাংশে দ্বিতলের নিম্নতলে সুরক্ষিত সিন্দুক এবং তন্মধ্যে সংরক্ষিত যাবতীয় দ্রব্য আমার পুত্র শ্রীমান হরগোপাল রায় পাইবে।‘ কর্নেল বললেন,–হরগোপাল রায় আপনার বাবা। আপনার ঠাকুরদা ‘দ্বিতলের’ লিখে ‘নিম্নতল’ লিখেছেন। কিন্তু শেষাংশ দ্বিতল নয়। দোতলা নয়। একতলা। তাহলে নিম্নতল’ কথাটার একটাই মানে হয়। তাই না হৈমন্তীদেবী? হৈমন্তী মুখ নামিয়ে বললেন,–কিছু বুঝতে পারছি না। –পশ্চিমে শেষাংশে আপনার ঘর। প্লিজ! আপনার ঘরে চলুন।

হৈমন্তী একটু ইতস্তত করে নিজের ঘরে গিয়ে তালা খুলে দিলেন। তারপর ভিতরে ঢুকে পশ্চিম, উত্তর এবং দক্ষিণের জানালা খুললেন। আমরা বারান্দায় জুতো খুলে ঘরে ঢুকলুম। দেখলুম, দেওয়ালের পশ্চিমে সেকেলে একটা উঁচু পালঙ্ক। অন্যদিকে আলমারি। র‍্যাকে সাজানো বই। এককোণে ছোট্ট বেঞ্চিতে কভারে ঢাকা বাক্স-প্যাঁটরা।

কর্নেল একটু হেসে বললেন,–”দ্বিতলের নিম্নতল’ কথাটা আমি বুঝতে পেরেছি হৈমন্তীদেবী! এই ঘরের তলায় একটা ঘর আছে। ইংরাজিতে যাকে বলে বেসমেন্ট। আগের দিনে বলা হত তিয়খানা। সেখানে দামি জিনিস রাখা হত। আপনার খাটের মাথার দিকে ছোট্ট বেঞ্চে বাক্স-প্যাটরা রাখা আছে।

বলে কর্নেল প্যান্টের পকেট থেকে তাঁর খুদে কিন্তু জোরালো আলোর টর্চ বের করে জ্বাললেন। তারপর একটু ঝুঁকে দেখে নিয়ে বললেন,–বেঞ্চের তলায় পেতলের বালতিটা সরাচ্ছি। আমাকে বাধা দেবেন না প্লিজ!!কর্নেল পেতলের বালতি সরাতেই দেখা গেল একটা মোটা লোহার আংটা। কর্নেল উঠে দাঁড়িয়ে বললেন,–হৈমন্তীদেবী! লোহার ওই আংটা ধরে জোরে টান দিলে লোহার চৌকো একটা পাত উঠে আসবে। নীচে সিঁড়ি আছে। নেমে গেলেই সিন্দুকটা পাওয়া যাবে।

হৈমন্তী কান্নাজড়ানো গলায় বললেন,–কিন্তু গোপালদাকে সিন্দুকের খোঁজ দিলে সে ঠাকুরদার জুতো দুটো বের করবে। জুতো দুটোর হিলে কী আছে তা কি আপনি জানেন? কর্নেল বললেন,–জানি! তার মানে, এই সুবিমলের মুখে একটা ঘটনা শোনার পর তা আমি যুক্তিসঙ্গতভাবেই অনুমান করেছি। ১৯৪২ সালের আগস্ট মাসে ঝড়বৃষ্টির রাতে স্বদেশি বিপ্লবীরা জমিদারের খাজাঞ্চিখানা লুঠ করেছিলেন। আপনার ঠাকুরদা ছিলেন খাজাঞ্চি। তাকে বেঁধে রেখে ধনরত্ন লুঠ করা হয়েছিল।

যেভাবে হোক, বাঁধন খুলে আপনার ঠাকুরদা পালিয়ে আসার সময়–হ্যাঁ, আমার অনুমান ঠিক, দৈবাৎ দুটি দামি রত্ন দেখতে পান। আমার দৃঢ় বিশ্বাস রত্নদুটি হিরে। তাই বিদ্যুতের আলোয় তার চোখ ধাঁধিয়ে দেওয়ার জন্য হিরের দুটি খণ্ড আপনার ঠাকুরদা কুড়িয়ে পান। এর পরের কাহিনি আপনার জানা। সুবিমল আমাকে বলেছে, আপনার ঠাকুরদাকে জেল খাটানোর চেষ্টা করেছিলেন জমিদারবাবু। আট বছর তিনি লুকিয়ে থাকার পর ফিরে আসেন।

হৈমন্তী বললেন, আমি সব জানি। বাবার কাছে শুনেছি। কিন্তু দাদা এতদিনে রেলের চাকরি থেকে রিটায়ার করে আসার পর মুখুজ্যেদের পাল্লায় পড়েছে, তা বুঝতে পেরেছিলুম। দাদাকে টাকার লোভ দেখিয়ে মুখুজ্যেরা হিরে দুটো হাতাতে চায়। তাই মিথ্যা করে জুতোচুরির গল্প শোনায়।কর্নেল হাসলেন,–আপনি জানেন তাহলে? হৈমন্তী চোখ আঁচলে মুছে বললেন,–আগে একটু সন্দেহ হয়েছিল। গতরাতে ওই পদ্য পড়েই বুঝেছিলুম, এটা দাদার পদ্য। হাতের লেখা অন্যের। দাদার পদ্য লেখার অভ্যাস আছে।

হালদারমশাই ফোঁস করে শ্বাস ছেড়ে বললেন,–খাইসে! এই সময় বাইরে গাড়ির হর্ন শোনা গেল। কর্নেল বললেন,–আপনার দাদা নিখোঁজ হয়েছিলেন। ওঁকে প্রমথ মুখুজ্যের ফার্ম থেকে পুলিশ উদ্ধার করে এনেছে। শিগগির এ ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে তালা এঁটে দিন। আমি বাইরে যাচ্ছি।পুলিশের জিপ থেকে একজন অফিসার নেমে এসে করজোড়ে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন,–আমার সৌভাগ্য, কিংবদন্তি পুরুষ কর্নেল নীলাদ্রি সরকারের সঙ্গে সাক্ষাৎ হল। আমি ও. সি. বাসুদেব ঘোষ।

কর্নেল বললেন,–জয়গোপালবাবুকে এনেছেন তো? –হ্যাঁ। প্রমথবাবুর ফার্মে দিব্যি বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আমাদের দেখে অবাক হয়ে, পরে বললেন, আমি নিখোঁজ হব কোন দুঃখে? বড় মুখুজ্যেবাবু জামাই-আদরে রানাঘাট স্টেশন থেকে গাড়ি চাপিয়ে ফার্মে নিয়ে এসেছেন। খাচ্ছি-দাচ্ছি! দিব্যি আছি! জয়গোপালবাবু জিপের পিছনদিক থেকে একলাফে নেমে এলেন। হাসিমুখে কর্নেলকে নমস্কার করে বললেন, আপনি এসে পড়েছেন তাহলে? কর্নেল গম্ভীরমুখে বললেন,–পাঁচজোড়া জুতোর মধ্যে প্রথমজোড়া ছিল আপনার।

বাকি চারজোড়া জুতো কি বড় মুখুজ্যে কিনে দিয়েছিলেন? জয়গোপালবাবু জিভ কেটে বললেন,–ছ্যা-ছ্যা! আমার কি জুতো কেনার পয়সা নেই? আপনার দিব্যি! মা কালীর দিব্যি! পুলিশস্যারের দিব্যি! আমার পাঁচজোড়া জুতো সত্যি চুরি গিয়েছিল। সেই জুতোগুলো আজ সক্কালে বড় মুখুজ্যের ফার্মের পাঁচিলের গোড়ায় ঘাসের মধ্যে দেখেছি। সবগুলোর হিল ওপড়ানো। খাপ্পা হয়ে বললুম, বড় মুখুজ্যেদা! এ কী করেছ? বড় মুখুজ্যের এক কথা। ঠাকুরদার জুতোজোড়া এনে দাও।

তবে ছাড়া পাবে! তারপর কাল দুপুরবেলা আমাকে দিয়ে পদ্য লিখিয়ে ছাড়ল। না লিখলে অ্যালসেশিয়ান দিয়ে আমাকে খাওয়াবে বলল। শেষে বলল, কালুর মতো মুণ্ডু কেটে এই বাড়ির দরজায় ঝুলিয়ে রাখব। করি কী বলুন? –প্রবোধবাবু আপনাকে দেখতে পেয়েছিলেন? –হ্যাঁ বড় মুখুজ্যে তাকে পেট ভরে মদ খাইয়ে ছেড়ে দিলেন! –তাই তিনি আপনার বোনকে বলে গেছেন, ‘গোপাল আছে শিবের কোলে। প্রমথ শিবের একটি নাম।

ও.সি. বাসুদেব ঘোষ বললেন,–প্রমথ মুখুজ্যের বিরুদ্ধে ‘রংফুল কনসাইনমেন্ট’-এর বেআইনি আটকের চার্জে এফ. আই. আর. করেছি। জয়গোপালবাবুর কথা শুনেই বুঝেছিলাম, ভদ্রলোক ওঁর সরলতার সুযোগ নিয়েছিলেন।জয়গোপালবাবু করজোড়ে বললেন,–মামলা করে কী হবে? ঠাকুরদার জুতো তো কেউ হিমির কাছ থেকে হাতাতে পারবে না। হিমি! বিশ্বাস কর আমাকে। আমি কখনও তোকে ঠাকুরদার সিন্দুকের কথা জিজ্ঞেস করব না।

ও.সি. বললেন,–ঠাকুরদার সিন্দুক। সেটা কী? কর্নেল বললেন,–পরে সব বলব। আমি সেচ-বাংলোয় আরও একটা দিন থাকছি। দোয়োহানি ড্যামে সাইবেরিয়ান হাঁসের ছবি না তুলে যাচ্ছি না। যাই হোক, আপাতত ভাই-বোনকে আশা করি একটু প্রোটেকশন দেবেন। অবনী মুখুজ্যে কেমন লোক আমি জানি না।

হালদারমশাই কিছু বলতে গিয়ে থেমে গেলেন। বুঝলুম, গতরাতে অবনী মুখুজ্যের দুটো লোকের পাল্লায় পড়ে হেনস্থা হওয়ার কথা বলার ইচ্ছে ছিল। কিন্তু তাকে থামতে হল ও. সি. বাসুদেববাবুর কথায়,সম্ভবত ইনিই সেই প্রাইভেট ডিটেকটিভ? আপনার বিরুদ্ধে অবনীবাবু নালিশ করতে গিয়েছিলেন।

হালদারমশাই স্মার্ট হয়ে পকেট থেকে তার ডিটেকটিভ এজেন্সির পরিচয়পত্র দেখিয়ে বললেন, –আমারে দাও দিয়ে অ্যাটাক করছিল অবনীবাবুর দুইজন লোক। লোক না গুণ্ডা! আমি প্রোফেশনের কাজে যেখানে ঘুরি, অগো কী? ও.সি. হাসতে-হাসতে জিপে উঠে বললেন,–দিনে সময় হবে না। সন্ধ্যা সাতটায় কর্নেলসাহেবের সঙ্গে সেচ-বাংলোয় গিয়ে ঠাকুরদার সিন্দুকের গল্প শুনব! নমস্কার!ও.সি. চলে গেলে হৈমন্তী বললেন,–কর্নেলসায়েব! দাদাকে বলে দিন, কখনও যেন আর ঠাকুরদার সিন্দুকের নাম না করে।

জয়গোপালবাবু করুণমুখে বললেন, কিন্তু ঠাকুরদার দু-পাটি জুতোর একপাটি আমার প্রাপ্য কি না বল হিমি।হৈমন্তী বললেন,–জুতো নিয়ে কী করবে তুমি? তার চেয়ে অবনী মুখুজ্যের জবরদখল জমিটা তুমি আর আমি আইনত মালিক হিসেবে গার্লস স্কুলে . •মে দান করে দেন! –দিলুম! তারপর? –দু’পাটি জুতো বিক্রি করে সেই টাকায় গার্লস স্কুলের বাড়ি তৈরি করে দেব।

–জুতো বিক্রি করে? হ্যাঁ? বলিস কী হিমি? কর্নেলসায়েব! এ কী অদ্ভুত কথা! সুবিমল মুখ ফসকে বলতে যাচ্ছিল জুতোর হিলের মধ্যে কী আছে, কর্নেল তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন,–জয়গোপালবাবু। অদ্ভুত কথার মানে যথাসময়ে জানতে পারবেন। কিন্তু আপনি নিজের জুতো নিজে চুরি না করলেও প্রমথবাবুর প্ররোচনায় একটা খারাপ কাজ করেছেন।জয়গোপালবাবু ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললেন,–আজ্ঞে? –কালু নামে কুকুরটা আপনাকে দেখলে বা আপনি তার কাছে গেলে চাঁচাত না।

কারণ আপনাদের বাড়িরই পোষা কুকুর। এবার বলুন কালুকে আপনি কি কোলে তুলে বা কোনোভাবে প্রমথবাবুর লোক দিয়েছিলেন? জয়গোপালবাবু! আপনার সাহায্য ছাড়া কারও সাধ্য ছিল না যে কালুর মুণ্ডু কাটবে।জয়গোপালবাবু ভেউ-ভেউ করে কেঁদে উঠলেন। তারপর বললেন, আমি কেমন করে জানব গণশা আমার কোল থেকে তাকে আচমকা কেড়ে নেবে আর কেষ্টা তার মুণ্ডু কাটবে? অন্ধকার রাত্তির।

আমাকে গণশা আর কেষ্টা ক্লাব থেকে এগিয়ে দেওয়ার ছলে সঙ্গে এসেছিল। তারপর বলল, কালুকে নিয়ে একটা মজার খেলা খেলবে! আমি কি জানতুম কী মজা? হৈমন্তী বললেন, তুমি কেন একথা লুকিয়ে রেখেছিলে? –ভয়ে। তোর দিব্যি। কর্নেলস্যারের দিব্যি। গণশা-কেষ্টা শাসিয়ে গিয়েছিল, তাদের নাম বলে দিলে আমার মুণ্ডু কাটবে।

কর্নেল বললেন,–হৈমন্তীদেবী! দাদাকে বাড়ি নিয়ে যান। যথাসময়ে এসে আপনার ঠাকুরদার সিন্দুক আর জুতো দেখব। চিন্তা করবেন না। আপনার প্ল্যানটা ভালো। বাবুগঞ্জে সৎ-ভদ্রমানুষও তো কম নেই। তারা আপনাকে সাহায্য করবেন। গার্লস হাইস্কুল হবে আপনার ঠাকুরদার নামে। আচ্ছা চলি।

 

Read more

কালো পাথর – সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ

Leave a comment

Your email address will not be published.